jamdani

মনের বাড়ি

রমা শেঠ দে

এষণা মোবাইলের মেসেজ ইনবক্স ওপেন করতেই দেখল অচেনা নম্বর থেকে আসা একটা মেসেজ। মেসেজটা পড়ে কয়েক মিনিটের জন্য হতবুদ্ধি হয়ে যায় এষণা। এ কে রে বাবা! মেসেজটা এইরকম, ‘অপেক্ষায় আছি। অপেক্ষা করব। ইচ্ছে হলে এসো’। কিছুক্ষণ আকাশ পাতাল ভাবার পর এষণা ওই নম্বরে ফোন করল। রিং হয়ে হয়ে থেমে গেল। এষণা মনে করেছিল ওরই কোনও বন্ধু হয়তো নতুন সিম থেকে মজা করছে। এষণা ‘ধ্যাত’! বলে মোবাইলটা রেখে বিছানা থেকে উঠে পড়ল।

এখন সাড়ে তিনটে বাজে। একটু পরে বুবলু ফিরবে। তারপর সুধাদির আসার সময় হয়ে যাবে। এষণা দু-হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে দ্বিপ্রাহরিক আলস্যকে সরাতে চাইল।

এষণার বেডরুমের জানলার সামনে একটা ইউক্যালিপটাসের ঝিরঝিরে পাতারা পথের ওপর স্নিগ্ধ আলোছায়ায় নক্সা বিছিয়ে রাখে। এষণার চোখ এখন ইউক্যালিপটাস ছাড়িয়ে অনেক দূরে। আকাশের রঙ এখন নীল থেকে ঘন নীল হওয়ার প্রস্তুতিপর্বে। এষণার মনে হয় সোনালি রোদ মাখা বাতাস, বাড়িঘর, রাস্তা, ইলেকট্রিকের তার সর্বত্র এই বার্তা স্পষ্ট যে, শীত আসছে। এষণার প্রতিবারই শীত আসার আগে এইরকম পড়ন্ত দুপুরে খুব মনে হয় বেশ একটা আয়োজন চুপিসারে কিন্তু নির্ভুল পদক্ষেপ চলছে শীত আসবে বলে। সে আয়োজন সোচ্চার না হলেও স্পষ্ট। এষণা গুনগুন করে ওঠে, ‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন- আমলকীর ওই ডালে ডালে’-

এই কথা একবার প্রদীপকে বলেছিল অনেক দিন আগে এই রকমই সময়ে জেটিতে বসে। প্রদীপ শুনে বয়ে যাওয়া গঙ্গার জল থেকে চোখ সরিয়ে এষণার দিকে কয়েক সেকেন্ড অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থেকে হা-হা করে হেসেছিল। যেন এরকম আজব কথা কোনওদিন শোনেই নি। হাসি থামিয়ে এষণার কানের কাছে মুখ এনে বলেছিল, ‘তোমার খুব তাড়াতাড়ি বিয়ের প্রয়োজন, বুঝেছ? আমি সেই চেষ্টাটাই করছি’। প্রদীপ তখন এম বি এ-র ফাইনাল ইয়ার। এষণা ইকনমিক্স অনার্সের সেকেন্ড ইয়ার। সে কথায় এষণার গালে হেমন্তের বিকেলে দেখা দিয়েছিল কৃষ্ণচূড়ার ছোঁয়া। ভীষণ ভালোলাগাতে ওর গলা বুজে এসেছিল আর বুকের ভেতর সুখের ঝরনা দু-কূল ছাপিয়ে গিয়েছিল।

এখন সেই কথা মনে পড়তে এষণার সমস্ত মন ধূসর হয়ে গেল। ও ভাবে, কী বোকাই না ছিলাম! ওই কথা শুনে পাগল হয়ে গেলাম! কেউ হয়? কী রকম ব্লান্ট হলে তবে না ওই রিপার্কেশন? কলিং বেল বাজছে। এষণার ভাবনায় ছেদ পড়ল।

দরজা খুলতেই আট বছরের বুবলু হা-ক্লান্ত হয়ে ঘরে পা দিয়েই বলে ওঠে, ‘মা জিয়োগ্রাফির মিস বলেছে পরশুর মধ্যে প্রজেক্ট সাবমিট করতে হবে’।

‘হবে বাবা হবে। এখন তুমি একটু ফ্রেশ হও। তারপর ওসব কথা হবে’।

এষণা বুবলুর জামা-প্যান্ট আনার জন্য যেতে যেতে আপন মনেই গজগজ করে।

‘মা আজ কী রান্না করেছ?’

‘ফুলকপির ডালনা আর তেলকই’।

‘দূর বাবা। আবার মাছ!’ ব্যাজার হয়ে যায় বুবলুর মুখ।

‘রাত্রে চিলি চিকেন হবে’।

শুনে বুবলু লাফিয়ে ওঠে। দু-হাত দিয়ে এষণার কোমর জড়িয়ে বলে, ‘মা, তুমি কী ভালো!’

এষণা বুবলুর গাল দুটো আলতো টিপে দিয়ে বলে, ‘ঠিক আছে। এখন নাও তাড়াতাড়ি। খেয়ে উঠে রেস্ট করতে হবে। সন্ধেবেলায় পড়তে বসতে হবে। মনে আছে?’

এই সময় এষণার কানে এল মেসেজ টোনের শব্দ। বুবলুকে খেতে দিয়ে এষণা তাড়াতাড়ি মেসেজটা ওপেন করল। নম্বর সেই একই। এবারের মেসেজটা- একটা ইকোয়েশন দিলাম। সলভ করার চেষ্টা করো। ওয়ান প্লাস ওয়ান, ইকোয়াল ট্যু টু, অর ওয়ান মাইনাস ওয়ান ইকোয়াল ট্যু জিরো। মোবাইল হাতে নিয়ে এষণা কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল। মনের মধ্যে তোলপাড় করে হাতড়াচ্ছে কে হতে পারে? এষণা আবার রিং করল। একই ব্যাপার, রিসিভড হল না।

সেদিন আরও বারকয়েক এষণার মোবাইলে মেসেজ টোন বেজে উঠেছে। আর যতবার মেসেজ টোনের আওয়াজ এষণার কানে গেছে ও ততবারই তীব্র কৌতূহলে মোবাইলটা সজাগ অথচ ক্ষিপ্রভাবে হাতে তুলে নিয়েছে। প্রদীপ ল্যাপটপে চোখ রেখেই বলেছে, ‘কী অ্যাতো মেসেজ আসছে তোমার?’ নেহাতই সাধারণভাবে সাধারণ কথা, কিন্তু এষণা এতেই খুব সতর্ক হয়ে গেল। কেন তা জানে না।

সুধাদি রান্না সেরে চলে গেছে। বুবলু নিজের পড়ায় ব্যস্ত প্রাইভেট টিউটরের কাছে। প্রদীপ ব্যস্ত ল্যাপটপে। অফিস থেকে ফিরেও প্রদীপ যেন রোজই অফিসটাকে সঙ্গে করে নিয়ে বাড়ি ফেরে। এই সময়টা এষণা রোজই সিরিয়ালে মগ্ন থাকে। আজ দিনটা হঠাৎ করে পালটে দিয়েছে ওই অজানা নম্বরের মেসেজগুলো। আবার মেসেজ টোন। ওপেন হতেই বিস্ময় ঝাঁপিয়ে পড়ল সবেগে। ‘আই অ্যাম ফরটি টু ইয়ারস ওল্ড। ডিভোর্সি। ব্যাঙ্ক এমপ্লয়ি। আই লাইক ইউ টু মাচ। ডু ইউ লাইক মি? ইফ ইয়েস, সেন্ড এস এম এস’।

তাহলে…? অংশুমান দত্ত?? কী আশ্চর্য!!

কয়েকমাস আগে সোহিনীর বিয়ের রিসেপশন পার্টিতে পরিচয় হয়েছিল ভদ্রলোকের সঙ্গে। কথায় কথায় জানিয়েছিলেন উনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে আছেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে অংশুমানের মুগ্ধ দৃষ্টি এষণাকে ছুঁয়ে গেছে অনেকবার। এসব এষণার গা-সওয়া ব্যাপার। সেই ক্লাস এইট-নাইনে শুরু হয়ে এই বত্রিশেও হেরফের হয়নি। এটা কারই বা মন্দ লাগে? বিয়েবাড়ি থেকে ফিরে দিন কয়েক অংশুমানের মুগ্ধ দৃষ্টি যে এষণার মনের আনাচে-কানাচে একেবারেই উঁকি দেয়নি তা নয়, তবে স্থায়ী হতে পারেনি। দৈনন্দিনতার স্তূপে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল কয়েকটা মুহুর্ত। তবে এষণা একটু বেদনার্ত হয়েছিল প্রদীপের কথা ভেবে। এই যে পেস্তা রঙের সিল্কের শাড়ি আর সঙ্গে পার্ল সেটে সেজে এষণা আয়নার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ না হয়ে পারে না, কিন্তু প্রদীপ দেখতে পেয়েছে বলে মনে হয় না। কেন এমন হয়? গাড়িতে যেতে যেতে এষণা প্রদীপকে বলেছিল, ‘কীরকম লাগছে বললে না তো?’ প্রদীপ স্টিয়ারিঙে হাত রেখে রাস্তার সামনে প্রসারিত মনোযোগী দৃষ্টিকে এক মুহুর্ত এষণার ওপর নিক্ষেপ করে বলেছিল, ‘ভালোই তো। এটা আবার বলার কী আছে?’ এষণা জানত এ রকমই একটা উত্তর পাবে। জেনেও মনের গভীরে এ আশা আলতো ঢেউ তোলে যে এইরকম বিশেষ সাজে প্রদীপের আবেগ ভরা কন্ঠস্বরে শুনতে পাবে, ‘বি-উ-টি-ফু-ল!’ অভিমানে গড়ে ওঠা দীর্ঘশ্বাস ধীরে ধীরে গাড়ির জানলা দিয়ে আসা ফুরফুরে হাওয়ায় মিশে যায়।

এখন প্রতিদিন সকালে এষণা দেখতে পায় একটা করে নতুন সূর্যোদয়। যে সূর্যোদয় জীবন উৎসবকে আনন্দ, তৃপ্তি, রুচি ভাগ করতে পারার সুখের নৈবেদ্যর উপচারে সাজায় নিত্য। বেলা এগারোটার সময় এষণার মোবাইল বেজে উঠল। ফোনে ভেসে এল অংশুর কন্ঠস্বর, ‘চলে এসো আমার বাড়ি। আজ অফিস যাব না’।

‘ক্যানো’?

‘ধরে নাও তোমার জন্য’।

ও প্রান্ত থেকে জলতরঙ্গের মতো হাসির শব্দ অংশুকে স্নাত করে।

‘চলে এসো তাড়াতাড়ি। এক সাথে লাঞ্চ করব আর প্রচুর গল্প!’

এষণা দ্রুত তৈরি হয়ে নিল।

আজ প্রথমবার অংশুমানের ফ্ল্যাটে যাচ্ছে এষণা। কিছু নিয়ে যাওয়া উচিৎ মনে করে প্রথমে মিষ্টির কথা ভেবেছিল। তারপর মিষ্টি বাতিল হল।

ব্যাপারটা কেমন যেন ফর্মালিটি প্যাকেট পরানো। তাহলে? ফুল? হ্যাঁ, ঠিক আছে।

অংশুমান দরজা খুলে দেখতে পেল কচি সবুজ তাঁতের শাড়িতে এষণা দাঁড়িয়ে। হাতে ধরা রয়েছে এক গোছা তাজা হলুদ গোলাপ।

অংশুমান হাত প্রসারিত করে আহ্বানের ভঙ্গি করে দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়।

এষণা ফ্ল্যাটে পা দিয়ে গোলাপের তোড়াটা অংশুর দিকে বাড়িয়ে দিতেই অংশু বলল, ‘দাঁড়াও একটু’। বলে ঘরের সেন্টার টেবিলের ওপর ফুলদানিটা রেখে বলল, ‘তুমি সাজিয়ে দাও’।

এষণা ভাবতেই পারেনি গৃহিণীহীন গৃহ এরকম সুসজ্জিত হতে পারে। ডাইনিঙের একপাশে ক্যাবিনেট। ক্যাবিনেটের এক ধারে মিউজিক সিস্টেম। এষণা মন দিয়ে সিডিগুলো দেখছিল। এষণা একটা সিডি হাতে তুলে উচ্ছ্বসিত গলায় বলে ওঠে, ‘অংশু, এটা তোমার কালেকশনে রয়েছে?’ অংশু মিটমিট করে হেসে বলল, ‘তোমার কি মনে হয় ওটা ভুল করে এসেছে?’

এষণা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে, ‘না তা নয়। আসলে আমি ভাবতে পারিনি’।

অংশু কিচেনের দিকে পা বাড়িয়ে বলে, ‘তুমি দ্যাখো। আমি ততক্ষণ দু-কাপ কফি করে আনি’।

কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে এষণা দেওয়ালের অনেকটা জায়গা জুড়ে যে মস্ত বড় অয়েল পেন্টিংটা রয়েছে সেদিকে তাকিয়ে আপন মনেই বলে ফেলল, ‘এই সংসার ছেড়ে কেউ যায়?’

অংশু মনে হল সামান্য চমকে উঠেছে। ধীরে ধীরে ঠোঁটের দু-কোণে হাসির মতো একটা ভাব ফুটে ওঠে, অথচ সেটা হাসি নয়। কয়েক সেকেন্ড সারা ফ্ল্যাটটায় ঝুপ করে নীরবতা নেমে এল অস্বস্তিকর ভাবে। অংশুমান উঠে দাঁড়িয়ে বড় করে শ্বাস নেয়। তারপর ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বল, ‘প্রায়ই ভাবি তোমাকে একদিন সব বলব, কিন্তু পারি না। আজ শোনো’। অংশু জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যুক্তির কোনও দোষ ছিল না’। তারপর ধীরে ধীরে বল, ‘যখন গভীর রাতে বাইরে উথাল-পাতাল ঝড় হয়, মুশলধারায় বৃষ্টি নেমে সবকিছু ভাসিয়ে দিতে চায়, তখন যুক্তিও চাইত, আমি ওই ঝড়ের মতো ওকে লণ্ডভণ্ড করে ক্লান্ত করে তৃপ্তির অতলে নিয়ে যাই’। বলতে বলতে অংশুর মাথাটা নীচু হয়ে যায়। অংশু প্রায় অস্ফুটে বলে, ‘আমি পারিনি’। অংশু জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে এষণার দিকে ফিরে বলল, ‘বলো তো ওকে কি দোষ দেওয়া যায়?’

শেষের দিকের কথাটা এষণার কানে কান্নার মতো শোনায়।

এষণা অংশুর মুখোমুখি দাঁড়াল।

‘তোমাকে অনেকদিন ধরে বলতে চাইছি। পারছিলাম না। ভালো হল আজ বলতে পারলাম’। অংশু মুখ নীচু করেই বলে যায় কথাগুলো।

ওর দাঁড়িয়ে থাকা, কথা বলা, সব কিছুতেই যেন একটা অপরাধবোধের মেঘলা ছায়া পড়ে আছে। অংশুর সুঠাম দেহের বলিষ্ঠতা লজ্জা পেয়ে কোথাও মুখ লুকিয়েছে মনে হয়।

এষণা অংশুর দুটো হাত ধরে বলল, ‘আমি যেমন আছি তেমন থাকব’।

অংশু চুপ। হয়তো কথাটা বিশ্বাস করতে চাইছে। ‘আমি ঝড়ের রাতে তোমার কাছে ঝড় চাইব না, তুফান চাইব না, কবিতা চাইব’।

অংশু ওর দিকে তাকাতেই এষণা বলে, ‘দেবে তো?’

অংশু দু-হাত দিয়ে এষণাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘নিশ্চয়ই’। এষণা অংশুর বুকে কান পেতে শুনতে পায় ইমন কল্যাণ।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes