jamdani

মায়াবী পিকনিক

শ্রেয়া ঘোষ

পর্ব-২

গত শীতে শান্তিনিকেতনে খাপছাড়া। মুক্তাবাবুর অ্যাম্বাসেডরে গন্তব্যহীন। চা খেতে কী রোদ পোহাতে বিরাট মাঠের সামনে কিছুক্ষণ। মাঠ আসলে মন্দির সংলগ্ন। কালীঠাকুরের মন্দির। কোনও এক দেবেন্দ্রনাথের স্মৃতিরক্ষায় তাঁর স্ত্রী ভানু সিংহ ও পরিবার- বলছে মন্দিরের গায়ে গাঁথা পাথরের ফলক। মাঠের মধ্যে এদিক-ওদিক খবরের কাগজ বিছিয়ে বা এমনি ঘাসের ওপর রং-পেনসিল, কাগজ, বোর্ড ছড়িয়ে মগ্ন ছেলে-মেয়ে। পায়ে পায়ে গিয়ে দেখি আঁকার স্কুল আসলে। রবিবার করে সকালবেলায় প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নিয়ম করে, বিশেষ এই শীতকালে। তবে সেদিন ছবির পাশাপাশি উনুন, খিচুড়ি, আনাজপাতি, কলাপাতা, বালতি হাঁড়ি কড়া, তেল মশলা, বুড়ো বুড়ি। শুধু বুড়ো-বুড়িই। প্রতি শীতেই নাকি। সব নিরামিষ। দেখভালে বুড়িমারা। কাজকর্মে ঠাকুর, আর তার দলবল। বুড়োরা রোদে বসে পুরোনো দিনের হাজার বার বলা শোনা গল্পে বুঁদ।

আমাদেরও নিমন্ত্রণ তৎক্ষণাৎ। ওনাদের গেস্ট হয়ে। দূর, পিকনিকে আবার গেস্ট কী? কয়েকটা বছর যাক না মেসোমশাই। পার্টিসিপেন্ট হয়ে তবেই।

জীবন জুড়ে পিকনিক কত, সবই বাইরে থেকে। দূর থেকে সুঘ্রাণ। কলাপাতায় ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত, ভাজা, মাংস, চাটনি। আমার জন্যে চাল ফুটেছে কি মস্ত হাঁড়িতে কোনও?

মাংসের হাড়ওয়ালা টুকরো? কোনওদিন না। একবারও আমার জন্যে পাতা হয়নি আসন।

সেই অফিস থেকে যেবার সূরয কুণ্ডে। টিফিনের সময়ে মিটিং। মেনু, জোগাড়যন্ত্র, বাসনকোসন অবধি দেখতে পাচ্ছি সব চোখ বন্ধ করলে। এখনও, এত বছর পেরিয়েও। চার-পাঁচটা গাড়ি ভাড়া করে দিল্লির কুয়াশায় ভোরবেলা। কিন্তু পিকনিকের দিন কোথাও তো আমি নেই। সব চুকে যাবার পর কতদিন ধরে গল্প। কিন্তু মাঝখানের দিনটায় সেই ফাঁক। ভরাট হল না কোনওদিন। কেন যে সূরয কুণ্ড অবধি পৌঁছোতে পারলাম না তাও ঝাপসা। বারবার সব পুরোনো পিকনিকেই এমন।

অসম্ভব একটা কথা। গোটা জীবন জুড়ে একটাও পিকনিক নেই? স্কুল থেকে অন্তত একবার। হ্যাঁ ক্লাস টেনে। টেনের তিনটে সেকশন আর দিদিমণিরা- কোলাঘাট না ফুলেশ্বর। ভোর ভোর রওনা। স্কুল বাস বোঝাই। পিকনিকের ছবি স্কুল ম্যাগাজিনে- বিজয়াদি ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেট হাতে। অনিলাদি মটরশুঁটি ছাড়াচ্ছেন। মাধুরীদি পরিবেশনে। আর পঞ্চাশ-ষাটজন ক্লাস টেন শাড়ি কী সালোয়ারে। খুশি উপচোনো মুখ। সিক্স কী সেভেন থেকেই বছর গুনে অপেক্ষা জারি। এমনিতে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে বেড়াতে যাওয়া- প্রশ্নই ওঠে না সেই সব শাসনের দিনে। কিন্তু এটা তো স্কুল থেকে। স্কুল বাস, দিদিমণী, দারোয়ান, কাজেই অনুমতি অন্তত এই একবার। স্কুল ম্যাগাজিনে ছবিগুলো পরের বছর। গল্পগুলো প্রতিদিন। একটাও গল্পে ছিলাম না আমি। অথচ ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছি, কেউ নজর করেনি তেমন।

চলবে…

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes