jamdani

বৈজনাথ পালামপুর

আশিসকুমার ঘোষ

( প্রথম পর্ব )

আবার হিমাচল তবে এবার পশ্চিমদিকে। ট্রেনের সময় বাঁচাতে এবার বিমানে। কিন্তু কলকাতা থেকে সরাসরি কোনও উড়ান নেই তাই দিল্লী হয়ে কাংড়া। দিল্লী থেকে ছোট প্লেনে মাত্র ঘন্টা খানেকের উড়ান কাংড়া। গাড়ির ব্যবস্থা করাই ছিল, তাই বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরুর কোনও অসুবিধা নেই। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল অল্প চেনা বারোট। যাত্রা পথেই পড়বে পালামপুর, বৈজনাথ যোগিন্দর নগর। এয়ারপোর্ট চত্বর থেকে বেড়িয়ে কাংড়ার বিখ্যাত চামুন্ডা মন্দির দর্শন সেরে আমরা এগিয়ে চলেছি। কাংড়া থেকে পালামপুর ২৫কিমি রাস্ত। পথে পড়ল গোপালপুর, এখানে আছে বিখ্যাত চিড়িয়াখানা। তবে এখানে বন্যপ্রনী থাকে উন্মুক্ত। আর দর্শক থাকে জালের অন্দরে। সময়াভাবে আমাদের গোপালপুর যাওয়া হয়নি। রাস্তায় মেলার কারণে বিশাল যানজট কাটিয়ে পালামপুর।

এ যাত্রায় পালামপুর শহরের মধ্যে আমরা প্রবেশ করিনি-এক ঝলক চা বাগানের দ্শ্য দেখেই সন্তুষ্ট হতে হল। পালামপুর আমরা খুটিয়ে দেখব বারোট থেকে ফেরার পথে, পালামপুর থেকে মাত্র ২৫ ২৫ কিমি দূরে বৈজনাথ, এখানে আমরা থামব বিখ্যাত শিবমন্দির দর্শনের জন্য। কাংড়া উপত্যকার শেষ প্রান্তে ১৩৬০ মিটার উচ্চতায় ছোট্ট শহর   বৈজনাথ। বরফে মোড়া ধৌলাধার পর্বতশ্রেনী সারা শহর থেকেই দেখা যায়। আর সামনে রয়েছে আশাপুরি রেঞ্জ। অনেকটা নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে স্রোতস্বিনী বিনয়া নদী। বৈজনাথ হল কাংড়া জেলার প্রধান হিন্দুতীর্থ ক্ষেত্র। ৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্টিত এই মন্দির ভারতের অন্যতম প্রাচীন শিবমন্দির। স্থানীয় মানুষেরা মনে করে থাকেন এটি তৈরী করেছিলেন পঞ্চপান্ডবেরা। আবার আর এক জনশ্রুতি বলে এই মন্দির রাবণ অমরত্বের বর প্রার্থনা করে দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে।

 

গাড়ি থেকে নেমে আমরা এই শিবমন্দিরের দিকে এগিয়ে চলি। পাথরের রাস্তা ধরে সামান্য হেঁটে মন্দিরের সামনে পৌঁছাতে  হবে। তখন সূর্য পশ্চিম দিগন্তে অনেকটাই হেলে পড়েছে। সূর্যের বিদায়ী রশ্মি পড়েছে ধূলাধার পর্বতমালার রূপোলি শ্ঙ্গে। যদিও ধৌলাধার মেঘের ছায়ায় অনেকটা অনেকটা ম্লান। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে মন্দিরের উঁচু শিখর। মন্দিরের সামনে সবুজ লন আর ফুলের বাগান । অনেকেই সেখানে মন্দির ও প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগে মগ্ন। অনেকটা নীচে বিনয়া নদী পাথরের বোল্ডারের মধ্যে দিয়ে সাদা ফেনা ছড়িয়ে বয়ে যাচ্ছে। মন্দির চত্বর থেকে সরু সিড়িঁ রয়েছে ঐ নদীর তীরে পৌঁছনর জন্য। বৈজনাথ হলেন শিব বৈদ্যনাথ অর্থাৎ বৈদ্যদের অধীশ্বর। বৈদ্যনাথ মন্দির থেকে অতীতের কিরণগামার নামান্তর হয়ে বৈজনাথ হয়েছে।

মন্দিরের প্রবেশপথের কুলুঙ্গিতে গঙ্গা, যমুনা, লক্ষ্মী, বিষ্ণু, চামুণ্ডা, কার্তিক ছাড়াও রয়েছে নানন দেবীমূর্তি। নন্দীর  মূর্তি রয়েছে মন্দিরের সামনেই। মন্দিরের কোনাকৃতি চূড়া গর্ভমন্দির ও মণ্ডপ দেখার মত। চারটি বিশাল স্তম্ভের ওপর পিরামিডের মতো ছাওয়া ছাদ সৌন্দর্য যেন আরও বাড়িয়ে তুলেছে। গর্ভগ্হে আছে দ্বাদশ জ্যোর্তিলিঙ্গের অন্যতম লিঙ্গ বৈজনাথের মূর্তি। শিবলিঙ্গের ওপর সাপের উদ্যত ফনা পাথরের দেওয়ালে নানা ভাস্কর্য। মন্দিরের পথেই এক ছোট চায়ের দোকানে একটু গলা ভিজিয়ে নিলাম। সেখানে এক বাঙালি সাধুর সঙ্গে পরিচয়। তাঁর কাছেই জানা গেল শিবরাত্রির সময় এই মন্দিরের কাছেই বিশাল জেলার আয়োজন হয়। হাজার হজার পুন্যার্থী ধৌলাধার পর্বতমালার পাদদেশে এই মন্দিরে বিশাল জমায়েতে সামিল হন।

এবারে আমরা ফেরার পথ ধরি, সূর্য তখন অস্ত গেছে। দুটো দিন বারোটে কাটিয়ে আমরা এবার ফেরার পথ ধরেছি। আজকেই আমাদের পালামপুর দর্শন। ব্রেকফাষ্ট সেরেই আমরা বেরিয়েছি বারোট থেকে। যোগিন্দর নগর, বৈজনাথ হয়ে তবেই পালামপুর। কাংড়া উপত্যকায় পালামপুর এক উল্লেখযোগ্য স্থান। প্রাচীন কালের ত্রিগর্ত এখন পালামপুর নামে পরিচিত। ত্রিগর্ত ছিল এক অগ্রনী পাহাড়ি রাজ্য যা জলন্ধরা রাজ্যের অর্ন্তগত ছিল।

পালাম কথাটি এসেছে স্থানীয় শব্দ ” পালাম ” থেকে যার অর্থ প্রচুর জল। এই জলের আধিক্যেই পালামপুরের সৌন্দর্য ও সবুজ রূপের গোপন কথা । ছোট ছোট নদী ঝরণা এই পালামপুরকে ঊর্বর করেছে আর তারই ভাঁজে ভাঁজে দিগন্ত জুরে চা বাগান আর ধান-জমির স্ষ্টি। ১৯ শতকে পালামপুরের সম্দ্ধি শুরু হয় যখন চা-উৎপাদন কারীরা এই পালামপুরের মাটিকে বাছে নেয়। পালামপুরের চা এখন  ” কাংড়া টি ” নামে খ্যাত দেশ বিদেশে তার খ্যাতি। আর পালামপুরকে আকর্ষনীয় করার জন্য প্রকৃতিও অক্পণ হাতে সাজিয়ে দিয়েছে এই অঞ্চলকে। পালামপুর সীমানা ছাড়িইয়েই ধৌলাধার প্রর্বতমালার শুরু। এছাড়া অনেক পুরাত্বাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপত্য পালামপুরের আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে। সেই পালামপুরের অম্বেশনে আমরা চলছি। আমাদের প্রথম গন্তব্য আনড্রেটা আর্ট গ্যালারি পালামপুর শহর থেকে ১৩ কিমি দূরে।

চলবে…

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes