রাখিবন্ধনের ঐতিহ্যবাহী বয়ানে ‘রক্ষা করা’ শব্দটির প্রাধান্যই বেশি। সেখানে একপক্ষ সুতোর বন্ধনে নিজের নিরাপত্তা খোঁজে, আর অন্যপক্ষ থেকে যায় আশ্রয়দাতা বা রক্ষকের ভূমিকায়। কিন্তু এই সনাতন দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরে কি অজান্তেই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সুপেরিয়রিটি (Superiority Complex)? একজন প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাধীন মানুষকে কি অন্য কারোর ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, নাকি সেই সুরক্ষার আড়ালে খর্ব হয় তার নিজস্ব আত্মনিয়ন্ত্রণ?
মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে দেখলে, এই প্রটেকশনিস্ট মাইন্ডসেট সম্পর্কের ভেতরে এক Hierarchy তৈরি করে। যে রক্ষা করছে, সে অজান্তেই ক্ষমতার ওপরের ধাপে বসে যায়, আর যাকে রক্ষা করা হচ্ছে, তাকে ধরা হয় অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা নির্ভরশীল হিসেবে। কিন্তু জানেন কি এই রাখীবন্ধনের শুরুটা ঠিক কোথা থেকে হয়েছিলো, প্রথম সুরক্ষার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল কোনো পুরুষ নয় বরং একজন নারী।
অবাক হচ্ছেন? চলুন আপনাদের একটা কাহিনি মনে করিয়ে দিই। মহাভারতের সভা পর্ব, যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞ উপলক্ষে তখন ইন্দ্রপ্রস্থের রাজসভায় সমবেত হয়েছেন অসংখ্য রাজা-মহারাজা। সেই সভায় শ্রীকৃষ্ণকে বিশেষ সম্মান দেওয়া হলে ক্রোধে ফেটে পড়লেন চেদিরাজ শিশুপাল। একের পর এক তীব্র বাক্যে তিনি কৃষ্ণকে অপমান করতে শুরু করলেন।
কিন্তু কৃষ্ণ নীরব। কারণ শিশুপালের মাকে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—তাঁর পুত্রের একশোটি অপরাধ তিনি ক্ষমা করবেন। শিশুপালের অপরাধের সংখ্যা যখন সেই সীমা পেরিয়ে গেল, তখন আর নীরব থাকলেন না কৃষ্ণ। তাঁর হাতে আবির্ভূত হল সুদর্শন চক্র। মুহূর্তের মধ্যেই সেই চক্র শিশুপালের জীবনাবসান ঘটাল।
সুদর্শন চক্র ফিরে আসার সময় কৃষ্ণের আঙুলে আঘাত লেগে রক্ত ঝরতে শুরু করল। সভার এত মানুষের মধ্যে দ্রৌপদীই প্রথম ছুটে এসে নিজের শাড়ির এক টুকরো ছিঁড়ে বেঁধে দিলেন কৃষ্ণের রক্তাক্ত আঙুলে।

কৃষ্ণের চোখে তখন সেই ছোট্ট কাপড়ের টুকরো যেন হয়ে উঠল এক গভীর ভালোবাসার প্রতীক। দ্রৌপদী সেদিন কোনও প্রতিদানের কথা ভাবেননি, পেতে চাননি কোনো সুরক্ষা বলয়। শুধু আপনজনের কষ্ট দেখে নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, জড়িয়ে দিয়েছিলেন মমতার স্মারকচিহ্ন। আর সেই মমতার ঋণ কৃষ্ণও মনে রেখেছিলেন, দৌপদীকে দিয়েছিলেন রক্ষা করার আশ্বাস। পরে যখন দ্রৌপদী কুরুসভায় অসন্মানের মুখে পড়লেন, তখন কৃষ্ণ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই এই গল্পের মধ্যে শুধু রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি নেই; আছে একজনের বিপদে অন্যজনের নিঃস্বার্থভাবে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার গল্প। আর হয়তো সেখানেই রাখির সবচেয়ে সুন্দর অর্থটি লুকিয়ে আছে—সম্পর্কে কে কাকে রক্ষা করবে, সেই হিসেব নয়; বরং প্রয়োজনের মুহূর্তে কে কার পাশে দাঁড়াবে, সেই অঙ্গীকার।
আধুনিক সম্পর্কের সমতাবাদী মনস্তত্ত্ব (Egalitarian Psychology) এই বয়ানকেই সমর্থন জানায়। সেখানে রাখির সুতোটি পিতৃতান্ত্রিক বা প্রটেকশনিস্ট ক্ষমতার স্মারক নয়, বরং তা দুই স্বতন্ত্র সত্তার পারস্পরিক সম্মানের চিহ্ন।
এখানে ‘সুরক্ষা’ শব্দটির অর্থ বদলে দেওয়া জরুরি।
- সুরক্ষা মানে ক্ষমতা নয়: এই সুরক্ষা কোনো শারীরিক বা সামাজিক কর্তৃত্ব নয়; এটি মূলত এক মনস্তাত্ত্বিক অভয়সূত্র।
- অধিকার ও স্বকীয়তা স্বীকার: একে অপরের জীবনধারা, সিদ্ধান্ত ও আত্মনিয়ন্ত্রণকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত না করে, যেমন সে আছে ঠিক তেমনভাবেই তাকে গ্রহণ করা ও সম্মান জানানো।
- সমান অধিকারের চুক্তি: রাখি কেবল বোনের ভাইয়ের প্রতি বা ভাইয়ের বোনের প্রতি একতরফা সুরক্ষার দাবি নয়, বরং এটি একে অপরের উপস্থিতিকে উদযাপনের এক দ্বি-পাক্ষিক আত্মিক চুক্তি।
সাহিত্যেও এই সম্পর্কের বিবর্তন লক্ষ করা যায়। যেখানে সম্পর্কের বাঁধন কাউকে ছোট বা পরনির্ভরশীল করে না, বরং উভয়কে দেয় নিজস্ব ডানা মেলে ধরার মানসিক বল। সুতোর গিটটি যেন কাউকে ‘আশ্রিত’ করে রাখার অহংকার না হয়ে ওঠে; বরং তা হয়ে উঠুক দুই স্বাধীন মানুষের পারস্পরিক আস্থা, সহমর্মিতা এবং একে অপরের আত্মনিয়ন্ত্রণকে পূর্ণ সম্মান জানানোর এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক দলিল। তাহলে আপনার কি মনে হয়, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রাখিবন্ধনের কি পুনর্মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন?
