jamdani

যুগল

সন্দীপ দত্ত

আজ আর কোনো কথাই শুনতে চাইল না কৌশিক। মেহুলীর সমস্ত বক্তব্যকে ছিন্ন করে একরকম জোর করেই সে ওকে বসালো ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে। বলল, ‘সাজো। এমনভাবে নিজেকে নিখুঁত করে তোলো, যাতে চোখের তলার ওই কালিগুলো ঢাকা পড়ে যায়।ও বাড়ির কেউ যেন বুঝতে না পারে তুমি অশেষ যন্ত্রণা পেয়েছো আমার কাছে। তুমি স্বাভাবিক থাকবে কারণ, ওদের বোঝাতে হবে প্রয়োজন্টা আমার নয়, তোমার। তুমি তোমার পাওনা চাইবে। জানাবে দাবি। প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রতিটা কথা বুঝে নেবে হিসেব করে। মা আর মাসি তো একই। যা না পারলে মাসিকে তো পারতেই হবে। আফটার অল বড়ো বড়ো কথা কিন্তু ওনারা বলেছিলেন। সেসব কথা আমি ভুলে গেছি ভাবলে কী করে?’

চায়ের কাপে আর চুমুক দেওয়া হল না মেহুলীর। চোখের কোলে জলের রেখা নিয়ে কপালের ওপর হামলে পড়া অবিন্যস্ত চুলগুলো কৌশিকের পাহারায় সরাতে হল যত্নে। চিরুনি চালিয়ে পরিপাটি করল সিঁথি। সিঁদুর নিতে গিয়ে একবার থমকে গেল হাতটা। পাষণ্ড এই মানুষটার জন্য ও সিঁথি রাঙাচ্ছে একমাস! ছিঃ! পাষণ্ড আর লোভী। লোভী আর নীচ। সেই কোন ফুলশয্যার দিন রাতে কৌশিক তাঁকে চুম্বন করেছিল। আদরের আবেশ দিয়েছিল শরীরে। সেই শেষ। তারপর আর কোনোদিন ছুঁয়ে দেখেনি মেহুলীকে। এসি আর ওয়াশিং মেশিনটাই মানুষটার কাছে বড়ো হয়ে গেছে। ও দুটো জিনিস বাড়িতে না ঢুকলে কৌশিক এক বিছানায় শোবে না। পাকা দেখার সময় মেহুলীর বাবা কথা দিয়েছিল বিয়ের দশদিনের মধ্যেই পাওনা সব মিটিয়ে দেবে। যা হয়নি। মেহুলীর মেসোর সরকারি চাকরি। সেদিন মাসি তাই গর্ব করে বলেছিল, ‘দাবির একটা জিনিসও মার যাবে না বাবা। বিয়েটা আগে হয়ে যাক না, আমরা তো সবাই আছি’। বেহায়ার মতো ঐ কথাগুলোই কৌশিক নিজের মনে গেঁথে নিয়েছে। এক্কেবারে বেহায়া!

পুরো একঘন্টা মেহুলীকে সময় দিল কৌশিক। পাক্কা এক ঘন্টা। নিজেকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে নিতে হবে এই সময়ের মধ্যে। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ শৌখিনতার ধারে চমক জাগাতে হবে। কৌশিকের আবদার। কৌশিকের নির্দেশ।

তারপর বাড়ির বাইরে দুটিতে বেরোলো যখন, অসংখ্য গাড়ি ঘোড়াকে পাশ কাটিয়ে ফাগুনের রোদের ওম গায়ে নিতে নিতে মৌলালি যাওয়ার রাস্তার কাছে এসে কৌশিক বলল, ‘নেহাত এক মাসে আমার হাঁফ ধরা কাজ ছিল। নইলে…’

‘নইলে?’ ঘুরে তাকায় মেহুলী।

‘নইলে এটা আমি আগেই করতে পারতাম’।

চোখে বিদ্যুৎ নিয়ে মেহুলী বলল, ‘তুমি একটা নির্লজ্জ!’ হাসল কৌশিক। ‘একটু আধটু নির্লজ্জ না হলে যে নিজের মনের আশ মেটে না। তুমি যেটা পারোনি, আমাকে তো সেটা করতেই হবে সোনা। একটুখানি নির্লজ্জ হতে পারলে না তুমি! তাহলে তোমার আজ এই দুর্গতি হতো না’।

বলতে বলতে কৌশিক মেহুলীকে নিয়ে মৌলালি ক্রস করে। চোখের ওপর ভেসে ওঠে নিজের ফুলশয্যার রাত। সুরভিত বিছানায় মেহুলীকে নিয়ে খেলতে খেলতে নববধূর মুখ থেকে সে শুনেছিল তিনটে অধরা স্বপ্ন। টাকার অভাবের কারণে জীবনে প্রবেশের জন্য উচ্চশিক্ষার বাঁধা আর শেষ স্বপ্নটা ছিল তার বুকের কলিজা। বাবা-মা’র ভয়ে অন্তরের প্রেমটাকে কবর দিয়েছে সে। অনুপমের হাত’টা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। তিনটে স্বপ্নই বেশিরভাগ পুরুষের মতো কৌশিকও সেদিন মেহুলীকে বলেছিল, ‘ সবাই সবটা পায় না মেহুলী। এই কঠিন সত্যটা তোমায় বুঝতে হবে। ভুলতে হবে ওসব। একমাত্র উচ্চশিক্ষাতেই আমি তোমায় পারমিশান দিতে পারি। বাকিগুলো নয়’।

সেই কৌশিকই আজ মাসির বাড়ি নিয়ে যাওয়ার নাম করে মেহুলীকে এনে দাঁড় করালো অনুপমের কাছে। মেহুলীর মুখে সব শোনার পর থেকেই গত এক মাস ধরে অনুপমকে শহরময় তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে কৌশিক। মেহুলীর প্রথম প্রেম। মেহুলীর স্বপ্ন। পালিয়ে বিয়ে করার সাহস ছিল না বলে কি ভালবাসাটাও মিথ্যে হয়ে যাবে? না, তা হতে দিতে পারে না কৌশিক। অনুপমের হাত ধরে সে শুধু একটা কথাই বলল, ‘ও লেখাপড়া করতে চায়। দয়া করে ওটা ছাড়িও না’।

তারপর মেহুলীর দিকে তাকাল কৌশিক। হাসল একটু। বলল, ‘ভাল থেকো। চিন্তা নেই, তোমার সমস্ত জিনিস পত্র আমি এক এক করে অনুপমের ঠিকানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করব। নির্লজ্জ হয়ে এটুকু না করলে যে আমার…’।

আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে মেহুলী তার অশ্রুভরা চোখে কৌশিকের দিকে তাকাল একবার। বেশিক্ষণ তাকাতে পারল না। দৃষ্টি সরিয়ে নিতে হল সম্ভ্রমে।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes