রং মানেই সৌন্দর্য। রং মানেই জীবনে নতুনত্বের ছোঁয়া। কিন্তু ভাবুন তো, এমন একটি রঙের কথা, যা দেখতে এতটাই সুন্দর ছিল যে ইউরোপের রাজপ্রাসাদ থেকে সাধারণ মানুষের ঘর—সব জায়গায় ছিল তার দাপট। অথচ সেই রং-ই নিঃশব্দে ছড়িয়ে দিত মৃত্যু। কোনও অস্ত্র নয়, কোনও মহামারিও নয়—শুধু একটি রং। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, ইতিহাসে এমন একটি রঙের অস্তিত্ব ছিল। তার নাম ‘প্যারিস গ্রীন’ (Paris Green)। একসময় যাকে আধুনিকতার প্রতীক বলা হতো, পরে সেই রং-ই পরিচিত হয় বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর বিষাক্ত রঞ্জক হিসেবে।

সবুজের প্রেমে মুগ্ধ হয়েছিল ইউরোপ

১৮১৪ সালে ইউরোপে তৈরি হয় প্যারিস গ্রীন। তামা (Copper) ও আর্সেনিক (Arsenic)-এর সংমিশ্রণে তৈরি এই উজ্জ্বল সবুজ রঙটি সমাজে খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। সে সময়ে ইউরোপে এত প্রাণবন্ত ও চকচকে সবুজ রঙের বিকল্প প্রায় ছিলই না। ফলে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এই রঙের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করেছিলো।

অভিজাত বাড়ির ওয়ালপেপার, পর্দা, পোশাক, টুপি, কৃত্রিম ফুল, খেলনা, বইয়ের প্রচ্ছদ, এমনকি শিল্পীদের ক্যানভাসেও জায়গা করে নিয়েছিলো এই প্যারিস গ্রীন। ইউরোপীয় সমাজের বুকে এই রঙ ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলো ফ্যাশন ও অভিজাত রুচির প্রতীক।

সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল বিষ

সমস্যার শুরু হয়েছিল রঙটির ভেতরে থাকা আর্সেনিক থেকে। আর্সেনিক পৃথিবীর অন্যতম বিষাক্ত রাসায়নিক। প্রথমদিকে বিষয়টি কেউ বুঝতে পারেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল, আর্দ্র পরিবেশে বা রং পুরোনো হয়ে গেলে সেখান থেকে বিষাক্ত কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে এবং মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস এবং স্পর্শের মাধ্যমে অনায়াসেই তাদের শরীরে প্রবেশ করছে। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় ছিল— এই বিষক্রিয়া হতো ধীরে ধীরে, ফলে মানুষ অসুস্থ হলেও প্রকৃত কারণ বুঝতে পারতেন না।

কী কী সমস্যা দেখা দিত?

দীর্ঘদিন প্যারিস গ্রীন-এর সংস্পর্শে থাকলে দেখা দিতে পারত—

  • ঘন ঘন মাথাব্যথা
  • বমি ও বমি বমি ভাব
  • চোখ ও ত্বকে জ্বালাপোড়া
  • শ্বাসকষ্ট
  • দুর্বলতা ও স্নায়ুর সমস্যা
  • গুরুতর ক্ষেত্রে অঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যুও

সেই সময় চিকিৎসাবিজ্ঞান এতটা উন্নত ছিল না। ফলে অনেক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ রহস্যই থেকে গিয়েছিল।

নেপোলিয়নের মৃত্যুর সঙ্গেও কি ছিল এই রঙের যোগ?

ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত একটি তত্ত্ব বলছে, নির্বাসনকালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যে বাড়িতে থাকতেন, তার সবুজ ওয়ালপেপারে প্যারিস গ্রীন ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে গবেষণায় তাঁর চুলে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। তবে এই আর্সেনিকের উৎস যে শুধুই প্যারিস গ্রীন ছিল, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এটি তাঁর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হতে পারে, আবার অন্য গবেষকেরা এ বিষয়ে ভিন্ন মতও দিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ হলো ‘বিষের রং’

উনিশ শতকের শেষ দিকে বিজ্ঞানীরা যখন প্যারিস গ্রীন-এর ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হন, তখন ধীরে ধীরে এটি বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। যদিও কিছু সময় কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশক হিসেবে এর ব্যবহার হয়েছিল, পরে সেখান থেকেও তা বাদ দেওয়া হয়। আজও বিশ্বের অধিকাংশ দেশে আর্সেনিকযুক্ত রঞ্জক ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ।

আজও কেন প্যারিস গ্রীন-এর গল্প গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমানে আমরা যে রং, প্রসাধনী, খেলনা বা গৃহসজ্জার সামগ্রী ব্যবহার করি, সেগুলো বাজারে আসার আগে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। এই নিয়মগুলো হঠাৎ তৈরি হয়নি। প্যারিস গ্রীন-এর মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতাই বিজ্ঞানীদের শিখিয়েছে—শুধু দেখতে সুন্দর হলেই কোনও বস্তু নিরাপদ হয় না।

জানেন কি?

আজও বিশ্বের কিছু জাদুঘরে সংরক্ষিত পুরোনো বই, ওয়ালপেপার ও শিল্পকর্মে প্যারিস গ্রীন পাওয়া যায়। তাই সেগুলো সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের সময় বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাতে আর্সেনিকের সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানো যায়।

ইতিহাসের পাতায় রয়ে যাওয়া এই ঝকঝকে প্যারিস গ্রীন রঙের বিবর্ণ ইতিহাস আমাদের জানান দিয়ে যায় যে, অনেক সময় চোখ ধাঁধানো জৌলুসের আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ঙ্কর বিপদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts