সময় বদলেছে, ফ্যাশন বদলেছে, বিয়ের সাজেও এসেছে নতুন নতুন ট্রেন্ড। তবুও বাঙালি বিয়ের কিছু গয়না আজও সময়ের স্রোত পেরিয়ে টিকে আছে – কিছু দৃশ্যমান, কিছু আবার হারিয়ে গিয়েও রয়ে গিয়েছে মনের স্মৃতির পাতায়।

একসময় এই গয়নাগুলো শুধু সাজের অংশ ছিল না। ছিল পরিচয়, আভিজাত্য, আর অনেক অজানা গল্পের বাহক। দিদিমার আলমারিতে যত্ন করে তুলে রাখা তার নিজের বিয়েতে পড়া গয়না হোক, কিংবা মায়ের সংসার খরচ বাঁচিয়ে নিজের মেয়ের বিয়ের জন্য বানানো গয়না। সবেতেই ধরা পড়ে বাঙালি বিয়ের ঐতিহ্য।

আজ আমরা খুঁজে দেখবো সেইসব গয়নার গল্প – যেগুলো হয়তো এখন আর খুব একটা দেখা যায় না, কিন্তু একসময় এগুলো ছিল বাঙালি সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।

১. খোঁপা পিন / খোঁপা ঝুমকাঃ

খোঁপার মধ্যে লাগানো এই গয়নাটি একসময় বাঙালি বধূর সাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ফুল বা ঝুমকার মতো ডিজাইন খোঁপাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলত। এখন এটি খুব কম দেখা যায়, কিন্তু পুরোনো ছবিতে এর ছাপ স্পষ্ট।

২. পৈছা হারঃ

কয়েন বা মুদ্রার মতো ডিজাইনে তৈরি এই হার সমৃদ্ধির প্রতীক ছিল। গ্রামবাংলার জমিদার বাড়ির বিয়েতে আগে এটি বেশ প্রচলিত ছিল। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী ডিজাইনের মোটা হার প্রায় হারিয়ে গেছে বলা যেতে পারে। তবে এখন আবার শুধু গিনি দিয়ে ছোট পেন্ডেন্ট, আংটি বা কানের দুলের ডিজাইন চোখে পড়ে।

৩. হাতফুলঃ

হাতের আঙুল থেকে কবজি পর্যন্ত সংযুক্ত এই গয়নাটি বধূর হাতে আলাদা সৌন্দর্য এনে দিত। আগের ডিজাইনগুলো ছিল ভারী ও সুক্ষ, যা এখনকার তুলনায় অনেক বেশি সুন্দর আর ঐতিহ্যবাহী। এখন আধুনিক রূপে দেখা গেলেও পুরোনো স্টাইল খুবই কম।

৪. দুলাভাতি নাকছাবিঃ

বড় আকারের এই নাকছাবি দুটি চেইন দিয়ে কানের সাথে আটকানো থাকত। তাই এটি দুলাভাতি নামে পরিচিত ছিল। আগে বিয়েতে এই ধরনের নাকছাবির প্রচলন ছিল বেশি। এখনকার মিনিমাল নাকছাবির ভিড়ে এটি প্রায় হারিয়ে গেছে বলা যায়।

৫. দর্পণ হারঃ

ছোট আয়নাকে পেনডেন্টের সঙ্গে যুক্ত করে এই হার নতুন বউদের পরানো হত। বিয়ের সময় নজর লাগা থেকে রক্ষার প্রতীক হিসেবে ধরা হত। অলংকারের পাশাপাশি এর মধ্যে ছিল বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ছোঁয়া। আজকাল এই ধরনের গয়না খুব একটা দেখা যায় না।

৬. সোনার সুতো হারঃ

অনেকগুলো সরু সোনার চেইন একসাথে গেঁথে তৈরি এই হার দেখতে বেশ সিম্পল লাগে কিন্তু জিনিসটা অত্যন্ত সুন্দর। আগে এটি দৈনন্দিন ও বিয়ের সাজ – দুই জায়গাতেই ব্যবহার করা হত। এখন ভারী ও জাঁকজমক ডিজাইনের ভিড়ে এটি হারিয়ে গেছে বলা যায়।

৭. প্রজাপতি টিকলিঃ

প্রজাপতির মতো নকশার এই টিকলি কপালের মাঝখানে পরলে বধূর সাজে আলাদা আকর্ষণ যোগ করত। আগেকার দিনে এই টিকলিরই ডিজাইন বেশ জনপ্রিয় ছিল। এখনও বেশ অনেক নববধূকে এই ডিজাইনের টিকলি নিজের বিশেষ দিনের জন্য বেছে নিতে দেখা যায়, তাহলে এটা মানতেই হবে এর সৌন্দর্য এখনও নজরকাড়া।

আজকের ঝলমলে বিয়ের অনুষ্ঠানে হয়তো এই গয়নাগুলোর জায়গা অনেকটাই কমে এসেছে। নতুন ডিজাইন, নতুন ট্রেন্ডের ভিড়ে তারা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও, তারা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি – তারা লুকিয়ে আছে পুরোনো ট্রাঙ্কে, দিদিমার গল্পে, আর সেইসব সেপিয়া রঙের পুরনো ছবিতে যেখানে এক বধূর সাজে মিশে ছিল সংস্কৃতি আর আভিজাত্যের ছোঁয়া। এখন তো বাঙালি বিয়েতে যোগ হয়েছে মেহেন্দি, সঙ্গীত আর অনেক জায়গায় দেখা যায় গায়ে হলুদ হয়ে গেছে অবাঙালিদের ‘হলদি’। যাইহোক হয়তো আবার কোনোদিন, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে সেই পুরোনো গয়নাগুলো ফিরে আসবে – নতুনভাবে, নতুন গল্প নিয়ে। কারণ, ঐতিহ্য কখনও হারিয়ে যায় না…সে শুধু অপেক্ষা করে, আবার ফিরে আসার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts