jamdani

আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফ্রম জোড়াসাঁকো (পর্ব ১)

সন্দীপ মুখোপাধ্যায়

সন্দীপ মুখোপাধ্যায়

–   “নাম কী? থাকো কোথায়? কোন ক্লাস অবধি পড়েছো? বয়স কত?” প্রশ্নগুলো এক নিঃশ্বাসে করে যাচ্ছে সবাইকে নিখিলেশ সেই সকাল থেকে।

–   “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়াসাঁকো। অষ্টম। বাহান্ন।”

ধড়াস করে উঠল নিখিলেশের বুকখানা। খাতা থেকে মুখ তুলে তাকাল সে। একটা পঞ্চাশ পেরোনো লোক, উচ্চতা ছ’ফুট তো হবেই। বেশ বাহারি দাড়ি, লম্বা চুল। তাকিয়ে আছে সটান নিখিলেশের দিকে।

–   “ইয়ার্কি হচ্ছে? এখানে খুব সিরিয়াস প্রতিযোগিতা হচ্ছে, ইয়ার্কি করার হলে অন্য কোথাও যাও হে।” বেশ খিঁচিয়ে বলল নিখিলেশ। লোকটা কিন্তু একটুও চটল না।

–   “আশ্চর্য! আপনি বয়সে আমার থেকে বড়। আমি খামোখা আপনার সাথে ইয়ার্কি করতে যাব কেন? আমার কোন কথাটা আপনার ইয়ার্কি মনে হল যদি একটু বলেন।”

খুব ভদ্রতা করছে কিন্তু লোকটা। নিখিলেশ কী বলবে বুঝে পেল না। “তুমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? তাও আবার অষ্টম শ্রেণী অবধি পড়েছো? জোড়াসাঁকোয় থাকো? এটা ফাজলামোর জায়গা মনে হচ্ছে? আর বলছো কী ইয়ার্কি করছো বোঝোনি?”

–   “আচ্ছা, কারো নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হওয়া অপরাধ? কেউ অষ্টম শ্রেণী অবধি পড়লে সেটা অন্যায়? আর কোথায় বলা আছে কেউ জোড়াসাঁকোয় থাকতে পারে না? আপনি প্রমাণ দেখবেন কি? আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিনা?”

এইবার নিখিলেশ একটু অসুবিধায় পড়ল। সত্যি তো। কোনওদিন তো এটা ভেবে দেখেনি সে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো হতেই পারে কারোর নাম। আর কেউ তো ক্লাস এইট অবধি পড়াশুনো করাও হতে পারে। কী বলবে বুঝে পেল না সে।

  • “প্রতিযোগিতা কী নিয়ে জানো? ”
  • “জানি। কবিতা লিখতে হবে। কবিতা লেখা প্রতিযোগিতা। যিনি প্রথম হবেন, তিনি ১০০০০, দ্বিতীয় জন ৭০০০ আর তৃতীয় জন ৫০০০ টাকা পাবেন।”
  • “তা তুমি কবিতা লিখেছো এর আগে? জানো কবিতা লেখা? অষ্টম শ্রেণী অবধি পড়াশুনো করে…।”
  • “তাতে কী? আপনারা তো সবাই জানেন যে আমি স্কুলে পড়াশুনো করিনি একদম। বাবা বাড়িতে পড়াশুনো করাতেন। অষ্টম অবধি পড়ে আমার যদি নোবেল পাওয়া না আটকায়, একটা কবিতা প্রতিযোগিতায় আটকে যাব বলছেন?” এই বলে লোকটা মুচকি হাসলেন।

এইবার নিখিলেশ আবার চটল খুব। “দেখো হে, তুমি আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট। একদম ফাজলামো মেরো না। আর যদি গঞ্জিকা সেবন করে এসে থাকো, তাহলে অন্য রাস্তা দেখো। এই পরের জন কে আছো, এদিকে এসো। তুমি কেটে পড়ো তো হে।” এই বলে নিখিলেশ হাত দেখিয়ে সরে যেতে বলল লোকটাকে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটু সরে দাঁড়ালেন। নিখিলেশ সমস্ত কাজ শেষ করা অবধি দাঁড়িয়ে রইলেন ওইখানেই। ঠিক যখন চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাবে, নিখিলেশের সামনে এসে দাঁড়ালেন রবীন্দ্রনাথ।

  • “তুমি আবার এসেছ? কী চাইছ বলবে?” একটু যেন শান্ত হয়েছে নিখিলেশ।

মুচকি হাসল রবীন্দ্রনাথ। “দেখুন আপনার বাবা, মা অথবা ঠাকুরদা, ঠাকুমা যে-ই দিয়ে থাকুন আপনার নাম, আমার উপন্যাসের চরিত্রর নামেই তো দিয়েছেন। আর আপনি আপনার স্রষ্টাকে দেখেই এরকম চোটে যাচ্ছেন? এটা কি ঠিক?”

এইবার হেসে ফেললেন নিখিলেশ। বুঝলেন ভদ্রলোক ঈষৎ নয়, সম্পূর্ণ পাগল। একটু তাকিয়ে দেখলেন লোকটাকে। “আচ্ছা তুমি বলছো তুমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? ঠিক?”

  • “আজ্ঞে একদম ঠিক। আমি জোড়াসাঁকোর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”
  • “কোনও প্রমাণ দেখাতে পারো, যে তুমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর?”

আবার মুচকি হাসল লোকটা। মাথা খারাপ হলেও হাসিখানি ভারি চমৎকার। এটা মানতেই হবে।

  • “আমি জানতাম আপনি প্রমাণ চাইবেন। তাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।”
  • “কী নিয়ে এসেছ?” ভারি মজা করে জিজ্ঞেস করল নিখিলেশ। এবার তাঁর মজাই লাগছে বেশ খেলাটা খেলতে।

লোকটা তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটা কাগজ আর একটা বাক্স বের করল। এগিয়ে দিল সেটা নিখিলেশের দিকে- “এই দেখুন। এইবার বিশ্বাস হবে আশা করি।”

নিখিলেশের কি কয়েক সেকেন্ড হুঁশ ছিল না? এ তো হুবহু নোবেল প্রাইজটা। সেই মেডেল। বহুবার শান্তিনিকেতনে দেখেছে সে। এখন তো নকলটা আছে। বসানো একদম সেটা। আর সাথে একটা সার্টিফিকেট। তাঁকে যেটা দেওয়া হয়েছিল। নিজেকে একটু ধাতস্থ করল নিখিলেশ।

  • “শোন হে ছেলে। তোমায় পুলিশে দেব আমি। কী সব জোচ্চুরি হচ্ছে? কোথা থেকে বানালে এইসব?”

এইবার লোকটা, যাকে এতক্ষণ ধরে খুব বাজেভাবে ট্রিট করছিল নিখিলেশ, চোয়াল শক্ত করল। মুখ গম্ভীর করল। পকেট থেকে একটা চশমা বের করে পরল। তাকাল খুব শক্ত হয়ে নিখিলেশের দিকে।

  • “নিখিলেশবাবু। আমার ভদ্রতা আমার দুর্বলতা নয় কখনও। আমি শেষবারের মতো বলছি, আমার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমার বাড়ি জোড়াসাঁকো। আমার জন্ম তারিখ ২৫শে বৈশাখ। আপনি থানা-পুলিশ-কোর্ট যা খুশি করতে পারেন। প্রমাণ করা আপনার দায়িত্ব, আমার না। অনেকক্ষণ অনুরোধ করছি। এবার কবিতা প্রতিযোগিতায় নামটা লেখান আমার।

নিখিলেশ একটু থামল। এবার বাড়াবাড়ি হচ্ছে। আর হতে দেওয়া যায় না। ফোন বের করল।

  • “হ্যালো, পুলিশ স্টেশন? আমি নিখিলেশ সেন বলছি গড়িয়াহাট থেকে…”

{চলুক এই লেখাটা। আরেকদিন লিখব বাকিটুকু…}

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes