jamdani

মার্জার সংবাদ  { শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায় } 

বেড়ালের ঝগড়া দেখতে খুব মজা লাগে উত্তীয়র। ও যেহেতু তিনতলা এই বাড়িটার তিনদিক-খােলা চিলেকোঠার ঘরে থাকে, সামনের খােলা ছাদ, পাশের বাড়ির কার্নিস, অথবা ভরদুপুরের শুনশান রাস্তায় পাড়ার বেওয়ারিশ বেড়ালদের ঝগড়া লেগেই থাকে। প্রতিবারই তীব্র কৌতুহল নিয়ে উত্তীয় সেটা দেখে। চাপা উত্তেজনা হয়, মারামারি শুরু হলে কে জিতবে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত মারামারিটা আর হয়ে ওঠে না! কারণ, বেড়ালরা আদতে বেশ সেয়ানা! ওই যে একে অন্যকে দেখে পিঠ ধনুকের মতাে বাঁকিয়ে, লেজ খাড়া করে গরগর আওয়াজ মুখে, আর সতর্ক নজর একে অন্যকে বেঁধে রাখা, এক সেকেন্ডের জন্যেও প্রতিপক্ষের ওপর থেকে চোখ না সরানাে, যে কোনও মুহূর্তে ঝটাপটি বেধে গেল বেধে গেল একটা ভাব বেশ কিছুক্ষণ ধরে এটা চলার পর হঠাৎই কোনও একটা বেড়াল রণে ভঙ্গ দেয়। অন্যটাও, যেন কিছুই হয়নি, এমন একটা মুখ করে হাঁটা দেয় অন্যদিকে।

ইদানীং রােহিণী এবং বিতস্তা ঠিক সেই ঝগড়াটে বেড়ালদের মতাে শুরু করেছে। দুজনে দুজনকে দেখলেই ওদের নাকের পাটা ফুলে যায়, তেরছা চাহনিতে একটা হিংস্র ভাব ফুটে ওঠে। যদিও কেউ কারও রাস্তা আটকায় না, কিন্তু ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, উপায় থাকলে একে অন্যকে ছিড়ে খেত! সারা দিনে ওদের মধ্যে যতবার দেখা হয়, সিঁড়ি দিয়ে নামতে-উঠতে, অথবা বাড়িতে ঢােকা-বেরনাের সময়, কিংবা সামনের গলি দিয়ে এ ওর পাশ কাটিয়ে হেঁটে যাওয়া প্রতিবার ঘটনাটা ঘটে। সামান্য দূরত্বে থাকলেও রােহিণী এবং বিতস্তা, কেউ কারও মুখের দিকে তাকায় না। চোখাচুখি এড়িয়ে যায়। নেহাৎ মুখােমুখি হয়ে গেলে কেউ একজন কষ্ট করে সামান্য হাসে। অন্যজন ঠিক ততটাই আড়ষ্ট হাসিতে ফিরতি সৌজন্য দেখায়। ব্যাস, ওইটুকুই। তার থেকে একরত্তিও বাড়তি নয়।

উত্তীয় জানে, এই যে মনে মনে আঁচড়ে কামড়ে দেওয়ার একটা শত্রুতা দুজনের মধ্যে, এটা স্রেফ ওর জন্যে। ওর মতাে একটা ফালতু, কোনও কম্মে না লাগা, চূড়ান্ত আনস্মার্ট একটা ক্যাবলা গেঁয়াে ভূতের জন্যে! যতবার এটা মনে হয়, ও নিজের মনে খুকখুকিয়ে হাসে।

না, উত্তীয় সম্পর্কে অন্য কোনও ধারণা তৈরি হয়ে যাওয়ার আগে ওর পরিচয় দিয়ে দেওয়া যাক। উত্তীয় পাত্র। জেলা মেদিনীপুর, মহকুমা ঘাটাল। গ্রামের নাম কেউ চিনতে পারবে না, তাই বলা নিষ্প্রয়ােজন। উত্তীয়র পরিবারে, বা ওর পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে, সম্ভবত ওদের গােটা গ্রামেই কারও নাম এরকম রাবীন্দ্রিক নয়। ওর বাবার নাম নিবারণ, ঠাকুর্দা বিপত্তারণ। ওর ছােটোবেলার বন্ধুদের নাম কমল, দুলাল, মন্টু এই রকম। তবুও যে ওর নাম উত্তীয় রাখা হয়েছিল, তার কারণ ওর এক পিসি। কোনও এক সুযােগে, কোথাও একটা রবি ঠাকুরের ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যটি দেখে ওই উত্তীয় নামটাই মনে ধরেছিল ‘কখনও বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া’ ওর সেই আইবুড়াে পিসির। পরে উত্তীয়র মনে হয়েছে, আহা, ‘বজ্রসেন’ নাম দিতে পারত! বেশ একটা তেজ থাকত নামের মধ্যে। কিন্তু মানুষের তাে সব সাধ পূরণ হয় না। আর তা ছাড়া রােগা-পাতলা উত্তীয়র নরমসরম স্বভাবের সঙ্গে বজ্ৰসেন নামটা ঠিক মানাতও না!

হ্যাঁ, অতীব নরম প্রকৃতির ছেলে ও । অবশ্য ছেলে নয়, এবার লােক বলা উচিত। ২২ বছর বয়স হতে চলল। ঘাটাল কলেজ থেকে বিএ পাশ করার পর কলকাতায় এসে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। এমএ বাংলা। এই শহরে নিজস্ব কোনও থাকার জায়গা নেই ওর। অসংখ্য হস্টেল, পিজি, সিঙ্গল রুম ফ্ল্যাট ইত্যাদি আছে অবশ্য। বস্তুত উত্তীয় ধরেই রেখেছিল, গ্রাম ছেড়ে শহরে এলে তার কাঁধে দুটি পাখনা গজাবে! কিন্তু উত্তীয়র বাপ-জ্যাঠারও ঠিক ওই কথাটাই মনে হয়েছিল। যে অভিভাবকহীন স্বাধীনতা দিলেই নষ্টামিতে ভরা শহরে ছেলে উড়তে শিখবে! ফলে একদা তাদের গ্রামেরই মানুষ এই জ্যাঠামশাইয়ের বাড়িতে ওর থাকার বন্দোবস্ত।

তিনতলা বাড়ির একতলায় বিপত্নীক, নিঃসন্তান জ্যাঠা। দোতলা, তিনতলায় ওয়ার্কিং গার্লস হস্টেল। ছাদের একটেরে ঘরে উত্তীয়- এই হল স্তরবিন্যাস। হস্টেলের মেয়েদের জন্যে রান্না হয়। তার থেকেই জ্যাঠামশাই খান, উত্তীয়ও খায়। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। এই মেসবাড়ির বিনেপয়সার কাজের লােক হয়ে গেছে উত্তীয়। প্রথম কবে যে ওকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে কোন মেয়ে ওর হাতে কাচা জামাকাপড়ের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘অ্যাই, এটা গলির মুখে ইস্ত্রিওয়ালাকে দিয়ে এসাে তাে’- সেটা উত্তীয় ভুলে গেছে। কিন্তু নতুন মেয়ে এলে পুরনােরা নির্ঘাত বলে দেয়, উত্তীয়ই এই বাড়ির কাজের লােক! ফলে ফরমাস চলতেই থাকে। বিশেষ করে রবিবারগুলােয়, যেদিনটা ও বাড়িতে থাকে। ‘চট করে বাজার থেকে দুটো পাতিলেবু’ আনা থেকে শুরু করে পাড়ার ওষুধের দোকান থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন, উত্তীয় কোনও হুকুমেই না বলতে পারে না। জ্যাঠার প্রথমদিকে একটু ভুরু কুঁচকে থাকলেও, এখন মনে হয় ওনারও স্বস্তি থাকা-খাওয়ার কড়ারে বিনে মাইনের একটা ফাইফরমাস খাটার লােক বাড়িতে আছে বলে। আর সত্যি কথা বলতে কী, উত্তীয়রও ব্যাপারটা ক্রমশ গা সওয়া হয়ে এসেছে। এখন আর ওর খারাপ লাগে না। শুধু মেয়েদের কাছে নিজের আসল নামটা বলতে ও লজ্জা পায়। কেউ নাম জিজ্ঞেস করলেই বলে মন্টু। কী অদ্ভুত, মেয়েরা ডাকাডাকি করে, সেই শুনে জ্যাঠামশাইও বিনা বাক্যব্যয়ে ওকে আজকাল মন্টু বলেই ডাকেন!

কিন্তু উত্তীয়র সমস্যা শুরু হয়েছে মাসখানেক হল। রােহিণী এবং বিতস্তা এই বাড়িতে থাকতে আসার পর। বিতস্তা এসেছে আগে, তার দু’মাস পর রােহিণী। ততদিনে বিতস্তার কাছেও বাড়ির কাজের লােক হিসেবে উত্তীয়, ওরফে মন্টুর পরিচয়টা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে বিতস্তা ওর সঙ্গে ঠিক কাজের লােকের মতাে ব্যবহার করেনি শুরু থেকেই। বরং বারদুয়েক নিজের ঘরে ডেকে, ইন্ডাকশন কুকারে গুঁড়াে চা আর মিল্ক পাউডার ফুটিয়ে দিব্যি চা করে খাইয়েছে। সেটা অবশ্য এই কারণেও হতে পারে, যে জ্যাঠামশাইয়ের কড়া নিয়ম, মেয়েরা কেউ ঘরে রান্না করতে পারবে না। স্টোভ রাখা যাবে না ঘরে। আগুন জ্বালানাে যাবে না। হিটারের তাে প্রশ্নই নেই। ইলেকট্রিক বিল বেশি আসে। কিন্তু মেয়েরা সে নিয়ম মানে না। আইনের ফাঁক খুঁজে বের করে, এবং আধুনিক রন্ধন পদ্ধতি সম্পর্কে জ্যাঠার অজ্ঞতার সুযােগ নিয়ে, বিনা-আগুনের ইন্ডাকশন কুকার খাটের তলায় লুকিয়ে রাখে প্রায় সবাই। তাতে লুকিয়েচুরিয়ে চা, ম্যাগি, চট করে দুটো ডিমসেদ্ধ চলতেই থাকে। বিতস্তা ওকে খাতির করে ডেকে, ওর সামনে চা বানিয়ে, খাইয়ে ওকেও সেই বেআইনি কাজের অংশীদার করে ফেলেছে। কোনওদিন ধরা পড়লে যাতে বলতে পারে, মন্টুই তাে এখানে বসে চা খেয়ে গেছে! যাতে ব্যাপারটা গােপন রাখার দায় ওদের যতটা, ততটা উত্তীয়র ওপরেও থাকে। সে যাকগে, উত্তীয় অত তলিয়ে ভাবেনি কোনওদিন। আর ডেকে চা খাওয়ানােই শুধু নয়, বিতস্তা যথেষ্ট ভালাে ব্যবহারও করত ওর সঙ্গে। উত্তীয়, থুড়ি, মন্টুকে যে স্রেফ কাজের লােক বলে মনে করে না, সেটা বােঝা যেত ওর হাবেভাবে, কথার ধরনে।।

এই অবধি দিব্যি চলছিল। কিন্তু সব গন্ডগােল করে দিলেন রােহিণী ম্যাডাম। ইনি নিজের বর এবং শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তুমুল ঝামেলা করে, অতঃপর নিজের বাড়িতেও ঝগড়াঝাটি করে এই হস্টেলে এসে উঠেছেন। নয়ত ইনি ঠিক এরকম জায়গায় থাকার লােক নন। কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা পালিশ করা চুল, হিলহিলে চেহারা, যে কোনও পােশাকেই তাকিয়ে থাকার মতাে রােহিণী ম্যাডাম বেশ বড়াে কোনও চাকরি করেন। নির্ঘাৎ প্রচুর বেতন পান। সব সময় যাতায়াত করেন অ্যাপ-ক্যাবে। আর রােজ সকালে কোম্পানির গাড়ি আসে তাঁকে নিতে। ঝকঝকে সাদা সেই পেল্লাই গাড়ির ধােপদুরস্ত পােশাক পরা, পুরুষ্টু গোঁফওয়ালা ড্রাইভারকে দেখলেও সম্ভ্রমে মাথা নুয়ে আসে। 

রােহিণী ম্যাডাম এসেই এই বাড়ির ‘রাত দশটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসতে হবে’ বা ‘ফিরতে দেরি হলে আগে থেকে জানাতে হবে’, ‘রাত এগারােটার পর গেটে তালা পড়ে যাবে, খুলবে সেই পরের দিন সকাল ছটায়’- এই নিয়মগুলােকে নস্যাৎ করে দিলেন। অমন প্রবলপ্রতাপ জ্যাঠামশাইয়ের সামনে কাঁধ ঝাকিয়ে বলেছিলেন, ‘সিলি রুলস। আমরা কলেজের বাচ্চা মেয়ে নই। আর এটাও ওয়ার্কিং গালর্স হস্টেল।’

কেন কে জানে, জ্যাঠামশাই কথা বাড়াননি। এখন নিয়মমাফিক রাত এগারােটাতেই গেটে তালা পড়ে যায়, কিন্তু সজাগ থাকতে হয় উত্তীয়কে। রােহিণী ম্যাডাম এলে নীচে নেমে এসে গেটের তালা খুলতে হয়। যদিও এমন কিছু বেনিয়ম করেন না ম্যাডাম। সাড়ে এগারােটা বারােটার মধ্যেই ফিরে আসেন রােজ। শুকুর-শনিবারগুলােও কখনও আরও রাত হয়। কোনও কোনও দিন ম্যাডামের গা থেকে বিদেশি পারফিউমের সুগন্ধির সঙ্গে হালকা মদের গন্ধও পায় উত্তীয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, ম্যাডামের পা টলে না, কথা জড়ায় না। মিষ্টি হেসে ওকে গুডনাইট বলে খটখটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে যান। গত চার মাসে উত্তীয় এই অপেক্ষাতেও অভ্যস্ত হয়ে গেছিল। সারা পাড়া যখন ঘুমিয়ে পড়ছে, ছাদের পাঁচিল থেকে ঝুঁকে রাস্তার দিকে খেয়াল রাখত। ঘর থেকে একচিলতে আলাে ওই জায়গাটায় এসে পড়ে। সেই আলােয় কখনও বই পড়ত, কখনও কিছু লিখত।।

কেলােটা হল মাসখানেক আগে। সেদিন উত্তীয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। রােহিণী ম্যাডামের আসা, বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, তার পর ধৈর্য হারিয়ে ঘন ঘন কলিং বেল বাজানাে, কোনও কিছুই উত্তীয়র কানে আসেনি। বাধ্য হয়ে একতলায় জ্যাঠামশাইকেই দরজা খুলতে হয়েছিল ঘুম থেকে উঠে গিয়ে। এবং সম্ভবত রােহিণী ম্যাডামের সঙ্গে জ্যাঠামশাইয়ের কোনও কথা কাটাকাটি হয়েছিল। কারণ পরদিন সাতসকালে বেতাে হাঁটু নিয়ে তিনতলার ছাদে উঠে এসে ওকে ঢালাও গালাগালি করেছিলেন জ্যাঠামশাই। উত্তীয় মিনমিন করে বলতে চেয়েছিল, সেদিন ভােরবেলা ঘাটালের বাড়ি থেকে ফিরে সারাদিন ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করে ও খুব ক্লান্ত ছিল, তাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। শুনতে চাননি জ্যাঠামশাই। উল্টে গলা সপ্তমে তুলে বলেছিলেন, নিজের দায়-দায়িত্ব বুঝে এ বাড়িতে থাকতে চাইলে থাকো, নয়তাে বিদেয় হও!

আরও কিছু বলতেন হয়তাে, কিন্তু হঠাৎ রােহিণী ম্যাডামকে ছাদের দরজায় দেখে হকচকিয়ে থেমে গিয়েছিলেন। রােহিণী দু’পা এগিয়ে উত্তীয়র চিলেকোঠার ঘরের সামনেটায় এসে দাঁড়িয়েছিল। সেই ফাঁকে জ্যাঠা তড়বড়িয়ে নেমে গিয়েছিলেন নীচে। ভয়ে ভয়ে তাকিয়েছিল উত্তীয়। ম্যাডাম এসে ঢুকেছিলেন ওর ঘরে। নিবিষ্ট হয়ে লক্ষ্য করেছিলেন দেওয়ালে টাঙানাে রবীন্দ্রনাথের যুবক বয়সের ছবি, অবন ঠাকুরের আঁকা ভারতমাতা, মলিন হয়ে যাওয়া পাবলাে নেরুদার পােস্টার। টেবিলে আর তাকে গুছিয়ে রাখা এমএ ক্লাসের বইগুলাে। শেষে গােটা ঘরে একবার চোখ বুলিয়ে শান্তভাবে গিয়ে বসেছিলেন উত্তীয়র খাটে। প্রথম প্রশ্ন ছিল- তুমি কি বরাবরই এরকম গােছানাে লােক, নাকি এই গার্লস হস্টেলে কাজ করতে করতে হয়েছ? গৃহকর্মে নিপুণ ?

প্রশ্নটার ঠিক কী উত্তর হয়, বুঝতে পারেনি উত্তীয়। কাজেই চুপ করে ছিল। এমনকি চোখে চোখও রাখেনি। তাকিয়ে ছিল মেঝের দিকে। মাথা নিচু। তখনই ছুটে এল দ্বিতীয় প্রশ্নটা— এই পােস্টারটা কোথা থেকে পেয়েছ? ঘরের দেওয়ালে পােস্টার একটাই। তাও মুখ তুলে নেরুদার পােস্টারটার দিকে তাকিয়ে আড়ষ্ট গলায় বলেছিল, ‘এক বন্ধু এনে দিয়েছে।’ – ‘বন্ধু না বান্ধবী?’

অস্বস্তিতে মুহূর্তে ঘেমে উঠেছিল উত্তীয়। চোখে চোখ রাখতেও অস্বস্তি। কোনওমতে বলেছিল, “না, বন্ধু। সাংবাদিক। দিল্লিতে চিলির দূতাবাসের একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। সেখানে এটা দেখে আমার কথা…’ 

– ‘পাবলাে নেরুদার কবিতা তােমার ভালাে লাগে?’ এইবার প্রথম সরাসরি তাকিয়েছিল উত্তীয়। কিছুটা আত্মবিশ্বাসী গলায় বলেছিল, “অসম্ভব ভালাে লাগে। আমি কয়েকটা অনুবাদও করেছি। ইংরেজি থেকে।’ 

এর পরের এক-দেড় ঘণ্টায় রােহিণী ম্যাডাম থেকে শুধু রােহিণী এবং তুমি হয়ে উঠল। সেই রবিবারের সকালে প্রচুর গল্প হল দুজনের। নেরুদার কবিতা থেকে মার্কেজের সাহিত্য, বাংলায় এখন কারা ভালাে লিখছে, এমএ পাস করে উত্তীয় কী করবে ঠিক করেছে থেকে শুরু করে রােহিণীর বর আসলে ভালাে, কিন্তু কাপুরুষ, আসল ‘বিচ’ হল ওর দাদার বউ এত পর্যন্ত। শেষে যাওয়ার সময় ওর গাল টিপে দিয়ে রােহিণী বলল, ‘এবার থেকে কিন্তু উত্তীয়ই বলব। আর মন্টু বলে ডাকব না।’

তার পর থেকে, নাম ধরে ডাকার নেশাতেই কিনা কে জানে, সারা দুপুর, সারা বিকেল নানা ছলে তিনতলায় নিজের ঘরের দরজার সামনে থেকে। ‘উত্তীয় উত্তীয়’ বলে হেঁকে হেঁকে ডাক দিয়ে গেল রােহিণী। সন্ধের মধ্যে হস্টেলের সবাই জেনে গেল, ওর নাম মন্টু নয়, উত্তীয়। তার পর নিশ্চয়ই নিজেদের মধ্যে আলােচনাও হল ওকে নিয়ে। কারণ, সেদিনের পর থেকে ওকে আর কেউ কোনও কাজের জন্যে বলে না। ডাকই পড়ে না মন্টুর। দুদিনেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠল উত্তীয়। তার আগে অবধি ও বােঝেনি, মুখ বুজে মেয়েদের ফাইফরমাস খাটার ব্যাপারটা কীভাবে ওর সিস্টেমে ঢুকে পড়েছে! যতক্ষণ বাড়ি আছে, কেউ ওকে ডাকছে না, কিছু করতে বলছে না, এক গামলা কাচা জামা-কাপড় ওর চিলেকোঠার ঘরের সামনে ঠকাস করে নামিয়ে রেখে হুকুম দিয়ে যাচ্ছে না, ‘একটু মেলে দাও তাে’, সকালে ইউনিভার্সিটি যাওয়ার তাড়ার মধ্যেই কারও কোনও দরকারি জিনিস আনতে দোকানে ছুটতে হচ্ছে না- এই যে কারও কোনও কাজেই ও লাগছে না, এটা ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠতে শুরু করল উত্তীয়র কাছে।

শেষে ও নিজেই একদিন সন্ধেবেলা দোতলায় বিতস্তার দরজার কপাটে টোকা দিয়ে জানতে চাইল, ‘কিছু কি ইস্তিরি করতে দেওয়ার আছে?’

ধড়াস করে খুলে গেল দরজা এবং যে রণরঙ্গিনী মূর্তি ওর সামনে এসে দাঁড়াল, বিতস্তাকে সেই চেহারায় ও কখনও দেখেনি। বর্ষার ভরা নদীর মতাে ফুসছে একেবারে। ঘন ঘন ওঠানামা করছে বুক, নাকের পাটা ফুলে উঠেছে, চুল উড়ছে এলােমেলাে। তীব্র কণ্ঠে বিতস্তা বলেছিল, “বলা যায়নি একবার, তাই না? খুব মজা লাগল আমাদের সবার সঙ্গে এটা করতে? ছিঃ!’

উত্তীয় বলতে চেষ্টা করেছিল, “কী করেছি আমি?”

কিন্তু তার আগেই সশব্দে বন্ধ হয়ে গেছে দরজার কপাট। এত জোরে, যে একতলায় জ্যাঠামশাই জোরে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠেছেন। পায়ে পায়ে সরে এসেছিল উত্তীয়। চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়ে বসেছিল ছাদের এক কোণে। বেশ অনেক রাত অবধি ওখানেই একঠায় বসেছিল, যতক্ষন না বাইরের রাস্তায় গাড়িটা এসে থামার আওয়াজ পেয়েছে। 

এখন ওই একটি কাজই ওর টিকে আছে। একমাত্র দায়িত্ব। রাত সাড়ে এগারােটা, বারােটা, দেড়টা-দুটো, যত রাতই হােক, গিয়ে দরজা খােলা। তার সঙ্গে অবশ্য একটা সংযােজনও হয়েছে। আগে যেমন রােহিণী গাড়ি থেকে নেমেই কোনওদিকে না তাকিয়ে গটগটিয়ে বাড়ি ঢুকে যেত, এখন দাঁড়িয়ে পড়ে ওর সঙ্গে দুটো কথা বলে। কখনও পাশাপাশি সিঁড়ি দিয়ে তিনতলা অবধি উঠতে উঠতে কথা বলে। এমনি সাধারণ, মামুলি কথা, কিন্তু খুব আন্তরিকভাবে বলা।

এই সময় আরও একটা ঘটনা ঘটে। যখন রােহিণীর জন্যে গেটের তালা খুলতে যায় উত্তীয়, তখন বিতস্তার ঘরে একটা টেবল ল্যাম্প গােছের কোনও আলাের নিস্তেজ আভা দেখতে পায়। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ও বিতস্তার ঘরের বন্ধ দরজার নীচে, সরু একচিলতে ফাক দিয়ে চোখে পড়ে সেই অনুচ্চকিত, নিরুচ্চার আলাে।

আর ওই সময় থেকেই রােহিণী আর বিতস্তার মধ্যে শুরু হয়েছে ঠান্ডা লড়াই। দুজনে দুজনকে দেখলে গােপনে ওই বেড়ালের মতাে ফুঁসে ওঠা! আর কেউ না বুঝুক, উত্তীয় বুঝতে পারে। 

খাটের ওপর লম্বা হয়ে শুয়েছিল উত্তীয়। আজ আর ইউনিভার্সিটি যাওয়া হল না। অবশ্য যাওয়ার সামর্থ্যও ছিল না। কাল মাঝরাত থেকে যা ঘটে গেল, এমন চূড়ান্ত নাটকীয় ঘটনা ওর ২২ বছরের জীবনে কখনও ঘটেনি। তার ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারেনি ও। 

চিৎ হয়ে শুয়ে আছে উত্তীয়। একটা পা হাঁটু থেকে ভাঁজ করে ওপরে তােলা। অন্য পা-টা তার ওপর রেখে সমানে নাচিয়ে যাচ্ছে। আঙুলে আঙুল জড়াচ্ছে, ফের খুলছে। আসলে এখনও ওর মধ্যে যে তিরতিরে উত্তেজনা, সেটাই ধরা পড়ছে ওর হাত-পায়ের এই অস্থিরতায়। ওর চোখ আটকে আছে ওপরে, সাদা রঙের সিলিংয়ে। ওটা যেন সিনমাের পর্দা। কালকের ঘটনা পরপর ভেসে উঠছে তাতে।

কাল রাতে ঘুম আসছিল না, একটা বই মুখের সামনে ধরে বসেছিল। কিন্তু মন বসছিল না পড়ায়। আকাশ-পাতাল ভেবে যাচ্ছিল। তবে কান ছিল রাস্তার দিকে। রােহিণীর ফেরার সময় হয়ে গিয়েছিল। কাজেই দূর থেকে একটা গাড়ির শব্দ গলির ভেতরে, এই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে বুঝতে

পেরেই তরতরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গিয়েছিল। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েছিল। গেটের তালাটা সবে খুলেছে, গাড়িটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, দরজা খুলেছে, রােহিণী গাড়ির বাইরে একটা পা রেখেছে, এমন সময় ঘটল ব্যাপারটা। গাড়ির পেছনের সিটে বসা কেউ একজন রােহিণীর কঁধটা ধরে হঠাৎ টেনে নিল ভেতরের দিকে। এমনই আচমকা সেই টান, রােহিণী টাল সামলাতে না পেরে গড়িয়ে পড়ে গেল গাড়ির সিটে। আর ভেতরের লােকটা ঝুঁকে পড়ল ওর ওপর।

ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে গাড়ির খােলা দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল উত্তীয়। ভেতরে রােহিণী তখন ছটফট করছে। চেষ্টা করছে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার। কিন্তু তাতে আরও অগােছালাে হয়ে যাচ্ছে ওর সব প্রতিরােধ। বুকের আঁচল সরে গেছে। আবছা অন্ধকারেও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে রােহিণীর বুকের সােনালি আভা, অবারিত ওর স্তনসন্ধি। লােকটা মুখ নামাতে যাচ্ছে সেই উপত্যকায়, উত্তীয় গজরে উঠেছিল- এইহহ!

মুখ তুলেছিল লােকটা। অত্যন্ত সুদর্শন একজন পুরুষ। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল যেন ক্ষুধার্ত কোনও জানােয়ার। শিকারের নরম মাংসে মুখ ডােবানাে শ্বাপদ যেভাবে মুখ তুলে তাকায়, সেরকম জ্বলন্ত চোখে তাকিয়েছিল লােকটা। উত্তীয় পরােয়া করেনি। ভয় পায়নি। গেটের পাশে, পাঁচিলের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা এক খণ্ড বাঁশ, বিদ্যুৎগতিতে সেটাই হাতে তুলে নিয়েছিল। উঁচু করে তুলে ধরে হিসহিসে গলায় বলেছিল, “ছেড়ে দিন ওকে।” 

থমকে গিয়েছিল লােকটা। কী করবে বুঝতে না পেরে মুহূর্তের জন্যে বিভ্রান্ত হয়েছিল। হতে পারে উত্তীয়র হাতের ওই একটুকরাে বাঁশ, হতে পারে ওর শক্ত চোয়াল, ধকধকে চোখ, মরিয়া ভাব, লােকটা থতমত খেয়েছিল। সেটুকু সুযােগই যথেষ্ট ছিল রােহিণীর জন্যে। ও সােজা হয়ে উঠে বসেছিল। তার পর ঘুরে গিয়ে প্রচণ্ড জোরে একটা চড় কষিয়েছিল লােকটার গালে। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতায় চড়ের শব্দটা প্রতিধ্বনি তুলে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা পাড়ায়। ঠিক তখনই ওদের মেসবাড়ির দোতলার একটা ঘরে আলাে জ্বলে উঠেছিল। বিতস্তার ঘর। কিছুটা আলাে জানলা দিয়ে ছলকে পড়েছিল গেটের সামনেটায়। কিন্তু উত্তীয়র তখন ওপরে তাকিয়ে দেখার সময় ছিল না। রােহিণী ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে গাড়ির বাইরে। তখনও ওর বিশ্রস্ত বেশবাস। তখনও বিপর্যস্ত ও। হাত বাড়িয়ে দিয়েছে উত্তীয়র দিকে।

রােহিণীকে সাবধানে ধরেছিল উত্তীয়। ওর গােটা শরীরের ভার তখন উত্তীয়র হাতে। এবং ও বুঝতে পেরেছিল, রােহিণী বেসামাল। ঠিক করে দাঁড়াতে পারছে না নিজের পায়ে। ওকে একরকম জাপটে ধরে শরীরের ভার ছেড়ে দিয়েছে। ওই অবস্থাতেই ওকে টেনে এনে গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে উত্তীয় প্রথমে তালা লাগিয়েছিল। গাড়িটা তখনও দাঁড়িয়ে। ভেতরে ড্রাইভার খুব উত্তেজিত গলায় কিছু বলছে পেছনের লােকটাকে। লােকটা জড়ানাে গলায় জবাব দিচ্ছে। খােলা দরজা দিয়ে বাইরে ছিটকে আসছে সেই কথা কাটাকাটি।

রােহিণী তখন দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরেছে উত্তীয়র। উপায় ছিল না। নয়ত পড়ে যেত। ওই অবস্থাতেই কোনওমতে রােহিণীকে সিঁড়ি দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ও। দোতলায় পৌঁছতে খুলে গিয়েছিল বিতস্তার ঘরের দরজা। ভেতরের উজ্জ্বল আলাের শিলুয়েটে ত্রস্ত, উদ্বিগ্ন এক নারীমূর্তি। দৌড়ে

এসে রােহিণীকে এক হাতে জড়িয়ে নিয়েছিল বিতস্তা। তার পর ওরা দুজনে মিলে, খুব সাবধানে রােহিণীকে আরও এক তলা উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছিল ওর ঘরের সামনে। ‘চাবি কোথায়? ব্যাগে?’ চাপা গলায় বিতস্তা প্রশ্ন করেছিল। তখন আর রােহিণী কথা বলার অবস্থায় নেই, কোনওমতে মাথা ঝাকিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলেছিল। 

ঘটনাটা ঘটল তার পর। রােহিণী দু’হাতে জাপটে আছে উত্তীয়কে। বিতস্তা ঝুঁকে পড়ে দরজার লকটা খুলতেই উত্তীয়কে নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল রােহিণী। হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল উত্তীয়। রােহিণী কেমন একটা ডুবন্ত গলায় বলেছিল, ‘যেও না। এখন আমাকে ছেড়ে যেও না !’ 

বিতস্তা, দরজার বাইরে থমকে থাকা বিতস্তার সেই চাহনি এখনও ভুলতে পারছে না উত্তীয়। ভয়ঙ্কর অবিশ্বাস আর যন্ত্রণায় বিস্ফারিত সেই চোখ। রােহিণী নিশ্চিত বিতস্তার মুখের ওপর অত জোরে দরজা বন্ধ করতে চায়নি, কিন্তু ওর তখন নিজের হাত-পায়ের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না।। ধড়াস করে দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজটা খুব জোরেই হয়েছিল। উত্তীয়র কিছু করার ছিল না। ও শুধু মনে মনে চেয়েছিল, প্রাণপণে চেয়েছিল, যে বিতস্তা খেয়াল করুক— দরজার চাবিটা তখনও বাইরেই ঝুলছে। চাইলেই যে কেউ ঢুকতে পারে ঘরে। চাইলেই।

ভােরের আলাে ফুটতেই রােহিণীর ঘর থেকে উত্তীয় চুপিসাড়ে বেরিয়ে এসেছিল। মেসের অন্য কেউ ঘুম থেকে ওঠার আগেই। তার পর সেই যে নিজের এই চিলেকোঠার ঘরে এসে সেঁধিয়েছে, সারা সকাল বাইরে বেরােয়নি। আর কেউ না, শুধু বিতস্তার মুখােমুখি হওয়ার ভয়ে।

অথচ রােহিণী ঘরে ঢােকার পর স্রেফ একবার উত্তীয়র ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে বলেছিল, ‘চুপটি করে থাকো। চলে যেও না কোথাও। পাহারা দাও আমাকে’ বলে টলতে টলতে গিয়ে শুয়ে পড়েছিল নিজের বিছানায়। অনেকক্ষণ, বেশ খানিকটা সময় উত্তীয় ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকেছিল। অগােছালাে, চারদিকে জিনিস, আর জামাকাপড় ছড়ানাে একটা ঘর। এলােমেলাে একটা জীবন। খাটের ওপর কুঁকড়ে শুয়ে থাকা রােহিণীর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ খুব মায়া হয়েছিল ওর।

কিন্তু এখন, এই ফাকা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রােহিণীর সেই মুখটা ও আর দেখতে পাচ্ছে না। সাদা রঙের মধ্যে কেবলই ফুটে উঠছে একজোড়া চোখ। গভীর যন্ত্রণায় মাখামাখি, তবুও মায়াময় দুটো চোখ।

বাইরে রােদ এখন বেশ জোরালাে। বেলা হয়ে গেছে। এবার উঠতে হবে। স্নান-খাওয়া সারতে হবে। কিন্তু ঠিক নিশ্চিত হতে পারছে না উত্তীয়, যে কখন নীচে গেলে ওকে কারও মুখােমুখি হতে হবে না। যদিও আজ কাজের দিন। এতক্ষণে সবাই নিশ্চয়ই যে যার অফিস বেরিয়ে গেছে। উত্তীয় দরজার দিকে তাকাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আলাে আটকে একজোড়া ছায়াশরীর এসে দাঁড়াল ওর দরজায়। রােহিণী আর বিতস্তা। উত্তীয়র দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে রােহিণী। আর বিতস্তা যেন জোর করে তাকিয়ে আছে অন্যদিকে। উত্তীয়র মুখের দিকে আর কোনওদিন চোখ ফেরাবে না, এমন একটা ভাব। রাগে লাল হয়ে আছে মুখ।

খুব সহজভাবে হাসল রােহিণী। তার পর বিতস্তার হাত ধরে টেনে সামনে দাঁড় করিয়ে বলল, “আসতে চাইছিল না। জোর করে নিয়ে এলাম। কাল মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়ায় খুব অভিমান হয়েছে। আমার ওপর না, তােমার ওপর। ওকে বললাম, বাকি রাতটা তুমি কী যত্ন নিয়ে আমার গােটা ঘর গুছিয়ে দিয়ে এসেছ। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের ঘর চিনতেই পারছিলাম না! বােঝালাম ওকে, যে খুব ভালাে ছেলে। গৃহকর্মে নিপুণ। সংসার সুখের হবে। তাও শােনে না। তখন টানতে টানতে নিয়ে এলাম। নাও, এবার তােমার ম্যাও তুমিই সামলাও!’ 

বলেই একটা আলতাে ধাক্কায় বিতস্তাকে উত্তীয়র সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল রােহিণী। দরজাটা ভেজিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘নাও, আমিও দরজা বন্ধ করে চলে গেলাম। শােধবােধ।

ব্যাপারটা ভালাে হল, না খারাপ, উত্তীয় এখনও বুঝে উঠতে পারে না। মানে, যাকে ভালােবাসে, সে সেই বাড়িতেই থাকে, যেখানে ও এক সময় ফাইফরমাস খাটার লােক ছিল- এটা ওর নিজেরই এখনও ধাতস্থ হয়নি। এদিকে বিতস্তা আবার ওর থেকে তিন বছরের বড়াে। আসলে তিন নয়, মােটে এক বছর। স্কুলের খাতায় উত্তীয়র দু’বছর বয়স কমানাে ছিল। যে পাড়াতুতাে কাকা ওকে স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন, এটা তাঁর কীর্তি। বয়েস কমিয়ে রাখা হলে ভবিষ্যতে নাকি লাভ, বেশিদিন চাকরি করা যায়। ওদের গ্রামে গঞ্জে এরকম হয়। বিতস্তা যদিও কথাটা বিশ্বাস করেনি। ফলে উত্তীয়র কথা নিজের বাড়িতে কীভাবে বলবে, এখনও ভেবে উঠতে পারছে না। কাজেই এক চূড়ান্ত নৈরাজ্যের মধ্যে কাটছে উত্তীয়র জীবন।

কিন্তু তার থেকেও বড়াে সমস্যা আছে। দুই ঝগড়ুটে বেড়ালের ভাব হয়ে গেছে। একেবারে গলায় গলায় ভাব। এ ওকে চক্ষে হারায়। এখন এমন একসুরে কথা বলে দুজনে, বিতস্তা আর রােহিণী, যে বােঝাই যায় না আসলে দুটো আলাদা লােক। বাণিজ্যিক পরিভাষায় এমন মিলনকেই বােধহয় ‘মার্জার’ বলে। এমনভাবে একে অন্যের সঙ্গে মিলে যাওয়া, যাতে বােঝাই যায় না দুটো আলাদা অস্তিত্ব কোনও কালে ছিল। মার্জার অবশ্য উত্তীয় আর বিতস্তারও হয়েছে। এখন কোনও কাজ, কোনও ভাবনা আর ওদের আলাদা নয়। ভবিষ্যতের কথাও এখন একসঙ্গেই ভাবে দুজনে। কিন্তু বিতস্তা-রােহিণী প্রাইভেট লিমিটেডের কাছে সেটা কিছুই না। এখন এমনকী ওরা দুজন একসঙ্গে উত্তীয়র পেছনে লাগে! উত্তীয় নয়, ওর নতুন নামকরণ হয়েছে ‘মদনকুমার।’ মেয়েদের মেসবাড়ির কাজের লােকের জন্যে ‘মদন’ নামটাই নাকি বেশি মানানসই। আড়ালে সেই নামেই ওকে ডাকে দুজনে। নানা অছিলায় ডাকে, আর নিজেদের মধ্যে গা ঠেলাঠেলি করে হাসে!

অলঙ্করণ: শুভেন্দু সরকার। 

 

Trending


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes