jamdani

মমতা বিছানাে নকশিকাঁথা 

সীতার গুণের কথা কি কহিব আর । 

কন্থায় আঁকিল কন্যা চান সুরুয পাহাড়… 

আর যে আঁকিল কন্যা হাঁসা আর হাঁসি চাইরাে পাড়ে আঁকে কন্যা পুষ্প রাশি রাশি। 

ময়মনসিংহ গীতিকার কবি চন্দ্রাবতী তাঁর রামায়ণ কাব্যে এমনভাবেই তুলে ধরেছেন লােকায়ত শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন নকশিকাঁথার কথা। একসময় যখন সহজিয়া জীবনের বেগ ছিল মন্থর, মধ্য দুপুরে আলসেমি মাখানাে রােদ্দুর ঝিরিঝিরি কাঁপত পুরবাসীর উঠোনে, তখন মানুষের জীবনও ছিল অনেকটা সরলরেখার মতাে। আজকের নাভিশ্বাস ওঠানাে জীবনযুদ্ধের ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছায়া গ্রাস করেনি সেদিনের নাগরিক জীবনকে। তখনও অবকাশ ছিল, অবসর ছিল, গাছের নিভৃত ছায়ায় মানুষ দু’দণ্ড জিরােতে পারত। অঙ্গনে তুলসী মঞ্চটির মতাে, কুলুঙ্গির সাঁঝবাতিটির মতাে কোমল ছিল জীবনস্রোত। রাজশক্তির উত্থান-পতন কিংবা অস্থিরতা যতই থাক, লােকজীবনের মূল সুরটিতে খুব বেশি হেরফের হতাে না। তখনও গেরস্থালীর গন্ধ মাখা ঈষৎ ভিজে আঁচলে মুখ মুছলে সব শ্রান্তি দূর হতাে। সে আঁচল যত মলিনই হােক, যত ছেঁড়াই হােক, গভীর নিরাপত্তার নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠতে বাধা ছিল না কোনও। মায়ের শাড়িটি যত পুরনাে হতাে ততই যেন আকুল মমতার অনুভব বিছিয়ে থাকত মায়ের বসনখানিতে। হেঁশেলের হলুদের দাগের পাশেই আঁচলে আঁকা থাকত করুণার কোমল গান্ধার। এইরকম আশ্চর্য মেদুরতায় ঘেরা সময়কালেই জন্ম নিয়েছিল বাংলার ঘরােয়া  সুচিশিল্পের অপরূপ কাব্যগাথা নকশি কাঁথা।

বাংলাদেশের (অবিভক্ত বাংলা) মায়েরা তখন গভীর অসীম ধৈর্য আর মমতা দিয়ে ঘিরে রাখতেন নিজস্ব গৃহকোণটি। সামান্য অর্থ দিয়েই জীবন নির্বাহ করার, সংসারের ছবিটিকে পরিপাটি গুছিয়ে তােলার সুনিপুণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন সেদিনের কল্যাণীরা। তাঁরা যেমন জানতেন ফেলা- ছড়ার রান্না, তেমনই জানতেন পুরনাে কাপড় জুড়ে কঁাথা সেলাই করার অপূর্ব কৌশল। একই সুতির কাপড় দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর যখন ভীষণ নরম হয়ে উঠত তখন সেই কাপড় জুড়ে তার ওপর ফুল লতা-পাতার নকশা ফুটিয়ে তুলতেন সুচিকর্মে। আশপাশের দৃশ্যমান জগৎ, আটপৌরে জীবনের জলছবি, ইস্ট দেবতা, ফুল, পাখি, মাছ সব কিছুই আঁকা হতাে কাঁথার ক্যানভাসে। বাড়ির প্রিয়জনদের জন্য বােনা সেই কথায় ধরা থাকত অন্তঃপুরবাসিনীদের শিল্পবােধ। সামান্য কিছু দিয়েই অসামান্য কিছু তৈরি করার আশ্চর্য প্রতিভা ছিল তাঁদের। নতুন সুতাে কিনে, তাই দিয়ে সেলাই করার কথা ভাবতেও পারতেন না তাঁরা। সেখানেও ছিল রিসাইক্লিং মেথড। পুরনাে কাপড়ের পাড় থেকে সুতাে বের করে, সেগুলি দিয়ে কঁাথার ওপর তাঁরা নকশা ফোটাতেন। সংসারের সমস্ত কাজ সামলে এক একটি নকশিকাঁথা বুনতে অনেক সময়ই দশ বারাে বছর লেগে যেত। কথাশিল্পীরা জীবন কর্ম করতে করতেই তাঁদের নকশার বিষয় বাছাই করতেন। বৈবাহিক সূত্রের চিন্তায় তারা ব্যবহার করতেন শাঁখা, সিঁদুর, কান বা নাকের রিং ও আয়না।

গার্হস্থ্য সমৃদ্ধির চিন্তা থেকে তাঁদের নকশায় ফুটে উঠত কলস, লাঙ্গল, ধানের ছড়া, নৌকো, গবাদিপশু, মাছ এবং উদ্ভিজ্জ প্রতীক। গ্রামীণ বাঙালি নারী তার ধর্মজ্ঞান ও তার থেকে জাত ধারণার সাহায্যে জন্ম, বিবাহ এবং পূজার আয়ােজন করত। এসব ধর্মীয় ধারণা তাঁদের হাতে প্রতীক মােটিফে রূপান্তরিত হয়ে আলপনায় রূপান্তরিত হতাে। মেঝেতে আঁকা নকশা আরও খানিকটা পালটে গিয়ে নকশিকাঁথার পৌত্তলিক ধারার চিত্রমালায় উঠে আসত। আসলে নকশিকাঁথা নারী হৃদয়ের এক গভীর বিশ্বাসের প্রকাশ যা বাঙালি গােষ্ঠী ও ভাবনাকে আমাদের সামনে তুলে ধরে।

সেকালের মহিলারা কোনও ড্রইং বা ট্রেসিং ছাড়াই সেলাই করতেন ছবির মতাে নকশিকাঁথা। নরম কাপড়ের স্তরগুলিকে একত্রে ধরে রাখতে তাঁরা ঘন সংবদ্ধ ‘রানিং স্টিচ’ এবং পরে ‘ব্যাক স্টিচ’ ব্যবহার করতেন। এর ফলে কাপড়ের ওপর এ ধরনের ঢেউ খেলানাে ভাব ফুটে উঠত। অধুনা বাংলাদেশের জাদুঘরে এরকম বহু অসাধারণ কাজ আজও রক্ষিত আছে। বাংলাদেশের নকশিকাঁথা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। এর মাধ্যমে জনমানুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি যেমন প্রকাশিত হয়, তেমনই সচেতন মানুষের কাছে এর মূল্য অপরিসীম।

বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলের মেয়েরা নকশিকাঁথা তৈরি করলেও যশাের, ফরিদপুর, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুষ্ঠিয়া, পাবনা, ঢাকা, জামালপুর ও বরিশাল অঞ্চলের কথাই বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। সে দেশের নকশিকাঁথা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। সে দেশের নকশিকাঁথা সেলাই এর ক্ষেত্রে দুটি প্রধান ধারার প্রচলন প্রত্যক্ষ করা যায়। একটি রাজশাহী অঞ্চলের এবং অপরটি যশাের অঞ্চলের। রাজশাহী অঞ্চলে চার ধরনের কথা সেলাই করা হতাে। কার্পেটকথা, লহরিকথা, সুজনিকাথা এবং লীকথা। যশাের অঞ্চলের কথা সাধারণত তিন ধরনের, চিত্রিতকথা, মােটিফ কাঁথা এবং পাইড়কথা। প্রথম দিকে কঁাথা সম্ভবত কারুকার্যহীন সাধারণই ছিল। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে নকশিকাঁথার নকশায় এল জীবনবৃক্ষ, হাঁস, চাঁদ, সূর্য, তারা, মাছ, হাতি, আয়না, চিরুনী, স্বস্তিকা, পানপাতা, চড়কি এবং গৃহস্থালির নানা বস্তু। এছাড়াও খেলাধূলা, উৎসব, উপচার, দুলদুল ঘােড়া, লক্ষ্মীর ঝাপি, কুলা, ফুল, ফল, ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, গােলাকার, সমান্তরাল চিহ্ন ফুটে উঠত নানা বাহারি রঙে। ফুটে উঠত মাতৃস্নেহের স্পর্শে। পুরনাে কাপড়ের পাড় থেকে যেমন সুতাে সংগ্রহ করা হতাে ঠিক তেমনই সামান্য কাঠকয়লা, গাছের রস থেকে সংগৃহীত রং দিয়ে আঁকা হতাে কথার চারদিকের বর্ডার। জীবজন্তু বা বৃক্ষলতার পরিত্যাজ্য নগণ্য জিনিস হতাে এই আর্টের প্রধান উপাদান।

বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় বিয়ের সময় কনের গৃহস্থালীর অন্যান্য গুণের সঙ্গে কাঁথা সেলাই একটি অন্যতম গুণ বলে বিবেচিত হতাে। গায়ে দিয়ে শােওয়ার কাঁথা ছাড়াও কাঁথাকাজে তৈরি হতাে আসনকাথা, আরশিলতা, নকশি থলে, জায়নামাজ, বর্তন ঢাকনি প্রভৃতি।

দ্বাদশ শতাব্দী থেকে পরবর্তী সময়ে কাঁথাকাজে লক্ষ করা যায় ইসলাম সংস্কৃতির প্রভাব। বাংলাদেশের সােনার গাঁ জাদুঘরে রক্ষিত নকশিকাঁথায় দেখা যায় মসজিদ এবং সমাধিচিত্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আরবীয় এবং জ্যামিতিক প্যাটার্নের প্রয়ােগ। তুর্কমান বা ইরানের কার্পেট থেকে নেওয়া ডিজাইন

এসময় ঢুকে যায় নকশিকাঁথার মােটিফে। এ ধরনের কাথার ডিজাইন চোখে পড়ে বিশেষত বােচকা কাঁথায়। অস্টাদশ, উনবিংশ শতাব্দীর কথায় প্রভাব পড়ে ইওরােপের। ব্রিটিশ সৈন্য নিজস্ব পােশাক পরে নৌবিহারে রত ইংরেজ পুরুষ-মহিলা কিংবা সংগীত উৎসব উপভােগের চিত্র এ যুগের কাঁথায় চোখে পড়ে। এ জাতীয় কাঁথায় ট্রেন, বিমান, স্টিমার, রাইফেল হাতে অবয়বের পাশাপাশি ইংরেজি অক্ষর, এমনকী শিল্পীর নাম পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায়।

দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে যেমন বদলেছে নকশিকাঁথার নকশা, তেমনই বদলে গেছে এর ব্যবহার। আগেকার দিনে মূলত গায়ে দেওয়ার কাঁথাই তৈরি করতেন মেয়েরা। এছাড়াও কিছু ক্ষেত্রে কাঁথাকাজ ব্যবহার করা হতাে বটুয়া বা পার্স, বটুয়ার বড়াে সংস্করণ গিলাফ, দস্তুরখান বা আসন, খাবারের ট্রের ঢাকনি প্রভৃতি তৈরিতে। কিন্তু পােশাকে কাঁথাথাকাজের ব্যবহার এসেছে আরও অনেক পরে। বর্তমানে যেমন আমরা দেখি শাড়ি, কুর্তি, টপ, দোপাট্টা প্রভৃতিতে অনুপম কাঁথাকাজ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহাররীতি যতই বদলাক নকশিকাঁথাকে ঘিরে বাঙালির আবেগ কিংবা ঐতিহ্য আজও প্রবহমান।

আজও বাঙালি রসিকজনের মনে গাঁথা আছে পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘নকশিকাঁথার মাঠ’। সেই অমর কাব্যসাহিত্যে ফুটে উঠেছিল এক গ্রামীণ কন্যার প্রেমকাহিনী। নায়িকা সাজু তার বিরহের দিনগুলি ভরিয়ে তুলেছিল সুচে গাঁথা নকশিকাঁথায়।

খুনের দায়ে নিরুদ্দিষ্ট স্বামীর জন্য তার প্রতীক্ষার পল-অনুপল যেন আঁকা হয়েছিল চোখের জলে। মৃত্যুর পর তার কবরে যেন বিছিয়ে দেওয়া হয়। তারই বােনা নকশিকাঁথা, এই ছিল তার শেষ ইচ্ছে—

‘একটু আমারে ধর দেখি মাগাে 

সুচসুতা দাও হাতে 

শেষ ছবিখানা এঁকে দেখি 

যদি কোনাে সুখ হয় তাতে 

এই কাঁথাখানি বিছাইয়া দিও 

আমার কবর পরে 

ভােরের শিশির কাঁদিয়া কাঁদিয়া 

এরি বুকে যাবে ঝরে।’ 

 

Trending


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes