jamdani

দুয়ার খোলা ডুয়ার্সে (পর্ব-২)

জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়

আধ ঘন্টার মধ্যে গাড়ি এসে থামল রাজাভাতখাওয়া নেচার ইনফর্মেশন সেন্টারের সামনে। জায়গাটা খুব সুন্দর। নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে একফালি ঘেরা জায়গা। তার মাঝখানে গোলাকার একটা বাড়ি। দেওয়ালে ইতিহাস আর বর্তমানের টুকরো টুকরো ছবি।

একটা ছবিতে রাজাভাতখাওয়া নামটার ইতিহাস ফুটে উঠেছে। কুচবিহারের রাজা পণ করেছিলেন ভুটানের রাজাকে না তাড়িয়ে ভাত খাবেন না আক্রমন করলেন ভুটানরাজাকে। বেগতিক দেখে সন্ধি করলেন ভুটানরাজ। নৈতিক জয় হল কোচবিহারের রাজার। দুই রাজা এই স্থানে বসে ভাত খেলেন। তাই নাম হল রাজাভাতখাওয়া। এই ঘটনা সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিতে। সেন্টারের ভেতরে ঢুকলাম। সেখানে নানান পশুপাখি ও কীটপতঙ্গের নমুনা সংরক্ষিত করা আছে।

রাজাভাতখাওয়া হল বক্সা টাইগার প্রজেক্টের গেট। সেই গেট পেরিয়েই গাড়ি ছুটে চলল। কিছুটা এগিয়ে মাথাপিছু ৪০ টাকা আর গাড়ি পিছু ২০০ টাকা এন্ট্রি ফি দিতে হল। রাজাভাতখাওয়া থেকে ১৬ কিলোমিটার পেরিয়ে এসে গাড়ি থমল সান্ত্রাবাড়িতে। এখান থেকে আমাদের হাঁটা পথ শুরু। গন্তব্য বক্সা ফোর্ট। দূরত্ব ৫ কিলোমিটার।

অসংখ্য পাখির কোলাহল শুনতে শুনতে আর রংবেরঙের প্রজাপতিকে সঙ্গে নিয়ে হালকা চড়াই ভাঙতে ভাঙতে চলেছি। ফোটো তুলেছি। দুপাশে শাল, সেগুন, শিরীষ, শিমুল, শিশু, জারুল, আরও কত নাম না-জানা গাছগাছালির ভিড়। ইনফর্মেশন সেন্টারে কিছু বইপত্র ঘেঁটে দেখেছিলাম। এই বক্সা টাইগার প্রজেক্টের আয়তন ৭৬০ বর্গ কিলোমিটার। ৩৩১ বর্গ কিলোমিটার কোর এরিয়া আর বাকিটা বাফার জোন। এর মধ্যে ২৬৯ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে অভয়ারন্য। ১৯৯২ সালে এই ব্যাঘ্র প্রকল্পের ১১৭ বর্গ কিলোমিটার বনভূমি জাতীয় উদ্যানের শিরোপা পেয়েছে। বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ৪০টি। বাঘ ছাড়া আছে হাতি, লেপার্ড, ভালুক, হরিণ, বুনো কুকুর, গাউর ইত্যাদি। এই বনে ব্ক্ষ আছে ১৫৯ প্রজাতির, গুল্ম আছে ১৫৭ প্রজাতির। এছাড়া বাঁশ আছে ৬ প্রজাতির আর বেত আছে ৮ প্রজাতির। অর্কিডের সংখ্যা ১৩২ প্রজাতির। বক্সায় সতেরো রকমের পোকামাকড় ও প্রজাপতি আছে। আর এগুলোই গড়ে তুলেছে পাখিদের খাদ্যভান্ডার। ২৩৪ প্রজাতির পাখি আছে বক্সা অরন্যে। তাই এই জায়গাটাকে পাখিদের স্বর্গরাজ্য বলা যায়।

দুলকি চালে গাছগাছালি আর পাখপাখালিকে সঙ্গী করে আড়াইয়ে পৌঁছে গেলাম বক্সা দুর্গে। ইতিহাস আর প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে এই বক্সাদুয়ারে। একদা ভুটান, তিব্বত ও কোচবিহারের মধ্যে বানিজ্যের প্রবেশদ্বার ছিল বক্সা।সিঞ্চুলা পাহাড়ের চূড়ায় (২৬০০ ফুট) এই দুর্গ, যা ১৮৬৪ সালে ভুটানরাজের পরাজয়ের পর ব্রিটিশদের অধিকারে আসে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্দি করে রাখার জন্যে প্রায় অগম্য এই শ্বাপদসংকুল বনের মধ্যে এই দুর্গকে জেলখানা বানিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। প্রভাস লাহিরি, হেমচন্দ্র ঘোষ, ত্রৈলোক্য মুহারাজ, গোপাল হালদার, নিকুঞ্জ সেন প্রমুখ বিপ্লবীদের স্ম্তিধন্য সেই দূর্গ আজ কিছু ইট-কাঠ-পাথরের খিলান মাত্র। সিঁড়ির মুখে পাথরের ওপর খোদাই করা বন্দিদের নিয়ে কবিগুরুর লেখা কবিতাটাও সময়ের সরণি ধরে যত্নের অভাবে মলিন হয়ে গেছে।

আধ ঘন্টার মতো বক্সা ফোর্টে কাটিয়ে একই পথে পাখিদের কাকলি আর ঝিঁঝিদের কনসার্ট শুনতে শুনতে নেমে এলাম সান্ত্রাবাড়ি। এবার আমাদের গাড়ি ছুটল জয়ন্তীর দিকে। আলিপুরদুয়ারের পথে ৭ কিলোমিটার পেরিয়ে পৌঁছালাম জয়ন্তী মোড়। এই মোড় থেকে বাঁদিকে ঘুরে আরও ৪ কিলোমিটার এগোতেই পেলাম জয়ন্তী নদী।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes