jamdani

যার যার চার্জার

অরুণোদয় (রাহুল ব্যানার্জি)

একটি জমজমাট পার্টি চলছে। কিন্তু আপনার সঙ্গে সঙ্গিনী নেই। অতএব প্রাণপণে পছন্দসই ঈশ্বরকে ডাকছেন যদি হঠাৎ করে আলাপ হয়ে যায় কোনও আজনবি হাসিনার সঙ্গে। ঈশ্বর বোধহয় পার্টিতেই Vodka খাচ্ছিলেন। তাই আপনার কথা শুনতেও পেয়ে যান। হঠাৎ একদিকের ভিড় যেন দু’ভাগ হয়ে যায়। অদ্ভুত আলোয় ভরে যায় চারিদিক। সেই ভিড় থেকে বেড়িয়ে আসে এক অসামান্য সুন্দরী। সেই সৌন্দর্যে বাকিরা Soft focus।

চুড়ান্ত ডিস্কোচিত মিউজিক মৃদু ব্যালাডে রূপান্তরিত। তার ত্রস্ত হরিণীর মতো চোখ খুঁজছে পার্টির আনাচ-কানাচ। যেন আপনাকেই। চোখে মদনবাণের তীক্ষ্ণতা, গলায় অমিতাভের ব্যারিটোন শানিয়ে স্লো-মো তে হেঁটে গেলেন আপনি তার দিকে

-Finding someone? (ভুরু নাচিয়ে আপনার প্রশ্ন)

-No, Yes, মানে কোথাও পাচ্ছি না জানেন তো, খুবই down… তার লজ্জিত উত্তর।

-হ্যাঁ, পার্টিতে একা থাকাটা খুবই Boring… আমিও তো… shall I pour you a drink। (আপনি ক্রমশ confidence gain করছেন। বুঝতে পারছেন মূল প্রসঙ্গ আর পাঁচ মিনিট দূরে।)

-No, No, thanks, you are so sweet।(গলাটা প্রশ্রয়ী শোনায় কি?)

-Thanks… ছোটবেলা থেকেই। (নিজের humor-এ আপনি নিজেই মুগ্ধ!)

-আচ্ছা, আপনি কি পারবেন?

-পারব না মানে, Try me…

-আমার মোবাইলের Battery একদম down… আপনার কাছে চার্জার হবে? আমার বয়ফ্রেণ্ড রণিত ওখানে বসে হুইস্কি খাচ্ছে… he is useless… সারাদিন শুধু exercise আর boxing… hello, শুনতে পাচ্ছেন? আপনার কাছে চার্জার হবে?

ঠিক সেই মুহুর্তে কোথাও কাঁচ ভাঙল কি? সেই সঙ্গে আপনার স্বপ্ন? পার্টির মিউজিক হঠাৎ করে বিশ্রি রকম জোরে হয়ে গেল না?

এ ঘটনা আমার কল্পনাপ্রসূত। কিন্তু এরকম ঘটা কি খুব বিচিত্র? একান্তই অবাস্তব? আমি জানি আপনারাও মেনে নেবেন, এটা হওয়া আদৌ অসম্ভব নয়। আকছার পার্টিতে এরকম একজন-দু’জনকে দেখতে পাওয়া যায়, যারা হন্যে হয়ে চার্জার খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ঘোড়া আর লাগামের থেকেও মোবাইল আর চার্জারের সম্পর্কটা ওতপ্রোত। লাগাম ছাড়াই বুনো ঘোড়া যদিও বা client eastwood চালিয়ে দিতে পারে, চার্জার ছাড়া মোবাইল ব্যবহার করা অসম্ভব। এবং মোবাইলের সাথে সাথে চার্জারের অভিযোজনও হয়েছে সমানতালে। আগে প্রত্যেকটা মোবাইলের সাথে নিজস্ব চার্জার থাকত। নিজস্ব মডেল ছাড়া চার্জার কাজ করত না কখনও। অবশ্য তখন ফোন করা, এসএমএস করা ছাড়া তেমন কোনও অ্যাপও ছিল না মোবাইলের। ফলত চার্জ থাকতও প্রায় দিন দেড়েক। কিন্তু By chance আপনি রাত্রে চার্জ দিতে ভুলে গেলে চিত্তির! প্রত্যেকের আলাদা Hand set, আলাদা চার্জার। সে সময় চার্জার ছিল যার যার, তার তার। হঠাৎ করে আর একজনের এক Hand set হয়ে গেলে এবং তার চার্জার পেয়ে গেলে মেলায় হারানো ভাইয়ের মতো জড়িয়ে ধরে হাপুস নয়নে কাঁদতে ইচ্ছে করত।

কিন্তু আজকের চার্জার অত এক্সক্লুসিভ বিষয় নয়। মোটামুটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন হলেও সবার চার্জার সবার ফোনে লেগে যায়। তার মধ্যে আবিষ্কার হয়েছে পাওয়ার ব্যাংক। চলতা ফিরতা চার্জার। মোবাইল-এর মোবাইল চার্জার… যার হাতে এই পরম বস্তুটি সে একাই শাহজাহান।

সময়মতো চার্জার যদি না থাকে এবং মোবাইলের চার্জ-ও মুমুর্ষু তাহলে যে জীবন কীর’ম বাঁকবদল করতে পারে তা মনে হয় সবথেকে ভালো আমার পাড়ার তোতোনদা জানে। ২০০৭-এর মাঝামাঝি তোতোনদা আর ভোলাদা পাড়ায় দু’দিনে দীঘা, চন্দনেশ্বর গোছের Trip arrange করলেন। পাড়ায় নতুন এসেছে মিষ্টি। কারও সাথেই ওদের পরিবারের লোক তেমন মেশে না। কিন্তু সন্ধের দিকে মিষ্টি গানের খাতা বুকে চেপে যখন গানের স্কুল থেকে ফেরে, ভোলাদা আর তোতোনদার বুকে ঢেউ ওঠে দীঘার চেয়েও বেশি। কিন্তু পাত্তা পায় না কেউই। তাই বরফ গলানোর জন্য মিষ্টির বাবাকে মোটা ডিসকাউন্ট দিয়ে সপরিবারে দীঘা যেতে রাজি করিয়েছে ভোলাদা ও তোতোনদা। সমবয়সীরা একসাথে থাকলে যা হয়। শাহরুখ না সলমন এই তর্কে কোলাঘাটের মধ্যেই ভাব জমে গেল মিষ্টি, ভোলা আর তোতোনের। আদান-প্রদান হল মোবাইল নম্বর। কিন্তু দীঘার সেই বিয়ারখেকো, সর্বনেশে পূর্ণিমার রাতে তোতোন-দার চক্ষস্থির হয়ে গেল মোবাইলের দিকে তাকিয়ে। জীবনের সব আশাসহ নিভে গেল মোবাইলের আলো। চোখের সামনে। পাশের বারান্দায় মোবাইল কানে ভোলাদার ফিসফিসে গলা আর চাপা হাসি তোতোনদার স্বপ্নের কফিনে পুঁতে দিল শেষ পেরেক। আজ আটবছর পর ভোলাদা আর মিষ্টি সুখে সংসার করছে। তোতোনদা সকালে লাফিং ক্লাব চালায়, আর রাত্রে মদ খেয়ে ফেসবুকে লেখে- Feeling alone।

ও বলা হয়নি, ভোলাদা ও মিষ্টির একটি ফুটফুটে বছর চারেকের ছেলে আছে। ভালো নাম আকাশদীপ, ডাকনামটা মুখে ভাতের দিন তোতোনদা দিয়েছে। কী নাম? চার্জার।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes