তারাপীঠের আকাশ সেদিন অস্বাভাবিক রকমের কালো। কৌশিকী অমাবস্যা। চারদিকে ঘন অন্ধকার। দ্বারকা নদের জল নিঃশব্দে বয়ে চলেছে। দূরের মন্দিরে ভক্তদের ভিড়, অথচ শ্মশানের এক কোণে পুরনো শিমুল গাছের নিচে একা বসে আছেন বামাখ্যাপা।

সামনে ধুনির আগুন। চোখ বন্ধ করে তিনি ধীরে বললেন, ‘মা… আজ কি আসবি?’ কোনও উত্তর এল না। শুধু দূরে শেয়ালের ডাক।

হঠাৎ নিভে গেল ধুনির আগুন। চারদিক অন্ধকার। ঠিক তখনই দূরের মন্দির থেকে ভেসে এল ঘণ্টার শব্দ। একবার, দু’বার, তারপর একটানা ঘণ্টাধ্বনি। বামাখ্যাপা উঠে দাঁড়ালেন। ‘মা এসেছিস?’

মন্দিরের দরজা তখনও বন্ধ। তিনি শ্মশানের আরও গভীরে এগিয়ে গেলেন। চারদিকে কুয়াশা। হঠাৎ সামনে দেখা গেল একটি ছোট মেয়ে। পরনে লাল কাপড়, খোলা চুল, মুখে অদ্ভুত শান্তি।

‘এই রাতে এখানে একা কেন মা?’

মেয়েটি কোনও উত্তর দিল না। শুধু হাতের ইশারায় তাঁকে অনুসরণ করতে বলল।

কিছুদূর গিয়ে মেয়েটি থামল। ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকাতেই বদলে গেল চারপাশ। শ্মশানের সব আগুন একসঙ্গে জ্বলে উঠল। আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো। সেই আলোয় বামাখ্যাপা দেখলেন— মা কালী।

তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ‘মা!’

মা কালী মৃদু হেসে বললেন, ‘বামা, সবাই আমাকে ভয় পায়। তুই কেন ভয় পাস না?’

বামাখ্যাপার উত্তর, ‘তুই তো আমার মা। মাকে আবার ভয় কিসের?’

মা বললেন, ‘এই রাত অন্ধকারের নয়, শক্তির রাত। যে সত্যি করে আমাকে ডাকে, আমি তার কাছে যাই।’

বামাখ্যাপা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘মা, তাহলে মানুষের এত দুঃখ কেন?’

মা কালী বললেন, ‘দুঃখের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের ভিতরের শক্তিকে চিনতে শেখে।’

এরপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল মায়ের রূপ। ভোরে বামাখ্যাপার চোখ খুলল। সামনে কেউ নেই। শুধু ধুনির পাশে পড়ে আছে একটি লাল জবা ফুল।

ফুলটি হাতে তুলে তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘মা এসেছিলি…।’

আজও তারাপীঠের লোককথায় বেঁচে আছে সেই রাত— কৌশিকী অমাবস্যার গভীর অন্ধকারে মায়ের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন এক পাগল সাধক, বামাখ্যাপা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts