jamdani

বৈজনাথ পালামপুর

আশিসকুমার ঘোষ

( শেষ পর্ব )

যেহেতু আমরা বৈজনাথের দিক থেকে আসছি, পালামপুর শহরের ৪ কিমি আগেই আনড্রেটার রাস্তা পেয়ে গেলাম। এবার পথ কমে দাঁড়াল ৭ কিমি। এখানে বিখ্যাত চিত্রকর শোভা সিং-এর বাসগ্হে আগে বাস করতেন শ্রীমতী নোরা রিচার্ডস। যিনি ভারতের গ্রামীন থিয়েটারের পথ প্রদর্শক  প্রকৃতি ও পর্বত প্রেমী এবং মহাত্মা গান্ধীর একনিষ্ট ভক্ত। তাঁকে এ এলাকার মানুষ এখনও মনে রেখেছে। সরদার শোভা সিং এক বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। শোভা সিং, নোরা রিচার্ডস ও বিসি সান্যালের প্রচেষ্টায় ও উদ্যোগে এই আর্ট গ্যালারির স্ষ্টি। বর্তমানে তা শোভা সিং-এর বাসগ্হে প্রতিষ্টিত। এই  গ্যালারিতে প্রবেশের জন্য ২৫ টিকিট। তবে ক্যামেরার প্রবেশাধিকার নেই। এখানে একদিকে শোভা সিং-এর স্টুডিও অন্যদিকে আর্ট গ্যালারি। এই স্টুডিও কাম মিউজিয়ামের উদ্ধোধন ২০/০৩/২০১২ সালে হিমাচলের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। চিত্রশিল্পী শোভা সিং বিষেশভাবে খ্যাতি লাভ করেন পাঞ্জাবের বিয়োগান্ড কাহিনীর নায়ক-নায়িকা সোহানি ও মাহিওয়াল-এর ছবি এঁকে। এই ছবি তার গ্যালারিতে শোভা পাচ্ছে। বিক্ষ্যাত ব্যক্তিদের তৈলচিত্র অঙ্কনে তিনি বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন। গ্যালারিতে প্রদর্শিত অন্যান্য ছবির মধ্যে রয়েছে রণজিৎ সিং, গুরু নানক, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, মহাত্মা গান্ধী, গুরু গোবিন্দ সিং, ভগৎ সিং প্রভ্তির প্রতিকৃতি। এছাড়াও রয়েছে ” স্নেক চার্মার “, ” হার গ্রেস ” প্রভ্তি বিখ্যাত চৈলচিত্র গুলি। এই চিত্র শিল্পী২০০০-এর বাশী ছবি এঁকেছেন। বেশির ভাগ চিত্রই রাখা আছে মিউজিয়ামে। অথবা দেশ বিদেশে ব্যক্তগত সংগ্রহে। তাঁর কয়েকটি ছবি রাষ্ট্রপতি ভবন, লোকসভা, রাজ ভব, সরকারী মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি ( চন্ডীগড় ) জম্মুর অমর মহল মিউজিয়াম হায়দ্রাবাদের সালার জং মিউজিয়ামে প্রদর্শিত রয়েছে। ১৯৮৬ সালে শিল্পি ইহলোক ত্যাগ করেন।

 

 

 

মিউজিয়ামের শোভা সিং-এর শয়ন কক্ষ, রান্নাঘর, ব্যক্তিগত জিনিস পত্র, ছবি আকার সরঞ্জাম, স্টুডিও দেখতে বেশ ভালই লাগল। একটি ঘরে শোভা সিং-এর একটি পূর্ণ অবয়ব মূর্তি প্রদর্শিত রয়েছে তবে এটি নিজেই করেছিলেন কিনা তার উল্লেখ নেই। সমস্ত চিত্রশিল্পী প্রেমী মানুষের আনড্রেটায় আসা উচিত। এখান থেকে ১ কিমি দূরে ক্র্যাফট সেন্টার ও ম্তশিল্প কেন্দ্র রয়েছে। টিকিট ঘরের সংলগ্ন স্থানে স্থানীয় মানুষের তৈরি বেশ কিছু হস্তশিল্প বিক্রির জন্য প্রদর্শিত রয়েছে।

আনড্রেটা থেকে পালামপুর শহর যাওয়ার পথে রেল গেটে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। ফলে আমাদের দেখা হয়ে গেল কাংড়ার ন্যারো গেজ লাইনের ট্রেন। ট্রেন দাঁড়াল স্টেশনে। লোকজন ওঠানামা রেলের বাঁশি বাজা, তারপর ভোঁ বাজাতে বাজাতে রেল চলল তার নির্দিষ্ট পথে। রেলগেট উঠে গেল- আমাদের গাড়িও চলল তার নির্দিষ্ট পথে অর্থাৎ পালামপুর শহরের অভিমুখে।

 

 

পালামপুর শহরে প্রবেশ করলে কিন্তু চোখ জুড়িয়ে যায়। কারণ , ঢেউ খেলানো জমিতে রাস্তার দুপাশেই সবুজ চা বাগানের উপস্থিতি।এই চা বাগানের সৌন্দর্য যেন বারে বারে ফিরে আসে চলার পথে। পথের বাঁকে বাঁকে মাঝে মাঝে চা বাগানের ফাঁক দিয়ে ধৌলাধার উকি মারছে। ঢেউ খেলানো চা বাগানে যেন ময়ূর পঙ্খী নৌকা ভাসিয়ে চলে যেতে ইচ্ছা করে।

সমানভাবে ছাঁটা চা বাগানের মধ্যে থেকেই যেন উঠে গেছে রূপোলি তুষার চূড়া। প্রায় সমতল অঞ্চল তাই রাস্তার বাঁকে বাঁকে পালামপুরকে একের রূপে অনুভব করা যায়- কখনও ছোট ছোট কুটির, কখনও চাষের ক্ষেত আবার কখনো বা আকাশের নীচে সবুজ মাঠ। পাইনের সুগন্ধি হাওয়ায় যেন বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়া যায়। হিমাচল প্রদেশের পর্যটন দপ্তরের হোটেল টি-বাড এই চা বাগানের একেবারে সান্নিধ্যে রয়েছে। হোটেলের চত্বরে দেবদারু ও পাইন গাছের ছায়ায় বসে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে দেওয়া যায়। টি-বাডের ২০০ মিটারের মধ্যে সামান্য উচ্চভূমিতে সেন্টজন চার্চ। প্রাচীন এই চার্চটি ১৯২৯ সালে পুর্ননির্মিত হয়। চার্চের গায়ে অনেক তথ্য মূলক ট্যাবলেট রয়েছে। চার্চ ঘিরে অনেকটা ফাঁকা জমি। চার্চের অভ্যন্তরে প্রবেশ করি। অনেকাই যীশুর মূর্তির সামনে বসে নীরবে প্রার্থনা করছে। এখানে দুদন্ড বসলে মনটা শান্তিতে ভরে যায়। ঝাউ ও পাইনে ছাওয়া ১২৪৯ মিটার উচ্চতার পালামপুরের আবহাওয়া স্বাস্থ্যপ্রদ প্রকৃতিও মনোরম। পালামপুরে কাংড়া উপত্যকা মিলেছে গিরিচূড়া ধৌলাধারে । চা-বাগানের উপস্থিতির সুযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে টি-প্রশেসিং ফ্যাক্টরি। এখন গরমকাল। তবে শীতে যথেষ্ট শীতবস্ত্রের প্রয়োজন হয়। কারণ তাপমাত্রা অনেকটা নীচে নেমে যায় । চার্চ থেকে বেড়িয়ে দেখি আকাশে কালো করে মেঘ করেছে এখনও আমাদের বিন্দুবাসিনী মন্দির দেখা বাকি আছে। ড্রাইভারও ঠিক চেনে না তাই স্থানীয় মানুষকে জিজ্ঞাসা করে পথ এগোতে হচ্ছে। অবশেষে ৪কিমি এগিয়ে বিন্ধবাসিনী মন্দিরের খোঁজ পাওয়া গেল। তবে গাড়ি থেকে নামার সময়েই বিপত্তি। প্রবল ব্ষ্টি শুরু হল সঙ্গে শিলাব্ষ্টি। দৌড়ে পৌছাই মন্দির চত্বরে। বহুপ্রাচীন এই মন্দির। দেবী দর্শন ও প্রণাম, পূজারীকে দক্ষিণা দেওয়ার পর অনেকটা সময় মন্দিরে আটকে থাকতে হল কারণ বাইরে শিলাবৃষ্টি চলছে। আধঘন্টা পরে ব্ষ্টি থামল।খিদেয় পেট চুই চুই করছে। কাছাকাছি কোনও দোকান চোখে পড়ছে না। আনেক খোঁজাখুঁজি করে একটি দোকানে ম্যাগি ও কফি খেয়ে দ্বিপ্রাহারিক খানা সমাপ্ত করতে হল। তখন আকাশে মেঘ অনেকটাই কেটে গেছে। ধৌলাধারের বরফে ঢাকা শিখরগুলি সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আমরা পালামপুরকে এবার বিদায় জানিয়ে এগিয়ে চলি পরবর্তী গন্তব্যের পথে।

 

 

প্রয়োজনীয় তথ্যঃ

  • পালামপুরের নিকটতম বিমানবন্দর হল কাংড়া বিমানবন্দর।দিল্লী থেকে ছোট প্লেনে ঘন্টাখানেক সময় নেয়। পাঠানকোট রেল জং থেকে পালামপুর ১১৫ কিমি। পালামপুর থেকে বৈজনাথ ১৫ কিমি।
  •  হিমাচল পর্যটন দপ্তরের হোটেলে টি বাড থাকার জন্য অগ্রগণ্য প্রাইভেট হোটেল আছে।
  •  পালামপুর সারা বছরেই আসা যায়। তবে গরমে সুতির পোষাক ও শীতে ভারী শীতবস্ত্র প্রয়োজন। পালামপুরের উচ্চতা ১২৫০ মিটার।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes