jamdani

‘বসন্তেশ্বরী’ রূপ নিল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’তে

ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

১৩৩৮ বঙ্গাব্দের (১৯৩২) খ্রিস্টাব্দের চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমীর প্রভাতে বাসন্তী ও অন্নপূর্ণা পুজোর সন্ধিক্ষণে যে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হয় ‘বসন্তেশ্বরী’ নামে একটি চম্পু শ্রীশ্রী মার্কন্ডেয় চণ্ডীর বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে বাণীকুমার লিখে ফেললেন। পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র বালীর সুর-সর্জনে রাগ বসন্ত এবং দেশী, দেবগিরি, বরাটী, তোড়ী, ললিতা ও হিন্দোলী— এই ছয় রাগিনী বাণী-সংযোগে এক অপূর্ব রসের সঞ্চার হয়। পঙ্কজকুমার মল্লিক অন্যান্য গানের সুর দেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কয়েকটি নাট্য-কথা সূত্র ও গীতাংশ পাঠ করেন এবং বাণীকুমার শ্রীশ্রীচণ্ডীর কতিপয় শ্লোক আবৃত্তি করেন। রাইচাঁদ বড়ালের সঙ্গীত পরিচালনায় ও বাণীকুমারের প্রবর্তনায় অনুষ্ঠানটি রসোর্ত্তীর্ণ হয়। এই অনুষ্ঠানটিই হচ্ছে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ পরিকল্পনার উৎস।
মহালয়ার দিন ভোর চারটের সময় রেডিয়ো থেকে ভেসে আসে সেই ঘোষণা: “আজ দেবীপক্ষের প্রাক-প্রত্যুষে জ্যোতির্ম্ময়ী জগন্মাতা মহাশক্তির শুভ আগমন-বার্তা আকাশ-বাতাসে বিঘোষিত। মহাদেবীর পুণ্য স্তবনমন্ত্রে মানবলোকে জাগরিত হোক ভূমানন্দের অপূর্ব প্রেরণা। আজ শারদ গগনে-গগনে দেবী ঊষা ঘোষণা করছেন মহাশক্তির শুভ আবির্ভাব-ক্ষণ।”

তারপর তিনবার শঙ্খধ্বনি। তারপর সুরে সুরে…

যা চণ্ডী মধুকৈটভাদিদৈত্যদলনী যা মাহিষোন্মূলিনী
যা ধূম্রেক্ষণচণ্ডমুণ্ডমথনী যা রক্তবীজাশনী।… [সমবেত কন্ঠ]
সমবেত কন্ঠে গান শেষের পরে – বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উচ্চারণে, সংস্কৃত স্তোত্রপাঠে দেবীর আগমন-বার্তা…

আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর; ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা। আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নব ভাবমাধুরীর সঞ্জীবন।তাই আনন্দিতা শ্যামলীমাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন। আজ চিৎ-শক্তিরূপিনী বিশ্বজননীর শারদ-স্মৃতিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবোধিতা।

সিংহস্থা শশিশেখরা মরকতপ্রখ্যা চতুর্ভির্ভুজৈঃ/শঙ্খং চক্রধনুঃশরাংশ্চ দধতী নেত্রৈস্ত্রিভিঃ শোভিতা।…

স্তোত্রপাঠের পরে সুরের মূর্চ্ছনায়, সুপ্রীতি ঘোষের মায়াময় গায়কীতে-

বাজলো তোমার আলোর বেণু, মাতলো যে ভুবন।
আজ প্রভাতে সে সুর শুনে খুলে দিনু মন।…

হে ভগবতী মহামায়া, তুমি ত্রিগুণাত্মিকা; তুমি রজোগুণে ব্রহ্মার গৃহিণী বাগ্‌দেবী, সত্ত্বগুণে বিষ্ণুর পত্নী লক্ষ্মী, তমোগুণে শিবের বণিতা পার্বতী, …তোমার আবির্ভাবে ধরণী হোক প্রাণময়ী। জাগো! জাগো, জাগো মা!

স্তোত্রপাঠের শেষে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের গায়কীতে মা দুর্গার আগমনী গান-

জাগো, জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী/অভয়া শক্তি, বলপ্রদায়িনী, তুমি জাগো…
এভাবেই প্রতি মহালয়ার ভোরে রেডিয়োতে নতুন করে আসে  ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। আকাশবাণী কলকাতার মহালয়ার বিশেষ প্রভাতী অনুষ্ঠান। আজও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান, দৃশ্য মাধ্যমের আকর্ষণ ফিকে হয়ে যায় কথা ও সুরের এই আশ্চর্য মহাকাব্যিক সৃজনের কাছে।

কী সেই আশ্চর্য রসায়ন ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র?

সময়টা ১৯২৭ সাল। ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি নামে বোম্বের (এখন মুম্বই) এক বেসরকারি সংস্থা ডালহৌসির ১নং গার্স্টিন প্লেসের একটি ভাড়া বাড়িতে চালু করল রেডিয়ো স্টেশন। অধিকর্তা স্টেপলটন সাহেব। ভারতীয় অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন ক্ল্যারিনেট বাদক নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ মজুমদার আর প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ রাইচাঁদ বড়াল। সে সময়ে হাতে-গোণা কিছু অভিজাত পরিবারেরই শুধু শোভা পেত রেডিয়ো।

১৯৩০-এর ১লা এপ্রিল সরকারী পরিচালনাধীনে এর নতুন নামকরণ হয়েছিল ‘ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং সার্ভিস’। পরে ১৯৩৬-এ এই রেডিয়ো স্টেশনের নাম হয় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’, আরও পরে, ১৯৫৭ সালে ‘আকাশবাণী।’

১৯২৮ সালে রাইটার স্টাফ আর্টিস্ট হয়ে রেডিয়ো স্টেশনে চাকরি নিলেন বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরাজি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস আর সংস্কৃতে ‘কাব্যসরস্বতী’ উপাধি পাওয়া বৈদ্যনাথ রেডিয়োতে যোগ দিয়ে নতুন নাম নিলেন ‘বাণীকুমার’। বহুমুখী সৃজনশীল প্রতিভা তাঁর।

ওই সময়েই রেডিয়ো থেকে একটা নিজস্ব মুখপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার প্রেমাঙ্কুর আতর্থী ওরফে ‘বুড়োদা’ এলেন সে মুখপত্র সম্পাদনার জন্যে। ১৯২৯-এর সেপ্টেম্বর মাসে আত্মপ্রকাশ করল রেডিয়োর নিজস্ব পত্রিকা ‘বেতার জগৎ’।

রেডিয়োর অনুষ্ঠানকে আরোও সৃজনশীল, আরোও জনগ্রাহী করার জন্য প্রায়ই আলাপ-আলোচনা হত তখন। সেরকমই এক আলোচনায় একবার বুড়োদা মত প্রকাশ করলেন, যা যা অনুষ্ঠান চলছে, তার পাশাপাশি কিছু অভিনবত্ব আনাও দরকার। বললেন, “এই তো বাণী রয়েছে- সংস্কৃতের তো আদ্যশ্রাদ্ধ করেছে। ও-ই কতকগুলো বৈদিক শ্লোক জোগাড় করে ফেলুক, আর গান লিখুক, রাই (রাইচাঁদ বড়াল) সুর দিক, বীরেন শ্লোক আওড়াক। ভোরবেলায় লাগিয়ে দাও, লোকের লাগবে ভালো৷”

কথাটা বেশ মনে ধরল নৃপেন মজুমদারের৷ বাণীকুমারও ভাবতে লাগলেন৷ এসব যখন কথা হচ্ছে, তখন দুর্গাপুজোর আর একমাস দেরি৷ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র প্রস্তাব দিলেন, যদি পুজোকে কেন্দ্র করেই কিছু করা হয় তাতে চণ্ডীপাঠ অবশ্যই থাকবে৷ সকলেই সমর্থন জানালেন৷ কিন্তু একটু দ্বিধার ছোঁয়াও ছিল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ তো কায়স্থ৷ তিনি চণ্ডীপাঠ করলে, শ্রোতারা সকলে মেনে নেবেন তো? নৃপেনবাবু বললেন,“প্রোগ্রাম করবে, তার আবার বামুন কায়েত কী হে? আমরা কি হিন্দুর মন্দিরে গিয়ে পুজো করছি? এই প্রোগ্রামে যারা বাজাবে তারা তো অর্ধেক মুসলমান- খুশী মহম্মদ, আলী, মুন্সী সবাই তো বাজাবে। তাহলে তো তাদের বাদ দিয়ে ব্রাহ্মণদের ডেকে আনতে হয়৷ তা ছাড়া আমরা একটা বিরাট উত্সবের আগে ভূমিকা হিসেবে এই প্রোগ্রাম করব। এতে কার কী বলার আছে?…”

বাণীকুমার তখন হেসে উঠে বলেছিলেন, যাই হোক না কেন, বীরেনবাবু ছাড়া আর কাউকে তিনি এ কাজের জন্যে ভাবতেই পারেন না৷

এই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনার আগে, ১৯৩২ সালের মার্চ মাসে অর্থাৎ ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের চৈত্রমাসে ‘বসন্তেশ্বরী’ নামে একটি গীতিআলেখ্য সম্প্রচার করে কলকাতা বেতার৷ সে ইতিহাস শোনা যাক বাণীকুমারের লেখা থেকেই: “…বন্ধুবর সঙ্গীতপণ্ডিত হরিশচন্দ্র বালীর সুর-সর্জনে রাগ বসন্ত এবং দেশী, দেবগিরি, বরাটী, তোড়ী, ললিতা ও হিন্দোলী- এই ছয় রাগিনী বাণী সংযোগে এক অপূর্ব রসের সঞ্চার হয়৷ অন্যান্য গানের সুর দেন পঙ্কজকুমার মল্লিক, কয়েকটি নাট্য- কথাসূত্র ও গীতাংশ গ্রহণ করেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এবং আমি শ্রীশ্রীচণ্ডীর কতিপয় শ্লোক আবৃত্তি করি৷ বন্ধুবর রাইচাঁদ বড়ালের সঙ্গীত-পরিচালনায় ও আমার প্রবর্তনায় অনুষ্ঠানটি রসোত্তীর্ণ হয়৷ এই অনুষ্ঠানটিই ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ পরিকল্পনার উত্স৷ … আমি সংস্কৃত রূপকের অন্তর্গত ‘বীথী’ (ORATORIO) নাট্য রচনাশৈলী অনুসরণে নবভাবে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ প্রণয়ন করি ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে৷ …”

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কলমেও ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সেই প্রথম  প্রস্তুতিপর্বের বর্ণনা বড় আকর্ষক: ‘‘পঙ্কজ সুর তুলে ও সুরারোপ করে তখনকার শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের কণ্ঠে গান তোলাতে লাগলেন। রাইচাঁদও এক বিরাট অর্কেস্ট্রা পরিচালনার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। সেকালের সবচেয়ে বড় বাজিয়েরা গানের সঙ্গে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এলেন।’’

১৯৩৪-এর ৮ই অক্টোবর প্রথমবার মহালয়ার ভোরে সম্প্রচারিত হল অনুষ্ঠানটি।

যেটুকু জানা যায়, প্রথম প্রচারের পর ‘শারদীয় বন্দনা’ খুবই ভালো লেগেছিল শ্রোতাদের। সমস্যা হল ১৯৩৪-এ, প্রথমবার মহালয়ার ভোরে সম্প্রচারের পর। কিছু রক্ষণশীল মানুষ, ধর্মকে যাঁরা চিরদিন বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখতে চান, তীব্র আপত্তি জানালেন।   বললেন, এক অব্রাহ্মণ ব্যক্তির কন্ঠে কেন চণ্ডীপাঠ শুনতে হবে? প্রতিবাদ করলেন বাণীকুমার। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র গ্রন্থনা ও চণ্ডীপাঠ করলে তবেই অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হবে, নচেৎ নয়। আরও একটি আপত্তি ছিল। মহালয়ার সকালে পিতৃপুরুষের তর্পণের আগেই কেন চণ্ডীপাঠ? এটা মাথায় রেখেই ১৯৩৫ ও ১৯৩৬ সালে অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়েছিল ষষ্ঠীর ভোরে।  ১৯৩৬ – এর ২১ অক্টোবর, ষষ্ঠীর দিনে প্রথমবার ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামটি ব্যবহার করা হয়।  বাণীকুমারের সিদ্ধান্ত মেনে, পরের বছর, ১৯৩৭ সাল থেকে আবারও মহালয়ার ভোরেই  ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র সম্প্রচার শুরু হল। এখনও সেই ধারাই অক্ষুণ্ণ। শিপ্রা বোস-এর মায়াবী কন্ঠের আগমনী গান দিয়ে শুরু হোল:
ওগো আমার আগমনী আলো, জ্বালো প্রদীপ জ্বালো।…
ত্বং স্বাহা ত্বং স্বধা ত্বং হি বষট্‌কারঃ স্বরাত্মিকা। সুধা ত্বমক্ষরে নিত্যে ত্রিধা মাত্রাত্মিকা স্থিতা। অর্ধমাত্রা স্থিতা নিত্যা যানুচ্চার্যা বিশেষতঃ..
মানবেন্দ্র বাংলা গানের মর্যাদাকে ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের উচ্চতায় তুলে দেন।

তব অচিন্ত্য রূপচরিত মহিমা।…
তখন মহাশক্তির আহ্বানে গগনে গগনে নিনাদিত হল মহাশঙ্খ। বিশ্বযোনি বিষ্ণু রুদ্রের বদন থেকে তেজোরাশি বিচ্ছুরিত হল; ব্রহ্মা ও দেবগণের আনন থেকে তেজ নির্গত হল। ওই তেজরশ্মি একত্র হয়ে পরমা রূপবতী দিব্যশ্রী মূর্তি উৎপন্ন হল।
তিনি কখনো বা সহস্রভুজা, কখনো বা অষ্টাদশভুজারূপে প্রকাশিত হতে লাগলেন। এই ভীমকান্তরূপিণী দেবী ত্রিগুণা মহালক্ষ্মী, তিনিই আদ্যামহাশক্তি। মহাদেবীর মহামহিমময় আবির্ভাবে বরণগীত ধ্বনিত হয়ে উঠল।

অখিল বিমানে তব জয়গানে যে সামরব…
দেবীর আবির্ভাবের এই শুভ বার্তা প্রকাশিত হল। সকল দেবদেবী মহাদেবীকে বরণ করলেন গীতিমাল্যে, সেবা করলেন রাগচন্দনে।

শুভ্র শঙ্খরবে সারা নিখিল ধ্বনিত/আকাশতলে অনিলে-জলে, দিকে-দিগঞ্চলে…
দেবী অষ্টাদশভুজামূর্তি পরিগ্রহণ করে শঙ্খে দিলেন ফুৎকার। দেবীর রণ-আহ্বানশব্দ অনুশরণ করে সসৈন্যে ধাবমান হল মহাবলশালী মহিষাসুর। দেবীর সঙ্গে মহিষাসুরের প্রবল সংগ্রাম আরম্ভ হল। দেবীর অস্ত্রপ্রহারে দৈত্যসেনা ছিন্নভিন্ন হতে লাগল। মহিষাসুর ক্ষণে ক্ষণে রূপ পরিবর্তন করে নানা কৌশল বিস্তার করলে। মহিষ থেকে হস্তীরূপ ধারণ করলে; আবার সিংহরূপী দৈত্যের রণোন্মত্ততা দেবী প্রশমিত করলেন। পুনরায় নয়নবিমোহন পুরুষবেশে আত্মপ্রকাশ করলে ওই ঐন্দ্রজালিক। দেবীর রূঢ় প্রত্যাখ্যান পেয়ে আবার মহিষমূর্তি গ্রহণ করলে। রণবাদ্য দিকে দিগন্তরে নিনাদিত, চতুরঙ্গ নিয়ে অসুরেশ্বর দেবীকে পরাজিত করবার মানসে উল্লসিত।

দেবতাগণ সানন্দে দেখলেন, দুর্গা মহিষাসুরকে শূলে বিদ্ধ করেছেন আর খড়্গনিপাতে দৈত্যের মস্তক ভূলুণ্ঠিত। তখন অসুরনাশিনী দেবী মহালক্ষ্মীর আরাধনাগীতিসুষমা দ্যাব্যা পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত হল।

মাগো, তব বীণে সঙ্গীত প্রেম ললিত/নিখিল প্রাণের বীণা তারে তারে রণিত…
শ্রীশ্রীচণ্ডিকা গুণাতীতা ও গুণময়ী। সগুণ অবস্থায় দেবী চণ্ডিকা অখিলবিশ্বের প্রকৃতিস্বরূপিণী। তাঁর স্থিতিকালোচিত শক্তির নাম শ্রী বা লক্ষ্মী; আবার সংহারকালে তাঁর যে শক্তির ক্রিয়া দৃষ্ট হয় তা-ই রুদ্রাণী দুর্গা। একাধারে এই ত্রিমূর্তির আরাধনাই দুর্গোৎসব।
বিশ্বপ্রকৃতি মহাদেবী দুর্গার চরণে চিরন্তনী ভৈরব ধ্যানরতা পূজারিণী ভৈরবীতে গীতাঞ্জলী প্রদান করে ধন্যা হলেন।

অনিলে সুনীলে নবীন জননোদয়ে দিকে দিকে সঞ্চারিত…

‘মহিষাসুরমর্দিনী’ প্রকাশের সময় প্রসঙ্গে বাণীকুমার লিখেছেন: ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ আমার প্রথম যৌবনের রচনা। কিন্তু মূল রূপটির বিশেষ পরিবর্তন না ঘটলেও এই গ্রন্থের বর্তমান রূপ বহুতর তথ্য ভাবগর্ভ বিষয় এবং বেদ-পুরাণাদি-বিধৃত শ্লোকাবলী সংযোজনায় সমলঙ্কৃত। প্রকৃতপক্ষে এই গ্রন্থ মার্কন্ডেয় সপ্তশতী চন্ডীর সংক্ষিপ্তসার বললেও অত্যুক্তি হয় না, তদুপরি এর মধ্যে আছে মহাশক্তি-সম্বন্ধে বৈদিক ও তান্ত্রিক তত্ত্বের ব্যঞ্জনা, এবং এর অন্তরে নিহিত রয়েছে শাশ্বত ভারতের মর্মকথা”।…

প্রথমবারের অনুষ্ঠানের আগে ঠিক হয়েছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ যেই সংস্কৃত শ্লোক পাঠ শুরু করবেন, অমনি বাদ্যযন্ত্রীরা তার সঙ্গে স্বরের ওঠানামা অনুযায়ী উপযুক্ত বাজনা বাজাবেন। তিনি যখন বাংলায় ভাষ্যপাঠ করবেন, তাঁরা সঙ্গত করবেন এক একটা শাস্ত্রীয় রাগের গৎ বাজিয়ে। রাইচাঁদ বড়াল সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন যন্ত্রসঙ্গীতশিল্পীদের।

প্রথম কয়েকবার ভাষ্য অংশ পাঠ করা হত স্বাভাবিক কথ্যভঙ্গিতে। সুরে নয়। একবার মহড়ায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ তাঁর নিজস্ব বাচনভঙ্গিতে চণ্ডীপাঠ করছিলেন সুরেলা কণ্ঠে। করতে করতে হঠাৎই কী মনে হল, রসিকতার ছলে বাংলা ভাষ্যটিও স্তোত্রের সুরের মত করে বলতে শুরু করলেন। বাকিরা নড়ে-চড়ে বসলেন। মুখে মৃদু হাসি। বাণীকুমার বসেছিলেন রেকর্ডিং কনসোলে। দ্রুত বেরিয়ে এসে বললেন,“আরে আরে থামলে কেন? বেশ তো হচ্ছিল! ওই ভাবেই হোক না।”

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ হেসে বললেন,

“আরে না না একটু মজা করছিলাম!”

কিন্তু বাণীকুমার গভীর আগ্রহ নিয়ে বললেন,

“মোটেই না! দারুণ হচ্ছিল! ওইভাবেই আবার করো তো!”

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ আবার শুরু করলেন। এবার সুরে ভাষ্যপাঠ- “দেবী প্রসন্ন হলেন…”। সকলেরই ভাল লেগে গেল।

সুরে, ছন্দ, উচ্চারণে, সাংগীতিক উপাদানের বৈচিত্রের দিক থেকে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ যেন সঙ্গীতের এক মহাকাব্য।

মাত্র একবারই মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সম্প্রচার বন্ধ হয়েছিল। ১৯৭৬ সালে। দেশে তখন জরুরী অবস্থা। দিল্লি থেকে নির্দেশ এল, চিরাচরিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র পরিবর্তে নতুন অনুষ্ঠান করা হোক।  আকাশবাণীর কর্তৃপক্ষ ঠিক করলেন অন্য কিছু করা যাক। ভাষ্যে উত্তমকুমারকে রাখা হোক। মিটিং হল। সেই মিটিং-এ  বাদ পড়লেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। বাদ পঙ্কজ কুমার মল্লিক-ও। এর কিছুদিন আগেই, দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর আকাশবাণীর ‘সঙ্গীত শিক্ষার আসর’ পরিচালনা করার পর সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তাঁকে। এই নতুন উদ্যোগ তাঁদের অগোচরেই শুরু হয়েছিল। বাণীকুমারকে অবশ্য এসব দেখতে হয়নি। ১৯৭৪ সালেই প্রয়াত হয়েছেন তিনি।

নতুন স্ক্রিপ্ট লিখলেন অধ্যাপক ধ্যানেশনারায়ণ চক্রবর্তী। সঙ্গীত রচনায় শ্যামল গুপ্ত। সঙ্গীত পরিচালনায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।  ১৯৭৬-এর ২৩শে সেপ্টেম্বর মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র বদলে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে বেজে উঠল বিকল্প অনুষ্ঠান- ‘দেবীং ‘দুর্গতিহারিণীম্’। সে অনুষ্ঠান চূড়ান্ত ফ্লপ।

বোম্বে আর কলকাতার নামীদামী শিল্পী অনুষ্ঠানে- ‘তবু ভরিল না চিত্ত’। বহু প্রত্যাশিত  ‘মহিষাসুরমর্দিনী’  শুনতে না পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়লেন মানুষ। সকালবেলায় রেডিয়ো স্টেশনের গেটে অগুন্তি লোক।  ভাঙচুরের উপক্রম। কেন বন্ধ হল মহিষাসুরমর্দিনী, তার জবাবদিহি চাই। পত্র-পত্রিকায় সমালোচনার ঝড়। শেষে সে বছর ষষ্ঠীর সকালে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনিয়ে শান্ত করা হল জনরোষ।

শোনা যায়, উত্তমকুমার নিজে ভাষ্যে অংশ নেবার দায়িত্ব নিতে চাননি। তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছে গিয়ে নিজের অস্বস্তি আর অযোগ্যতার কথা বলেছিলেন। তাঁকে আশ্বস্ত করে উৎসাহ দিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। বলেছিলেন, “আমি তো অমর নই, একদিন না একদিন অন্যদের তো এগিয়ে আসতেই হবে এ কাজে।”

আসলে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের অভিমান ছিল আকশবাণী কর্তৃপক্ষের ওপর। ভোর হবার আগে রাত্রিবেলাতেই বেতারকেন্দ্রে চলে আসতেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত থেকে তারপরে বাড়ি যেতেন। রেকর্ডেড অনুষ্ঠান চালু হলেও এ অভ্যাস তিনি চালিয়ে গেছেন বরাবর। কিন্তু ১৯৭৬ সালের পর থেকে তিনি আর কখনও মহালয়ার আগের রাত্রিবেলা আকাশবাণী যাননি। অভিমান করে বলেছিলেন, “ওরা একবার আমায় জানালোও না। আমি কি নতুন কিছুকে কোনও দিন বাধা দিয়েছি?”

আশ্চর্যের কথা, যখন শুনলেন, মানুষের চাহিদাকে মর্যাদা দিতে আবার সম্প্রচার হবে, তখন অভিমান, ক্ষোভ সব ভুলে আবার কাজে নেমে পড়েছিলেন।

আর ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম’-এর অশেষ দুর্গতি-র পরে উত্তমকুমার নিজে বলেছিলেন, ‘‘ঠাকুর ঘরকে রিনোভেট করে ড্রয়িং রুম বানালে যা হয়, তাই-ই হয়েছে।’’

ছোটবেলায় শরতের ঝকঝকে নীল আকাশটা দেখলেই মনের মধ্যেও একদল মেঘ খুশিতে আমাদেরই মতো হুটোপাটি করে উঠত। তখনই একদিন ভোরবেলা বেজে উঠত এক অপার্থিব আলোর বেণু। মন্দ্রকন্ঠ বীরেন্দ্রকৃষ্ণের উচ্চারণে যেন কৈলাস থেকে আশ্চর্য নীলকন্ঠ পাখিটি উড়ে আসত শারদপ্রাতে। আসতেন মা দুগগা।

তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা: ‘মহিষাসুরমর্দিনী’: বাণীকুমার

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes