jamdani

  মুক্তি অবিরাম

রাজশ্রী বসু অধিকারী

আমার এই বারান্দার একটা স্পেশ্যাল ক্যারেকটার আছে । সরী , বারান্দার বলাটা ভুল হল । বলতে হবে এই বারান্দার দেওয়ালে ফিক্সড জানলাটার । এই জানলার বন্ধ থাকাই নিয়ম । স্বাভাবিক নিয়মে সে বন্ধই থাকে সকাল দুপুর বিকেল সন্ধ্যে । বন্ধই থাকে দিনের পর দিন মাসের পর মাস । কিন্তু ক্কচিত কখনো যখন সে খুলে যায় অবিরাম অনন্ত অবাধ হয়ে , দুদিকে হাট হয়ে মেলা হয়ে যায় তার মলিন হয়ে আসা সবুজ রং লাগানো অভিমানী পাল্লা দুটো ,ঠিক তখনই একটু একটু করে প্রকাশ পেতে থাকে সেই স্পেশ্যাল ক্যারেকটার । যা একমাত্র আমি ছাড়া আর কেউ বুঝতেই পারবেনা বাইরে থেকে । আমি পারব কারন আমার জন্যই একমাত্র এই স্পেশ্যালিটী বুকে নিয়ে জানলাটা অপেক্ষা করে দীর্ঘ দীর্ঘ বন্ধকাল । কখন কবে আমি আসব তার জন্যই এই আপাত প্রানহীন বস্তুখন্ডটির নির্বাক সপ্রান প্রতীক্ষা ,যা শুধু আমি বুঝি ,একমাত্র আমিই , আর কেউ না, আর কেউই না ।

এবার আসতে অনেকগুলো দিন দেরী হয়ে গেল । সেই পুজোর আগে থেকে চেষ্টা করে করে এবং ফেল করে করে এই ফেব্রূয়ারীর শেষে পাতাঝড়ার বেলায় অবশেষে এসে পৌঁছোতে পেরেছি আমার চিরজন্মের আপন , আমার সমস্ত স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্নের তুলিবোলানো ,আমার রক্তে মেশা , সারাক্ষন শিরা ধমনীতে বয়ে ফেরা এই নিজস্ব ভূখন্ডে । এই আমার  নিজের বাড়ী , আমার নিজের ঘর, নিজের বারান্দা । আমেরিকার গ্রীনকার্ড ঝোলানো ঝাঁ চকচকে প্রপার্টীও যার কাছে তুচ্ছ খেলনা মাত্র । কিন্তু আমার এই ফিলীংস বোঝানো যায় না জ্বলিকে । আমার ঔরসে যারা জন্মেছে ,জ্বলির সেই দুই মেয়ে রিয়া টিয়াও এসব বোঝার মত মন পায়নি । পাওয়ার কথাও নয় । ওরা এই শতাব্দীর পশ্চিমী প্রোডাক্ট , ডিজনীল্যান্ডের ওয়াটারল্যান্ডে জলখেলা করে অভ্যস্ত।  ওরা আমার নরম মাটীর গন্ধভাসা  বাংলা বুকের ভেতরে সর্বক্ষন বইতে থাকা তির তির  সোনালী ঝর্নায় ভুলেও পা ভেজাতে চাইবেনা । আমি তাতেই খুশী । খুশী কারন এ আমার একার সম্পত্তি ।  একার রাজত্ব । ওরা এই জায়গাটা নিয়ে ইন্টারেষ্টেড হলে হয়তো আমার ভাল লাগতো না ।  আমি এই ফুলতলিচর বাড়ীখানার একক অধীশ্বর হয়ে থাকতেই ভালবেসে এসেছি বরাবর । কাউকে কখনো ডাকিনি সঙ্গ দিতে । আমার বাহ্যিক জীবন আমার মেধা পরিশ্রমজনিত যা কিছু রোজগার যা কিছু যশ খ্যাতি যা কিছু সম্পত্তি সব আমি ওদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছি ।  আমার নিজের বলতে শুধু  এই ফুলতলিচর আর কিছু গহীন গোপন আলোকময় গভীর অন্ধকার ।

বেশ চলছিল জীবন । উত্তাল সমুদ্রে একাকী নাবিকের মতো অদৃশ্য পানসি চালিয়ে চালিয়ে পার করলাম সুদীর্ঘ  ছাপ্পান্নটা বছর । জ্বলির  পোষমানা হাবি হয়ে, রিয়া টিয়ার উপযুক্ত সোসাইটীফীট ড্যাডি হয়ে , বিদেশী ইউনিভার্সিটির  ফিজিক্সের ফ্যাকাল্টী হয়ে । এগুলো সব এক একটা রোল , যা আমি বরাবর খুব দায়িত্বের সঙ্গে খুব সফলতার সঙ্গে পালন করে এসেছি , করে যাব । আমার নিজের বলতে শুধু এই ফুলতলিচর , এই ঘর এই বারান্দা এই জানলা আর এই মাটীতে শিকড় বিছিয়ে থাকা একটা অন্য অর্নবকান্তি মজুমদার ।

প্রতিবছর অন্তঃত দু’বার চেষ্টা চরিত্র করে , নানা সেমিনার ,কনফারেন্স  জুটিয়ে বা অন্য কোন বাহানায় এসেছি এখানে , অন্তঃত চার পাঁচটা দিন নিজের সঙ্গে দেখা করব বলে , নিজের সঙ্গে কথা বলব বলে ,আমার জানলায় দাঁড়াব বলে । কিন্তু এবারটায় আমার সেই স্বাধীনতা টুকু আর রইলনা ।

এতবছর বিয়ে সংসার পাশাপাশি দীর্ঘ পথচলা । কখনো কোনদিন জ্বলি আমার সঙ্গে পার্সোনাল ট্যুরে আসার বায়না করেনি । সে তার রঙ্গীন ফানুসের মত জীবন নিয়ে , মেয়েদের নিয়ে , সামাজিক অবস্থান নিয়ে খুশী থেকেছে । মাঝেমধ্যে ফ্যামিলী ট্যুরের প্রোগ্রামিং এর সময়ে মেয়েদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে জ্বলিও সিলেক্ট করেছে সুইজারল্যান্ড বা নায়াগ্রা । ইন্ডিয়া এক আধবার এসেছে ঠিকই তবে তা খুব নির্দিষ্ট  কোন প্রয়োজনে , যেমন কোন বিয়ে বা শ্রাদ্ধ ইত্যাদি।  নিজের দেশ বলে তেমন কোন সেন্টিমেন্ট কখনো দেখিনি জ্বলির মধ্যে । এতে আমি খুশী না অখুশী সেকথা ভেবে দেখার অবকাশ নেই আজ আঠাশ তিরিশ বছর পরে , ওসব নিয়ে আর ভাবিওনা । শুধু এইবারটাই কেমন সব ওলোটপালট করে জ্বলি সামনে এসে দাঁড়ালো । আমার ট্রাভেল এজেন্টের নম্বরটা লাগিয়ে মোবাইল কানে চেপেছি , কোথা থেকে উদয় হয়ে শান্ত গলায় ও বলে বসল , “ দুটো টিকিট বলে দাও… “।

আমার  অবাক দৃষ্টির সামনে থেকে ও আবার চলেই যাচ্ছিল । আমি প্রশ্ন করে ফেলি , ” দুটো টিকিট ? মানে ? ”

দরজা থেকে ফিরে আসে জ্বলি ।  চোখে চোখ রাখে । “মানে… এবার আমিও যাব তোমার সঙ্গে । রিয়া টিয়া ক্যান ম্যানেজ দেমসেলভস… ।”

আমি ঢোক গিলে ওকে বোঝাতে চেষ্টা করব ভেবে ছিলাম , কিন্তু সে সুযোগটাই পাইনি ।  কেমন একরকম দৃঢ় প্রতিজ্ঞ পা  ফেলে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল জ্বলি । আমার পরিচয় ছিলনা এই জ্বলির সঙ্গে । আমি অবাক হব নাকি আমার স্বাধীনতায় হতক্ষেপ ঘটল ভেবে দুঃখ পাব ঠিকমত বুঝে ওঠার আগেই পরপর টিকিট কাটা লাগেজ প্যাক ছুটির বন্দোবস্তো এই এইগুলো ঠিক ঠিক হয়ে গিয়েছিল । নির্দিষ্ট দিনে ফ্লাইট টেক অফ করার অনেক পরে , যখন এক এয়ারবাস প্যাসেঞ্জার তাদের নিজস্ব বৃত্তে সুপ্তিমগ্ন , মাটী থেকে অনেক অনেক ওপরে ,এক মেঘের রাজ্যে বসে আমি নতুন করে চিনেছিলাম আঠাশ বছর আগে থেকে চেনা আমার বউকে ।

একটু নড়েচড়ে গলা খাঁকারী দিয়ে আমি ওকে বলতে শুরূ করি , “ আমার যে সেমিনারটায় জয়েন করার কথা ছিল সেটা কালই পোষ্টপোনড হয়েছে… তাই… ভাবছি একবার… আই মীন… আমার একটু অন্য কাজ আছে…ক’দিন থাকবনা… তুমি কলকাতার বাড়ীতেই থেকে যেতে পার… আমি চারদিন পর ফিরে আসব… “  

আমাকে গভীর সমস্যায় ফেলে দিয়ে স্পষ্ট চোখে তাকিয়েছিল জ্বলি । স্পষ্ট গলায় বলেছিল , “ এবারটা তোমার সঙ্গেই থাকব আমি পুরোটা সময় । আমাকেও ফুলতলিচর নিয়ে চল… ”

এরপরেও আর কোন পর্দার আড়ালে ঢোকার কথা মাথায় আসেনি আমার । জ্বলি পরিষ্কার করেই বুঝিয়ে দিয়েছে আমার কোন পদক্ষেপই ওর কাছে অজানা নয় ।  নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করে গিয়েছিলাম । ও কি জানে কতটুকু জানে কিকরে জানল তাও জিজ্ঞেস করিনি ।  মনের গভীরে একটা কোথাও রিলীভড হলাম কিছুটা  । পুরো ব্যাপারটা ভাল কি মন্দ জানিনা , শুধু এক  গোপন কুঠুরী তার জগদ্দল ওজন নিয়ে সারাক্ষন যে চেপে বসে থাকে  বুকের ভেতর , সেইখানটায় যেন একটুখানি হঠাত হাওয়ার ঝাপটা লেগেছিল এয়ার ইন্ডিয়ার এয়ার টাইট ফ্লাইটের মধ্যে বসেও ।

আর কোন কথা হয়নি গন্তব্য বিষয়ে । কানাডা থেকে  দিল্লী , দিল্লী থেকে কলকাতা , কলকাতা থেকে গৌহাটি … দীর্ঘ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিলাম দু’জনে পরস্পর বিশ্বস্ত স্বামী স্ত্রী হয়ে । শুধু মাঝে মাঝে কেমন একটা বুক খালি করা নিঃশ্বাস পড়তে চেয়েছে আমার , যাকে আমি নিজের মধ্যেই রেখে দিতে চেয়েছি চিরকাল, যা আমার একান্ত ।

জ্বলিকে দেখে কিছুতেই বোঝা যায়নি ওর ভেতরে কি চলছে । বা আদৌ কিছু চলছেই কিনা । বরাবরের মতই শান্ত সমাহিত ওর মুখের ভাব ।

কিন্তু আমি কিছুতেই শান্ত থাকতে পারিনি । যত কাছে এগিয়ে এসেছে ফুলতলিচর , নিজের মধ্যে থেকে কেবলই যেন বাধভাঙ্গা অস্তিত্বে উঠে আসতে চেয়েছে আমার কৈশোর আমার যৌবন আমার ভগ্নপ্রান ছিন্ন মালা নষ্টদিবসরাত্রিব্যপী অনেকটা অতীত আর কিছুটা বর্তমান । জানলা দিয়ে চুপ করে তাকিয়ে বসে থাকা আমি, গম্ভীর থেকে ক্রমশঃ আরো বেশী গম্ভীর হতে থাকা আমি ভেতরের এই উত্তাল ঢেউ কি করে সামলাবো ভেবে পাইনি ।

গৌহাটি এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় আশিকিলোমিটার রাস্তা  বিবিধ চড়াই উতরাই পেরিয়ে এই মাত্র কিছুক্ষন আগেই এসে পৌঁছেছি ফুলতলিচর । টিলার ওপরে লাল গোলাপী হলুদ নানা রং বোগেনভিলিয়া মোড়ানো ছোট্ট সাদা কাঠের দোতলা বাড়ীটা  যেন প্রোষিতভর্তিকা কোন নারীর মত আমারই অপেক্ষায় সারাবছর ধরে ফুলের গয়নায় সেজে থাকে । ছোট্ট কাঠের গেট ঠেলে শুকনো ফুলের পাপড়ি মাড়িয়ে মাড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিবারই আমার মনে জীবনে প্রথমবার ফুলশয্যার ঘরে ঢোকার অনুভূতি হয় । সে অনুভূতিকে রেখে ঢেকে রাখার কোন প্রয়োজন পড়েনা । এই পাহাড়ে আমার একার সাম্রাজ্য । আমি এই সাম্রাজ্যের একাকী সম্রাট । এতদিন তাইই হয়ে এসেছে ।

কিন্তু এবার আর আমি একা নই । তাই  ভেতর থেকে  স্বস্তি পাচ্ছিনা । জ্বলিকে অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম , এখানে অনেক অসুবিধা ওর থাকার পক্ষে । অনেক করে নিরুৎসাহ করার চেষ্টা করেছি । কিন্তু বারেবারেই ওর এককথা , “ এবারটা আমি তোমার সাথেই থাকব ।“ অতএব হাল ছেড়ে দিয়েছি । কিন্তু এখন বাড়ীর দরজায় পা রেখে আবার মনটা ছটফট করে ওঠে , যেন আমার কোন লুকিয়ে রাখা সম্পত্তির অনিচ্ছুক ভাগ দিতে হচ্ছে কাউকে । বাড়ীর রক্ষক কাম যত্নকারী হাফবৃদ্ধ লোকটি ,মংলু যার নাম ,সে কিন্তু বউদিমনির অযাচিত আবির্ভাবে  নিদারূন খুশী । সেই থেকে অনর্গল বকে চলেছে , যেন কতই আপনারজনকে কাছে পেয়েছে বহুকাল পরে । আমি বিরস মুখে তাকাই ওদের দিকে । আর দেখে অবাক হই যে স্বল্পভাষী জ্বলি মংলুর ক্রমাগত বক্তিয়ার আচরনে একটু বিরক্তও হচ্ছেনা । জ্বলি যেন নিয়মিত ইন্টার্ভ্যালেই এখানে এসে থাকে এভাবেই সব খোঁজখবর নিচ্ছে ।  আর মংলুও নির্বিবাদেই মেনে নিয়েছে এবাড়ীতে প্রথম আসা বউদিমনির কর্তৃত্ব ।

লাগেজগুলো টেনে টেনে নীচের বসার ঘরে রেখেই বউদিকে নিয়ে বাড়ীর আনাচ কানাচ দেখাতে কে জানে কোথায় নিয়ে গেল মংলু । আমি কিছুসময় চুপচাপ ফাঁকা ঘরে দাঁড়িয়ে থাকি একা একা। তারপর  লাল রেলিং লাগানো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিশ্চুপ পা ফেলে ফেলে উঠে আসি আমার নিজস্ব দোতলার ঘরে ।

ওপরে লুডোর ছকের মতো চারখানা ঘর । প্রতিটা ঘরের সাথে খানিকটা করে বারান্দা  । আমার ঘর থেকে  যে দরজাটা দিয়ে বারান্দায় যাওয়া যায় সেখানে একটা বিশাল ওয়ার্ডোব দিয়ে বন্ধ করা আছে । আমিই বন্ধ  করিয়েছি । আর একটা দেওয়ালে রয়েছে ওই জানলাটা । যেটা সেই কবে থেকে আমাকে কেবলই হাতছানি দিয়ে এসেছে । এই হাতছানি ঘুমে জাগরণে এড়াতে পারিনা আমি । ছাব্বিশ থেকে ছাপ্পান্ন হয়ে গিয়েও এই হাতছানির টানে কেবলই ছুটে ছুটে আসি সেই দূর বিদেশ থেকে । কেউ তা জানেনা । কেউ না । যারা জানতো , সেই আমার মা দিদি বাবা পিসি… তাদের একজনও আর এই পৃথিবীতে নেই ।  এখন শুধু আমি আর আমার জানলা ।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে এঁটে  বসে থাকা সবুজ পাল্লাদুটোকে হাট করে খুলে দিই । সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে অনেকখানি আকাশ , ঝলক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া , হাওয়ায় মিশে থাকা কনকচাঁপার গন্ধ … ,  এবং… জানলার ঠিক নীচে বিছিয়ে থাকা রূপঝোড়ার মোহময়ী সুবিস্তীর্ন সুবিশাল কাকের চোখ জলভূমি । গরাদবিহীন জানলায় দুদিকে হাত মেলে ওই ঝিকিমিকি  আলপনা আঁকা জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গত তিরিশ বছরের বহু বহুবারের মত আমার মনে হয় ঝাঁপ দিয়ে পড়ি । মনে হয় …, সমাজ সংসার মিছে সব… মিছে এ জীবনের কলরব… “ । আমার মনপ্রান মথিত করে উঠে আসা দীর্ঘ নিঃশ্বাসে শুধু একটাই নাম পাখীর পালক বুলিয়ে যেতে থাকে … । ভেতরে ভেতরে হাহাকার ওঠে । আমি জলের দিকে দু’হাত মেলে দিয়ে চীৎকার করে ডেকে উঠতে চাই… মহুল… মহুল…মহুয়াআআআ… আমার মৌ… । কিন্তু বরাবরের মতই একটাও শব্দ বের হয়না গলা দিয়ে । তিরিশ বছর আগেও পারিনি মুখ ফুটে কিছু বলতে , আজো পারিনা ।

সেদিনও সে এসেছিল । আমি তখন ভীষন মনোযোগী স্কলার একজন ছাত্র মাত্র । সামনে পড়ে আছে বিশাল উজ্জ্বল ভবিষ্যত ।  বাবা মা আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশী সকলের ধারনা অনুযায়ী আমি শুধু সকলের মুখ উজ্জ্বল করতেই জন্মেছি । কোন জাগতিক মলিনতা  কোন কালি আমাকে স্পর্শমাত্র করতেই পারেনা । সকলের কাছে শুনে শুনে আর বিশেষ আচরন পেয়ে পেয়ে আমার নিজের মধ্যেও সেরকমই ধারনা বাসা বেঁধেছিল বোধহয় । তাই পিশির মেয়ের অবিমিশ্র অবারিত বাড়িয়ে দেওয়া ভালবাসার উপঢৌকন আমি হাত বাড়িয়ে নিতে পারিনি । অদ্ভুত এক শঙ্কার চোখে তাকিয়ে থাকতাম মহুলের দিকে । মন চাইতো ওকে আমার সদ্য জেগে ওঠা শরীর দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখতে , আবিষ্কার করতে । মগজ চোখ রাঙ্গাতো, ছিঃ অর্ণব , তোমাকে এসব মানায়না ,তুমি না ভাল ছেলে ,তোমাকে না অনেক বড় হতে হবে । সারাক্ষন দোটানায় পড়ে নিজেকে নিয়ে তোলপাড় করে ফেলতাম । মহুল এসব বুঝতোনা । সে শুধু আমাকে চাইতো , আমাকেই চাইতো । যত পেতোনা ,যত আমার বাইরের কপট বৈরাগ্য ওকে দূরে ঠেলতো ও ততই অস্থির অস্থির হয়ে উঠতো ।  সবটা বুঝেও , নিজের মনে হাজারবার চেয়েও কখনো স্বনির্মিত দেওয়ালের বাইরে এসে ওর হাত ধরা হয়নি আমার ।

তখন বুঝিনি ।  আনেক পরে জেনেছি ,খুব কিছু অসম্ভব ছিলনা হয়তো সম্পর্কটাকে  বাস্তবে রূপ দেওয়া । মহুলের মা তো আমার নিজের পিশি ছিলেন না । বাবা ওনাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন একটা সময় । কালে দিনে বোন বলেই পরিচিত হন তিনি । সেসব আমার জন্মের আগের কথা ।আমি জ্ঞান হয়ে থেকে মহুলের মাকে নিজের পিশি এবং মহুলকে নিজের পিসতুতো বোন বলেই জেনে এসেছি । কেউ আমার ভুল কোনওদিন ভাঙ্গিয়ে দেয়নি । যখন ভুল ভাঙ্গল তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে । শুধু নিজের মধ্যে থেকে থেকেই মহুলের প্রতি জেগে ওঠা অন্যায়রকম আকর্ষণ অনুভব করে নিজেকে তিরস্কার করে গেছি ক্রমাগত । প্রতি পদে পদে ও যত নিজেকে এগিয়ে দিতে চাইতো আমার দিকে , আমি ততই বেশী করে বই-এর পাহাড়ে মুখ গুঁজে আড়াল খুঁজতাম । দুটি কাছাকাছি বয়সের ছেলেমেয়ের এই পারস্পরিক দ্বন্দ কিংবা উথাল পাথাল মনের বেভুল গতি কেন বাড়ীসুদ্ধ অতগুলো গুরুজনের চোখে বা মনে সেদিন কিছুমাত্র রেখাপাত করেনি তা ভেবে এই পরিণত বয়সেও আমি একই রকম অবাক হই । কিন্তু এসব অতি গোপনের ভাবনা আমার এমনি সময়ে তো চাপা পড়ে থাকে রোজকার জীবনের তলায় । যে কদিনের জন্য আমি আসতে পারি ফুলতলিচরের এই দোতলার ঘরে , এই জানলা খুলে যেটুকু সময় দাঁড়াতে পারি ওই বিশাল জলের বিছানায় চোখ রেখে , যেটুকু সময় প্রানভরে দেখতে পাই ওই সুবিস্তৃত জলরাশির ওপর নানা বিভঙ্গে শুয়ে থাকা ,আমাকে দু’হাত মেলে ক্রমাগত ডাকতে থাকা মহুলকে , শুধু সেই সময়টাতেই মনের জমাট লোহার দরজায় ঘা মারতে থাকে নানা প্রশ্ন ।আমি বোবার মত তাকিয়ে থাকি এই উত্তরহীন প্রশ্নমালার দিকে । নিশ্চুপ সেই তাকিয়ে থাকাও তবু আমাকে একটা যেন বিশেষরকম শান্তি দেয় । একটা কোন প্রায়শ্চিত্তবোধ জেগে ওঠে ভেতরে ।  অনেক কথা বলে যাই যা একমাত্র আমি এবং মহুল ছাড়া পৃথিবীর আর কারোই শ্রূতিগোচর হয়না । আমি শব্দহীন চীৎকারে একটা কথাই বলে যাই , সেদিনের দুর্ঘটনার পেছনে আমার কোনও হাত ছিলনা । সেই অসংলগ্ন ব্যাখ্যা মহুল পর্জন্ত পৌঁছায়  কিনা আমি জানিনা । শুধু এইটুকুই জানি যে যতদিন আমি বাঁচব আমাকে চেষ্টা করে যেতে হবে , যেতেই হবে । তাই শত সফলতার শীর্ষে বসেও ছুটেছুটে আসি আমি ।  পাল্লা হাট করে খুলে দিই জানলা , যেখান দিয়ে পা ফেলে ফেলে  নীচে জলের ওপর শুয়ে অপেক্ষা করা মহুলের বুকের কাছে পৌঁছে যাব ।

কিন্তু জানলাটার সেই এক অদ্ভুত ক্যারেক্টারিস্টিকস…,সেটাই যেন আজো পর্জন্ত আমাকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেয়নি । যতবার আমি নিজের ভুল সংশোধন করতে চেয়ে দৃড়প্রতিজ্ঞ হয়ে জানলার দিকে এগিয়েছি , ঠিক ততবার যেন আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বাঁধা দিয়েছে কেউ । গত তিরিশ বছর ধরে অসংখ্য বার চেষ্টা করেও আমি পারিনি ঠিক মহুলের মত করেই ওই জানলাটা দিয়ে রূপঝোড়ায় ঝাঁপ  দিতে । যখন মহুল আমায় ডেকে যায় এক অজানা জগতের সঙ্গী হওয়ার জন্য তখন কে আমায় আটকে রাখে এই মাটির পৃথিবীর সঙ্গে ? এই তিরিশ বছরে বহু বহুবার চেষ্টা করেও তবু কেন আমি সুইসাইড করতে পারলামনা ? সে কি ওই জানলাটাই নয় যে আমাকে কেবলই বুকে জড়িয়ে আটকে রাখে লাফিয়ে পড়ার মূহুর্তে ? কিন্তু আমার আন্তরিক চেষ্টার কোন ত্রূটি নেই সেকথা মহুলের আত্মা স্বীকার করতে বাধ্য ।প্রতিবছর এসেছি আমি । ওর শেষদিনের ইচ্ছাপূরনের দায় চাপিয়ে রেখেছি বুকের মধ্যে । ওর নয় শুধু ,কখন সেটা নিজেরই ইচ্ছা হয়ে উঠেছে জীবনের ভিন্নভিন্ন বাঁকে এগোতে এগোতে । আজ এতদিন পর আমার মুক্তকন্ঠে স্বীকার করতে বাধা নেই… হ্যাঁ মহুলকে আমি ভালবেসেছি … বোনের মত নয় , ঠিক যেমন এক সক্ষম পুরূষ ভালবাসে তার প্রিয় নারীকে , তাকে পেতে চায় শরীরের সমস্তশিরা উপশিরা রক্তবিন্দু দিয়ে , যেভাবে একতাল নরম মাটি ছেনে ছেনে অতিযত্নে কুমোর তৈরী করে তার প্রথম প্রতিমাখানি , যেভাবে সদ্যফোটা ফুলের মধু ছুঁয়ে যায় ভ্রমর ।

কিন্তু এতকথা নিজেরও জানা ছিল না সেদিন । নিজেকে চিনতে ভুল করেছিলাম । তাই মন যা বলতে চায় তার ভিন্ন অর্থ করেছিলাম । রাতের অন্ধকারে অনেক ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে আমার ঘরে এসেছিল সে , আর আমি তাকে সম্পুর্ণ উলটো কথা বলেছিলাম । বলেছিলাম , তুই চলে যা তুই চলে যা তুই চলে যা ।

বলেছিলাম , তোকে একটুও ভালবাসিনা আমি , তোকে ভালবাসা আমার পাপ ।

আমার মুখে অত অত পাপের কথা শুনে নিষ্পাপ হেসেছিল কিশোরী মেয়েটি । ঠোঁটের কাছে ঠোঁট  এনে বলেছিল , দেখো ঠোঁটে  ঠোঁটে  চুম্বক তৈরী করা যায় , এসো এক্সপেরিমেন্ট করে দেখি। আমার  ভয়ে কেঁপে ওঠা বুক শক্ত করে ওকে ধাক্কা দিয়েছিলাম আমি । নিষ্ঠুরের মত বলেছিলাম , এসব বাজে ছেলেরা করে ,অসভ্য মেয়েরা করে ।তুই আর কখনো আসিস না আমার ঘরে ।এক্ষুনি চলে যা এখান থেকে ।

ভীষন অভিমানী সেই মেয়ে আমার কথায় কাঁদেনি , শুধু একটু থমকে গিয়েছিল । কেমন একটা হেসেছিল । বাঁকানো ঠোঁট  আরো বেঁকিয়ে বলেছিল , বেশ , আমি তবে চলেই যাচ্ছি । কিন্তু আমি চলে গেলে তুমি শান্তি পাবে তো ?

ওর কথায় পাত্তা দেই নি । তখন আমার একটাই চিন্তা কেউ না ওকে মাঝরাত্রে আমার ঘরে দেখে নেয় । প্রাণপন চেষ্টায় অঙ্কখাতা বের করে মুখ ঢাকতে ব্যস্ত ছিলাম । খেয়াল করিনি প্রেমে পাগল মেয়েটার দিকে ।

নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে একটা শুধু ঝপ করে শব্দ… । আমার শিরদাঁড়ার মধ্যে দিয়ে বরফের নদী বইয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল । মূহুর্তের মধ্যে মহুল জানলা খুলে নিচে ঝাপ দিয়েছে । আমার চোখের সামনে যেন একটা কোন নাটকের ভয়াবহ ড্রপসীন পড়ে গেল এইভাবে তড়িঘড়ি উঠে জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে গুড়িসুড়ি মেরে শুয়ে পড়েছিলাম বালিশে মুখ গুঁজে । আমার ভালছেলের তকমায় যেন না কোন দাগ লাগে ।  তারপর তিরিশ বছর ধরে একটা কথাই ভেবেছি বারবার , সেদিন সঙ্গে সঙ্গে বাড়ীশুদ্ধ সবাইকে জাগিয়ে চেষ্টা করলে হয়তো মহুলকে বাঁচানো যেত , পরদিন সকালে জলে ভেসে ওঠা ওর নিথর শরীরটা দেখতে হতনা । কিন্তু আমার মাথায় তখন ভাল হওয়ার ভুত , সুনাম রক্ষার ভুত ,এবং হয়তো অনেকখানি নিরাকার অবয়বহীন অপরাধবোধের ভার , যার যোগফল আমাকেও আর সকলের মত নীরব দর্শক করেই রেখে দিয়েছিল ।

কিন্তু পৃথিবীময় যেখানেই যাক যাই করূক মানুষ কখনো তার অন্তর্গত বোধের হাত থেকে মুক্তি পায়না । আমিও পাইনি । সেই অপরাধবোধের তাড়না , অবরূদ্ধ ভালবাসার তাড়নায় ঘুরে মরছি আজ ছাপ্পান্ন বছর বয়স পর্যন্ত । ছবির মত সংসার , একনিষ্ঠ স্ত্রী , আদরের সন্তান , প্রচুর সম্মানের সফল পেশা এবং প্রচুর প্রচুর অর্থ , কিছুই আমাকে কাঙ্খিত মুক্তি এনে দিতে পারেনি । তাই আবারও এসেছি মহুলের কাছে । যদি সে এখনো আমাকে তার বুকে টেনে নিতে রাজী থাকে তবে আর দেরী করব না । এবার আমি জানলার পাল্লা দুটো মিস্ত্রী দিয়ে খুলিয়ে দেব ঠিক করেছি । সেসব দিনের বেলার কাজ । তারপর আমার জন্য গোটা রাত পড়ে আছে । না , শুধু আমার জন্য নয় , আমার আর মহুলের জন্য । দেখব কেমন করে  ঠোঁটে  ঠোঁটে চুম্বক তৈরী হয় , দেখব এখনো , এই ছাপ্পান্ন বছরে এসেও সেই চুম্বক তৈরী করা সম্ভব কিনা ।

কিন্তু এবারে কেন যে জ্বলি এমন অদ্ভুত জেদ ধরলো !

কতক্ষন খোলা জানলার ধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম নিজের খেয়াল নেই । চমক ভাঙ্গে জ্বলির ডাকে । এরই মধ্যে কখন স্নান সেরে নিয়েছে ও । মেলে রাখা  চুল দিয়ে জল ঝরছে টপটপ । নিত্যদিনের মত গাউন বা হাউসকোট নয় , আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি একটা বেগুনী রং সুতির ছাপা শাড়ি আটপৌরে করে জড়িয়ে ধরেছে জ্বলির পশ্চিমী কালচারে স্টাইলে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা শরীর । আশ্চর্জ্য ! এই শাড়ি কোথায় পেল ও ! তাছাড়া এভাবে শাড়ি ও শেষ কবেই বা পড়েছে ! আমার অবাক ভাব ওর চোখ এড়ায় না । মুচকি  হেসে পেছনে দাঁড়ানো মংলুর হাত থেকে চায়ের কাপ ডিশ সমেত ট্রে নামিয়ে রাখে পাশের টেবিলে । লিকার ঢেলে একখানা সুগার কিউব মিশিয়ে এগিয়ে দেয় আমার দিকে । “ আগে চা টা খেয়ে নাও তারপর তদন্ত করতে বোসো ‘খন … ”

“কি কিসের তদন্ত ? “

“ এই… বিয়ে করা বউকে বহুদিন পর শাড়ি পরা দেখলে বাঙ্গালী পুরুষের কেমন লাগে… “

ওহ… রসিকতা… । আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি । তদন্ত শব্দটার মধ্যেই কেমন একটা আতঙ্ক মিশে আছে , মনে হয় একলহমায় উন্মুক্ত হয়ে পড়বে সব লুকিয়ে রাখা সাদা কালো পৃষ্ঠা । একটু বেশী মন দিয়েই চা টা খাচ্ছিলাম আমি । এবারে কানে আসে  মংলুর  উৎসাহী মন্তব্য । ঘাড় নেড়ে নেড়ে সে বলে যায় অনেক গুলো কথা ,যার মধ্যে সবটা নয় ,  শুধুমাত্র কোন একটা ভয়ঙ্কর অংশই আমার কানে ঢোকে  ।

“ বউদিমনি তো খুব বায়না ধরলেন পিছনের রূপঝোড়াতে স্নান করবেন… আমি বলি নতুন জল… কাল বরং… “

সবটা শেষ হওয়ার আগেই আমার গলা দিয়ে একটা চীৎকারের মত নিষেধ বেরিয়ে আসে , “ না আ আ  একদম না… “ । নিজের চীৎকার  আমি নিজে শুনতে পেয়েই আচমকা থেমেও যাই । কিন্তু ততক্ষনে জ্বলি এগিয়ে এসেছে আমার একদম কাছে ।  অদ্ভুত দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে একটু হাসে ।  তারপর বলে , “  কিন্তু আমি তো বাথরুমেই স্নান করেছি । ডোন্ট গেট এক্সাইটেড… “।

*             *          *            *             *

আমাকে চা খাইয়ে ধীরে সুস্থে নীচে চলে গিয়েছিল জ্বলি আর মংলু  । সারাদিনে মাত্র কয়েকবারই দেখা হয়েছে । জ্বলি নিজের জিনিসপত্র ঢুকিয়ে নিয়েছিল নিচের তলায় মায়ের ঘরটাতেই । আমি উচিত বোঝা সত্ত্বেও কেন যেন ওকে বারন করতে পারিনি । বরং ভেতরে ভেতরে রিলীভড হয়েছিলাম অনেকখানি । শুধু মনে মনে সারা বিকেল দুপুর সন্ধ্যা একটা প্রশ্নই ভেসে ভেসে এসেছে , এরকম একটা বেগুনফুল রঙের শাড়ী কোথায় পেল জ্বলি । ওর আগেও কেউ কি কখনো এসেছিল আমার কাছে এরকম একটা রঙ্গীন সাজে ? প্রশ্নটা জ্বলিকেও মুখ ফুটে বলতে পারলামনা । অবশ্য  মনের কথা মনে চেপে রাখা আমার  কাছে নতুন কিছু নয় ।

সারাদিন এমন স্কোপ পেলামনা যে জানলার পাল্লা দুটো মিস্ত্রী ডেকে খুলিয়ে দেব । সে হোকগে । আজ কেন যেন মনে হচ্ছে জানলাটা আর কিছুতেই আমার ওপর কোন ক্ষমতা বিস্তার করতে পারবেনা । আজই । হ্যা  আজই আমি ওর শত বাধা স্বত্তেও ঠিক একইরকম ভাবে লাফিয়ে পড়ব রূপঝোড়ার জলে । যেখানে উদ্ভিন্ন শরীর বিছিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে মহুল । আমার মহুয়া । তিরিশ বছর আগের ভুল আজ  সংশোধন করে নেব । দেখব কেমন করে ঠোঁটে  ঠোঁটে চুম্বক তৈরী হয় , দেখব কি কি লেখা আছে ওর চঞ্চল শরীরের বাঁকে বাঁকে । গত তিরিশ বছরে যা পারিনি বারবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও আজ  আমাকে সেই কাজটা সেরে ফেলতেই হবে । হবে কারন এই আপাতসফল জীবনের মূলে আজীবনের বয়ে ফেরা ফাঁকি আমি আর সহ্য করতে পারছিনা । আমি জানি  জ্বলি রিয়া টিয়া আমায় ঘৃনা করবে । করূক , তবুও আমি জানব এক বিশাল ফাঁকি থেকে , অসম্মানের বন্ধন থেকে আমি ওদের মুক্তি দিয়ে যাচ্ছি । এবং একমাত্র তখনই আমারও মুক্তি আসবে , তার আগে নয় , তার আগে কিছুতেই নয় ।

রাত কত জানিনা । ভীষন অস্থির অস্থির লাগছে । ঘরের মধ্যেটা চাপ চাপ  অন্ধকারে ভারী হয়ে আছে । হাতড়ে হাতড়ে জানলাটা খুঁজে নিয়ে এসে সামনে দাঁড়াই । দু’হাতে ধাক্কা দিয়ে খুলে দিই পাল্লাটা । চোখের সামনে রূপঝোড়ার নিথর শরীর । হাল্কা কুয়াশার চাদরে মোড়ানো , যেন সকালবেলায় ডাঙ্গায় তোলা পান্ডুর মহুলের শরীর । একটুও বাতাস নেই যে জলে একটাও ঢেঊ তুলবে । পাড়ের বড় বড় গাছগুলো পর্জন্ত নির্বাক প্রহরী । ওদের শাখা প্রশাখায় নেই কোন আন্দোলন । এতদূর থেকেও আমি দেখতে পাচ্ছি মহুল আমায় ডাকছে । আমি মাথা গলিয়ে ঝুঁকে পড়তে যাই । কিন্তু এতগুলো বছরের মত আজও আমায় জানলাটা বাধা দেয় । আমি প্রানপনে চেয়েও নিচে ঝুঁকতে  পারিনা , বরং পেছনের দিকে জানলাটা আমায় ঠেলে দেয় ।

সেই বহু বহু বছর আগের মতই কেউ আমায় আচমকা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেছে । কেউ জড়িয়ে ধরেছে নাকি এই জানলাটাই তার সমস্ত বশীকরন ক্ষমতা দিয়ে আমায় ঠেলে দিচ্ছে মহুলেরই কাছে ! আমার মনে হয় বাইরে একটুও হাওয়া না থাকা সত্ত্বেও পাল্লাদুটো কেঁপে কেঁপে হাসছে যেন , যেন মহুল ওই বাইরে নয় , এই ঘরেই আছে , ঠিক আমার পেছনেই , আমার খুব কাছেই , যেন মহুলের নতুন জেগে ওঠা বুকদুটো নরম আদরে ছুঁয়ে আছে আমাকে । আমি বিবশ হয়ে যাই , একটুও দেরী না করে নিজেকে সঁপে দিই । ছাপ্পান্নয় ছাব্বিশের উন্মাদনা নিয়ে পরীক্ষায় মাতি কিকরে ঠোঁটে  ঠোঁটে  চুম্বক তৈরী করা যায় , আরো আরো আরো নানা রকম পরীক্ষা আর নিরীক্ষা করে করে করে নিজেকে সারারাত নিঃশেষ করে ফেলি … যতক্ষণ না আমার চোখে মহুল আর জ্বলির শরীর দুটো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ।

এখন ভোরের আলো সবে ফুটেছে । খোলা জানলা দিয়ে একটা দুটো আলোর রেখা এসে ঘরের মেঝেয় আলপনা কাটবে কিনা ভাবতে ভাবতে আবার পালিয়ে যাচ্ছে । আমি আমার আজানুলম্বিত বাহু… বাড়িয়ে দিয়ে আটকে দিচ্ছি তাদের , আবার ছেড়েও দিচ্ছি । বেশ নতুন রকম এই খেলা । আমার পাশে এলিয়ে পড়ে নিবিড় ঘুমে আচ্ছন্ন আমার দুই যুগ পুরোনো বউ , যার  সারা মুখে গলায় লেপটে থাকা লাভ বাইটস আর আধোখোলা ব্লাউজের হুকে নববধূর পরিচিতি ।

খোলা জানলা দিয়ে তাকিয়ে থেকে আর আমার বুকটা  বরফ ঠান্ডা হয়ে উঠছে না । বুকের ভেতরটাও আর ভার ভার লাগছে না । জ্বলির মুখের দিকে তাকিয়ে বরং হাল্কা হয়ে যাচ্ছে জমিয়ে রাখা পাথরটা ।

নিজেকে  নিজে বন্দী করে রেখেছিলাম । সেই বন্দীদশা থেকে আমায় হঠাত মুক্তি এনে দিয়েছে যে দু’জন তাদের একসঙ্গে সকালবেলার জেগে ওঠা আশ্লেষে বুকে চাপি । আমার গোঙ্গানির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় জ্বলির । সে আবার বিয়ের পরের জ্বলি হয়ে যায় , আরো গুটিসুটি হয়ে আমার কোল ঘেঁষে আসে অদৃশ্য মহুলকে টেনে সরিয়ে দিয়ে ।

 

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes