jamdani

বিস্ময়কর নায়াগ্রা

মনিকা মিত্র

সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘ এ পয়েন্ট অব নো রিটার্ন ‘ – বড় বড় গাছ উপড়ে ফেলে রেখেছে বুকের ওপর, বিশাল স্কেলিটনের মতো দেখতে লাগছে। নদীটি পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে – যেমন তার স্রোত তেমন তার গর্জন। এ হল নায়াগ্রা নদী। দেখলে প্রথমে থমকে যেতে হবে। রবিঠাকুরের গানের বাস্তব রূপ ‘ নদী আপন বেগে পাগল পারা ‘ যে কী ভয়ংকর হতে পারে তা নায়েগ্রা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন । আর তার দূর্বার গতির যখনই ছন্দপতন ( fall-175 ফুট) হচ্ছে যে যেন হা-হা রবে গর্জন করে জল ছিটকে দিচ্ছে আকেশের দিকে। তখন নদীর ফেনারাশি, জলকণা, মেঘ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে এক অতুলনীয় সৌন্দর্যের স্ষ্টি করছে ।

নায়াগ্রার অর্থ জলরাশি। সেই কোন বরফ যুগের শেষে হিমবা  গলে বাধাবন্ধহারা হয়ে তা তা থৈথৈ রবে ছুটে চলেছে। লেক অন্টারিও থেকে নায়াগ্রা নদী এরি হ্রদ হয়ে আটল্যান্টিক মহাসাগরে গিয়ে পড়ছে প্রতি-মিনিটে ১৬৮০০০ মিটার বেগে। তাই নদীর এই প্রচণ্ড স্রোতে পড়ে গেলে কেউ আর ফেরে না। এত যে গর্জন, নদীর পাড় কিন্তু অদ্ভুত রকম শান্ত সুন্দর। যেন ধ্যানস্থ।

সবুজ ঘাসের গালচে পাতা তীরভূমিতে বড় বড় গাছ, যেন রবি কবির সেই ‘ তন্দ্রাহারা স্তব্ধ চাঁপার তরু!’

ঘাসের গালচেতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে কত সাদা সাদা সিগাল- নদীর মাছই যে তাদের প্রশান্তির কারণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই লেক গার্ডেন-এ উপভোগ করার জন্য আছে গাছের তলায় বেচ। নায়াগ্রা ফলস আমেরিকার সব থেকে পুরোনো state Park. ১৮৮৫ সালে এক বিখ্যাত আরকিটেক্ট ফ্রেড্ররিক ল অমস্টেড (Frederick law Olmsted) এর ডিজাইন করেন ।

গত সামারে প্রোগ্রাম করা হয় নায়াগ্রা দেখার, সেই মতো আমরা কলকাতা থেকে মুম্বাই হয়ে গিয়ে পৌঁছোলাম নিউ জার্সির নেওয়ার্ক বিমান বন্দরে- রাত তখন ১০ টা। তবে ওদেশে ওদেশে রাত ১২ টা। বিশাল বিমান বন্দর কখনও এসকেলটর চেপে কখনও এয়ার বাস,আবার কখনও লিফটে নেমে হোটেন ‘ Road way inn?’

পরদিন সকালে হোটেলে কমপ্লিমেনটারি ব্রেকফাস্ট সেরে ‘ মিশন নায়াগ্রা ‘ ?

নিউ জার্সিতে ছবির মতো সব সুন্দর ফুলের বাগান দিয়ে সাজানো বাড়িঘর।

নির্জন রাস্তাঘাট। শহরকে পেছনে ফেলে আমাদের গাড়ি ক্রমশ ঢুকে পড়ল গভীর অরণ্যে। এই ভাবে প্রায় ঘন্টা সাত সবুজের মধ্যে দিয়ে পথ চলা। গোল গোল পাতা বিশিষ্ট ৩০ ফুট উচ্চতার একই রকম গাছ, মাঝে মাঝে ফার বা সিলভার ফারের গাছ। প্রায় ব্ষ্টি হয় বলেই এই সবুজতা।

 

ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিস্কার করেন তখন লিখেছিলেন।

” This island is quite big and all of it so green that is pleasure to look at it…”

Oct 12 & 13, 1492

গাছেদের এই সজীবতা আমরা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে করতে চলেছি।

ফিলাডেলফিয়া , পিটসবার্গ, পেনসিলভেনিয়া ইত্যাদি কত শহর ছুঁয়ে চলেছি  প্রাকৃতিকসৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখে । বনের ভেতর তিরিশ-চল্লিশটি ঘর-বাড়ি স্কুল-কলেজ নিয়ে এক একটি স্বনির্ভর শহরে।

মাছে মাঝে আসছে রেস্টিং এরিয়া। বড় বড় গাছের নীচে যেন ঘাসের সবুজ মখমুল পাতা। কাঠের বসার বেঞ্চ ও টেবিলে পাতা রয়েছে । সেই  প্রাকৃতিক  পরিবেশে অল্প কিছু খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার পথ চলা। দু-চার ঘন্টা চলার পর অরণ্যের ফাঁক দিয়ে নীলচে মেঘের মতো সব পাহাড় উঁকিঝুঁকি দিয়ে যেন লুকোচুরি খেলতে লাগল।

একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম এত যে গাছগাছালি কিন্তু বনের মধ্যে মিষ্টি গান গাওয়া পাখি চোখে পড়ল না। হয়তো বনে মিষ্টি ফলের অভাব বলেই। বনের পাখি বলতে প্যাঁচা, সি-গাল ও হাঁস এইসব। আর জীব –জানোয়ার বলতে দু-এক প্রজাতির হরিণ, কাঠবেড়ালি ও ভাল্লুক ।

অন্তবিহীন পথ পেরিয়ে অবশেষে ‘ নায়াগ্রা সিটি ‘ –র ‘ বেস্ট ওয়েস্টার্ন  ‘ হোটেলে। এখানেই সব ইনফরমেশন পাওয়া গেল। রাত ন’টা থেকে বারোটা পর্যন্ত নায়াগ্রা ফলসকে আলোর সাহায্যে দেখানোর। ব্যবস্থা আছে। বরফের সময় বা এপ্রিল, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর-এর শুক্র, শনি ও রবিবার বা স্পেশাল দিনে নায়াগ্রাকে রামধনু রঙে আলোকিত করা হয়। আতশবাজি পোড়ানো হয়।

কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য- প্রচণ্ড ব্ষ্টিতে ভেজাই সার হল । সেদিন রাতে নায়াগ্রাকে ভালো করে দেখতে পারলাম না আমরা । কেবল নায়াগ্রার অদম্য গতিতে ছুটে আসা ও হা-হা রবে গর্জন করে একশো পঁচাত্তর ফুট নীচে আচরে পড়া দেখে হাড় হিম হয়ে যাচ্ছিল।

কাছেই ‘ ইন্ডিয়ান টেস্ট ‘ – এক রেস্তোরাঁ। সেখানে ডিনার সেরে হোটেলে ফেরা হল।  পরদিন বেশ ঝকমকে রোদ-ঝরা সকাল দেখে হোটেলের ড্রায়ারে জামা-জুতো –ছাতা শুকিয়ে মনে অনেক আশা নিয়ে আবার বের হলাম নায়াগ্রা দর্শনে । কিন্তু বিধি বাম। নায়াগ্রার কাছাকাছি পৌছাতেই প্রবল ব্ষ্টি। সঙ্গে বজ্রের গর্জন ও বিদ্যুতের চোখরাঙানি।

এবারে নীচুতে অন্য পয়েন্ট থেকেই ফিরে আসতে হল। মনটা দমে গেল । এতদূর থেকে আসা , কিন্তু নায়াগ্রা তার কাছেই যে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। ছুটে আশ্রয় নিলাম একটি সুভনির হাউসে। অল্প শপিং ও খাওয়া দেওয়ার জন্য। রোড সাইডে ছাতার নীচে বসার ব্যাবস্থা আছে। ঢোকার মুখে এক আমেরিকান মহিলা হাসিমুখে বললেন ‘ এখানে শ্রিম্পরোস্ট স্যান্ডুইচ খেয়ে দেখো-দারুণ করেছে’। যেন কত কালের চেনা। এরা এই রকমই হাসিখুশি আর হেল্পিং মুডে। সত্যিকথা বলতে কী আমাদের ওই কাঁচা বাঁধাকপি, কাঁচা গাজর , অল্প রোস্ট করা চিকেন বা চিংড়ি খুব একটা ভাল লাগেনি। কিন্তু অন্যরা অম্লানবদনে খেয়ে চলেছে।

হঠাৎই ঝকঝকে রোদ্দুর উঠেছে দেখে স্ক্লের সঙ্গে আমরাও ফসলের দিকে দৌড় লাগালাম। যদি মিস্টের ওপর রামধনু রং দেখার সৌভাগ্য হয়। কিন্তু আবারও ব্ষ্টি। উঠে পড়লাম শাটল বাস ‘ নায়াগ্রা সিনিক ট্রলি’তে। গাইড আমাদের নানান দ্রষ্টব্য জায়গা দেখাতে ও বোঝাতে চলল।

দেখা গেল –গেট আইল্যান্ড থ্রি-সিস্টার আইল্যান্ড থ্রি-সিস্টার আইল্যান্ড, অ্যাকোইয়ারিয়াম ইত্যাদি । আমরা অবশ্য কোথাও না নেমে একেবারে ‘ প্রসপেক্ট পয়েন্ট ‘ হয়ে ‘ গ্লোসারভেশন-টাওয়া ‘ –এ ওঠাড় জন্য টিকিট কাটলাম। তিরিশ ডলার মত লাগল।

তিনশো ফুট উঁচু এই টাওয়ার থেকে ‘ আমেরিকান ফলস ‘ , ব্রাইডাল ফলস ও কানাডা ফলস – এই তিনটি জলপ্রপাতই সুন্দর দেখা যায়। ওপারে কানাডার বড় বিল্ডিং ও কানাডা- আমেরিকার সংযোগকারী ‘ রেনবো ‘ সেতুটি দেখা যায়। ভিসা থাকলে কানাডা ঘুরেও আসা যায়। তা ছাড়া এলিভেটরে নেমে জলপ্রপাতের ভেতরে ঢুকে দেখার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্থিবী বিখ্যাত ‘ মেইড অব দি মিস্ট বোট ট্যুর ‘ লঞ্চে।

লঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেককে নীল পলিথিন ক্লোও দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হল। তখন মেঘের গর্জন ও বিদ্যুতের ঝলকানি। নীচ অশান্ত নায়াগ্রা। মুখে হাসি, কিন্তু দূরু দূরু বুকে দেবতাকে স্মরণ করে লঞ্চের খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কুয়াশাছন্ন এক রাজ্যের মধ্যে প্রবেশ করলাম। অজস্র জলকনা মাথার আর্শীর্বাদের মতো ঝরে পড়ল।

আস্তে আস্তে ধোঁয়াশার ঘোমটা সরিয়ে জলপ্রপাত গুলি দ্শ্যমান হল। প্থিবীর এ এক আশ্চর্য।

প্রথমে ‘ আমেরিকান ফলসের ‘ সবুজ আভা, পরে ধূসর রঙের ‘ ব্রাইডাল ফলস ‘ ও তারপর শ্বেতশুভ্র অশ্বক্ষুরাকতি ‘ কানাডা ফলস ‘ –এর জলের ধারা বিশাল এক বরফের প্রাচীরের মতো আমাদের ঘিরে ধরল। ভয়- ভাবনা কোথায় ধুয়েমুছে উধাও- দর্শকদের মুগ্ধ উচ্ছাস ও মুহুর্মুর্হু ফ্লাশের ঝলকানি।

প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ মিনিট ধরে লঞ্চটি আমেদের প্রকৃতির ঐ প্রলংকর ও রহস্যময় রাজ্য ঘুরিয়ে আবার নির্বিঘ্নে ফিরিয়ে আনল।

আমেরিকার পর্যটন বিভাগ ১৮৮৬ সাল থেকে এই পরিষেবা দিয়ে আসছে। মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিটের অভিজ্ঞতা, কিন্তু মনে থাকবে চিরদিন।

এছাড়া যদি গর্জ-এর গভীর জলপ্রপাতের আরোও কাছে গিয়ে জলোচ্ছ্বাসের শক্তি অনুভব করতে চাও তাহলে ‘ কেভ অফ দ্য উইন্ডের ‘ সুরঙ্গ দিয়ে নেমে ‘ হ্যারিকেন ডেক ‘ এ যেতে হবে-এ এক অন্য জগৎ ,  অন্য প্রকতি । তবে উঠে আসার রাস্তাটিতে তিনশোটির মতো পিচ্ছিল সিঁড়ি রয়েছে কিন্তু। টিকিটের সঙ্গে ‘ সুভ্যেনিসের চপ্পল ও হলুদ ক্লোক বর্ষাতিও দেওয়া হয়। এখানে রাতেও দেখার ব্যবস্তা আছে, তবে সেটা সিজনাল।

হরেক মজার জন্য আছে নায়াগ্রা গর্জ ডিসকভারি সেন্টার। বরফের যুগ থেকে কীভাবে লেক ও জলপ্রপাতের স্ষ্টি তা দেখানো হয়। আছে নায়াগ্রা  অ্যাডভেঞ্চার থিয়েটার- পঁয়তাল্লিশ ফুট পর্দায় বারো হাজার বছের মিথ, মিরাকল ও অ্যাডভেঞ্চারের নানা কাহিনির ফিলম- ছ’রকম ভাষায় দেখেনো হয়।

রয়েছে নায়াগ্রা স্কুব সেন্টার, লক পোর্ট লকস অ্যান্ড এরিক্যানাল ক্রুজেস। জলে তুফান তুলে রোমহর্ষক Whirl pool jet bool tour করা যায় মাত্র পনেরো মিনিটে।

আর ‘পাখির চোখে’ নায়াগ্রাকে দেখে নেওয়ার জন্য আছে রেনবো এয়ার হেলিকপ্টার ট্যুর।

এছাড়াও আছে জলবিদ্যুত কেন্দ্র, হন্টে হাউস, ওয়াক্স মিউজিয়াম। তিনটি দূর্গ। রয়েছে ক্যাসিনো। ৪০ টি গলফ কোর্স, আরও কত কী।

 

Trending


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes