jamdani

শতরূপা রুপিন পাস

অর্ণব আচার্য্য

 

মস্তক মুকুট হার,হিম শৈল দুগ্ধ সফেন,

তোমার শরীরের বাঁকে প্রাণ খুঁজে পায় ,

জীবনানন্দেরবনলতা সেন ” …

 

“বাকি রাখা খাজনা , মোটে ভালো কাজ না”…. কিছু কিছু কাজ দেখেছি সামান্য ফেলে রাখলে আর করাই হয়ে ওঠে না। তাই সাম্প্রতিক নিম্নচাপ ও সেই বৃষ্টিভেজা দুপুরের অসম্ভব আলস্য কাটিয়েও শেষ অবধি আর একবার কলম ধরলাম।

মে মাসের গরমে তখন খড়্গপুর ঘামে ভেজা বিছানায় ছটফট করছে। চারিদিকের আঁটোসাঁটো উত্তাপ যখন শরীর না চাইতেও প্রায় মানিয়ে নিয়েছে ,তখন জুন মাসের শুরুতে একছিদ্র অবকাশ বেয়ে কিছুটা হিমেল হাওয়ার গন্ধ উপহার দিয়ে গেলো ফুসফুস ভরা স্বপ্ন।

স্মার্ট ফোন , ট্যাবলেটের পরিধির বাইরে যদি চোখ তুলে তাকানো যায় তাহলে এখনো কিছু মানুষ দেখা যায় যারা আজও আর্য সভ্যতার প্রাচীনতম জীবীকাপশুপালনএর ওপর নির্ভরশীল। ইংরেজিতে “shepherd ” নামে পরিচিত এই মানুষদের প্রধান প্রতিপালিত পশু ভেড়া। উত্তরাখন্ড থেকে হিমাচলের কিন্নর পর্যন্ত ওদের আনাগোনা।

দেরাদুন থেকে সাঁকরি হয়ে ধৌলা নামের এক জায়গা থেকে এই যাত্রাপথ শুরু। রুপিন নদীর গতিপথ অনুসরণ করে তার উৎস পর্যন্ত অবর্ণনীয় রূপের পাপড়ি মেলে পাহাড়পাগল প্রজাপতিদের আহ্বান জানায় এই পথের গান।

৬ দিনের এই লম্বা ট্রেকের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট হলো প্রতদিন যেন কোন জাদুবলে চারিদিকের সৌন্দর্য বদলে যায়। কখনো ঘন জঙ্গল তো কখনো বুগিয়াল, কখনো গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাওয়া পাথুরে রাস্তা তো কখনো ২৩ ফিট পুরু বরফের রাস্তা, কখনো নদী গুলোকে সরু সুঁতোর মতো মনে হওয়া তো কখনো সেই ভয়ঙ্কর নদীর ওপর দিয়ে পেরিয়ে যাওয়া।এই পথের পাঁচালীরুপিন পাস ” নামে পরিচিত।

 

|| প্রস্তাবনা ||

 

সাঙলা থেকে শিমলার দূরত্ব ভালোই। পাহাড়ি রাস্তায় প্রায় ৫৬ ঘন্টা লাগে। কিন্তু আমাদের সেদিন কপাল গুনে ৮ ঘন্টারও বেশি লেগে গেলো। তারপর আবার আম্বালা অবধি যেতে হবে। সেখান থেকে দিল্লী হয়ে যে যার জীবনে ফিরে যাবো।আমাদের অতিসাবধানী ড্রাইভার এর দয়ায় শিমলা পৌঁছতেই সন্ধ্যে ৬টা বেজে গেলো। তাড়াহুড়ো করে করে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সবাই উঠে পড়লাম। ট্যাক্সি ৫০ মিটার যেতে না যেতেই ড্রাইভার বললোমেরে পাস্ এক বড়া গাড়ি ভি হ্যায় , Swift Dzire , আপ উসমে যাওগে ?” সারাদিনের ক্লান্তির পর আরাম কে না চায় ? বললামঠিক হ্যায়

ড্রাইভার কাকে একটা ফোন করতে গেলো।কিছুক্ষন পর ফিরে এসে বললোসরি ভাইসাব , উয়ো গাড়ি নেহি মিলেগা ,ইসিমে জানা হোগা “.

বেশ খানিকটা বিরক্তির সাথেই উত্তর দিলাম -“ঠিক হ্যায় ,জলদি চলো

পড়ন্ত বিকেলের মাঝে পাহাড়ি রাস্তা,সারাদিনের ক্লান্তি আর গাড়ির হালকা দুলুনি , এই জুড়ি উত্তমসুচিত্রা কেও হার মানায়। কখন যে চোখ বুজে এলো বুঝিনি। ট্রাফিকের শব্দ ফিকে হয়ে কানে এলো ফেলে আসা রুপিননদীর বয়ে যাওয়ার শব্দ।

|| ১ ||

দেরাদুন থেকে ৫-৬ ঘন্টা লাগে সাঁকরি যেতে। পাহাড়ের কোলে ছোট্ট গ্রামটি ভারতের অনেক প্রচলিত ট্রেক রুটের আরম্ভ-স্থল। একে উত্তরাখণ্ডের গেটওয়ে অফ ট্রেকিং বলা হয়। বিখ্যাত কিছু ট্রেক যেমন কেদারকণ্ঠবালি পাস শুরু হয় এই সাঁকরি থেকে। এখান থেকে “স্বর্গারোহিনী” , “ব্ল্যাকপিক ” দেখা যায়। সেই রাস্তা “হারকিদুন ভ্যালি” নামে পরিচিত। সাঁকরি খুবই ছোট ছিমছাম একটা জায়গা। পাশেই রয়েছে শর গ্রাম। শর গ্রামের লোকজন মূলত সাঁকরিতে এসে ব্যবসা, কৃষিকাজ করে। প্রথমদিনে সূর্যাস্তের কমলা রঙে রাঙা স্বর্গারোহিনী উপভোগের পর দ্বিতীয় দিন গাড়িতে ধৌলা এলাম। এখন থেকেই হাঁটা শুরু।

পরিচয় পর্বটা এখনই সেরে রাখা ভালো। দল বলতে আমরা ৪ জন। অরিত্র ,আমি,রামিজ এবং আমাদের দলের নাবালক অবকাশ। অবকাশের এই নামকরণের একটা কারণ আছে। এখানে আসার কথা যখন ঠিক হয় তখন অবকাশের ভাই আকাশের আসার কথা ছিল। সে না আসতে পারায় আমি যোগ দিই। অবকাশের বাচ্চা সুলভ চেহারার জন্য ওর ভাইয়ের নামে কাটা অনূর্ধ ১৮ এর টিকিট এ ও ট্রাভেল করে এবং অবকাশের টিকিটে আমি। অনূর্ধ ১৮-এর টিকিটের দৌলতে নাম হয় “নাবালক” , সৌজন্যে অবশ্যই ওর বাচ্চাসুলভ চেহারা। এ ছাড়াও আমাদের সাথে আছে ট্রেক লিডার নীল ,রাঁধুনি রাহুল এবং আমাদের গাইড সন্তুভাই ও তাদের সহকর্মীরা।

শুরুতেই অভ্যর্থনা জানালো রুপিন নদীর ওপর লোহার এক ঝুলন্ত ব্রিজ। নিচে প্রবল স্রোতে বয়ে যাচ্ছে রুপিন নদী। নদীর গর্জন এতটাই বেশি যে ৪-৫ ফিট দূরে দাঁড়িয়ে কেউ কিছু বললে শোনা যাচ্ছিল না। এই নদীরই উৎসস্থল আমাদের এবারের গন্তব্য। প্রথম দিনের রাস্তা খুব একটা খাড়াই নয় ,তবে কিছুটা লম্বা। নদীকে ডান দিকে রেখে আমরা এগিয়ে চললাম।

 

দিনটা ৪ঠা জুন , ICC – Champions Trophy , ভারত – পাকিস্তান ম্যাচ। সারাদেশ যখন টিভির পর্দায় একত্রিত হয়ে রোহিত – কোহলি দের জন্য গলা ফাটাচ্ছে ,আমরা তখন পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে চললাম। সুন্দর গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে একটু ঘন রাস্তায় এসে পড়েছি ,হঠাৎ বাঁ হাতটা কিসে যেন একটা খোঁচা খেলো। সাথে সাথে হাতের তালু থেকে কনুই অবধি ঝনঝনিয়ে উঠলো। হাতটা তুলে দেখি সারা হাতে লাল চাকা-চাকা দাগ হয়ে ফুলে উঠেছে। “বিচ্ছু-ঘাস” ,যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় Urtica Dioica বলা হয়ে থাকে। কাঁটা জাতীয় এক বিষাক্ত গুল্ম। অনেক জায়গায় আমাদের এর সামনে পড়তে হবে। চিৎকার করে ডাকলাম – “সন্তুভাই ইধার আও” ….

সন্তুভাই সব দেখে বললো — “কুচ নেহি , চরস লাগালো ,সব ঠিক হো জায়েগা ” …

হ্যাঁ , চরস , Cannabis . আমরা এখন হিমাচলীয় অংশে রয়েছি , যাকে Cannabis এর প্রোডাকশন হাউস বলা হয়। পাহাড়ের গায়ে ,রাস্তার ধারে ধারে থরে থরে সাজানো এই সেবক পাতার বাহার। মুঠোয় কিছুটা ছিঁড়ে নিয়ে ঘষে নিলাম হাতে। ১০ মিনিটের মধ্যে সমস্ত দাগ ম্যাজিকের মতো ভ্যানিশ। টোটকা যখন জানা হয়ে গেছে ,এই দুশমনকে তখন আর ভয় নেই। এগিয়ে চললাম , মোবাইলের টাওয়ার আর রুপিন নদী দুই-ই এখন আমাদের আড়ালে। চলতে চলতে একটা বাড়ির কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাড়িটাকেই দেখতে লাগলাম। তখনই এক বৃদ্ধা এসে বাড়িটার সামনে বসলেন। মনে হলো যেন —

হাজার বছরের ইতিহাস আগলানো তোমার কোলে,

যেন কোন নিপুন শিল্পীর মনযোগে ধরা তুলি,

সেই ইতিহাস গল্প বলবে বলে,

বসিয়ে রেখেছে প্রাচীনা একঠাকুরমার ঝুলি” –

বেলা ১২:৩০ নাগাদ এসে পৌঁছলাম সেওয়া নামের একটি গ্রামে। ছিমছাম ছোট্ট একটি গ্রাম যেখানে অনেকেই প্রথম দিনের ক্যাম্প ফেলেছে। আমরা আর একটু এগিয়ে যাবো। এখানে একটা কাঠের মন্দির দেখেছিলাম। স্থানীয় দেবতা মাসুদেবের মন্দির। মন্দিরের গায়ে সুন্দর কারুকার্য এবং তার গায়ের নানা ফাটলে অনেক কয়েন গোঁজা। মন্দিরের প্রবেশপথের ওপর বেশ কিছু জিনিস ঝুলছে যা অনেকটা ট্রফির মতো দেখতে। শুনলাম গ্রামের ছেলেরা নিজেদের মধ্যে ক্রিকেট খেলে এবং বিজয়ী দলের ট্রফি তারা এখানে ঝুলিয়ে দেয়। ক্রিকেটের কথায় ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের কথা মনে পড়লো।

মোবাইল টা একবার বেরকরে , নিরুপায় দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম।কিছুটা এগোনোর পর নানা পথের বাঁকে হারিয়ে যাওয়া রুপিন নদী আবার আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালো। পৌঁছলাম “আলীগাড” নামের এক জায়গায়। আমাদের প্রথম দিনের ক্যাম্প এখানেই। নদীর জলে মুখ ধুয়ে পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে নদীর ধরেই হারিয়ে গেলাম। অবকাশ ও অরিত্র জলের হিমেল স্রোত ও ভীষণ মিষ্টি হাওয়ায় ডুবিয়ে নিলো নিজেদের।

মুহূর্তকেও আটকে রাখা যায় ,

বাঁধতে হলে ফস্কে যাবে তারা

মেলে ধর শুধু নীরবতার জয়,

দিক ভুলে সব আপনি দেবে ধরা….

|| ২ ||

সকাল সকাল এক মহান কর্ম সেরে , ব্রেকফাস্ট করে ৮টা নাগাদ সবাই রেডি। আজ আমরা যাবো “ঝাকা” নামের একটি গ্রামে। সেখানে হোমস্টে ,ক্যাম্পের দরকার নেই। আলীগাড থেকে সব গুঁটিয়ে এগিয়ে চললাম। নিচে রয়ে গেলো রুপিন নদী ,ঢেউয়ের আল্পনা এঁকে বুঝিয়ে দিলো “জলদি-ই দেখা হবে “।এসে পড়লাম বেশ খানিকটা বড়ো একটা রাস্তায়। বেরোনোর সময় জল ভরতে ভুলে গেছিলাম আমি। এখানে একটা ওয়াটার লাইনে ফাটল ধরেছে দেখলাম।ব্যাস , জোগাড়ে বাঙালি যোগ্য হাতে ভরে নিলো জলের বোতল। এখানে একটা দোকানে গতকাল খেলায় ভারতের জেতার খবরও পাওয়া গেলো।

রাস্তার ডানপাশে আরেকটি উপত্যকা।সবুজের চাদর বিছিয়ে ঘাসেরা ঠান্ডা হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে। তার নাম রুপিন-সুপিন। এপাশ থেকে দেখে ঠিক যেন মনে হচ্ছে কোনো সদ্যস্নাত নারী তার ভেজা চুল শুকোতে বসেছে ,আর দিনের আলো যেন তার সোনালী উত্তরীয় বুলিয়ে খুব যত্নে মুছিয়ে দিচ্ছে তার শরীরের প্রতিটি জলবিন্দু। এই স্নিগ্ধতার পাহারা দিতে শানিত দৃষ্টি আর তীক্ষ্ণ চঞ্চু নিয়ে মাথার ওপর উড়ে বেড়াচ্ছে “Great Himalayan Griffon Vulture” , যার নখের একটি আঁচড়ে মানুষের খুলিও ফুটো হয়ে যেতে পারে।

খুব সন্তর্পনে তার শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। কিছুটা পথ পরে এলাম “জিসকুন” নামের একটি গ্রামে। অনেকে দ্বিতীয় দিনের ক্যাম্প এখানেই করে। এখান থেকেই দেখতে পাওয়া যায় পাহাড়ের গায়ে ছবির মতো সুন্দর ঝুলন্ত দুটি গ্রাম “ঝাকা” ও “ধারা”। আমরা ঝাকার পথে রওনা হলাম। জিসকুন থেকে ঝাকা পর্যন্ত রাস্তা বেশ ভালো চড়াই।

৫-ই জুন , বেলা ৩ :০০ নাগাদ পৌঁছলাম “ঝাকা”। প্রথমে হোমস্টে শুনে ভেবেছিলাম ছিমছাম এক থাকার জায়গা হবে। কিন্তু আমাদের যে রুম দেওয়া হয়েছিল তাতে ঢুকে অবাক না হয়ে পারলাম না। সমস্ত দেওয়াল জুড়ে নানা তৈলচিত্র যেমন চিত্তাকর্ষক তার রুচিবোধও তেমনই মানানসয়ী চারপাশের প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতার সাথে। আর এই আমেজকে পরিপূর্ণ করতে কালো আঁচল , একরাশ আতিথেয়তা , ও সবার জন্য সরবতের গ্লাস নিয়ে সামনে এলো “অনুরাধা”। এই বাড়িরই মেয়ে ,সিমলায় পড়াশুনো করেছে। ভারী মিষ্টি মেয়ে। তার গাল ভরা লালিত্ব বারান্দার ধারে ফুটে থাকা ছোট্ট লালাভ আপেল গুলোর বুকেও আংশিক ঈর্ষা ধরায়। তার সাথে আলাপ হয়ে খুব ভালো লাগলো।

সন্ধ্যেবেলা পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নায় সবাই যেন নিথর হয়ে বসে রইলাম বারান্দায়। দূরে দেখা যাচ্ছে “ধারা” গ্রাম। ছোট ছোট আলোর বিন্দু ,যেন আলোর মালা পরিয়ে রেখেছে পাহাড়ের গলায়। হালকা সুরে মোবাইল-এ একটা গান বাজছিলো। রুপোলী সন্ধ্যায় সেই সুর বহুদূরে কোথাও অনুরণিত হলো।

পরদিন সকাল ৬ই জুন , ঝাকা থেকে বেরিয়ে আমাদের আজকের গন্তব্য “বুরাস-কান্দি”। ঝাকা থেকে প্রায় জনবসতি শেষ। বৃষ্টির পূর্বাভাষ না থাকলেও পাহাড়ের আবহাওয়া বলা যায় না। আজকের অতিক্রম্য দূরত্বও বেশ খানিকটা। তাই সকাল সকাল হাটা লাগলাম। এখন থেকে আমাদের আরও এক নতুন সদস্য যোগ হলো। তার নাম “ভুটু” , ঝাকার -ই স্থানীয় কারো পোষা কুকুর। বহু চেষ্টাতেও তাকে ফেরানো যায় নি। আপনারা হয়তো বিশ্বাস করবেন না , ভুটু শেষ দিন অবধি আমাদের সাথে ছিলো।

ঝাকা থেকে কিছুটা এগিয়ে বেশ ঘন এক জঙ্গলের রাস্তায় এসে পড়লাম। চারদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর অনুমতি ছাড়া এখানে সূর্যালোক প্রবেশও নিষেধ। রাস্তা খানিকটা শ্যাওলা আর স্যাঁতসেঁতে, সাবধানতা আবশ্যক। সেই বর্ণময় নিস্তব্ধতার মাঝেই কানে এলো জলস্রোতের শব্দ। কথা দেওয়া প্রেমিকার মতো রুপিন নদী আমাদের আবার ঠিক খুঁজে নিয়েছে। সেই শব্দ অনুসরণ করে একটু এগিয়েই থমকে দাঁড়াতে হলো। জঙ্গল শেষ হয়ে রাস্তাটা খাড়া নেমে গেছে, তার তলা দিয়ে তরঙ্গ-ভঙ্গ রূপে বয়ে চলেছে রুপিন। এর আগে যতবার নদীটা পেরিয়েছি উপরে একটা ব্রিজ ছিলো, কিন্তু এবার পড়ে থাকা দুটি কাঠের গুঁড়ি ই ভরসা। খাড়া চড়াইয়ের থেকে খাড়া উৎরাই অনেক ভয়ানক। আমি আর অরিত্র খুব সাবধানে নেমে নিচে বাকিদের অপেক্ষা করতে লাগলাম।

অবকাশ , রামিজ দুজনেরই পাখির ছবি তোলার সখ। তাই ওরা একটু পিছিয়ে পড়েছিল। আমরা নিচ থেকে দেখছি ,ওরা দুজনও একই ভাবে থমকে দাঁড়ালো সেই পিছল রাস্তা নামার আগে। রামিজ কিছুটা বসে নামতে শুরু করলো। কিছুটা নেমেছে অমনি অবকাশের পায়ে লেগে একটা আলগা পাথর প্রায় রমিজের শরীর ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। এই ঘটনার পর রমিজের শিরদাঁড়ার শীতল স্রোত ঠিক কতটা শীতল ছিল তা বেশ অনুমেয়।

খুব সাবধানে নদী পেরিয়ে আবার হাঁটা শুরু।আজ উচ্চতাও খানিকটা বেড়েছে ,তাই বাইরের রোদ বেশ মিষ্টি লাগছে। এসে পৌঁছলাম “উদকনাল” নামের এক জায়গায়। অনেকেই এখানে ক্যাম্প ফেলে, কিন্তু যথারীতি আমরা দামাল ছেলের দল , আর একটু এগিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় ক্যাম্প করবো।

সকাল থেকে চড়াই রাস্তা হাঁটতে হাঁটতে শরীর যখন খানিকটা ক্লান্ত তখন আচমকা এক এমন জায়গায় এসে পৌঁছলাম যার ক্যানভাসের সাথে ৫ মিনিট আগে ফেলে আসা জায়গায়ও কোনো মিলই নেই। রুপিন পাশের এই এক অদ্ভুত খেলা। landscape যেন সিনেমার সেটের মতো পাল্টে যায় হঠাৎই। সামনে দেখলাম প্রচুর গবাদী পশু চরে বেড়াচ্ছে এবং দুপাশের পাহাড়ের মাঝের উপত্যকা যেন তাদের দুবাহু খুলে জড়িয়ে রেখেছে এক অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে।একটু পরে খেয়াল করলাম , শুধু গবাদী পশু নয় , কয়েকটা কুকুরও আছে। এরা শেফার্ড ডগ নামে পরিচিত। অত্যন্ত ভয়ানক। এদের ট্রেনিং দেওয়া থাকে গবাদী পশুর ওপর কোনো অবাঞ্চিত আক্রমণ হলেই যেন তাদের ওপর হামলে পড়ে। এদের নজর এড়িয়ে থাকাই শ্রেয়।সেই রাস্তা পেরিয়ে আবার চমক। বুরাস-কান্দি ঢোকার মুখে এই জায়গা অনেকটা “mini valley of flowers”. চারিদিকের সৌন্দর্যও সেই ফুটে থাকা ফুল ও মখমলের মতো ঘাসের মতোই নির্মল।

এসে পৌঁছলাম বুরাস-কান্দি। আমাদের আজকের ক্যাম্প এখানেই। দূরে হালকা সুতোর মতো দেখা যাচ্ছে একটি জলপ্রপাত। ওটাই রুপিনের উৎসস্থল। আমাদের পরের দিন ওই জলপ্রপাতের মাথায় উঠতে হবে। জায়গাটা “Upper water fall” নামে পরিচিত।

|| ৩ ||

এই বুরাস-কান্দি ভ্যালিতে জায়গায় জায়গায় শীতকালীন বরফ যথেষ্ট আলো না পাওয়ায় এখনও জমে আছে সাদা ছোপের মত। এদের Glacial Patch বলে। এখান থেকেই স্নো লাইন শুরু। শীতকালে এই অঞ্চলের সবুজের লালিত্ব চাপা পড়ে যায় নিষ্ঠুর বরফের চাদরে। ক্যাম্প ফেলার কিছুক্ষনের মধ্যেই চারদিক কালো করে মেঘ করলো। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি আর ঠান্ডা হাওয়া শীতকে যেন বহুগুন বাড়িয়ে দিলো। তাঁবুর ভেতর আড্ডা আর তাসের খেলায় মাতলাম আমরা।

পরের দিন সকালে তাঁবু থেকে বেরিয়ে দেখলাম আবহাওয়ার খুব একটা উন্নতি হয় নি। বৃষ্টি হালকা থামলেও চারপাশের আকাশ যা অভিমান করে আছে , তাতে যেকোনো সময় কান্না নামতে পারে। গতকালের রাত্রি ব্যাপি বৃষ্টির পর যে ফ্রেশ স্নো পড়েছে তাতে ফেলে আসা পাহাড়গুলোর মাথাগুলোও ঢেকে গেছে। সামনে সেই সদ্য প্রস্তুত শ্বেত-চন্দন অনুলেপন করে দাঁড়িয়ে আছে রুপিন নদীর উৎস।আমাদের আজ এই প্রকান্ড জলপ্রপাতের মাথায় উঠতে হবে।

আজকের যাত্রাপথ মূলত দু-দিনের , কিন্তু আমরা সেটা একদিনেই অতিক্রম করবো। কারণ ৮ই জুন আবহাওয়া পরিস্কার থাকার পূর্বাভাষ আছে , তাই সেই দিন পাস ক্রসিং এর আদর্শ দিন। রুপিনের উৎস জলপ্রপাত আর এই জলপ্রপাতের উৎস তার চারপাশের পাহাড়ের গায়ের বরফের দেওয়াল। সেই বরফের রাস্তায় আরও বেশ খানিকটা উঠে গেলে হিমাচল ও উত্তরাখণ্ডের সীমানায় পৌঁছানো যায়। ওই জায়গাটাই রুপিন পাস নামে পরিচিত। সে বর্ণনা দিচ্ছি একটু পর।

কিছুটা সমতল রাস্তা এগোনোর পর এসে পড়লাম জলপ্রপাতের তলায়। এই জায়গার নাম “ধানদেরস থাচ “…. এখান থেকে খাড়া উঠে গেছে রাস্তা। আসলে রাস্তা বলতে আর কিছুই নেই। ওই জলপ্রপাতের পাশে পড়ে থাকা বোল্ডার বেয়েই উঠতে হবে আমাদের।রাস্তার ঝুঁকি এখানেই শেষ নয়। এই নির্জন প্রান্তরে রূপসী রুপিন নদীর গর্জন অনুরণিত হয়ে জানান দেয় তার একাকিত্বের অহংকার। কিন্তু এতো নির্মল পরিবেশ যে এতদিন উপহার দিয়ে এসেছে ,তার অন্তর যেমনই হোক বাইরেটা মমতাময়ীই। তার অভ্যন্তরীণ আর্তনাদ সে ঢেকে রেখেছে বরফের চাদরে। ফল্গু ধারার মতো তার তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জমে থাকা অভিমানের এক প্রখর প্রবাহ। জায়গায় জায়গায় বরফের চাদর ফেটে গিয়ে দগদগে ঘায়ের মতো দেখাচ্ছে। সেখান থেকে ঠিকরে আসছে তার স্রোত, সে যেন এক সাবধানবাণী। সেই প্রায় ৬০° হেলে থাকা বরফের চাদর আমাদের আড়াআড়ি ভাবে পেরোতে হবে বেশ কয়েকবার। তবেই পৌঁছনো যাবে এর মাথায়। সে রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে শিরদাঁড়া ঠান্ডা হয়ে আসে , আর ঠিক তখনই এই বিপদসংকূলতাকে যোগ্য সঙ্গত দিতে আকাশ ভেঙে নামলো বৃষ্টি।

পাহাড়ে বৃষ্টির সময় হাঁটবার জন্য রেইনকোট জাতীয় এক আলখাল্লা পাওয়া যায় যাকে Poncho বলা হয়। সবাই poncho পরে সেই ভেজা পিছল বোল্ডার বেয়ে হাঁটা শুরু করলাম। দলের একমাত্র আমারই চশমা আছে , তাই বিপদ আরো বেশি। চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে গিয়ে প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিনা। অত্যন্ত সন্তর্পনে প্রথমবার বরফের চাদরে পা রাখলাম। মাটিতে আর বরফে হাঁটার মধ্যে বিস্তর ফারাক। বরফে পায়ে গ্রিপ হয় না ,পিছলে যায়। তাই বরফের গায়ে পা ঠুকে ঠুকে এগোতে হয়। এই কৌশলকে “Toe Tipping” বলে।

পায়ের তলায় ৬০° হেলানো বরফের চাদর ,যার তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নিশ্চিত মৃত্যু। পাশাপাশি ২ জন যাওয়ারও উপায় নেই। কোনোমতে একজন শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে পার হতে পারে সেই রাস্তা। পেছন ফিরে দেখারও অবকাশ নেই। এই রুদ্ধশ্বাস ভয়াবহতা আমি বড় ভালোবাসি। খুব সাবধানে পার হলাম প্রথম বরফের চাদর। আরও তিনবার আমাদের এই অভিজ্ঞতা হবে আজ।

আমার পেছনে গুজরাট থেকে আসা একটি দলের একটি মেয়ে ছিল। রাস্তায় তার সাথে আলাপ হয়। আমি পেরিয়ে যাওয়ার পর সে ওই বরফের চাদরে পা রাখে। সে পেরোতে পারেনি। শারীরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গেলে ঘন ঘন উঁচু জায়গা থেকে নীচের দিকে দেখতে নেই , মাথা ঘোরায়। সে সেই ভুলটিই করে বসেছিল। ভগবানের অশেষ কৃপা যে আমার ট্রেক লিডার নীল তাকে পড়ে যাওয়ার পর তুলে আনে। বাঁ -পা ভেঙে গেছিলো তার। তাকে ফেরত পাঠানো হয় নিচের একটি গ্রামে ,সেখান থেকে শিমলা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।এই একঘেঁয়ে ভয়ানক রাস্তা আমাদের কষ্ট দিয়েছে অনেক , তবে তার যোগ্য উপহার যে উপরে অপেক্ষা করছিলো তা তখনই বুঝতে পারিনি। পাহাড়ের আবহাওয়া যেমন হঠাৎ করে খারাপ হয় , তেমন হঠাৎ করে ঠিক ও হয়ে যায়। আধ-ঘন্টার মধ্যেই কোনো এক আনমনা জাদুকরের কাঠির ছোঁয়ায় চারদিক পরিষ্কার হয়ে গেলো। সোনালী আলোয় চোখের সামনে যা দেখলাম তা স্মৃতির ক্যানভাসে এক আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

অপরূপ সৌন্দর্য যখন নিজের শরীর থেকে তার শেষ আবরণটিও সরিয়ে নিয়ে ধরা দেয় , সেই মাধুর্য আর শুধু উপভোগের থাকে না , তা হয়ে ওঠে পূজার। ১৪৫০০ ফুট থেকে হালকা সুতোর মতো দেখতে পাওয়া রুপিন নদী যেন কোনো চিত্রশিল্পীর দুটি অর্ধেক ছবিকে একসাথে মাঝবরাবর বুনে দিয়েছে। এই অপরূপ স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে চোখ ভেজাতে ভালো লাগে আমার।

|| ৪ ||

৮ই জুন ,আজ আমাদের এই যাত্রাপথের মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ রুপিন পাস পেরিয়ে সম্পূর্ণ রূপে প্রবেশ করবো হিমাচল প্রদেশে। পাহাড়ের পাস্ ক্রসিং বা যে কোনো Summit সবসময় সকাল সকাল করা উচিৎ। একটু দেরি করলেই আবহাওয়া খারাপ হতে পারে। তখন এতটা পথের কষ্ট বিফলে গেলে বড় খারাপ লাগবে। গতকাল থেকেই আবহাওয়া পরিষ্কার। চারিদিকে ঝকঝকে রোদ। আমরা ভোর ৫টা নাগাদ হাঁটা শুরু করে দিলাম। গতকালের ওই ভয়ানক রাস্তা পেরিয়ে আসার পর সবার মনেই একটা আলাদা জোর এসেছে , তাই শুরুতে রাস্তা খাড়াই হওয়া সত্ত্বেও , দ্রুত এগিয়ে চললাম। হিমালয় তার বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে রেখেছে নানা সৌন্দর্য , নানা ভয়। একটু এগিয়েই সম্মুখীন হলাম এক বহমান জলধারার। আসলে চারদিকের বরফের দেওয়াল গলে এই জল গিয়ে একত্র হয়েই সেই জলপ্রপাতের সৃষ্টি , তার থেকে জন্ম রুপিন নদীর। এই বরফ যেখানে গলে জল হয়ে যায় , সেই জায়গার বরফ একটু আলগা এবং খুব স্বচ্ছ। একে Barglass বলে। এটি মারাত্মক বিপদজনক কারণ এটি অসম্ভব পিচ্ছিল। পাথরের গায়ে জমে থাকা এই বরফ এতটাই স্বচ্ছ যে চোখে ধরা পড়ে না এর উপস্থিতি। একবার যদি পা পড়েছে এর উপর সঙ্গে সঙ্গে পা হড়কে যাবে। রাস্তার একদিকে খাড়া পাহাড় , অন্যদিকে বহমান জলধারা ও গভীর খাদে ক্ষুধিত পাষানের লোলুপ দৃষ্টি। ব্যালান্স হারিয়ে একবার নীচে পড়লে আর ফিরে আসার সম্ভাবনা কম , আর এলেও আস্ত নয়।

এই অসংলগ্ন বরফ আমরা ট্রেক-পোল দিয়ে ঠুকে পরীক্ষা করে নিচ্ছিলাম, এটিই নিয়ম। জোরে ট্রেক পোল দিয়ে ঠুকলে স্বচ্ছ বরফ ভেঙে যাবে , তখনি বোঝা যাবে barglass -এর উপস্থিতি। সেই পাথরে পা দেওয়া যাবে না। এই ভাবে এগোতে এগোতে একটা বাঁ হাতে বাঁক নিতেই চোখ জুড়িয়ে গেলো। কেউ যেন এই ভয়ানক রাস্তা পার করে আসার উপহার স্বরূপ দিগন্ত অবধি দুধ-সাদা বরফের চাদর পেতেছে আমাদের বরণ করার জন্য। এই জায়গা “রাতাফেরী” নামে পরিচিত। অনেকে এখানে একদিন রেস্ট নেয়। এই উচ্চতায় কায়িক শ্রম খুব দামি।গাছপালা নেই,অক্সিজেন ও কম , তাই শারীরিক নানা অসুবিধে এড়াবার একমাত্র উপায় এই উচ্চতায় শরীরকে কিছুটা খাপ খাইয়ে নেওয়া। আমাদের মধ্যে কারো সেরকম অসুবিধে না হওয়ায় ,আমরা রাতাফেরী ছেড়ে এগিয়ে চললাম।

ছবিতে একদম ডানদিক ঘেসে যে সরু গলির মতো রাস্তা দেখা যাচ্ছে , আমরা ওটা বরাবরই উঠবো , ওরই নাম রুপিন পাস।অসম্ভব ঠান্ডা হওয়ার কামড় থেকে বাঁচতে সেই শীতের সকাল গায়ে রোদ মাখতে বসেছে। শুভ্র বরফের চাদরের গায়ে সেই রোদ পিছলে যাচ্ছে। আর ঠিকরে পড়া রোদের ছটা চারদিকে এক সোনালী আবেশ সৃষ্টি করেছে। তার দিকে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকা যায় না , মাথা ঘোরায়। একে Sun Blindness বলে। আমি ছাড়া সবাই সানগ্লাস পরে নিলো। আমার চোখে চশমা থাকায় আমার সে সুযোগ নেই। তাই খুব সাবধানে মুখ নীচু করে চলতে লাগলাম।এসে পড়লাম রুপিন পাশের তলায়। ছোট্ট একটা গলির মতো জায়গা। পাশাপাশি দুজন যেতে পারে। অসম্ভব খাড়াই আর পুরোটাই বরফে মোড়া। বরফের গায়ে এতো চড়াই রাস্তা ওঠার অভিজ্ঞতা আমার পূর্বে ছিল না।

এখানে এই বিশাল বরফের চাদরের সব চেয়ে ভয়ানক বিভীষিকা হলো “ক্রিভাস” বা ফাঁপা বরফ। অনেক জায়গায় বরফের তলায় পাথর না থাকলেও অনেক দিনের জমে থাকা বরফ এক আস্তরণ তৈরী করে। সেটা যেকোনো সময় ফেটে যেতে পারে। একবার ক্রিভাসে পড়লে সে যে কোথায় তলিয়ে যেতে পারে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

এই রাস্তা এতটাই দুর্গম যে ক্যামেরা বের করে ছবি তোলার কথা আর ভাবা যায় নি। এমনকি পেছন ফিরে তাকালেও পা আড়ষ্ট হয়ে আসে। Ice Axe দিয়ে বরফ কেটে কেটে স্টেপস বানিয়ে দু-হাত দু-পা দিয়ে ব্যালান্স করতে করতে একটু একটু করে এগিয়ে চললাম। চারিদিকে এক রুদ্ধশ্বাস নিস্তব্ধতা। আমার বুকের হৃৎস্পন্দন যেন বাইরে থেকেও শোনা যাবে। প্রতিটি নাড়ির শোনিত-প্রবাহ অনুরণিত হচ্ছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে।

এই নিরবচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতা ভেদ করে হঠাৎ অরিত্র-র গলার চিৎকার কানে এলো। রুপিন পাশের এই সরু গলি ওঠার সময় ওপারের দৃশ্য কিছু দেখা যায় না। তবে এই যাত্রাপথের রূপের ডালির শ্রেষ্ঠ উন্মোচন যে আমাদের অপেক্ষায় তা অরিত্র-র গলার অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট।

তবে ওর এরকম চিৎকারে যে বাকিরা চমকে গিয়ে কোনো বিপদ ঘটতে পারে সেটা সাথে সাথেই বুঝতে পেরে আমাদের সাবধান করে বললো “আস্তে আস্তে ওঠ, তারপর enjoy করিস beauty ” …

সকাল ৮:৩২ মিনিট , ১৫,৫০০ ফুট , প্রায় ঘন্টা দেড়েকের প্রবল নাড়ির স্পন্দন ও সারা শরীর জুড়ে আড্রিনালিনের তান্ডবের পর আমরা এসে দাঁড়ালাম রুপিন পাসের মাথায়। এতক্ষন যে পথের বর্ণনা দিলাম তার উচ্চতা ৬০ মিটার মতো হবে। মাত্র ৬০ মিটার এই পথ উঠতে আমাদের ১ ঘন্টার বেশি সময় লেগেছিলো। আমি অনেক পাহাড়ি পথ চড়েছি ,তবে এই ৬০ মিটার ,পাহাড়ের কোলে আমার দেওয়া সবচেয়ে জটিল পরীক্ষা।

আবার একই সাথে , জীবনে যত পরীক্ষা দিয়েছি ,তাতে উত্তীর্ন হওয়ার শ্রেষ্ঠ পুরস্কারও ছিল এটা। চোখের সামনে শহস্র পর্বতশৃঙ্গ নাটকের শেষ পর্দা সরিয়ে দিয়ে অঙ্গবিহীন আলিঙ্গন জানাচ্ছে আমাদের। ডান হাতে হিমাচলীয় হিমালয় , বাঁ হাতে ধৌলাধার রেঞ্জ ও সামনে তুষার মুকুট পরিহীত কিন্নর কৈলাশ রেঞ্জ। ডান দিকে আরও একটা রাস্তা দূরে দেখা যাচ্ছে যার নাম “নলগান পাস” …

স্বচ্ছ নীল জলের ওপর আলতো ফেটে যাওয়া বরফের চাদরের মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। সোনা রোদ্দুরের গয়নার আভাতে সে এক মোহময়ী পরিবেশ,যা এতদিন ভাবতাম কল্পনাতেই সম্ভব।

পথের দেবতা মুচকি হাসেন। চমক তখনও ফুরোয় নি। অরিত্রর ডাকে পেছন ফিরে তাকালাম। রাতাফেরী থেকে একটা বিশাল গতিমান সরলরেখা এগিয়ে আসছে। পূর্বেই বলেছি এই পথ মেষপালকেরা ব্যবহার করে থাকেন। সেই বিশাল মেষের পাল এখানে হাজির। তারা কিন্নর যাবে। বুরাস-কান্দি ঢোকার আগে এদের সাথে দেখা হয়েছিল। বিশাল ভেড়ার পালকে রুপিন পাশের মাথা থেকে বরফের গায়ে গড়িয়ে পড়া বাদামী নুড়ি-পাথরের মতো দেখাচ্ছে। ভেড়ার পায়ের খুরে বরফের মসৃণতা নষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা এই রাস্তা পেরোবার আগেই আমাদের নেমে যেতে হবে। আমরা একই রাস্তায় নামবো না , রুপিন পাসের উল্টো দিক দিয়ে নেমে “রোন্টিগাড” নামের এক জায়গায় যাবো। পরদিন সেখান থেকে নেমে যাবো “সাংলা”।

পাহাড়ে ওঠার থেকেও নামা বেশি কষ্টকর , আর সামনে বরফ থাকলে তো কোথায় নেই ,সোনায় সোহাগা। এ রাস্তা পায়ে হেঁটে নামা অসম্ভব। তাই কিছু না ভেবে বরফের ওপর স্লাইড মেরে দিলাম।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , বরফে স্লাইডিং যতটা সহজ শোনাচ্ছে অতটা সহজ না। মসৃন বরফে একবার স্লাইড করা শুরু করলে স্পিড কন্ট্রোল করা খুব মুশকিল। ঠিক সময়ে থামতে না পারলে গড়িয়ে পড়ে যে কোনো রকম বিপদ হতে পারে। আর তাছাড়াও সব বরফের চাদর স্লাইড করার উপযোগী ও না। তাই পাঠক বন্ধুদের বলছি , সঠিক কৌশল জানা না থাকলে বা ট্রেক লিডার এর পরামর্শ ছাড়া একা একা এটি চেষ্টা করতে যাবেন না। পাহাড়ের অনির্বচনীয় সৌন্দর্যও কিন্তু আপনার জীবনের চেয়ে বেশি দামি নয়।

যাইহোক , আমরা এরকম বেশ কয়েকবার স্লাইড করে পুরো রাস্তা নেমে গেলাম। যে রাস্তা উঠতে সময় লেগেছিলো ২ ঘন্টারও বেশী , সেই রাস্তা নেমেছিলাম মাত্র ২০ মিনিটে। সে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। কিছুক্ষনের জন্য ছোটবেলাকে ফিরে পেতে কে না চায়?

ইতিমধ্যে ভেড়ার পাল আমাদের ধরে ফেলেছে। ওদের চার-পা থাকায় ব্যালান্সের সমস্যা নেই। ওরা মানুষের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারে পাহাড়ের গায়ে। কাজেই ওদের পক্ষে আমাদের ধরে ফেলাটাই স্বাভাবিক। ১৩০০ টি ভেড়া তাদের রাজপথ ধরে এগিয়ে চলেছে , আর সাথে আছে তাদের অতন্দ্র রক্ষক “শেফার্ড ডগ” ….

স্নো-ফিল্ড শেষ হতেই আবার সবুজ শুরু। চারপাশের সবুজ যতই মন ভোলাক , মনের কোন ছাইরঙা মেঘ ততক্ষনে জমতে শুরু করে দিয়েছে। ফেলে আসা রুপিন নদী যেন হাত নেড়ে বলছে “সাবধানে যাস” …!! এই সময় ঠান্ডা হাওয়ায় কান পাতলে একটা শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দ ফিকে হয়ে আসে কিন্তু শেষ হয় না। এই শব্দ আসলে নাড়ির টান। তার অনুরণনে চোখ আবছা হয়ে আসে। মনের মধ্যে শুম্ভ-নিশুম্ভের লড়াই চলে। একজন বলে “মন খারাপ” , আরেকজন বলে “ফিরে আসতে শেখ ” … !!

দূরে দেখা যায় সাংলা , কিন্নর কৈলাশের কোলে ছোট্ট একটি শৈলশহর। বিপাশা নদী তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। শীতল স্নেহে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে সে। আমরাই যেন প্রথম কড়া নেড়ে ঘুম ভাঙ্গাবো তার।

ছোট বেলায় মেলায় যেতাম ,তখন ক্যালিডোস্কোপ বুঝতাম না। এক কাকু আসতো মেলায়। তার যন্ত্রে চোখে কাচ লাগিয়ে অনেক রঙিন ছবি দেখতাম। মেলা শেষ হলে সেই কাকুকে আর দেখতে পেতাম না। আজ হঠাৎ সেই কাকুর কথা ভীষণ মনে পড়ছে। সিন্দুক ভরা স্বপ্নের ঝাঁপি ধীরে ধীরে বন্ধ করে রুপিন পাস। এগিয়ে যাই আমরা।

 

|| পরিশিষ্ট ||

(গল্পের ইতি আমি এখানেই টানতে পারতাম ,কিন্তু আমরা এর পর আরও এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলাম যা না বললে পাঠকের প্রতি খানিক প্রবঞ্চনা করা হবে। )

গাড়িটা হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে একটা বাঁক নিতেই ঝাকুনিতে ঘুমটা ভেঙে গেলো। এতোক্ষনের স্বপ্নের পর ফিরে এলাম বাস্তবে। দেখি ড্রাইভার -এর পাশে বসা অরিত্রর সাথে ড্রাইভার-এর বচসা চলছে।

– এইসে কোই গাড়ি চালাতা হ্যায় ?

– আরে কুচ নেহি হোগা , ক্যাইসে ম্যানেজ কিয়া দেখা ?

– আপ ধীরে ধীরে চালাও , ফোন পে কিউ বাত কর রহে হো ?

কথোপকথনে যা বুঝলাম , ড্রাইভার কার সাথে যেন ফোনে ব্যস্ত। সামনে রাস্তার কাজ চলছে , তাই রাস্তা ওয়ান ওয়ে। ট্রাফিকের মাঝে অসাবধানতা বসত আর একটু হলেই ঠোকাঠুকি লাগছিলো। কোনোমতে সেটা সামলে নেয়। আমরা তখন সোলান এর কাছাকাছি। আবার ড্রাইভার এর ফোন।

এতক্ষন ফোনের অজুহাত ছিল , তার এক পরিচিত কেউ গাড়ি নিয়ে দিল্লী যাচ্ছে , সে রাস্তা চেনে না , তাই তাকে সাহায্য করছে। কিন্তু এবারের ফোন একটু খটকা লাগলো। কাকে যেন গাড়ি নিয়ে সামনে এসে কোথাও দাঁড়াতে বলছে। তার সঙ্গে দেখা করবে। এদিকে আমাদের দেরি হয়ে গেছে। আম্বালা অবধি যেতে হবে। পরদিন সকালে দিল্লী-র ট্রেন। সোলান পেরোনোর পর চন্ডীগড় অবধি হরিয়ানার রাতের রাস্তা খুব একটা সুখ্যাত নয়।

আমরা কি ব্যাপার জিজ্ঞেস করতে প্রথমে কিছু বলতে চাইলো না। শুধু বললো একজন আসবে সামনে একটু দাঁড়াবে। আমরা বললাম , অনেক দেরি হয়ে গেছে , আর কোথাও দাঁড়াবো না আমরা। তখন সে বললো , তার কাছে গাড়ির কাগজ-পত্র কিছু নেই। একজন এসে কাগজপত্র দেবে। তার জন্য দাঁড়াতেই হবে তাকে।

সন্দেহটা ছিলই , তখন আরো পোক্ত হলো। আমরা সাথে সাথে বললাম ,কাগজ না নিয়ে এতটা রাস্তা বেরোতে রাজি হলে কেন ? আমরা যে আম্বালা অবধি যাব সেটা তো শুরু থেকেই বলে আসছি।তখন সে আমতা আমতা করে অযৌক্তিক কিছু কথা বললো।

রামিজ মোবাইলে GPS – on করে রাস্তা ট্র্যাক করতে লাগলো। অন্ধকার রাস্তা, প্রায় রাত ৯:৩০ ,চারদিক ফাঁকা। এদিকে খিদেও পেয়েছে ,কিন্তু সে কথা কেউই আর বলতে পারছে না। সবাই একটা চাপা উৎকণ্ঠায় ভুগছে। না পৌঁছনো অবধি শান্তি নেই।

ড্রাইভার এর কাছে আবার ফোন ,এবং এর পর হঠাৎ গাড়িটা হাইওয়ে থেকে নামিয়ে একটা অন্ধকার গলির দিকে মোড় নিলো। আর স্থির থাকতে পারলো না কেউই। চেঁচামেচি শুরু করলাম।

পাহাড়ে ATM থাকে না। তাই liquid cash আমাদের সবার কাছেই যথেষ্ট রাখতে হয়। তার সাথে দামি ক্যামেরা ও অন্যান্য জিনিসপত্র আছে। এই নির্জন প্রান্তরে হরিয়ানায় আমাদের কেউ চেনেও না যে সাহায্য করবে। এতদিন যা টি.ভি -এর পর্দায় দেখেছি তা যে কোনো সময় আমাদের সাথেও ঘটে যেতে পারে ভাবলেই কেমন অস্থির লাগে। এতক্ষনে ড্রাইভার-ও আমাদের সাথে তর্কাতর্কি শুরু করে দিয়েছে।

অবশেষে চেঁচামেচির ঠেলায় সে পিঞ্জর শহরের একটি ধাবার সামনে গাড়ি থামায়। ধাবার নাম “Nukkad Dhaba” …

প্রায় সারাদিন গাড়িতে ,তাই খিদেও কম নেই। আমরা সমস্ত জিনিস নামিয়ে নিয়ে খেতে গেলাম। এই ড্রাইভারকে আর বিশ্বাস করা কঠিন। বলে গেলো সে নাকি কোনো এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। আমরা হিমাচল প্রদেশের মানুষের সরলতার উদাহরণ দিয়ে থাকি ,কিন্তু ব্যতিক্রম সবজায়গাতেই থেকেই থাকে। ধাবাতে এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হলো , যিনি ওই এলাকার কাউন্সিলর। তাকে পুরোটা বললাম।

তিনি বেশ হৃদয়বৎসল ভদ্রলোক। তার মুখেই পুরোটা শুনলাম।

পাঞ্জাবে চরস ,গাঁজা ,সিগারেটের চোরাই ব্যবসা চলে এই রাস্তায়। এই ড্রাইভার-রা হলো এই ব্যবসারই পুতুল মাত্র। এর শিকড় অনেক গভীর অবধি ছড়িয়ে। এদের ব্যবসার জন্য কারো প্রাণ নেওয়ার হলেও দু -বার ভাবে না। আমাদের ড্রাইভারও সেই চক্রেরই পুতুল। তাকে গাড়ির কাগজ-টাগজ নয় , ওই চোরাই নেশার মাল দিয়ে যাবে পেছনের গাড়ির লোক ,যা তাকে চন্ডীগড়ে ঠিকমতো পাচার করতে হবে। লোকাল পুলিশকে জানিয়ে কোনো লাভ নেই ,সবাই এদের মুনাফা-পুষ্ট কেনা গোলাম।

অনেক রাতে সে গাড়ি নিয়ে ফিরেছিল। তখন তার সঙ্গী গাড়ির কাগজ , থুড়ি চোরাই মাল নিয়ে এসে পৌঁছয় নি। গাড়ির কাগজের মিথ্যে কথা কাউন্সিলর এর সামনে বলাতে একটা ৮২ সিক্কার থাপ্পড় খেয়েছিলো আমাদের সামনে।

এসব শোনার পর আর সেই গাড়িতে সারারাত যাওয়ার মানে হয় নিখাদ বোকামো। ওই কাউন্সিলর ভদ্রলোকই আমাদের সেই রাত-টুকু থাকার একটা ব্যবস্থা করে দিলেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , ধাবাতে ঢুকেই , শেষ পর্যন্ত অবকাশ কিন্তু খাবার টেবিলে মাংসের বাটি আগলে বসে ছিল। ও এই চড়-থাপ্পড়ের ঘটনা কিছুই জানে না। পরে আমাদের মুখে শুনেছে। আদর্শ নাবালক।

যাইহোক আগের পর্ব অবধি আপনাদের যে অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা দিলাম তা ছিল জীবনের Reel Life , আর পরবর্তী অভিজ্ঞতা হলো Real Life … রুপিন পাসের সুবাদে আমাদের দুই অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট হয়েছে। সে তার ঝুলি উজাড় করে সবটুকু দিয়েছে আমাদের। আর কিছু পাওয়ার নেই। বিষণ্ণতায় মোড়া মনে তখন একমাত্র আশার আলো , সামনের পুজোয় ত্রিশূল পর্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রা। সেই পথ মূলত “রূপকুন্ড-জুনারগলি” নামে পরিচিত।

প্রত্যেকবার এই পাহাড়ের পথে কিছু একটা অজানা অন্বেষণে নামি আমি। অভিজ্ঞতা ছাড়াও আরও বেশ কিছু ভোরে ফেলি ঝুলিতে ,সেসবের ব্যাখ্যা হয় না।

এসব আমার সঞ্চয়। শেষ বেলার চোখ জ্বালানো মনখারাপি গোধূলি আলোর কটাক্ষ যেন আমায় স্পর্শ না করতে পারে।

এ অজানা অন্বেষণ কি শেষ হবার নয় ?

পথের দেবতা প্রসন্ন হাসি হাসেন। তার পথ যে শেষ হয় নি কোনোদিন। জানা-অজানা ,জন্ম-মৃত্যু ,মন্বন্তর – মহাযুগ পেরিয়ে সেই পথ এগিয়ে যায়। মর্মর জীবনের স্বপ্নেও শ্যাওলা পড়ে আসে। তখনও এই পথ ফুরোয় না। সেই বিরাটের পূজার আনন্দযজ্ঞের প্রজ্বলিত সমিধ সাক্ষী রেখে , তার অনন্ত আনন্দযাত্রার বিজয় তিলক ললাটে এঁকেই তো ঘরছাড়া হই। হোক না তা সাময়িক , এই সঞ্চয় তো চিরন্তন।

জানলার ধারে সন্ধ্যে নামে , দূরে কোথাও হাস্নাহানা ফুটছে। মেলার সেই ছবি কাকু ছুটি নিয়েছে অনেকদিন হলো। তার খবর পাঠায় ক্লান্ত তারার হাতে। চোখ বুজে আসে। জলের শব্দ , বরফের চাদর , ঠান্ডা হাওয়া , মেঘের গন্ধ ,বাঁশির সুর ……… স্বপ্ন , স্বপ্ন , আরো স্বপ্ন চাই…..

 

মেঘের ছোঁয়া নীল আকাশে , যেন হাত বোলানো আদর

স্নিগ্ধতা তার লজ্জা ভুলে , সরিয়ে দিলো চাদর ,

উপত্যকা টানছে আজও , হাতছানিতেই ভাসি

চুপ করে শোন , শুনতে পাবি , জাতিস্মরের বাঁশি .. !!

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes