jamdani

যাত্রায় এলো সুখবর

করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের প্রোটোকলের মধ্যেও সাম্প্রতিক এক নির্দেশিকায় নবান্ন থেকে জানানো এক বিজ্ঞপ্তি মুখে হাসি ফোটাল যাত্রাশিল্পীদের মুখে।

পৃথিবী হয়তো একদিন এই করাল জীবাণুর হাত থেকে মুক্ত হবে, মানুষ আবার নিশ্চিন্তে ভীড় জমাবে রাস্তায়, মেতে উঠবে উৎসবে কিন্তু যাত্রা শিল্প কী পারবে আবার ঘুরে দাঁড়াতে, নিজের হারিয়ে যাওয়া কৌলীন্য ফিরে পেতে। আবার কী আসর জমে উঠবে বাদ্যে-গানে। কথায় আছে ‘দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে, আবার ঘুরে দাঁড়াতে হয়’। তবে জানি না, এর সঠিক উত্তর একমাত্র সময়ই দিতে পারবে। তবে সেই কথায় যাবার আগে একবার দেখে নিই তার সোনালী দিনগুলো।

সেই প্রাচীন কাল থেকে আপামর বাংলার সংস্কৃতি অত্যন্ত গর্বের। সাহিত্য হোক বা পুরাকীর্তি। আর সবেতেই বাংলার নিজস্বতা ছিল যাত্রাপালা। বাংলার বিনোদনের উপকরণ যাত্রাপালা। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব তো বলেই গেছেন যে, থিয়েটারে লোকশিক্ষা হয়, যাত্রাপালাও কিন্তু তার মধ্যেই পড়ে।

গ্রামের বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান বা মেলা যেমন চড়ক, দুর্গাপূজা, শিবরাত্রি উপলক্ষে সাধারণত যাত্রার আয়োজন হয়। অনেক সময় আবার গ্রামের মাতব্বরদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও চলে কে কত ভালো পালা আনতে পারে সেই নিয়ে। তবে সে সবই এখন অতীত। বর্তমানে যাত্রা শিল্প বেশ দুরবস্থার মধ্যে আছে। গ্রামের সাধারণ মানুষও অনেক সময় নিজেরাই যাত্রাদল বেঁধে অভিনয় করতো।তাতে অবশ্যই পুরুষদের একচেটিয়া ছিল। সাধারণ বাড়ীর মহিলারা অভিনয় করবেন এ ভাবাই যেত না। মজা ছিল এই যে, অনেকসময় পুরুষরাই সেজেগুজে মহিলার ভূমিকায় অভিনয় করতেন। বিখ্যাত দলগুলিতেও যে এই রেওয়াজ ছিল, তার প্রমান বিখ্যাত যাত্রা জগতের বিখ্যাত চপলরানী। পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের একটি ছায়াছবিও আছে এই নিয়ে। অবশ্য পরে মহিলাদের অনুপ্রবেশ ঘটে যাত্রায়। শখের যাত্রা দলগুলিও ‘ফিমেল’ ভাড়া করা শুরু করে।

সেইসময় যাত্রাশিল্পীরাও ভীষণ বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ছিলেন, বিশেষ করে গ্রামের মানুষের মধ্যে। সিনেমার অভিনেতা অভিনেত্রীদের যে ভীড় বর্তমানে যাত্রায় দেখা যায়, তখন কিন্তু সেসব খুব একটা চোখে পড়তো না। বরং বছরের প্রথম দিকেই শিল্পীদের সঙ্গে যাত্রা দলের চুক্তি হতো, আর এতে অনেক সময়েই ময়দানের দুই প্রখ্যাত ক্লাবের দল বদলের মতো তুলকালাম চলতো। সাধারণত রথের দিন এই চুক্তিপর্ব সম্পন্ন হতো। গ্রাম থেকে বাবুরা যেতেন শহরে,যাত্রাদলের বায়না সেরে রাখতে। বেশ কয়েকমাস আগে থেকে বায়না না করলে যাত্রা দলের ‘ডেট’ পাওয়াই মুশকিল হতো। সেই ছিল যাত্রার স্বর্ণযুগ।

খোলা আকাশের নীচে বিশাল মাঠের মধ্যে স্টেজ বাঁধা শুরু হতো, বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই। চারদিক খোলা মঞ্চ সাধারণত যাত্রার ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। পৌরাণিক পালার জন্য একসঙ্গে চারটে মঞ্চও ব্যবহার হতো কখনও কখনও। একটা সময় যাত্রা মানেই ছিল ধর্মীয়,ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক পালা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাহিদা বাড়ে সামাজিক যাত্রাপালার। সমসাময়িক বহু বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হতে থাকে পালা।

যাত্রার সঙ্গে সঙ্গীতের সম্পর্ক সবসময়ই ছিল গভীর। মঞ্চের পাশেই খোল, করতাল, হারমোনিয়াম, তবলা, সানাই নিয়ে বসতেন একদল বাদ্যকর। যাত্রার প্রথম ঘন্টা পড়লেই শুরু হয়ে যেত বাদ্য-বাজনা। আর যার গানের গলা মিষ্টি, সেই অভিনেতাদের কদর যেত বেড়ে।

অন্যদিকে গ্রামের মানুষের উন্মাদনাও কম ছিল না যাত্রাপালা ঘিরে। কোথাও যাত্রা হচ্ছে শুনলেই সেখানের মানুষের মধ্যে সাজো সাজো রব পড়ে যেত। ছোট্ট টেম্পো করে যাত্রার প্রচারে বেড়িয়ে পড়তো স্থানীয় ক্লাব। গ্রামে গ্রামে ঘুরে হতো যাত্রার প্রচার, সেইসঙ্গে টিকিট বিক্রিও হতো।
আসছে! আসছে! আসছে! কলিকাতার বিখ্যাত নট্টকোম্পানির এবছরের ‘সেরা যাত্রাপালা’ বলে প্লুতস্বরে পালার নাম। নামগুলিও হতো চমকদার। ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় রচিত এরকমই কয়েকটি বিখ্যাত যাত্রাপালা হলো- ‘থানায় যাচ্ছে ছোটবৌ’ ‘মা আসামী ছেলে জজ’ প্রভৃতি। এছাড়াও রয়েছে রাহুগ্রাস, নাচমহল, চাঁদ-সুলতানা, পার্থসারথি, সত্যের জয়, রাজসন্ন্যাসী।

সেইসময় মাইলের পর মাইল হেঁটে এক গ্রাম থেকে আরেকগ্রামে যাত্রা দেখতে যেত মানুষ। অনেক সময়েই চেয়ারের ব্যবস্থাও থাকত না, তাই বলে মাটিতে পাতা ঢালাও চটে বসে মানুষ যাত্রার স্বাদ নিতে কুন্ঠা করতো না।

সামাজিক যাত্রাপালায় সাধারণত দুজন নায়িকা থাকত, একজন বেশ সিধেসাধা প্রকৃতির আর একজন দুষ্টুমিষ্টি গোছের আর একজন ‘গায়ক নায়ক’ আর ভিলেন। বাকিরা নানা চরিত্র শিল্পী। এছাড়া বিবেক বলেও একটি বেশ জনপ্রিয় চরিত্র থাকত।

এক জায়গায় যাত্রা শেষ করে দলের বাসে চেপে অন্য জায়গায় পৌঁছে যেত দলের শিল্পীরা। আর নায়ক নায়িকারা আসতেন শো শুরুর ঠিক আগে আগে, অন্য গাড়ীতে। যাত্রা শিল্পীদের থাকা খাওয়া সব মিলিয়ে যে গ্রামে যাত্রা হতো, সেখানে তৈরী হতো উৎসবের পরিবেশ। এখন অবশ্য যাত্রার সেই রমরমা একেবারেই নেই। টিভির নিত্য নতুন চ্যানেল,ইন্টারনেটের ব্যবহার যাত্রার আকর্ষণকে অনেকদিন আগেই ম্লান করে দিয়েছে। তার আগে অবশ্য পাড়ায় পাড়ায় ভিডিও শো এসে যাত্রার অবস্থা কিছুটা ম্লান করেই ছিল। ছোটখাট পুজো-পার্বনে যে টুকটাক যাত্রাপালা হয়, স্থানীয় যাত্রা শিল্পীদের ভাষায় সেটি মাছ-ভাতের শো হিসেবে পরিচিত। তার কারণ টুকটাক শো করে,সামান্য যাতায়াত খরচ আর খাওয়া -দাওয়া ছাড়া কিছুই মেলেনা শিল্পীদের, তাই এই সব শো মাছ-ভাতের শো নামেই।

তবে যাত্রার কফিনে শেষ পেরেকটি বোধহয় বিধেঁছে করোনা। আজ প্রায় ২ বছর হতে চলল, করোনাকালীন পরিস্থিতির কারনে সমস্ত শো বন্ধ হয়ে গেছে পুরোপুরি। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন। অনেকেই বাধ্য হয়েই বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পেশা।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes