jamdani

আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফ্রম জোড়াসাঁকো (পর্ব ৭)

সন্দীপ মুখোপাধ্যায়

বিশু মণ্ডল কিঞ্চিত সুস্থ বোধ করলেন। চোখ অল্প খুলেই বুজে নিচ্ছিলেন। শরীরে একটা ব্যাথা আছে। কিন্তু এই অবস্থাতেও তিনি সামনের মানুষটিকে চিনতে ভুল করলেন না। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে। মুখে তাঁর হাল্কা একটি স্বর্গীয় হাসি। সে হাসি হাজার কথার সামিল। তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আরও কিছু মানুষ। চোখে মুখে তাদের প্রবল উত্তেজনা। তাঁরা জানতে চায় এই মানুষটি কে। কেন এই মানুষটি তাদের দেবতাকে গ্রেফতার করেছিলেন। কোন অপরাধে? বিশু মণ্ডল ভেবেছিলেন যে তাকে বুঝি এরা মেরেই ফেলে দেবে। গণহত্যা যাকে বলে। কিন্তু একদম তা হল না। এরা ভীষণ শান্ত, মুখে চোখে কোন হিংস্রতা নেই। কি যত্ন সহকারে দুধ, খাবার বাড়িয়ে দিচ্ছে তার দিকে।

আপনি কে? আপনার সাথে রবীন্দ্রনাথের এরকম আশ্চর্য মিল কেন? আপনি কি স্বয়ং উনি?” খুব ধীরে ধীরে প্রশ্নগুলো করলেন বিশু মণ্ডল। তার রাগ, তার মেজাজ, সব উধাও। সে আজ ক্লান্ত খুব। এই ভয়ানক খেলা সে আর খেলতে চাইছে না। এর একটা নিষ্পত্তি চাই। যে কোন মুহূর্তে সে বুঝি পাগল হয়ে যাবে। মাথা ফেটে যাবে তার।

যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, যিনি এই মুহূর্তে বিশু মণ্ডলের কাছেও রবীন্দ্রনাথ, তিনি হাল্কা হাসলেন।ইশারায় অন্য সকলকে ঘর থেকে চলে যেতে বললেন। ঘর ফাঁকা। এই মস্ত ঘরে এখন শুধু এই মানুষটি আর বিশু মণ্ডল।

আমার নাম রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল। আমি affidavit করে পদবী ঠাকুর করেছি ২০০৪ সালে। যেদিন ওনার নোবেল চুরি হয়। যখন জন্মেছিলাম তখন বাপ মা বোঝেন নি, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে উপলদ্ধি করি, যে আমার সাথে ওনার অসম্ভব মুখের মিল, উচ্চতার মিল। যদিও আমি ওনার চেয়ে কিঞ্চিত খাটো। নাম আমার রবীন্দ্রনাথ ছিল। বাবার নাম দেবেন্দ্রনাথ। খুব ছোটবেলায় ঠাকুরদার কাছে শুনেছিলাম, যে আমাদের বংশের কেউ কখনো জোড়াসাঁকোতে ঠাকুর পরিবারে কাজ করতেন। ভৃত্য ছিলেন। ও বাড়িতে ভৃত্য হওয়াও মস্ত পুণ্যের কাজ।তাই আমার প্রপিতামহ বংশের সবার এই ভাবে নাম রাখা শুরু করেন। অলৌকিক কিনা জানিনা, আমার সাথে এরকম আশ্চর্য মিল পাওয়া যায় কবিগুরুর। আমি ক্রমশ সচেতন হতে থাকি। নিজেকে খুব যত্নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাজাতে থাকি। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে সবাই চমক যান। আমি এক একটা সময়ে সম্পূর্ণ অন্য একটা পৃথিবীতে চলে যাই। সে পৃথিবী সমান্তরাল পৃথিবী। সেটি ঠাকুর পরিবার। তাদের সাথে কথা বলি। তাদের দেখতে পাই আমি। আমার ছেলের নাম রথিন্দ্রনাথ। আমরা জোড়াসাঁকোতে থাকি। ইচ্ছে করে ওখানে থাকার সিদ্ধান্ত নি। শান্তিনিকেতনে বাড়ি কিনি। বাবার ব্যাবসা ছিল। ভালো চলতো। সেই অর্থে এ বাড়ি কেনা। আপনি খেয়াল করেন নি, এটি কোনভাবেই মুল কবির বাড়ি নয়। সম্পূর্ণ আদলে তৈরি করেছি আমরা। এত খানি বলে থামলেন রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল।

বিশু মণ্ডল কিরকম অবাক হয়ে শুনছিলেন সব। উনি থামতেই প্রশ্ন করলেন “ সব বুঝলাম, কিন্তু এই সমগ্র পরিকল্পনা কেন? আদালত কক্ষ? আপনার পরিচিত ওই উকিল ভদ্রলোক? যাকে অবিকল চিত্তরঞ্জন দাসের মতো দেখতে? গড়িয়াহাট মোড়ের সেই পুলিসের গাড়িতে সাহেবের বসে থাকা? এগুলো? এগুলো কি করে বানালেন?”

এই সমস্ত খেলায় সবচেয়ে আশ্চর্যের কি জানেন?” খুব ধীরে প্রশ্ন করলেন রবীন্দ্রনাথ

কি? কি আশ্চর্যের?”

শুধুমাত্র আপনি ভাড়া করা নন। তা ছাড়া সমস্ত সিস্টেমটা আমরা কিনে নিয়েছিলাম। সমস্তটা। শুধু মাত্র চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর জন্য যে আমরা, মানুষ কতখানি লোভী, কতখানি corrupted”।

মানে? কি বলছেন? আমার সহকর্মীরা বিক্রিত? আদালত বিক্রিত? কিন্তু কেন? কিন্তু কেন? আপনারা শাস্তি দেওয়ার জন্যে, বিশু মণ্ডলকে বেছে নিলেন কেন? কি অপরাধ আমার?

ঘরের মধ্যে এক বৃদ্ধ চা দিয়ে গেলেন। “ নিন চা খানবলে কাপ এগিয়ে দিলেন বিশু মণ্ডলের দিকে।

যখন নোবেল চুরি যায়, তখন আপনি কোন থানায় ছিলেন বিশু মণ্ডল বাবু?”

আমি? আমি তখন জোড়াসাঁকো থানায় ছিলাম। বেশ মনে আছে। খুব হইহুল্লর হয়েছিলো চুরি যেতে। আমাদের থানা ঘেরাও অবধি হয়েছিলো। হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

রবীন্দ্রনাথ একটু গম্ভীর হলেন। থামলেন। খানিক আওয়াজ করেই চায়ে চুমুক দিলেন। সেইদিন খবরের কাগজের লোকেরা থানার বড়বাবুর কাছে গেছিলেন, বিবৃতি নিতে, উনি ছিলেন না। আপনি তখন মেজবাবু ছিলেন। SI। আপনি বিবৃতি দিয়েছিলেন। মনে আছে?”

বিবৃতি দিয়েছিলাম মনে আছে। কিন্তু কি বলেছিলাম তো মনে নেই। কিন্তু এইসব প্রশ্নের সাথে কি সম্পর্ক আপনার এই গোটা বিষয়টা?”

এইবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তার ঘরের দেরাজের দিকে গেলেন।ঘটাং করে একটা শব্দ হল। সেখান থেকে এক খানা কাগজ বের করলেন। পনেরো বছর আগের কাগজ। একটা পাতা নিখুঁত ভাবে কাঁচি দিয়ে কাটা। হাতে দিলেন সেটি বিশু মণ্ডলের।সাথে মুল কাগজটিও।

এটা পড়ুন। বিশু মণ্ডল দেখলেন সেইদিনের কাগজের সিংহভাগ জুড়েই নোবেল চুরির খবর ছিল। সমাজের সমস্ত অংশ থেকে ছি ছি রব উঠেছিলো। বিরোধী পক্ষ মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। কিন্তু ভিতরের পাতার একটি জায়গায় খুব ছোটো করে একটি খবর বেরিয়েছিল। সেটি এইরকম

দেখুন নোবেল চুরি হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। যেখান থেকে চুরি হয়েছে সেটি পুলিসের অধীন জায়গা নয়। সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকে। হ্যাঁ, রাজ্য স্তরের পুলিস যে পাহারায় ছিলেন না তা বলছি না। কিন্তু এর সাথে কোনভাবে কেউ দুর্নীতিতে যুক্ত এসব বলবেন না। নোবেল গেছে। আবার আসবে। ওরা আবার দিয়ে দেবে আরেকটা

এইটা পড়ে কিরকম থম মেরে গেলেন বিশু মণ্ডল।

আজকে আপনার এইটা পড়ে মনে হচ্ছে না যে এই মন্তব্য কতখানি অসংবেদনসীল ছিল। আপনি বিশ্বাস করেন কোথাও কোনভাব দুর্নীতি হয়না? এখনো করেন? এখনো করেন? করেন? চুপ করে থাকবেন না। বলুন। করেন? সেদিনের আপনার মন্তব্য নোবেল চুরি যাওয়ার থেকেও খারাপ ছিল

বিশু মণ্ডল মাথা নামিয়ে নিলেন। চূড়ান্ত অপমানিত হয়েছেন বোঝা গেলো। একটা গোটা সমাজ ব্যাবস্থার উপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা সপাটে চর মেরেছেন যেন।

সেদিনের সেই কাগজখানা আপনার বাড়ি গিয়েছিলো মনে করতে পারছেন?”

হ্যাঁ পারছি। বেশ পারছি। রবি ঠাকুরের নোবেল পাওয়ার খবর বেরিয়ছিল। সেটা? সেটাও আপনি……?”

আপনি কিসের পুলিস হয়েছেন বিশু মণ্ডল বাবু? বাংলায় এত গুচ্ছ গুচ্ছ পিরিয়ড মুভি হচ্ছে আর একখানা সেই আমলের কাগজ বানাতে পারবো না? ছাপাখানার লোকেদের কাছে ও কাজ হাতের ময়লা যে।?”

আপনার উদ্দেশ্য কি ছিল আমাকে মেরে ফেলা? শেষ করে দেওয়া?” জিজ্ঞেস করলেন বিশু মণ্ডল।

ছি ছি। কি বলছেন কি? মেরে ফেলা উদ্দেশ্য হলে কবেই তা লোক লাগিয়ে করতে পারতাম। তার জন্য এত আয়োজন কি দরকার। আমার উদ্দেশ্য ছিল আপনাকে উচিৎ শিক্ষা দেওয়া। প্রায় পাগল করে দেওয়া। যাতে আপনি ভবিষ্যতে ওই মন্তব্য না করেন। আজ আঠারো বছর হল। নোবেল পাওয়া গেলো না। যাবে না হয়তো। একটা নকল নোবেল রেখে লোককে দেখানো হচ্ছে। এখন ওখানে গেলে কত পাহারা, কত সতর্কতা। তখন তোরা কোথায় ছিলিশ? লজ্জা করে না?”।

রাত অনেক হল। বিশু মণ্ডল আজ এইখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি থেকে যাবেন। সেরকম কথা। ভোরে উনি ফিরে যাবেন বাড়ি।

অনেক অনেক ভোরে দরজা ধাক্কাতে কোন সাড়া এলো না। বিশু মণ্ডল যে ঘরে শুয়েছিলেন তার সামনে লোক জড়ো হতে লাগলো। উনি বলেছিলেন সকালে ডেকে দিতে। বেরিয়ে যাবেন। অনেক ধাক্কাতেও যখন দরজা খুলছে না তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এলেন। সাথে দুজন লোক লোহার রড নিয়ে। স্থির হল দরজা ভাঙা হবে। দরজা ভাঙা হল। কি আশ্চর্য। ভিতরে কেউ নেই। ফাঁকা। এমনকি কেউ যে রাতে ছিল তার চিহ্ন অবধি নেই।

হুজুর, উনি তো নেই। উনি….” হাত দেখিয়ে থামালেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। খাটের নীচে একখানি সাদা কাগজ। তুলে নিলেন। খুব কাঁচা হাতের লেখায় লেখা

প্রিয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাবু,

আমি চললাম। রাতেই আপনার বাড়ি ছাড়ছি। নোবেল খোঁজের সন্ধানে বেরলাম। যদি কোনদিন পাই, ফিরে এসে প্রথমে আপনাকে দেখাব। আর যদি না পাই, ঈশ্বর আমার মঙ্গল

করবেন আশা রাখি। আর ঘর ভিতর থেকে বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কি করে পালালাম আশা করি বুঝে নেবেন। আমি সত্যি সত্যি পুলিশ কিন্তু

গল্প – আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফ্রম জোড়াসাঁকো (পর্ব ৬)

ইতি বিশু মণ্ডল

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes