jamdani

স্পর্শ

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

স্বপ্ন কি আসলে একটা রেকর্ডার? অতীতে ঘটে যাওয়া সব কিছু ধরে রাখে যে? আর কখনও উগরে দেয় অঙ্ক মিলিয়ে ?

ছােট্ট এক টুকরাে ব্যালকনিতে বেতের মােড়ায় বসে বিকেলের চা খেতে খেতে মঞ্জুরী কথাগুলাে ভাবছিল। সামনের বড়াে মাঠটা এখন আড়ে-বহরে অনেক ছােটো হয়ে গেছে, বলা যায় তিনভাগের একভাগ হয়ে টিকে আছে। বাকি জায়গাটা জুড়ে মস্ত এক বিল্ডিং কমপ্লেক্স উঠে গেছে যার বেশিরভাগ ফ্ল্যাটই এনআরআই-রা কিনে নিয়েছে। মূলত এই কমপ্লেক্সের কারণেই পাড়াটা অনেকখানি বদলে গেছে, এক-একসময় চেনা কঠিন হয়ে পরে। মঞ্জরীদের বাড়িটাও আর নেই; বাবা থাকতেই প্রােমােটারের হাতে গিয়ে পড়েছিল আর দেড় বছরের সময়সীমাকে তিন বছর টেনে নিয়ে গিয়ে, অবশেষে যখন ‘সাঁঝের প্রদীপ নামের দেড়তলা বাড়িটা চারতলা সৃষ্টি অ্যাপার্টমেন্ট’-এর চেহারা নিল, বাবার শরীরে ধ্বংসের বীজ চারিয়ে গেছে। কেমােথেরাপির ধকল বেশিদিন নিতে পারেনি বাবা, নতুন ফ্ল্যাটে গৃহপ্রবেশের বছর ঘােরার আগেই বাবার অর্ধেক হয়ে যাওয়া শরীরটা সাদা খইয়ের পিছন পিছন সামনের গলিটা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

তখন বিয়ে হয়ে গেছে মঞ্জরীর। বাড়িটা ভেঙে ফ্ল্যাট তৈরির কাজ মাস চারেক পিছিয়ে গিয়েছিল মঞ্জরীর বিয়ের কারণেই। নিজের দেরির অজুহাত দিতে গিয়ে প্রােমােটার হামেশাই সেই কথা বলত, আর প্রথম প্রথম ‘হ্যাঁ যাও না’ থেকে, ‘এই তাে সেদিন গেলে, আবার আজ যাবার কী দরকার’ বলতে শুরু করা সুরঞ্জনের কথা অগ্রাহ্য করে বাস থেকে নেমে অটোয় উঠে বাপের বাড়ি আসতে থাকা মঞ্জরীর মনে হত, ওর দেরি হয়ে গেছে, বাবা আছে তাে!

বাবার চলে যাওয়ার দিন, মন্টুকে দেখেছিল মঞ্জরী। ওদের ফ্ল্যাটের ঘর থেকে বাবাকে যারা নামাল তাদের মধ্যে মন্টু ছিল। নিয়মভঙ্গের দিন এক পঙক্তিতে খেতে বসা শ্মশানবন্ধুদের মধ্যে থেকে আর এক পিস মাছ চেয়ে উঠেছিল মন্টু। মঞ্জরী এগিয়ে গিয়ে ওরই রান্না করা দই-মাছ একটার বদলে দু’পিস ওর পাতে দিতেই একগাল হেসে বলেছিল, খাইয়ে মারবি নাকি?

মন্টু আসলে খুশি হয়েছিল। আর সেই খুশিটার দিকে তাকিয়েই মঞ্জরী আবিষ্কার করেছিল, সামনের একটা দাঁত নেই মন্টুর। সময় ওর খিদে অটুট রাখলেও, ফোকলা করে দিয়ে গেছে ওকে।

কিন্তু আজ দুপুরের ঘুমে যে মন্টুকে মঞ্জরী দেখল সে একদম সা-জোয়ান। মিঠুন চক্রবর্তীর মতাে ঘাড় ছাপানাে চুল তার, চোখে সানগ্লাস। মঞ্জরীকে সে পৌঁছে দিয়েছিল, ওর বাবার মৃত্যুরও দশ বছর আগে, যখন মঞ্জরী ক্লাস নাইনের ছাত্রী।

ক্লাস এইটে নতুন একটা স্কুলে এসে ভর্তি হয়েছিল মঞ্জরী। পুরনাে স্কুলটা ছাড়তে চায়নি ও একেবারেই, কিন্তু, কে জানে কেন, ওর বাবার মাথায় ঢুকে গিয়েছিল, স্কুলের মান পড়ে গেছে, এখন সেখানে পড়াশােনা হয় না। বাবার ইচ্ছার অবাধ্য মঞ্জরী কোনওদিনই হয়নি, তাই মন থেকে সাড়া না পেলেও, শ্রীলেখা, মধুমিতা, সুতপাদের ছেড়ে নতুন স্কুলের নতুন ক্লাসে, নতুন মেয়েদের মধ্যে গিয়ে বসেছিল। আর কয়েকদিনের মধ্যেই আবিষ্কার করেছিল যে ওদের বন্ধু হওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়।

– প্রথম প্রথম ওরকমটা হয়। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে সব। তুমি শুধু মন দিয়ে পড়াশােনাটা করে যাও। মায়ের মুখ থেকে মঞ্জরীর অসুবিধের কথা শুনে, বাবা বলেছিল।

মঞ্জরী জবাবে বলতে চেয়েছিল যে মনটাই যদি খারাপ থাকে তাহলে পড়াশােনাতেও তাকে বসানাে যায় না। কিন্তু বাবার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে মুখে কথা বলার রীতি ওদের বাড়িতে ছিল না তাই পায়ের নখ দিয়ে সিমেন্টের মেঝে খোঁচাতে খোঁচাতে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল আর ভাবছিল, কবে অলৌকিক কিছু ঘটবে যখন নতুন স্কুলটাও পুরনােটার মতােই ভালাে লাগবে।

অলৌকিক অত সস্তা নয় পৃথিবীতে, তাই ভালাে লাগা তাে দূর, দিন দিন নতুন স্কুলটা যেন জগদ্দল পাথরের মতাে বুকে চেপে বসছিল মঞ্জরীর। সেই পাথরটাই মাথায় এসে পড়ল যেদিন অলােকা নামের মেয়েটা ওকে থার্ড বেঞ্চ থেকে উঠে গিয়ে লাস্ট বেঞ্চে বসতে বলল।

– কিন্তু আমি তাে বরাবরই এখানে বসি। অবাক হয়ে গেল মঞ্জরী।

–বরাবর বসিস মানে কী? কতদিন এসেছিস এই স্কুলে? অলােকা চেঁচিয়ে উঠল।

– যে কদিনই আসি না কেন, আমাকে ক্লাস টিচার এখানেই বসতে বলেছেন।

– দ্যাখ মঞ্জরী ওইসব টিচার-ফিচার আমাকে দেখাবি না। এই ক্লাসে তাই হবে, যা আমরা বলব। এখন তাে তবু লাস্ট বেঞ্চে বসতে দিচ্ছি, এরপর ক্লাস থেকেই বের করে দেব। অলােকার স্যাঙাত কাকলি বলে উঠল।

কাকলির কথার মধ্যেই মঞ্জরীর ব্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করে দিল অলােকা। ঠিক তখনই ভূগােল দিদিমণি অসিতাদি ক্লাসে ঢুকলেন।
ওঁকে দেখে এক পলকের জন্য থেমে গেল অলােকা। পরক্ষণেই গলা তুলে বলল, মঞ্জরীর মাথায় উকুন দিদি। ও আমাদের পাশে বসলে আমাদের চুলেও উকুন চলে আসবে। আপনি প্লিজ ওকে লাস্ট বেঞ্চে গিয়ে বসতে বলুন।

অনেক কথা বলতে গিয়ে মানুষ যখন একটাও কথা বলতে পারে না, সেরকম একটা অবস্থায় জীবনে প্রথমবার পড়ার সময় মঞ্জরী জানত না যে পরেও অনেকবার ওই অবস্থায় পড়তে হবে ওকে। তবু সেই প্রথমবার ও বলে উঠতে পেরেছিল যে অলােকা মিথ্যে বলছে, অলােকার তালে তাল মেলানাে কাকলি আর অন্যান্যরাও তাই। কিন্তু মাস ছয়েক বাদে রেজাল্টের দিন যখন ওই একই নাম আর মুখগুলাে ওকে দেখে হেসে হেসে বলতে থাকল, ‘ফেল করেছে, ফেল করেছে, মাথায় উকুন ফেল করেছে’ তখন মঞ্জরী কোনও জবাব দিতে পারেনি, কারণ মাথায় উকুন নেই সে বিষয়ে ও যতটা নিশ্চিত ছিল, পাস করেছে সে বিষয়ে ততটা নয়।

সে বছর ঠাকুমাকে নিয়ে যমে-মানুষে টানাটানি চলছিল একরকম। প্রতি পনেরাে-কুড়ি দিন অন্তর মরাে মরাে ঠাকুমা মৃত্যুর কিনার থেকে ফিরে আসত আবার মৃত্যুর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে বলে। সেই দু-তিন দিন বাড়িতে হুলস্থুল পড়ে যেত একদম, তারপর বন্ধ হয়ে যেতে যেতেও যখন আবার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসত ঠাকুমার, তখন, ধাক্কা খেয়ে যেমন চলতে শুরু করে বন্ধ ফ্যান, থমকে থাকা সংসার, চালে-ডালে-তেলে-নুনে ছুটতে শুরু করত।

কিন্তু একদিন নিঃশ্বাস বন্ধই হয়ে গেল ঠাকুমার। আর চালু হল না। ঠাকুর্দার মৃত্যুর সময় মঞ্জরী জন্মায়নি তাই মৃত্যুর সঙ্গে সেই ওর প্রথম মােলাকাত। আর যতই আভাস থাকুক না কেন, কারও মরে যাওয়ার জন্য কেউই তৈরি থাকে না। তাই ঠাকুমার মৃত্যুর পরদিন রেজাল্ট আনতে যেতে দেরি হয়ে গিয়েছিল মঞ্জরীর।

তখন দিদিমণিরা অনেকেই বেরিয়ে গেছেন স্কুল থেকে। কয়েকজন আছেন ভিতরে কিন্তু মঞ্জরী কী করতে স্কুলে ঢুকবে যখন বাইরে অলােকা ওর রেজাল্টটা হাতে তুলে নাড়াচ্ছে আর বাকিরা চেঁচিয়ে ওর ফেল করার কথা ঘােষণা করছে।

মঞ্জরীর একবারও মনে হয়নি যে ওরা অন্য কারও রেজাল্ট নিয়ে ভয় দেখাচ্ছে, ও এত খারাপ পরীক্ষা দেয়নি যাতে একেবারে ফেল করে যাবে! আসলে দুঃসংবাদের ভিতর দুঃসংবাদকে অস্বীকার করার ক্ষমতা থাকে না; ওর তাই মনে হচ্ছিল ঠাকুমা যেমন একটা গনগনে চুল্লির ভিতর ঢুকে গেল, ওর নামটাও ঢুকে গেছে ফেল করা মেয়েদের তালিকায়। ওর দেরি দেখে ওর রেজাল্ট অলােকার হাতে তুলে দেওয়া দিদিমণিদের উপর একটুও রাগ হচ্ছিল না ওর, কেবল মনে হচ্ছিল, ও তাে আর নিজের পুরনাে স্কুলে ফিরতে পারবে না, প্রতিনিয়ত টিটকিরির মধ্যে এই স্কুলেই আসতে হবে ওকে।

স্কুলগেটের বাইরে দাঁড়িয়ে মঞ্জরী অঝােরে কাঁদছিল আর হয়তাে কাঁদতেই থাকত যদি না সেই সময়ই স্কুলের সামনে এসে দাঁড়াত মন্টু আর কী চলছে না চলছে বুঝে নিত মুহূর্তের মধ্যে।

মন্টু তখন উঠতি মাস্তান। সাইকেল করে দোকানে-দোকানে মাল সাপ্লাই দেওয়ার কাজ ছেড়ে ও তখন মেজো মাপের কোনও নেতার খুঁটি ধরে এর ভাড়াটে, তার বাড়িওয়ালার সঙ্গে কাজিয়া করে বেড়াচ্ছে। অবশ্যই এমনি এমনি নয়, একে ধমকে, ওকে চমকে দিব্যি টু-পাইস হচ্ছিল ওর। তবে মঞ্জরী সেই সমস্ত কথা কানাঘুষােয় শুনলেও বােঝার বয়সে পৌঁছােয়নি আর সেদিন দুপুরে মন্টুকে দেখে ওর খারাপ কিছু মনেই হয়নি। বরং মন্টু যখন মঞ্জরীর রেজাল্ট অলােকার হাত থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে তখন মঞ্জরীর চোখে ও একরকম দেবদূত হয়ে উঠেছে।

সেদিন মঞ্জরীর প্রগতিপত্রটা দেখতে দেখতেই তার উপর দু’বার হাত বুলিয়েছিল মন্টু। তারপর মঞ্জরীর দিকে এগিয়ে দেবার সময় মুখ দিয়ে ‘হিলি পিলি ফুক’ জাতীয় কিছু একটা উচ্চারন করে বলেছিল, ম্যাজিক করে তােকে পাস করিয়ে দিলাম।

মন্টুর হাত থেকে নেওয়া সেই প্রগতিপত্রই যেন জীবনের প্রথম প্রেমপত্র হয়ে উঠেছিল মঞ্জরীর। ওটা নেবার সময় মন্টুর আঙুল বেশ খানিকক্ষণ ছুঁয়ে ছিল মঞ্জরীকে। কিন্তু সেই ছোঁয়ায় নয়, ওর শিহরন জেগেছিল প্রােগ্রেস রিপাের্টের প্রথম পাতাটা উল্টে, ‘প্রােমােটেড’ শব্দটা পড়ে।

সেদিন রাতে, পরদিন দুপুরেও মঞ্জরীর মনে হচ্ছিল, আসলে বােধহয় ও পাশ করেনি, মন্টুই ম্যাজিক করে প্রতিটা বিষয়ের নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছে ওর, লাল দাগগুলাে অদৃশ্য করে দিয়েছে রেজাল্টের পাতা থেকে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে গেছে অলােকা-কাকলিদের করা সব অপমান, যা মঞ্জরীর পায়ের নীচ থেকে মাটি সরিয়ে নিচ্ছিল একটু আগেই।

সেই বেঁচে যাওয়ার দিনটার প্রায় কুড়ি বছর পরের একটা দুপুরবেলা ক্লাস টেনে ওঠার দুপুরটা কমা, সেমিকোলন সমেত মঞ্জরীর স্বপ্নে ফিরে এল।

ঘুম ভাঙতেই মনে হল, মন্টুর সঙ্গে কি আর দেখা হতে পারে না?

ওদের জমি আর বাড়ির বিনিময়ে প্রােমােটার তিনটে ফ্ল্যাট দিয়েছিল। তার মধ্যে দুটো ফ্ল্যাট মিলিয়ে একটা বড়াে ফ্ল্যাট বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল দাদার জন্য। দাদার হবু বউ এবং শ্বশুরবাড়ির সেটাই শর্ত ছিল একরকম। বাবা প্রথমটায় একটু আপত্তি করেছিল তারপর পরিবেশ, পরিস্থিতির কারণে মেনে নেয়।

অনেকগুলাে মেনে নেওয়ার সুতােয় গাঁথা থাকে জীবন, বিয়ের পর পদে পদে অনুভব করত মঞ্জরী। সম্বন্ধ বিয়েতে রাজী হওয়া একটা মেয়ের মনে ভয়ের পরিমাণ যেমন বেশি থাকে, তেমনই থ্রিলও বেশি থাকে খানিকটা। প্রেমের বিয়েতে চেনা মানুষের সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বস্তি, আর সম্বন্ধের ক্ষেত্রে অচেনা মানুষকে আবিস্কারের আনন্দ। কিন্তু অপমান আর আঘাত এসে যখন সেই আনন্দকে যন্ত্রনায় বদলাতে থাকে, কীরকম যেন তেতাে-তেতাে হয়ে যায় সবটা। সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে আর তখনই টের পাওয়া যায় পালানাের রাস্তাটা অসম্ভব কঠিন আর পালিয়ে বাঁচার মানচিত্রটাও ঝাপসা।

সুরঞ্জন উঁচু পদে চাকরি করত বলে মঞ্জরী প্রাইমারি স্কুলের চাকরিটা উল্লেখের যােগ্যতা হারিয়ে ফেলেছিল অচিরেই। কিন্তু তাই বলে ওর বর বিস্মৃত হত না যে মাস গেলে মঞ্জরী একটা মাইনে পায়। কারণে অকারণে সেই সামান্য টাকার ভাগ চেয়ে বসত সে, সিনেমা দেখতে যাবার কথা বললে টিকিট কাটতে বলত মঞ্জরীকে। ন’মাসে- ছ’মাসে হােটেলে খেতে নিয়ে গেলে, বিল মেটাতে বলত মঞ্জরীকে। প্রথম-প্রথম চুপ করে মেনে নিত মঞ্জরী হাজার খারাপ লাগলেও। পরের দিকে আপত্তি করলেই ঝাঁঝিয়ে উঠত সুরঞ্জন। নরমে-গরমে বুঝিয়ে দিত যে বিয়ে যখন করেছে তখন মঞ্জরীর সবকিছুর উপরই ওর অধিকার।

– ভুলে যেও না, আমার দয়াতেই চাকরিটা করছ। পেটে জল পড়লে বাঁধা বুলি ছিল সুরঞ্জনের।

– পরীক্ষা আর ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরিটা পেয়েছিলাম, তােমার দয়ায় নয়। আর ঘটনাটা ঘটেছিল বিয়ের অনেক আগে। তখন তুমি ত্রিসীমানাতেও ছিলে না। উত্তর জানা থাকলেও জবাব না দিয়ে পারত না মঞ্জরী।

– তােমার বাপের বাড়ি থেকে প্রায় দু’ঘণ্টা লাগত তােমার ওই পাঠশালায় পৌঁছতে। আর আমার বাড়ি থেকে আধ ঘণ্টারও কম সময়ে পৌঁছে যাও। তাহলে ভুল কী বললাম? আরে বাবা, ওই চাকরির জন্যই তাে তুমি হাওড়ার ছেলেটাকে ক্যানসেল করে নাচতে নাচতে দমদমে এলে। নইলে প্রথমটায় তাে আমাকে পছন্দ হয়নি তােমার।

সুরঞ্জনের কথাগুলাে ভিতরে ভিতরে জ্বালিয়ে দিত মঞ্জরীকে আর ও একপশলা বৃষ্টির আশায় ওর সেই হাওড়ার সম্বন্ধটার কথা মনে করার চেষ্টা করত; কোঁকড়া চুলের সেই লম্বা ছেলেটা, যার মুখ অস্পষ্ট হয়ে আসছে যত দিন যাচ্ছে..

যা খুশি বলতে বলতে বিছানায় শুয়ে পড়ত সুরঞ্জন আর মঞ্জরীর দেরি হলেই বলত, মন ব্যাকুল হয়ে উঠল নাকি হাওড়ার জন্য?
মঞ্জরীর গা ঘিনঘিন করে উঠত আর মনে হত, কেন এই লােকটাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল ও? অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য একটা খাঁচার ভিতর ঢুকে জীবনটাকেই নষ্ট করে দেওয়ার কী মানে হল?

জীবন কবিতা না আর মানুষও পাখি নয় যে সেতুর উপর দিয়ে উড়ে চলে যাবে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ধুলাে লাগবেই তার প্রতিটা পদক্ষেপে। শরীর বাধ্যতামূলক তার প্রতিটি দাম্পত্যে।

অত সব কথার পরও তাই ঢেউ আর বালির সংঘাত হত, মিশে যেত বাতাস আর ধোঁয়া, আলাদা করা যেত না প্রােটন আর ইলেকট্রনকে। কেবলমাত্র বৃষ্টি আর ফোয়ারা এক হয়ে যেত না কারণ মনহীন সব ক্রিয়াই প্রতিক্রিয়া মাত্র; সেখানে কাদা আছে, কান্না নেই।

নেই বলেই, মাস খানেকের অস্বস্তির সূত্রে স্থানীয় এক চিকিৎসককে দেখিয়ে এসে, মঞ্জরী যখন আতঙ্কে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, সুরঞ্জন তখন ঘৃণা আর বিরক্তি প্রকাশ করতেও পিছপা হচ্ছিল না।

– আমার হাত পড়লেই তাে সরিয়ে দেবার জন্য অস্থির হয়ে যাও, এবার যখন অন্যরা ধরবে? তারপর তােমার ওই লাম্প ম্যালিগন্যান্ট বেরােলে পরে ওই সব কেমাে-ফেমাে নিয়ে মাথায় চুল থাকবে না, বুকও হাওয়া হয়ে যাবে, তােমায় মেয়ে বলে মনে হবে তখন?

– খারাপ রিপাের্টই আসবে এমন কোনও গ্যারান্টি তাে নেই। আমার তেমন কিছু নাও হতে পারে।

– যা হবে, দায়িত্ব তােমার। ম্যামােগ্রাফি করতে গিয়ে জিওগ্রাফি পালটে গেলে, আমি জানি না। এখন মনে হচ্ছে, আগের বছর তােমার মিসক্যারেজ হয়ে গিয়ে ভালােই হয়েছিল, বাচ্চা হলে পরে কোন ললিপপ চুষত কে জানে! ভগবান যা করে তা ভালাের জন্যই করে, বুঝলে?

– ভগবান কি শুধু পিশাচ আর ইতরদেরই ভালাে করে? মঞ্জরী প্রতিবক্স ক্রিয়ায় বলে উঠল।

– কী বলতে চাইছ? বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল সুরঞ্জন।

কিন্তু ওর হাতের গ্লাসটা হাত থেকে পিছলে মাটিতে পড়ে গেল। আর তার ভাঙা কাচে পা কেটে ফেলল লােকটা। ভাঙা কাচে নিজের অস্তিত্বকে অবিরাম কাটতে থাকার নামই বােধ হয় বেঁচে থাকা।

মঞ্জরী বাপের বাড়ি চলে আসার চারদিনের মাথায় তাই ওর দাদা এসে বলল, সুরঞ্জন ফোন করেছিল, আমি তখন ধরতে পারিনি। পরে রিং ব্যাক করতে সব জানালাে। তুই কী পাগলামি করছিস এসব? এখান থেকে তাের স্কুলও তাে অনেক দূরে। যাওয়া-আসার ধকল নিতে পারবি?
– যতদিন পারব, নেব। তারপর না পারলে পরে, পাড়ার দু-তিনটে বাড়িতে রান্নার কাজ নেব। আমার রান্নার হাত ভালাে, তােরাই তাে বলতি।
দাদা আর কথা না বাড়িয়ে সরে পড়েছিল।

– আসলে বাবার সম্পত্তির তিন ভাগের দু’ভাগ গাপ করে নিলে বেশি কথা বলাও যায় না। মঞ্জরীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব ব্যবস্থাগুলাে নিজের উদ্যোগে করে দিয়ে, চিরন্তনদা বলেছিল।

দাদার ছেলেবেলার বন্ধু চিরন্তনদা এখন নামকরা ডাক্তার কিন্তু মঞ্জরীর মনে লােকটার বয়স ওর জন্য অন্তত বাড়েনি। মনে হল বলেই, মন্টুর খবর জিজ্ঞেস করতে পারল সহজে।।

-মন্টু তাে শুনেছিলাম ওয়াগন ব্রেকারদের দলে ভিড়ে পুলিশের গুলি খেয়েছে। বেঁচে নেই বােধহয়। থাকলে আমার কাছে ও ওষুধ নিতে আসতই। কিন্তু মন্টুকে নিয়ে তাের কী দরকার?

বাইরে অনেক পেশেন্ট অপেক্ষা করছিল চিরন্তনদার। অবশ্য একজন না থাকলেও কি কিছু বলতে পারত মঞ্জরী?

বেঁচে থাকাটা খুব দরকারি কোনও জিনিস তাে নয়। কিন্তু বেঁচে থাকাটা একটা ম্যাজিক। আর সেই ম্যাজিকের দেখা জীবনে একবারই পেয়েছিল মঞ্জরী। যে কোনও ম্যাজিকের মতােই সেও অবাস্তব, ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু মিথ্যে নয়। হলে পরে মঞ্জরীর চিরন্তনদার কথাটা মিথ্যে মনে হত না। সন্ধ্যায় ঘর থেকে বেরিয়ে একইসঙ্গে নিজের অতীত আর ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা শুরু করত না ও। উঠে যাওয়া খাটাল আর থেকে যাওয়া কাঠের গােলা পেরিয়ে দুপুরে দেখা স্বপ্নটার পিছন পিছনই হাঁটছিল মঞ্জরী। হাঁটছিল স্বপ্নের চেয়েও স্বপ্নিল সেই দুপুরটার দিকে।

কাল মঞ্জরীর পরীক্ষা। রেজাল্টও কালই। আর এবার মার্কশিট ওর নিজের শরীরের সেই অংশ, যার ভিতরে হৃদয় নামের সেই অবিশ্বাস্য বস্তুটা থাকে। আচ্ছা, যে নিজে অবিশ্বাস্য তার জন্য সেরকমই কিছু ঘটতে পারে না? মন্টু পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরতে পারে না ওকে? একবার নিজের হাতদুটো বুলিয়ে দিতে পারে না যাতে ম্যালিগন্যান্সির ছিটেফোঁটাও না থাকে কোথাও ?

কীরকম একটা ঘােরের মধ্যে ওদের মহল্লার শেষ প্রান্তে এসে পড়েছিল মঞ্জরী। এখনও কিছুটা ফাঁকা এদিকটা। গঙ্গা এখান থেকে অল্পই দূরে। বলা নেই, কওয়া নেই, গঙ্গার বাতাস যেন মন্টুর কণ্ঠস্বর হয়েই মঞ্জরীর কানের লতিতে চুমু খেয়ে গেল আচমকা।

মঞ্জরী স্পষ্ট শুনতে পেল, মন্টু বলছে, তুমি এখনও আমাকে মনে রেখেছ মঞ্জরী?

মঞ্জরী বলতে চাইল, দেবদূতকেও মানুষ ভুলে যেতে পারে, ম্যাজিশিয়ানকে তাে ভুলতে পারে না, মন্টু…

কিন্তু ওর সামনে-পিছনে, আশপাশে কাউকে দেখতে পেল না।

শুধু অনেকটা অন্ধকার। আর অল্প একটু আলাে।

অলঙ্করণ: শুভেন্দু সরকার

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes