jamdani

বরফের মুকুট {রাজশ্রী বসু অধিকারী}

একটা মনে করতে চাওয়া গান বারেবারে এসে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে অথচ হাতের মুঠোয় ধরা দিচ্ছে না কিছুতেই। একরাশ বুক তােলপাড় সুর এসে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে যেতে দিঠিকে স্ট্যাচু করে ফেলে রাখছে আধা বসন্তের মর্মর ভরানাে নির্ঘুম একলা বিছানায়, দুদ্দাড় হাওয়ায় ওড়া নীল পর্দাগুলাের পেছনে অশান্ত জানলার পাল্লায়, আর মােমপালিশ গালের অহঙ্কারী মসৃণতা মাখানাে উদাসী ঠান্ডা মেঝেতে।।

একা থাকা খুব যন্ত্রণার। একা থাকা বড়ােই রক্তাক্ত। আমি আর একা থাকতে পারছি না। নিজের ভার নিজে বইতে বইতে এই সুন্দর পৃথিবী আমার চোখে এক অতিকায় আগুনকুণ্ড হয়ে উঠছে, যার ভেতরে ঝাঁপ দিয়ে পড়ি প্রতি মুহূর্তে। প্রতিটি এরকম ঝােড়াে আবহাওয়ায় নিজেকে পরিশুদ্ধ করি দারুণ অগ্নিবাণে। কিন্তু আজ কেন কিছুতেই সেই পােড়া ছাইয়ের নিস্পৃহ শান্তি আসছে না আমার মনে? তবে এখন আমি কী করব? আমি কি কেবলই জ্বলব? জ্বলতেই থাকব দাউদাউ ? নাকি একটা ফোন করব? একটা ফোন করে সেই আগুনের তাপ কিছুটা হলেও ছড়িয়ে দেব আমার থেকে অনেকখানি দূরে? 

দিঠি বেঁকেচুরে শােয়। বিশাল সাত বাই বারাে খাটের মধ্যিখানে ওর বাকানাে শরীরটা দেখতে লাগে দ-এর মতাে। কদিন আগে হলেও একপিঠ কালাে চুল ঢেকে রাখত বালিশ। কিন্তু এখন সেখানে সাদাটে শূন্যতা। ঘাড়েরও ওপরে জমাট বেঁধে আছে বরফের কান্না। শুধু ছােটোই নয়, একেবারে পুরাে ব্লিচ করিয়ে এসেছে সমস্ত চুল। যে মেয়ের নাম দিঠি, যার কাজল চোখের জমিতে মেঘেরা খেলা করে অবিরত, তার সাদাচুলে ভরা মাথাটা যেন প্রকৃতির সমস্ত শ্যামল শােভার ওপর প্রতিশােধের মতাে উদ্যত করে রেখেছে এক বরফের অস্ত্র। ফোন হাতে নিয়ে চোখের সামনে ধরে দিঠি। কোনও নম্বর ডায়াল করে না। শুধু ঠোট দুটো কেঁপে কেঁপে যায়।

আমি বলব হ্যালাে…

তুমি বলবে হুমম…

আমি বলব শােন না… কেন তুমি আমাকে কাল রাত্র, তার আগের দিন রাত্রে অথবা তারও আগের দিন রাত্রে ফোন করােনি? আমার বুঝি ইচ্ছে করে না তােমার গলাটা একটু শুনতে?

তুমি বলবে আচ্ছা শােনাে আমি এখুনি একটা মিটিং-এ ঢুকতে যাচ্ছি, ইটস ভেরি আর্জেন্ট… বাই …

ওই তাে তুমি কেটে দেবে ফোন। আমি কল লগ খুলে দেখব, পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড ছিল ফোনটার আয়ু। আজ অবধি কখনও পাঁচ মিনিট ক্রশ করেনি তােমার সঙ্গে আমার কথা। কুড়ি, পঞ্চাশ, চল্লিশ সেকেন্ডের গল্প সব। খুব বেশি হল তাে এক মিনিট তেইশ সেকেন্ড। শুধু দু’দিন…, কখন কীভাবে যেন পার হয়ে গিয়েছিল অর্ধেক রাত…, কিন্তু সে তাে গত জীবনের কথা। তখনও তাে একল মেঘ ছিল আমার শরীর। ছেয়ে, সেই মেঘে ছিল লুকানাে বৃষ্টির কণা, ছিল বিদ্যুৎশিখা। তখনও আমার মাথায় বরফের মুকুট চাপেনি।

‘কী রে! এখনও তুই বিছানায় গড়িয়ে পড়ে আছিস? আবার সেই ফোন হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে মরছিস? আরে বাবা করার থাকলে ফোনটা করেই ফ্যাল না। অত ভাবনাচিন্তার কী আছে?’ বন্যা দুপদাপ করে ঘরে ঢুকে বন্যার জলের মতােই কথার স্রোতে ভাসিয়ে তােলে। চারদিক। দিঠির পা ধরে ঠেলা মারে অধৈর্য হাতে।

‘ওঠ ওঠ… ওঠ না. তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে, বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে। গাড়ির হর্ন শুনতে পাচ্ছিস না? ওই… ওই যে… আবার…’

‘আঃ… আমি তাে বলেছি আমি যাব না। তােরা যা। আমায় ডিস্টার্ব করিস না বুনু’ দিঠি বিরক্ত হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শােয়। বন্যা তার চেয়েও বেশি বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। ঘরের ভেতর খানিকক্ষণ পায়চারি করে অস্থিরভাবে। তারপর বেরিয়ে যেতে গিয়েও দরজার কাছ থেকে গোঁজ মুখে ছুঁড়ে দেয় ব্রহ্মাস্ত্র।

‘তা যাবি কেন ? আমরা এত করে বলছি সেটা তাের কানে ঢুকছে না। এতগুলাে মানুষের সেন্টিমেন্ট এতদিনের প্ল্যানপ্রােগ্রাম কিছুরই কোনও দাম নেই তাের কাছে। অথচ পার্থদা বললে এককথায় নেচে উঠতিস, এক সেকেন্ড লাগত না ভাবার জন্য…’।

পার্থর নামটা কানে যেতেই ছিলা ছেড়া ধনুকের মতাে লাফিয়ে উঠে বসে দিঠি। ফর্সা মুখ পলকে লাল। বন্যার দিকে আঙুল তুলে অস্বাভাবিক চেঁচিয়ে ওঠে বিছানায় মিশে থাকা মেয়েটা, ‘কতবার বলেছি এই নামটা মুখে আনবি না… এই বাজে তুলনাগুলাে করবি না.. তবু? তবুও? কী চাস? আমি চলে যাব বাড়ি ছেড়ে?’ রাগে ফেটে পড়া দিঠির মুখ দেখে যে কেউ বুঝবে অনেকটা কান্নার ইচ্ছে জমছে কণ্ঠের নীচে। চিৎকার শুনে পাশের ঘর থেকে মানবেন্দ্র এসে দাঁড়ান।

আজ একটা গেট টুগেদারের আয়ােজন করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের পনেরাে-কুড়িজন মিলে হৈ হৈ করে প্রথমে ফুলডুংরি পাহাড়ে চাপতে যাবে। তারপর একসাথে বনফায়ার। গানবাজনা। হৈ-হুল্লোড়। এরকম প্রায়দিনই লেগে থাকে এখানে। মূল উদ্যোক্তা ল্যাংস্টার গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের পার্সোনেল ম্যানেজার অরিন্দম। শুধু অফিস চত্বরেই নয়, পুরাে ক্যাম্পাসে প্রতিটি এমপ্লয়ির মধ্যেই সে ছড়িয়ে দিয়েছে তার ম্যানেজমেন্ট ক্যাপাসিটি। এই চত্বরের বয়স্ক বা নবীন প্রজন্ম সকলের কাছেই অরিন্দম অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। দিঠি বন্যা বরাবর এখানকার সমস্ত প্রােগ্রামেই জয়েন করে আসছে। কালচারাল, সােশ্যাল বা অ্যামিউসমেন্ট যা-ই হােক। সীমন্তিনী চলে যাওয়ার পর থেকে আর মেয়েদের কোনও ইচ্ছেতেই বাধ সাধেন না মানবেন্দ্র। তার একটাই চাওয়া, মেয়েরা ভালাে থাকুক আনন্দে থাকুক। কিন্তু বড়াে মেয়েটা ভালাে নেই। খুব, খুবই খারাপ আছে। এই খারাপ থাকাটা মানবেন্দ্র বাবা হয়ে, সমস্ত ভালােবাসা উজাড় করে দিয়েও পাল্টাতে পারছেন না। ছ’মাসের ওপর হয়ে গেল দিঠি নিজেকে বাইরের পৃথিবী থেকে উইথড্র করে নিয়েছে প্রায়। কোনও কিছুতেই আর উৎসাহ নেই ওর। চার দেওয়ালের মধ্যে স্বেচ্ছাবন্দী জীবন আঁকড়ে ধরেছে সে। মানবেন্দ্র প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মেয়েকে আগের মতাে করে তুলতে। কিন্তু এখনও পারেননি। আজও বাইরে বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে। সবাই হাজির। শুধু দিঠির অপেক্ষায় ওদের দেরি হয়ে যাচ্ছে। এর পরে গেলে পাহাড়ে চাপার মজাটাই থাকবে না। বিকেল শেষ হয়ে আসছে।

‘কী হয়েছে সােনা মা? এত জোরে চিৎকার করলে কেন?’ খাটের ওপর কাপতে থাকা আঠাশ বছরের মেয়েকে আট বছরের মেয়ের মতাে জড়িয়ে ধরে বলেন মানবেন্দ্র। মাথাটা বুকে চেপে ধরে হাত বুলিয়ে দেন পরম স্নেহে। দিঠি হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে আবার হঠাই শান্ত হয়ে গিয়েছিল। চুপ করে বাবার বুকে মাথা দিয়ে বসে থাকে সে। দেখে বােঝাই যায় না এই মেয়েই একটু আগে অমন বিকট চিৎকার করে উঠেছিল। সেটা যেন ও নয়। যেন আর কেউ। 

‘আমি বলি কি, মা, ওরা যখন বলছে, তুমিও যাও না একটু ঘুরে এসাে। ভালাে লাগবে। এমনিতেই তাে তােমাকে কতগুলাে স্ট্রং ওষুধ খেতে হচ্ছে। তার ওপর সারাক্ষণ এই ঘরে আটকে থাকা কি ভালাে? ডক্টর তাে বলেছেন একটু ঘুরতে বেড়াতে। ডক্টরের কথা না শুনলে ভালাে হবে কী করে?’ 

বড়াে বড়াে চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়ে দিঠি, “আচ্ছা… বাবা… যাব আমি। শুধু তুমি বুনুকে বলে দাও আমার সামনে যেন পার্থর নামটাও না করে। আমি কোনও পার্থজিৎ মুখােপাধ্যায়কে চিনি না। চিনিনাআআআ…’

বেশ ভালােই কথা বলছিল। শুধু শেষের দিকটাতেই বাবাকে আঁকড়ে ধরে আবারও চেঁচিয়ে ওঠে দিঠি। কারণ এবার পার্থর নামটা ওর নিজের মুখ থেকেই নিঃসৃত হয়ে নিজেরই কানের পর্দা বেয়ে হৃদয়ের তন্ত্রীতে ঘা দিয়েছে। যেন কোনও অদক্ষ মানুষের আঙুল নিদারুণ ছুঁয়ে দিয়েছে মস্তিষ্কের কোষের ভেতর সাজিয়ে রাখা সুরবাহার, সুরেলা স্বরগম হয়ে বাজার কথা ছিল যার, অযত্নে অনবধানে সে বেজে উঠেছে কর্কশ হয়ে। মানবেন্দ্র এই সব মুহূর্তে ভেতরে ভেতরে একদম পাজলড হয়ে যান। বুঝে উঠতে পারেন না ঠিক কীভাবে এত বড়াে মেয়েকে ট্যাকল করবেন। তাকে আদর করে বুকে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়েও সব সময় কাজ হয় না। অবুঝের মতাে চিৎকার । চেঁচামেচি করেই যায়, এটা-সেটা ছুঁড়ে ফেলে। আবার কখনও একেবারে শান্ত হয়ে যায়। নিঝুম স্তব্ধতায় বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এই সব সময়ে অসহায়ের মতাে মানবেন্দ্রর মনে হয়, সীমন্তিনী থাকলে আজ কোনও সমস্যাই হত না। সে পারত সব কিছুর সমাধান করতে। কিন্তু যে নেই সে নেইই। শত ডাকলে বা চাইলেও সে আর বাড়িয়ে দেবে না তার কল্যাণী হাত। আর বন্যাটাও হয়েছে তেমনিই। খুব ছােটো তাে নয়। বাইশ হবে এবার। ওর তাে বােঝা উচিত কোন কথাটা বলব আর কোনটা বলব না। মায়ের পেটের বােন না হলেও সেটা তাে কখনও বুঝতে দেওয়া হয়নি। বিয়ের অনেকগুলাে বছর পর যখন আর আশা ছিল না যে সীমন্তিনী মা হতে পারবে তখনই ছােট্ট  দিঠিকে রাউরকেল্লা অনাথ আশ্রম থেকে দত্তক নিয়েছিলেন মানবেন্দ্র আর সীমন্তিনী। সেই ছ’বছর তাঁদের সমস্ত প্রাণ উজাড় করে দিঠিকে একমাত্র সন্তানের জায়গায় বসিয়েছেন ওঁরা। তারপর প্রকৃতির আশীর্বাদের মতােই বন্যা এল সীমন্তিনীর কোলে। কিন্তু তাতেও তাে দিঠির জায়গাটা একটুও বদল হয়নি। দুই মেয়ের মা হয়েই সীমন্তিনী শেষদিন অবধি সুখী ছিল। বন্যা দিঠি এই সব ইতিহাস জেনেছে বড়াে হয়ে। কিন্তু তাতে কী এসে যায়। মানবেন্দ্র বরাবর বিশ্বাস করেছেন ভালােবাসার কাছে রক্ত, সমাজ বা যাবতীয় বিধিনিয়ম সব তুচ্ছ। তাই তিনি আশা করেন বন্যাও দিদির অসুস্থতাটা বুঝবে, সেইমতাে আচরণ করবে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ততই যেন বন্যার আচরণ দিঠির প্রতি রূঢ় হয়ে উঠছে। মানবেন্দ্র নিজে ওকে বুঝিয়ে বলেছেন ডাক্তারের কথাগুলাে, কীভাবে দিঠির সাথে ব্যবহার করতে হবে না হবে। কিন্তু বন্যা প্রায়ই মানছে না। মাঝে মাঝে তাে মানবেন্দ্রর প্রশ্ন জাগছে বন্যার আচরণ নিয়েও। কিন্তু তিনি দিঠিকে নিয়েই এত জর্জরিত যে আর কোনওদিকে মন দিতে পারছেন না। সব কিছুর মধ্যে কানে বেজে ওঠে ডক্টর সিং-এর কথাগুলাে। দিঠিকে সুস্থ করে তুলতে হবে, খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ করে তুলতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আকুল চিন্তায় ডুবে থাকেন মানবেন্দ্র। এই মনে হয় পুরােপুরি সেরে গেছে মেয়েটা। আবার পরমুহূর্তেই সেই নিশ্চিন্ততা ভুল প্রমাণিত করে দেয় দিঠি। বন্যা রেগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেল গেট ঠেলে। যদি দিঠিও উঠত তাে একটু শান্তি পেতেন তিনি। কিন্তু ওর তাে ওঠার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। আপনমনে ফোনটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করছে। এ তল্লাটের সবচেয়ে ইন্টেলিজেন্ট, ব্রাইট মেয়েটার এমন অবস্থা দেখে বাবা হয়ে মানবেন্দ্র স্থির থাকবেন কী করে! তিনি মনে মনে ঠিক করেন, যা-ই রেজাল্ট হােক, একবার পার্থজিতের সঙ্গে দেখা করবেন। এবং সেটা করতে হবে অত্যন্ত সঙ্গোপনে। দিঠিকে তাে নয়ই, এমনকি বন্যাকেও ঘুণাক্ষরেও জানানাে চলবে না।

‘সেনদা…’

ড্রয়িংরুমে অরিন্দমের গলা। নিজেই চলে এসেছে দেরি দেখে। মানবেন্দ্র বাইরে আসেন তাড়াতাড়ি। অরিন্দম বয়সে ছােটো হলেও পােস্টে বড়াে। তাকে তাই খাতির না করলে চলে না। অপ্রতিভভাবে হাসেন মানবেন্দ্র, “আরে… কী ব্যাপার… আসুন… আসুন। 

‘উই আর গেটিং লেট। দিঠি কি রেডি হয়নি এখনও ? আজ সবাই ফুলডুংরি পাহাড়ে ওর গান শুনব প্ল্যান করেছি। আমি তাে স্প্যানিশ গিটারটাও নিলাম গাড়িতে তুলে…’ কথা বলতে বলতেই ভেতর দিকে দু-এক পা এগিয়ে যায় অরিন্দম। গলা উঁচু করে ডাকে, ‘হাই দিঠি… আর ইউ কামিং? 

বড় ওভারস্মার্ট এই ছেলেটি। মনে মনে বিশেষ পছন্দ করেন না মানবেন্দ্র। দিঠির জন্য এর যে একটু বিশেষ পক্ষপাত আছে তা জানেন তিনি। সীমন্তিনী বেঁচে থাকতে এই নিয়ে তাদের মধ্যে কথাবার্তাও হয়েছে। যদিও অরিন্দম কখনও বিয়ের প্রস্তাব দেয়নি সরাসরি, তবু তার আগ্রহটা বােঝাই যায়। হয়তাে এপক্ষের কিছু সবুজ সংকেত পেলে এতদিনে সে কথাটা পারত। কিন্তু দিঠির জীবন এতদিন তাে ছিল পার্থময়। মানবেন্দ্রও পার্থকে পছন্দই করে এসেছেন বড়ােমেয়ের ভাবী জীবনসঙ্গী হিসেবে। পার্থও কোনওদিন বলেনি বিয়ের কথা, তবু এই চারজনের পরিবারের প্রতিটি সদস্যই জানত কী হতে চলেছে ভবিষ্যতে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎটা আর এল না। বিনিময়ে ঝড় এল গগন কাপিয়ে। লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল করাল বজ্রাঘাতের আকস্মিক প্রলয়। মাত্র তিনদিনের জ্বরে সীমন্তিনী চলে গেল। আর দিঠির জীবন থেকে পার্থ কোথায় যে ছিটকে গিয়ে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলল, কেন যে তুলল, কেউ তা জানে না। মানবেন্দ্র তাে নয়ই, দিঠিও নয়। সতেজ সবুজ মেয়েটা প্রতিদিন কেমন ফ্যাকাসে হলুদ হয়ে উঠছে। সুস্থ ব্রিলিয়ান্ট মেয়েটা কেমন দেখতে দেখতে ডিলিরিয়ামের পেশেন্ট হয়ে গেল। বাইরের লােকের কাছে ওর অসুখটা চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করেন মানবেন্দ্র। কিন্তু তা আর বেশিদিন বুঝি সম্ভব নয়। ডক্টর রূপক সিং বলছিলেন দিঠিকে যদি নতুন কোনও পরিবেশ দেওয়া যায় তাহলে বেটার। মানবেন্দ্র তাই মাঝেমধ্যে এমনকি অরিন্দমের কথাও যে ভাবেননি তা নয়। মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করেছেন দিঠির প্রতি ওর আকর্ষণের গভীরতা নিয়ে। মেয়ের স্বার্থেই নানারকম চিন্তা মাথায় আসে। যদি বিয়ের পর দিঠি একটা নতুন জীবন পায়! যদি ও ভুলে যেতে পারে যা কিছু ওর পরাজয়! কিন্তু তার আগে একবার মানবেন্দ্র পার্থজিতের সঙ্গে দেখা করতে চান। জানতে চান দিঠিকে সে আপন করে নিতে আজও প্রস্তুত আছে কিনা। নাকি এতগুলাে দিনের অদর্শন তার মনে কোনও ফাটল তৈরি করেছে। আর খুব সত্যি এবং অন্তরতম গােপন ইচ্ছাটা হল যদি কোনওভাবে সেই ফাটলটা মেরামত করা যায়। কারণ এ পৃথিবীর যে কোনও স্নেহশীল বাবার কাছে পার্থজিতের চেয়ে যােগ্যতর পাত্র আর কেই বা হতে পারে! মানবেন্দ্র তাে মন থেকেই তাকে নিজের জামাই কল্পনা করে রেখেছিলেন। সেই কল্পনার চারাগাছ বৃক্ষরাজির পরিপূর্ণতা কেন পেল না, কেন দিঠির মতাে একটা মেয়েকে ডিলিরিয়াম পেশেন্ট হতে হল সেই প্রশ্নটার উত্তর খোঁজার দায়টাও মন থেকে মুছে ফেলা যায়নি এতদিন। কিন্তু এখন তাে আর সে দায় নেই। খুব সম্প্রতি মানবেন্দ্র খুঁজে পেয়েছেন উত্তর। এখন শুধু কর্তব্য স্থির করা। তাই অরিন্দমকে নিয়ে চকিত ভাবনা মনে এলেও তাতে জল দাঁড়ায় না। সব মিলিয়ে এখনও অনেক অস্থিরতা। এসময়ে সীমন্তিনীর অভাবটা বড় প্রকট। পরামর্শ করার কেউ নেই।

‘কী হল সেনদা? আপনি কী এত ভাবছেন? দিঠিকে ডাকুন…’ অরিন্দম অধৈর্য হয়। সত্যিই খারাপ হল ব্যাপারটা। মানবেন্দ্র একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন, “না আ আ… মানে ও বােধহয়… মানে ওর শরীরটা ঠিক ভালাে নেই।

“সে কী? হােয়াটস রং উইথ হার? দেখি…’ ভেতরদিকে পা বাড়ায় অরিন্দম। মানবেন্দ্র বাধা দেওয়ার আগেই ভেতর থেকে এলােমেলাে পায়ে ছুটে আসে দিঠি। হাতে মােবাইল। ভয়ঙ্কর উত্তেজিত। গায়ের দড়ি বাঁধা গাউন এক কাধে নট খুলে গিয়ে খানিকটা ঝুলে পড়েছে। একমাথা সাদা সিল্কের সুতাের মতাে চুল, ঝকড়া, অবিন্যস্ত। দুদ্দাড় করে প্রায় দৌড়ে এসে মানবেন্দ্রর পাঞ্জাবির হাতা খামচে ধরে। কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে… ‘বাপি.. এই যে.. এই যে দ্যাখাে.. দ্যাখাে.. ফোন… ফোন করেছিল.. বাপিইইই.. এই তাে একটু আগেই.. দ্যাখাে.. দ্যাখাে নাআআ…’

মােবাইলটা এগিয়ে ধরে দিঠি। গলায় অবুঝ অনুনয়। মানবেন্দ্র নিঃশব্দে মােবাইলটা দেখে দিঠির হাত থেকে নিয়ে পকেটে পােড়েন। এক হাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে কঁাধের খুলে যাওয়া নটটা বেঁধে দিতে থাকেন। অত্যন্ত হাঁফাচ্ছে দিঠি। সারা শরীর কাঁপছে উত্তেজনায়। চোখে জল গড়াবে বুঝি এখুনি। সব মিলিয়ে একটা অস্বাভাবিক চেহারা। অরিন্দম রয়েছে ঘরে দাঁড়িয়ে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। দিঠির উদভ্রান্ত আচরণে কিছুটা অবাক হয়েই তাকিয়ে আছে সে। মানবেন্দ্র মনে মনে লজ্জা পান একটু। একজন দেখা মানেই এবার পুরাে কলােনি জানবে কোনও সমস্যা রয়েছ দিঠির। তারপরেই নানারকম বুদ্ধি পরামর্শ, আলােচনা-বিলােচনার ঝড় বইবে মেয়েকে নিয়ে | কোনওরকম আলােচনা তিনি চান না। দিঠির পুরাে আচরণটাই বিসদৃশ। সেটা চোখে পড়ল কিনা অফিস বসের। বন্যার ওপর রাগ হয় তাঁর। সে তাে অরিন্দমকে একটু আটকাতে পারত। কিংবা সে যে আসছে তার একটা সিগন্যাল দিতে পারত। 

দিঠিকে শান্ত করার চেষ্টা করেন মানবেন্দ্র, ‘চল তাে সােনা মা… চল… ঘরে চল…’

‘তুমি তুমি… কথা বল না বাপি… ফোনটা কানে দাও… আমাকে দাও আমাকে… দাওনাআআআ..’ চিৎকার করে দিঠি। মাটিতে পা ছোঁড়ে… নিজের মাথার চুল টেনে ছিড়তে চেষ্টা করে..

‘কী হয়েছে ওর? সেনদা? এরকম করছে কেন? স্ট্রেঞ্জ!… দিঠি? এই দিঠি ? যাবে না তুমি বেড়াতে? সবাই যাচ্ছে তাে…’ অরিন্দম একের

পর এক প্রশ্ন করেই যেতে থাকে। তার কৌতুহল চরমে উঠেছে।

মানবেন্দ্র দু’হাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন বুকে। তারপর শান্ত গলায় অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘ওর যাওয়া হবে না আজ। ওর শরীরটা খারাপ আছে। আপনারাই ঘুরে আসুন।’

মানবেন্দ্রর মুখের পেশিগুলােয় ফুটে ওঠা নিরুচ্চার ফুলস্টপগুলাে দেখে অরিন্দম বুঝতে পারে এবার থামা প্রয়ােজন। পায়ে পায়ে বেরিয়ে যায় বারান্দা, কম্পাউন্ড, গেট ছাড়িয়ে।

ভর্তি বাসটা একটু আগেই বেরিয়ে গেল সামনে দিয়ে। বড্ড ধুলাে ওড়া রাস্তাটা। চৈত্রের শেষবেলায় রাস্তার দু’ধারে লাল হয়ে থাকা পলাশফুলের গাছে লাল ধুলাে মিশে চারপাশটা কেমন রঙিন করে তুলেছে। আর কিছুক্ষণ পরেই এই ক্যানভাসে মিশে যাবে অস্তসূর্যের লালিমা। যেন কোনও অদৃশ্য শিল্পীর হাতে আঁকা ছবিতে চুইয়ে পড়া শিল্পীর বুকের রক্ত। এরকমনটাই মনে হয় মানবেন্দ্রর। বারান্দায় বেতের সােফায় বসে আনমনা চোখে তিনি তাকিয়ে আছেন সামনের রাস্তায়। এখানে কলােনির সব বাড়ির সামনেই লাগােয়া অনেকখানি করে জমি বাগান। সামনের বাড়ি পাশের বাড়ির প্রায় সবাই গেছে বেড়াতে। রাস্তা দিয়ে মাঝেমধ্যে দু-একটা সাইকেল ছাড়া বিশেষ কেউ নেই বললেই চলে। দিঠির একটু আগের স্পেলটা কেটে গিয়েছে বােধহয়। সে এতক্ষণ বাবার কাধে মাথা দিয়ে শান্ত হয়ে বসেছিল। এখন উঠে গিয়ে সামনের দোলনাটায় বসেছে। হাতে মােবাইলটা আঁকড়ে ধরা আছে ঠিক। একমনে তাকিয়ে আছে মােবাইলটার দিকে, মাঝে মাঝে কানে ধরে বিড়বিড় করছে। মানবেন্দ্র জানেন ফোনের ও প্রান্তে কেউই নেই। শুধু দিঠির অতিমাত্রায় কল্পনাপ্রবণ মন ভেবে নিচ্ছে। কেউ ওকে ফোন করেছে, কেউ ওর সাথে অনেক কথার ফুলঝুরি সাজিয়ে ভালােবাসা ভালােবাসা খেলায় মেতেছে। এইরকম ভেবে নিয়েই বেশিরভাগ সময় খুশি থাকে মেয়েটা। শুধু যখন এই কল্পনার জালটা কোনওভাবে ব্যাহত হয় বাস্তবের আঘাতে তখনই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তখন ও কী করবে তার কোনও ঠিক থাকে না। ডক্টর সিং বলেই দিয়েছেন, এই রােগের এটাই লক্ষণ। এই ডিসওরিয়েন্টেশন অফ মুড, এই হ্যালুসিনেশন আঁকড়ে থাকা, অ্যাংজাইটি, মেন্টাল ডিস্ট্রেস, সব একসাথে দেখা দেবে। অনেক ধৈর্য নিয়ে ডিল করতে হবে এই খামখেয়ালিপনা। ডক্টর বলেই দিয়েছেন, কোনওরকম মেন্টাল স্ট্রেস হওয়া চলবে না। মানবেন্দ্র বসে বসে ভাবেন, চিন্তায় তার কপাল কুঁচকে থাকে।

পার্থজিৎ মুখােপাধ্যায় দিঠির কলেজেই পার্টটাইম পড়াতে এল। দিঠি সে বছর মাত্র ক্লাস টুয়েলভ। এক প্রবল ঝড়জলের দিনে কোম্পানির যে গাড়িতে কলােনির মেয়েরা যাতায়াত করে, তাতেই লিফট নিতে হয়েছিল পার্থকে। এ বাড়িতে সেই প্রথম তার আসা। কোনও উপায় ছিল না বলেই এসেছিল। কারণ অন্য মেয়েদের নামিয়ে এ বাড়ির গেটের সামনে এসেই ব্যাটারি ডাউন হল সেই পুরনাে ঝরঝরে গাড়িটার।

‘আসুন না স্যার… এক কাপ কফি খেয়ে যান..’ ডেকেছিল দিঠি, “বাপি ততক্ষণে অন্য একটা গাড়িও আনিয়ে নেবেন।’ 

‘না না… আমি এমনিই চলে যাব’ ঘরে ঢুকে সােফায় বসতে বসতে বলেছিল পার্থজিৎ। 

মেয়ের ডাকে মানবেন্দ্র সীমন্তিনী দুজনেই এসেছিলেন বাইরের ঘরে। দিঠি পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল খুব উৎসাহ নিয়ে, ‘আমাদের ইংলিশ টিচার পি এম…’ 

বন্যা তখন অনেক ছােটো। পর্দার পেছন থেকে উঁকি মেরে বলে, ‘পি এম কী রে দিদিভাই? প্রাইম মিনিস্টার?’

পার্থজিৎ হেসে উঠে নিজের নামটা বলেছিল। আর সেই মুহূর্তেই লম্বা শ্যামবর্ণ ছেলেটিকে ভালাে লেগে যায় মানবেন্দ্রর। সবচেয়ে বেশি আকর্ষক ওর চোখ। শান্ত, গভীর, অন্তর্লীন বুদ্ধির দীপ্তিতে শানিত। প্রথম দিনটার কথা আজও পরিষ্কার মনে আছে মানবেন্দ্রর। তারপর একটু একটু করে কবে কখন যে পার্থজিৎ এ বাড়ির অংশ হয়ে গেল সে এক ইতিহাস। মানবেন্দ্র শুধু দেখতেন তাঁর ছটফটে মেয়েটা কী জাদুমন্ত্রবলে এই মানুষটার সামনে ঘাের লাগা পাথরের মূর্তি হয়ে যেত, কীভাবে তার চঞ্চল চোখ দুটো শান্ত হয়ে খুঁজে ফিরত অচেনা কোনও সুর। এমনভাবে ও শুনত পার্থজিতের সামান্যতম কথাটাও, যেন কথা নয়, কী এক পূজার মন্ত্রোচ্চারণ চলছে ওর ভেতরে ভেতরে।

দিঠি আই এস সি, বি এ অনার্স, এম এ.. সব শেষ করল পার্থজিৎকে ছুঁয়ে থেকে। সম্পর্ক হয়েছিল ওদের মধ্যে। আর সেই নিরুচ্চার সম্পর্কটা এ বাড়ির কারাের অজানা ছিল না। মানবেন্দ্রর ছেলেটিকে রীতিমতাে পছন্দই ছিল। সীমন্তিনীরও। সহজাত শিক্ষার আবহে এ বাড়ির একটি মানুষও সেই জানা বােঝাটাকে স্কুল পর্যায়ে কোনওদিন টেনে আনেনি। কিন্তু একদিন বলল সীমন্তিনী। রাত্রে শুতে গিয়ে সম্পূর্ণ আকাশ থেকে টেনে এনে বলল একটি কথা, ‘এবার তাহলে পার্থর বাড়ির খোঁজখবর নিতে হয়…’

‘বাড়ি? ও তাে স্টেশনের কাছে রেন্টে থাকে না? একাই তাে থাকে জানি…’

‘আঃ সে তাে এখানে চাকরি করে তাই। ওর তাে নিজের একটা বাড়ি আছে…। সেখানে বাবা-মাও আছেন নিশ্চয়ই। বিয়ের কথাবার্তা তাে তারাই বলবেন, নাকি? আর কতদিন ফেলে রাখবে?’ সীমন্তিনী বিরক্ত হয়েছে স্বামীর অজ্ঞানতায়। মানবেন্দ্ৰ বােজা চোখে দৃষ্টি পেলেন।। সত্যিই তাে, প্রথাগত পড়াশােনা শেষ প্রায়। এবার তাে মেয়ের বিয়ে দিতে হয়। জামাই খোঁজার দায় নেই। ওরা দুজনে দুজনের জন্যই তৈরি এ বিশ্বাসটা দিঠির থেকেও তার বাবা-মায়েরই বেশি ছিল বােধহয়। অতএব ডাক পড়ল মেয়ের। কিন্তু আশ্চর্য! পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার কোনও একটি গ্রামে আদিবাড়ি পার্থর, এইটুকু ছাড়া আর কোনও তথ্য দিঠির কাছেও নেই। আশ্চর্য, এতদিন ধরে মেয়ে শুধু মন্ত্রমুগ্ধের মতাে ওর মুখের দিকেই তাকিয়ে থেকেছে। জেনে নেয়নি কোনও এসেনশিয়াল ইনফর্মেশন। ঠিক হয়েছিল পরদিন সব ডিটেলস কথা হবে। 

কিন্তু সেই পরদিনটা আর এলই না। অদ্ভুতভাবে যেন এই ছােট্ট শহর থেকে হাওয়া হয়ে গেল পার্থজিৎ। দিঠির কাছ থেকেই শুধু নয়, কলেজ থেকেও সরিয়ে নিল নিজেকে। ভাড়াবাড়িটা ছাড়ল। চেঞ্জ করে দিল মােবাইলের সিমকার্ড। চেনা জগতের কেউই আর কোনওভাবে ওর নাগাল পেল না। সেই সময়টা থেকেই দিঠির ভেঙে পড়া শুরু। প্রথমদিকে শুধু পার্থ আসার সময়টায় বারবার ঘরবার করত। বারান্দায় গিয়ে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়ে দিল। আস্তে আস্তে ছাড়ল নিত্যদিনের যত প্রিয় বিলাসব্যসন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গ, হাসি গান গল্প, কথা বলা। সে সময়টা মানবেন্দ্র একটু একটু করে দেখেছেন মেয়েটার বদলে যাওয়া। আচমকা সীমন্তিনীর চলে যাওয়াটা তাকেও প্রায় স্থবির করে তুলেছিল। অনেকটা সময় শুধু নষ্ট হয়েছে নিজেকে গুছিয়ে তুলতে। তারপর যখন মেয়েটার দিকে তাকালেন তখন দিঠি এক অন্য পৃথিবীতে ঢুকেই গিয়েছে। সেখান থেকে ওকে বের করে আনার লড়াই শুরু হয়েছে তারও প্রায় ছ’সাত মাস হয়েই গেল। এক একবার মনে হয় মানবেন্দ্রর যদি বন্যাটা একটু সিমপ্যাথি নিয়ে মিশত দিদির সঙ্গে! তাহলেও হয়তাে দিঠি কিছুটা তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে পারত। কিন্তু সে তাে নিজেকে নিয়েই মশগুল। দিদির প্রতি বাবার এতটা মনােযােগ যেন ভেতরে ভেতরে ওকে আরাে বেশি রুক্ষ করে তুলেছে। সে যা-ই হােক, মানবেন্দ্র তাে এভাবে ছেড়ে দিতে পারবেন না মেয়েটাকে। তাঁর জীবনে প্রথম বাবা ডাকটা তাে ওরই কচি মুখটা থেকে এসে জুড়িয়ে দিয়েছিল প্রাণ। সে কি ভােলা যায়! রক্তই তাে সকল সম্পর্কের একমাত্র পরিমাপ নির্ধারক শক্তি হতে পারে না। আরও কিছু আছে। আরও বড়াে কিছু।

সেই থেকে শান্ত হয়ে বুকের কাছে বসে আছে মেয়েটা। মােবাইলটা বুকের কাছে মুঠো করে ধরা। চোখ কোন অজানায় কে জানে। মেয়ের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বুকের ভেতর একটা উঠে আসা ঢেউ অনুভব করেন মানবেন্দ্র। সাদা নরম চুলগুলাের গুচ্ছ তাঁর চোখের সামনে একটা শূন্যতা এঁকে দিয়ে যেন কেঁপে কেঁপে আবার থেমে যাচ্ছে।।

‘চুলগুলাে এভাবে সাদা করলি কেন সােনা মা?’ মৃদু প্রশ্ন করেন মানবেন্দ্র, ‘চুল বুঝি সাদা হয়? চুল তাে কালাে হয়।’ 

‘এগুলাে চুল নয় বাপি…’ ফিসফিস করে বলে দিঠি। চমকান মানবেন্দ্র। ডক্টর সিং বলেছেন ওর সাথে স্বাভাবিক বিষয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতে। কিন্তু সে সব চেষ্টা প্রায়শই ফলবতী হয় না। এখন একবারেই জবাব দিয়েছে দিঠি। 

‘চুল নয়? তবে কী এগুলাে?

এবার বাবার পাশ থেকে উঠে দরজার বাইরে উঁকি দিয়ে দেখে আসে দিঠি, ভাবখানা এমন যেন কেউ ওর কথা না শুনতে পায়। তারপর প্রায় নিশ্ৰুপ আওয়াজে বলে, ‘এগুলাে বরফ বাপি, আমি বরফের মুকুট পড়েছি দ্যাখাে…’

‘কেন? বরফের মুকুট কেন পড়েছ মা? তােমায় আমি সােনার মুকুট গড়িয়ে দেব..’

‘না বাপি.. তুমি কিছু জানাে না… সেইইই হিমালয় পাহাড়ের অনে এ এ এ ক ওপরে… একদম চূড়ায় যদি ওঠো… গুঁড়াে গুঁড়াে বরফ। এমনভাবে পড়বে তােমার মাথায়… দেখে মনে হবে তুমি বরফের মুকুট পড়ে আছ… সেইখানে গিয়েছিলাম তাে আমি… আমি আর… আমি আর…’

খুব প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল দিঠিকে। খুব একটা আনন্দের সঙ্গে যেন একটা স্বপ্নের ঘােরের মধ্যে থেকে কথা বলে যাচ্ছিল ও। কিন্তু আচমকাই সেই উজ্জ্বল চোখদুটির ওপরে একটা যেন ছায়া নেমে আসতে থাকে। মানবেন্দ্র তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন, “আচ্ছা আচ্ছা… আমি বুঝেছি । সােনা মা… আর বলতে হবে না… চল আমরা ডিনার করে নিই…’

হঠাৎ দিঠি দায়িত্বশীল দিদির গলায় কথা বলে ওঠে, “বুনু কোথায় বাপি? বুনু খাবে না?’

“সে তাে বেড়াতে গিয়েছে.. তােমাকেও তাে কত ডাকল ওরা। তুমি গেলে না…’

‘কিন্তু বাপি… বুনু কিন্তু একদম পড়াশােনা করছে না.. এরকম করলে পাশ করবে কী করে?’

মানবেন্দ্র কিছু বলার আগেই বন্যা এসে দরজা ঠেলে ঢােকে। বারান্দা থেকেই দিদির কথাটা কানে গিয়েছে তার। কোমরে হাত দিয়ে দিদির মুখােমুখি দাঁড়ায়। বিদ্রুপের হাসিতে ঠোট বেঁকানাে। বিসদৃশভাবে আচমকা চেঁচিয়ে ওঠে দিঠির সামনে গিয়ে, ‘বাঃ… এদিকে তাে নাকি মাথাখারাপ, আর আমার অ্যাবসেন্সে আমার নামে নিন্দে করা হচ্ছে?’

‘বন্যা! বুঝে কথা বলাে’ জোরে ধমকে ওঠেন মানবেন্দ্র। দিঠি হঠাৎ মারমুখী বন্যাকে দেখে কেমন দিশেহারার মতাে গিয়ে সােফার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে পড়েছে। ভাঁজ করা দুই হাঁটুর মধ্যে গুঁজে দিয়েছে মাথা। বন্যা গোজমুখে তর্ক করে যায়। 

‘সব শুধু কেন আমাকেই বুঝতে হবে বাপি? আমি কি তােমার মেয়ে নই? তােমার সমস্ত অ্যাটেনশন শুধু একজনই পাবে? কেন ? 

এবার হতাশ লাগে মানবেন্দ্রর। কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে বন্যার এটা উনি বুঝতে পারছেন। এরকম ছিল না মেয়েটা। দিদি অন্ত প্রাণ ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাসে চোখের ওপর বদলে গেল। ওর সাথে একান্তে কথা বলতে হবে। বুঝিয়ে বলতে হবে সবটা। ভাবেন মানবেন্দ্র। কিন্তু তারও আগে একটা অত্যন্ত জরুরি কাজ সেরে ফেলার আছে। যেটা করে ফেলতে পারলে হয়তাে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। 

কেউ জানে না এ কথাটা। আর জানানাের মতাে আছেই বা কে? বন্যা বা দিঠিকে তাে বলার মতাে পরিবেশ নেই। দিন পনেরাে আগে পার্থজিতের খোঁজ পেয়েছেন মানবেন্দ্র। খুব অদ্ভুতভাবে দেখা হয়ে গিয়েছিল। দুদিনের জন্য ফ্যাক্টরির কাজে মুম্বাই গিয়েছিলেন মানবেন্দ্র। সেখানে এক কলিগের পাল্লায় পড়ে এলিফ্যান্টা কেভ যেতে হয়েছিল। সেখানেই এক গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে থাকা উদাস চোখের পার্থজিৎকে দেখতে পেলেন। মানবেন্দ্র একাই চমকেছিলেন। পার্থজিৎ একটুও চমকায়নি। স্মিত হেসে এগিয়ে এসেছিল কিছু দূরে স্থানুর মতাে দাঁড়িয়ে থাকা মানবেন্দ্রর দিকে। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন এই এতদুরে এসে দেখা হওয়াটা পূর্বনির্ধারিতই ছিল। তাৎক্ষণিক বিস্ময় কাটিয়ে মানবেন্দ্র সুস্থির হয়ে এসে বসেছিলেন সেই মন্দির পার্শ্ববর্তী গাছের গােড়ায়। একটু একটু করে শুনেছিলেন পার্থজিতের অন্তর্ধানের কারণ। শুনেছিলেন আর নতুন করে আরও একরাশ অন্ধকারে যেন ডুবে গিয়েছিলেন। এমন সুন্দর একটি তাজা প্রাণের সামনে যখন দুরারােগ্য ক্যান্সার মৃত্যু পরােয়ানা ঝুলিয়ে দেয় তখন তার কোনও আচরণই আর অপরাধ বলে মনে হয় না। পরীক্ষানিরীক্ষা চলছিল অনেকদিন ধরেই। নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেই পার্থ দিঠির থেকে দূরে চলে এসেছে। কলকাতার যে কলেজে ও পড়াচ্ছে এখন সেই ঠিকানা আর ফোন নম্বরটুকু নিয়ে চলে এসেছিলেন মানবেন্দ্র। দিঠির কোনও খবর দিয়ে আর ওকে ভারাক্রান্ত করতে ইচ্ছে হয়নি। ফেরার পথে সারা রাস্তা শুধু কানে বেজেছিল পার্থর বলা একটি কথা, ‘দিঠির কাছে আমি অপরাধী হয়ে রইলাম, কিন্তু ঈশ্বরের কাছে আমি অপরাধী হতে পারব না, তাই সরে এসেছি। দিঠির জীবনটা আমি নষ্ট হতে দিইনি আমার এটাই সান্ত্বনা।’

তখনও মনস্থির করতে পারেননি মানবেন্দ্র। তখন নয়, তারপরেও অনেকদিন পর্যন্ত নয়। কেবলই মাথার মধ্যে জটিলতম সমীকরণের খেলা চলেছে। দুরারােগ্য মৃত্যুমুখী অসুখ বা অসুখজনিত শূন্যতাবাহী প্রিয়সঙ্গ নাকি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে অপ্রকৃতিস্থ বেঁচে থাকা, কোনটা বেশি কাম্য? যে কোনও একটা বেছে নিতে বললে কোনটা মেনে নেবে মন? মানবেন্দ্র পারেননি মেয়ের অকাল বৈধব্য মানতে। তাই পার্থজিতের কথা মুখ ফুটে বলেননি কাউকে, বন্যা বা দিঠিকেও না। কিন্তু দিঠি যেদিন সমস্ত চুল সাদা করে এল পার্লার থেকে সেদিন একটা ধাক্কা লাগল মনে। সেদিনই প্রথম মনে হয়েছিল, পার্থজিৎ ছাড়া আর কেউই পারবে না দিঠির মনের জট ছাড়াতে। তারপর থেকে। অনেকবারই বিভিন্ন মুহূর্তে মনে হয়েছে মানবেন্দ্রর পার্থজিতের সঙ্গে দেখা করে তাকে দিঠি সম্পর্কে সব জানানাে দরকার। আর এখন তাে সােফার কোনায় ধ্বংসস্তুপের মতাে কুণ্ডলি পাকিয়ে বসে থাকা মেয়েটাকে দেখে আরও বেশি করে মনে হয় এবার ওকে পার্থজিতের কাছে নিয়ে যাওয়া অবশ্যই দরকার। তা না হলে কখনওই পুরােপুরি সুস্থ করে তােলা যাবে না দিঠিকে। অনাগত মৃত্যুর বিভীষিকা হেরে যায় অনাগত সুন্দর স্বপ্নের কাছে। সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলেন মানবেন্দ্র। 

বন্যা পা দাপিয়ে দরজা কাপিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেছে। মানবেন্দ্র মনস্থির করেন। পায়ে পায়ে দিঠির পাশে এসে বসেন। মাথায় হাত রাখেন।

‘সােনা মা… আমার দিকে তাকাও… শােনাে…’

দিঠি নড়ে না। হাত দুটোকেও মুঠো করে খুঁজে রেখেছে। মানবেন্দ্র একটু জোর করেই মেয়েকে নিজের দিকে ফেরাতে যান। এতক্ষণ দেখা যায়নি, এবার নাইটির ভেতরে সন্তর্পণে রেখে দেওয়া মােবাইলটা বের করে মেঝেয় ছুঁড়ে ফেলে দেয় দিঠি। বাবাকে আঁকড়ে ধরে বলে ওঠে, ‘আমি আর ফোন করব না বাপি, ও তাে সব সময় ব্যস্ত… একটুও সময় নেই ওর…’

‘পার্থ ফোন ধরবে মা… আবার ফোন ধরবে..’ মেয়ের মাথায় আদরের হাত বােলাতে বােলাতে বলেন মানবেন্দ্র। কিন্তু কাজ হয় না তাতে। আবার নেগেটিভ ঝোক চেপেছে দিঠির মাথায়। চিৎকার করে মাথার চুলগুলােকে টেনে টেনে ছিড়তে চায়। নিজের হাতে খিমচে ধরে। এটাই রােগ ওর। এরকম চলবে কিছুক্ষণ। মানবেন্দ্র ধীরে ধীরে মােবাইলটা কুড়িয়ে নিয়ে আসেন। পার্টসগুলাে জোড়া লাগান। তারপর খুব স্বাভাবিক শান্ত গলায় বলেন, “কলকাতা যাবি? সােনা মা?’

এই যে মেয়েটা অশান্ত ঘূর্ণিঝড়ের মতাে মত্ত ছিল, সে হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়। শিশুর মতাে প্রশ্ন নিয়ে বড়াে বড়াে দু’চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে, ‘কলকাতা? কলকাতায় কী আছে বাপি?

‘কলকাতায় ? কলকাতায় বরফ আছে সােনা মা, অনেক অনেক বরফ। তােমায় চুল সাদা করতে হবে না, এমনি তােমার সারা গায়ে মাথায় গুঁড়াে গুঁড়াে বরফের আস্তরণ শান্তির পালক বুলিয়ে দেবে, তােমার সব কষ্ট জুড়িয়ে যাবে মা… কালাে রাত্রির বুক বেয়ে ওই সাদা বরফের স্রোত তােমার নতুন এক জন্মদিন নিয়ে আসবে। তুমি দেখতে পাবে সবটা… তুমি.. আর…’

দিঠি শান্ত হয়ে শুনছিল। ওর বড়াে বড়াে চোখ দুটোতে কতদিন যেন কাজল ছোঁয়ানাে হয়নি। তবু কী আশ্চর্য কাজলকালাে দেখাচ্ছিল দু’চোখের কোলগুলাে, যেন বর্ষার আগে থমকে থাকা মেঘের পুঞ্জ। সেই দুই চোখে বিস্ময় নিয়ে, আর সেই সঙ্গে অনেকখানি খুশি ভরে নিয়ে তড়িঘড়ি বলে ওঠে, ‘হা বাপি… দেখব… আমি… আমি… আর. আর…’

মেয়ের মাথা বুকে চেপে ধরে বলেন মানবেন্দ্র, তুমি আর পার্থ সােনা মা, তােমরা দুজনে একসঙ্গে সেই বরফের মুকুটটা মাথায় পরবে। যে কটা দিন ঈশ্বর দেবেন, তােমরা একসঙ্গে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিও।

অলঙ্করণ: মৃণাল শীল 

 

Trending


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes