ভাদ্রমাসের শেষে আকাশ যখন হালকা মেঘের ভেলায় ভাসতে শুরু করে, আর কারখানার সাইরেনের স্বরের সঙ্গে মিশে যায় ঘুড়ি ওড়ানোর এক অদ্ভুত আমেজ, তখনই আগমন ঘটে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার। হাতে দাঁড়িপাল্লা, হাতুড়ি আর সাথে বৃহদাকার এক হাতি নিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে তাঁর উপস্থিতি বেশ জমকালো। একদিকে প্রদীপ শিখা, মঙ্গলারতি, যন্ত্রপাতির গায়ে লেগে থাকা সিঁদুরের ফোঁটা, আর অন্যদিকে উৎসবের আবহে কাজের ছুটি– এসবের মাঝে একটি পুরোনো প্রশ্ন আজও আমাদের গভীর ভাবনায় ফেলে দেয়—বিশ্বকর্মা কি সত্যিই কোনো একক পৌরাণিক ব্যক্তি, নাকি তিনি আসলে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক অনন্য কারিগরগোষ্ঠী বা প্রথাসিদ্ধ পদবি?
পৌরাণিক কথাসাহিত্যে যার কীর্তির শেষ নেই
লঙ্কা নগরীর স্বর্ণপ্রাসাদ থেকে শুরু করে সমুদ্রবেষ্টিত কৃষ্ণের দ্বারকা পুরী, ইন্দ্রের অজেয় বজ্র থেকে শুরু করে পুরীর জগন্নাথ দেবের মূর্তি—সবকিছুই এই মহাজাগতিক কারিগরের হাতযশ। তবে যদি পুরাণের পাতায় আটকে না থেকে ঋগ্বেদের প্রাচীন স্তোত্রের কথা স্মরণ করা হয়, তবে দৃশ্যপট কিন্তু খানিকটা পাল্টে যায়। সেখানে ‘বিশ্বকর্মা’ কেবল হাতুড়ি-বাটালি হাতে কোনো দেবমূর্তি নন, বরং পরম স্রষ্টার এক নিরাকার বিশেষণ—যিনি ‘বিশ্ব’ অর্থাৎ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডকে নিজের ‘কর্ম’ দিয়ে রূপ দিয়েছেন। অর্থাৎ, বৈদিক দর্শনে তিনি সৃষ্টির আদি ও অখণ্ড মহাজাগতিক শক্তি।
তবে বিশ্বকর্মার এই পরিচয় একেবারে অনন্যও নয়-

বিশ্বের অন্যান্য প্রাচীন মাইথোলজিতেও এমন কিছু চরিত্রের সন্ধান মেলে, যাঁদের ভূমিকার সঙ্গে বিশ্বকর্মার আশ্চর্য মিল রয়েছে। গ্রিক পুরাণের হেফাইস্টাস (Hephaestus) ছিলেন দেবতাদের কারিগর ও কামার—দেবতাদের জন্য অস্ত্র, বর্ম এবং নানা অলৌকিক বস্তু নির্মাণের কৃতিত্ব ছিল তাঁর। মিশরীয় পুরাণে পতাহ (Ptah) ছিলেন কারিগর ও স্থপতিদের সঙ্গে যুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ দেবতা; একই সঙ্গে তাঁকে সৃষ্টির ধারণার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়। ফিনিশ মহাকাব্য Kalevala-য় বর্ণিত ইলমারিনেন (Ilmarinen) ছিলেন এক অতিমানবীয় দক্ষ কারিগর ও নির্মাতা, যাঁর হাতে তৈরি হয়েছিল নানা আশ্চর্য বস্তু। অর্থাৎ, বিভিন্ন সভ্যতার কল্পনায় বারবার ফিরে এসেছে এমন এক ‘দেবশিল্পী’র ধারণা—যিনি সাধারণ মানুষের কারিগরি দক্ষতাকে দেবত্বের স্তরে উন্নীত করেন। তবে ভারতীয় বিশ্বকর্মার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও জটিল, কারণ এখানে ‘বিশ্বকর্মা’ কখনও দেবশিল্পী, কখনও স্রষ্টা, আবার কখনও কারিগরদের আদি প্রতীক হিসেবে সামনে আসেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব এবং নৃবিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় কিন্তু উঠে আসে আরও এক রোমাঞ্চকর ও বস্তুনিষ্ঠ সত্য। বৈদিক যুগ বা তার ঠিক পরবর্তী সময়ে প্রাচীন ভারতে স্থাপত্য, ভাস্কর্য এবং ধাতুর কাজে পারদর্শী কারিগরদের একটি বিরাট নিজস্ব ধারা গড়ে উঠেছিল। সত্যযুগ থেকে শুরু করে ত্রেতা ও দ্বাপর—হাজার হাজার বছরের মেয়াদে লঙ্কা, হস্তিনাপুর, দ্বারকা কিংবা পুরীর জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ নির্মাণের মতো সুবিশাল প্রকৌশল বিদ্যা কি কোনো একক মানুষের আয়ু বা ক্ষমতার মধ্যে সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়।

ইতিহাসবিদদের মতে, যুগে যুগে ভারতবর্ষের বুকে যেসব সর্বশ্রেষ্ঠ স্থাপত্যশিল্পী, নকশাকার ও ধাতুবিদ জন্মেছিলেন, সমাজ তাঁদের পৃথক ব্যক্তিসত্তাকে এক ছাদের নিচে এনে এক শ্রদ্ধেয় যৌথ পরিচয় দিয়েছিল, যার নাম ‘বিশ্বকর্মা’। এই অনুমানকে জোরালো ভিত্তি দেয় প্রাচীন স্থাপত্যগ্রন্থ ‘বিশ্বকর্মা প্রকাশ’ বা ‘শিল্পশাস্ত্র’। শত শত বছর ধরে বিস্তৃত এই আকর গ্রন্থগুলো কোনো একক লেখনীর ফসল নয়; এগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংগৃহীত ও পরিমার্জিত কারিগরি অভিজ্ঞতার এক অমূল্য দলিল। কাঠের কাজ থেকে শুরু করে সোনা, লোহা কিংবা পাথরের ভাস্কর—সব ধরনের কারিগর সমাজ নিজেদের এই আদি সত্তার মানসপুত্র মনে করতেন। নিজের ব্যক্তিগত অহংবোধ বা নামযশের তোয়াক্কা না করে তাঁরা নিজেদের সেরা সৃষ্টিগুলোকে এই কাল্পনিক আদি গুরুর নামেই উৎসর্গ করে ধন্য হতেন।
তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়
দিনশেষে তিনি একক কোনো পৌরাণিক দেব-কারিগর হোন, কিংবা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা কোনো কুশলী কারিগর সম্প্রদায়, একটি বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে বিশ্বকর্মা আসলে মানুষের গড়ে তোলার দুর্নিবার বাসনা এবং কারিগরি মেধার এক রূপক উদযাপন। তাই প্রতি বছর যন্ত্রপাতির ধূলো মুছে সিঁদুর ছোঁয়াতে গিয়ে আমরা শুধু দেবতার উদ্দেশ্যে হাত জোড় করি না, বরং স্যালুট জানাই মানুষের সেই অসীম সৃষ্টিশীলতা, শিল্পবোধ এবং সভ্যতা নির্মাণের অজস্র অদৃশ্য হাতকে। তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়—বিশ্বকর্মা কি সত্যিই কোনো একক পৌরাণিক ব্যক্তি, নাকি যুগে যুগে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কারিগর, স্থপতি ও শিল্পীর সম্মিলিত সত্তার এক প্রতীকী রূপ? বিশ্বকর্মা কি একজন দেবতা, নাকি এক সমগ্র কারিগরগোষ্ঠীর রূপক? উত্তরটা হয়তো লুকিয়ে আছে ইতিহাস, পুরাণ আর মানুষের সৃষ্টিশীলতার সেই সংযোগস্থলেই।