jamdani

বডি 

বিনােদ ঘােষাল 

ইয়াসিনের পাঁজর বার করা শুকনাে, নির্লোম বুকে আঙুল দিয়ে খোঁচা দিয়ে পিউ বলল, শুধু ছড়া কাটলে হবে? পেটে একটু নুনপান্তাও তাে দিতে হবে নাকি? যা চেহারা হয়েছে আর খুব বেশিদিন বাঁচবি বলে মনে হয় নাইয়াসিন পিউয়ের কথায় হাসল। কথাটা মিথ্যে নয়চব্বিশ বছরের ইয়াসিন আনােয়ারের চেহারাটা আগুনে ঝলসে যাওয়া গাছের মতাে। পােড়া, খটখটে শুকনাে। একবার তাকালে যে কেউ বুঝবে ছেলেটার জীবনের সব রস শুকিয়ে গিয়েছেনেহাৎ টিকে রয়েছে এই যা। অতিরিক্ত রােগা বলে ছয়ফুট উচ্চতার ইয়াসিন অল্প বয়সেই কোলকুঁজোইয়াসিন সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত খাটেএই সন্ধ্যানগর জুটমিলের ইয়াসিন হল গােডাউন সুপারভাইজারযদিও এই কাজ করতে ওর অসহ্য লাগে। সেই নাইনটিন সিক্সটি ফোরে মজফফরপুর থেকে ইয়াসিনের বাবা ফারুক হােসেন কাজের খোঁজে কলকাতায় বেশ কিছুদিন কাজের সন্ধান করে তেমন কিছু সুবিধার জুটল না। শেষে কলকাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে গঙ্গার ধারে বহু পুরােনাে সন্ধ্যানগর জুটমিলে ঠাই মিলললেবার হয়ে ঢুকে সুপারভাইকর পদ পর্যন্ত উঠেছিল ফারুকমিলের কোয়াটারেই থাকার জায়গাএকটা সময় ছিল যখন এই রাজ্যে জুটমিলের রমরমা বাজারগঙ্গার ধার ঘেসে অজস্ৰ মিল গড়ে উঠেছিলকম বেশি প্রতিটা চলত ভাল। এই সন্ধ্যানগর জুটমিলও প্রতিবছর বেশ ভাল লাভের মুখ দেখত। শ্রমিক কর্মচারীদের মাইনে বােনাস, ওভারটাইম ছিল ভালসন্ধ্যানগর রেলস্টেশন ছিল একটা জংশনকর্ড আর মেনলাইন এখান থেকে দুইভাগফলে জংশন এবং জুটমিলকে ঘিরে সন্ধ্যানগরে গড়ে উঠেছিল সন্ধ্যাবাজার নামে এক বিশাল পাইকারি বাজার। সেখানে কঁচা আনাজ থেকে মুদি সবকিছুই পাওয়া যায়।

পাইকারি বাজার হওয়ার ফলে সেখানে প্রতিদিন উদয় অস্ত নানা ধরণের মানুষের আনাগােনা শুরু। বাজারে আসা মুটেমজুর ব্যাপারীদের একটু বিশ্রাম আর আমােদ আহ্লাদ দিতে স্টেশন আর সন্ধ্যাবাজারের মাঝামাঝি জায়গায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠল একটি পতিতাপল্লী। সেই পল্লীর বেশ্যারাও গরিব আর তাদের কাস্টমারও কেউ উচ্চবিত্ত নয়। সবমিলিয়ে ছাপােষা ব্যাপারএখানে বেলফুলের মালা বিক্রি না হলেও, একটা দিশি এবং দুটো বিলিতি মদের দোকান চপ, ঘুগনির দোকান দিব্বি চলতে থাকল। কোনও রসিকমানুষ কোনওকালে এই পতিতাপল্লির নাম দিয়েছিলেন সন্ধ্যারতি। সেই নামই মুখে মুখে ছড়িয়ে ওটাই থেকে গেলকলকাতার সােনাগাছির বাচ্চা সাইজ-এর এই সন্ধ্যারতি দিব্বি রমরমিয়ে চলতে থাকলছােটছােট গুমটি ঘর, টিনের ছাউনি। প্রতিটি ঘরে একজন করে গরিব ঘরের আলগা রঙমাখা প্রজাপতি অপেক্ষা করত, জুটত খদ্দেরঅল্প পয়সায় কিছুটা সুখকোনও ব্যাপারী আবার রাতেও থেকে যেত সামান্য বেশি পয়সা দিয়ে, পরের দিন ভােরের ট্রেনটা ধরে ফিরবে বলেতাে ফারুকের কোনও মেয়েছেলের দোষ ছিল না, কিন্তু সন্ধে হলেই পুরাে বােতল দিশি না হলে তার চলত নাএইটুকুও সহ্য করে নেওয়া যাচ্ছিল কিন্তু জুটমিলের বাজার যখন পড়তির দিকে, বােনাস, ওভারটাইম তাে দূর কি বাত মাইনেও অনিয়মিত হতে শুরু করেছে তখন মদের পিছনে টাকা ঢালা আর বরদাস্ত করল না জাহেদা। লাগল অশান্তিরােজের ঝগড়াঝাটি দেখতে দেখতে কিশাের ইয়াসিন হাঁফিয়ে উঠতবাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করত নাপুঁকতে ধুকতে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়াশােনা করে আর ইস্কুলমুখাে হল না। আসলে জগতের কোনও হইচইই ভাল লাগত না ইয়াসিন আনােয়ারেরবরাবর একটু চুপচাপ, অন্তর্মুখীশুধু তাই নয় কল্পনাবিলাসী এবং জেদি। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় স্কুলের এক বন্ধু ক্লাসে নিয়ে এসেছিল হিন্দী প্রেমের শায়রি নামে একটি চটি বইবইয়ের মলাটে হিন্দী নায়ক নায়িকার ছবি ছিল। বইটা সবাই কড়াকড়ি করছিল বটে কিন্তু ইয়াসিন দুই একটা পৃষ্ঠা পড়ার পর কেমন যেন মনের ভেতরটা করে উঠেছিল ওর। কী সুন্দর শব্দগুলােকী সুন্দর কথা। অনেক শব্দের ভেতরে যে একটা সুর থাকে সেটা ওকে নাড়া দিয়েছিলবইটা নিয়ে এসেছিল বন্ধুর কাছ থেকেসারারাত ধরে পড়েছিলকী অদ্ভুত এক ভালােলাগার অনুভূতি। নেশা ধরে গেলবইয়ের স্টল থেকে ওই ধরনের সস্তার শের শায়রির বই খুঁজে খুঁজে বার করে তাতে মুখ ডুবিয়ে পড়া। উর্দু টু হিন্দি পকেট ডিকশনারি কিনে শব্দের মানে বুঝে নেওয়া চলতে থাকল বেশি কিছুদিনপড়তে পড়তে একদিন ইয়াসিন নিজেই লিখে ফেলেছিল ঔর উসকো দিলায়েগা চ্যায়ন ক্যায়সে দেখেঙ্গে উয়াে হমসে মিলায়েগা নয়ন ক্যায়সে হম উনসে হার কর ভি রহতে হ্যায় খুশ বহত দেখনা উয়াে জিত কর ভি রহেঙ্গা বেচ্যায়ন ক্যায়সে। 

এই চারটে লাইন লেখার পর ঠিক কী যে হয়েছিল ইয়াসিন আনােয়ারের নিজেও জানে নাশুধু এইটুকু বুঝতে পেরেছিল খােদাতাল্লা ইনসানকে যখন এই দুনিয়ায় পাঠান তার সঙ্গে একটি খেলও পাঠান তা হল তার আনন্দদুজনকে একসঙ্গে তিনি কখনই পাঠান না। ইনসানের কাজ হল তার আনন্দকে খুঁজে নেওয়ানসীবওয়ালা হলে চট করে খুঁজে পাওয়া যায় বদনসীব হলে আজীবন ঘুরেও ইনসান তার আনন্দকে খুঁজে পায় না। ইয়াসিন পেয়ে গিয়েছিল। ওই পনেরাে ষােল বছর বয়েসেই পেয়ে গিয়েছিল সেই আলাদিনের চেরাগসকলকে লুকিয়ে লিখতে শুরু করল ইয়াসিন।। কিন্তু প্রতিভা ঢেকে রাখা যায় নাসে কখনও কখনও উপচে পড়বেইতাই হলক্লাসের খাতার পিছনে একদিন ক্লাসটিচার নিজামউদ্দিন স্যার দেখলেন লেখা রয়েছে হর জনিব কোই তুমকো আপনা মিলেগা কোই ভি নেহি তুমকো মগর হামসা মিলেগা। জখম এ মুহব্বত কভি ভরতা হি নেহি হ্যায়। যব ভি মিলােগে তুমকো ইয়ে তাজা মিলেগা বদলতে ওয়ক্ত কে হমরহ হাম নেহি বদলে ইয়াসিন উনহি দিনােসে তুমকো তনহা মিলেগা। শুধু এটা নয়, আরও এবং আরও লেখানিজামউদ্দিন ওর সবকটা খাতা জমা নিয়ে নিলেন তারপর সব পড়ে স্কুল ছুটির পর ওকে ডেকে বললেন স্কুলের খাতায় এইসব লিখিস না। এই নে, তােকে এটা দিলাম এতে লিখবিপ্রতিদিন লিখবি, তাের লেখার হাত হাত রয়েছেআল্লাহর ফেরেস্তা হল শায়রতুই লেখ বাবা। অনেক লেখবলে ছাত্রটির মাথায় হাত বুলিয়ে একটি সুন্দর ডায়রি দিয়েছিলেনআর এই খবরটা দাবানলের মতাে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল ক্লাসের বন্ধুমহল থেকে গােটা স্কুল থেকে ইয়াসিনের মহল্লায়ইয়াসিন আনােয়ার একজন শায়র।

ব্যাপারটা প্রথমদিকে ভালাে লাগত ইয়াসিনেরলিখে বন্ধুদের শােনাত, বন্ধুরা বাহ বাহ করত। নিজামুদ্দিন স্যারও শুনতেনপ্রশংসা করতেন। তারপর একদিন ইয়াসিনের স্কুলে যেতে ভালাে লাগল না। ছেড়ে দিল। ফারুক বললেন স্কুল ছেড়েছিস যখন কাজে লেগে পড়বলে ওকে ঢুকিয়ে দিলেন পরিচিত একটা লেদ মেশিন কারখানায়সারাদিন ধাতব চঁা চোওওও শব্দ শুনতে শুনতে পাগল হয়ে যাচ্ছিল ইয়াসিন। বাড়ি ছেড়ে পালাবে ভাবছিলতখন এক বন্ধুর সহায়তায় পেয়ে গেল বেশ ছিমছাম একটা কাজ। সন্ধ্যাবাজারের মধ্যে একটা চালের পাইকারির দোকানে খাতা লেখাছাদ ছোঁয়া চালের বস্তার আড়ালে সারাদিন বসে আনােয়ার জমা খরচের হিসাব আর শায়েরি লেখা। মানুষের দেখা মেলে কমওখানে বেশ কিছুদিন কাজ করার শেষে বাবার ছেড়ে দেওয়া সেই জুটমিলেই অবশেষ চাকরি লাগলওই বয়সেই হাতে কাঁচা টাকাফলে সেই টাকার সদব্যবহারের থেকে বদব্যবহারের ঝোকই বেশি থাকে। আর ইয়াসিনের মতাে কবির পক্ষে জীবনে সাবধানে চলা খুব কঠিন। তাই শায়রিতে আরও রস মেশাতে উনিশ বছর বয়সেই হাতে গেলাস তুলে নিয়ে বলল দস্ত সাকি সে অগর সরাব মিলে শ হজো কা মুঝে শবাব মিলে খুম পেখুম ভরকে ম্যায় পিউ জাহিদ 

অচ্ছি হাে ইয়া খরাব মিলে দস্ত এ সাকি অগর সরাব মিলে। 

অবশ্য সন্ধ্যাবাজারের মধ্যে একমাত্র দিশি মদের ঠেকটায় ইয়াসিনকে সরাব এগিয়ে দেওয়ার জন্য তেমন কোনও সাকি ছিল ।

ওখানে কাউন্টারে টাকা গলিয়ে নিজের বােতল নিজেকেই নিতে হত। তারপর ছােলাসেদ্ধ বা ঘুগনি দিয়ে বােতল শেষ করাশের আর জাম দুটো নেশা চলতে চলতে ওই দিশি বারেরই এক জুটে যাওয়া বন্ধু একদিন ইয়াসিনকে নিয়ে গেল সন্ধ্যাবাজারের সন্ধ্যারতিতে যেখানে সারে সারে সাকিরা অপেক্ষা করে বসে থাকে গেলাসে জাম ঢেলে দেওয়ার জন্য। ওইখানেই কয়েকদিন যাতায়াত করতে করতে একদনি পরিচয় হয়ে গেল পিউএর সঙ্গে। 

ইয়াসিনের হাসি দেখে গা চিরবির করে উঠল পিউ-এর। আবার দাঁত ক্যালাচ্ছিল। তুই মিলিয়ে নিস এই বয়সে যে রেটে মাল খাস, আর পাঁচ বছরও বাঁচবি বলে মনে হয় নাপিউয়ের কথায় আবারও হেসে উঠল ইয়াসিনডান হাতটা সামান্য শূন্যের দিকে তুলে বলল লায়ি হায়াৎ, আয়েকজা লে চলি, চলে। ন অপনে খুশিসে আয়ে হ্যা। অপনে খুশি চলেজীবন নিয়ে এসেছিল। মৃত্যু নিয়ে যাবে, নিজের ইচ্ছেয় আসিওনি, নিজের ইচ্ছেতে ফিরেও যেতে পারব না। উফ সবসময় ছড়া বলিস নাতােবলে ইয়াসিনের লম্বা চুলগুলােকে খামচে টেনে দিল পিউমুখে বিরক্তি দেখালেও মনে মনে ইয়াসিনকে বেশ কিছুটা ভালবাসতে নেই। খদ্দেররাও বেশ্যাদের ওই শরীরটা ভােগ করার সময়টুকু ছাড়া আর কোনও মায়ায় জড়ায় না। এটাই রীতি, কিন্তু তবু মাঝে মাঝে পৃথিবীতে নানা রকমের দুর্ঘটনা ঘটেঅনেক হিসেব ওলােট পালট হয়ে যায়। এই যেমন ইয়াসিন আরণ পিউএর মােলাকাত। ঘটেছিল আচমকাই, ইয়াসিন সেই রাতে তার সেই রাতের সঙ্গীনির ঘর থেকে প্রায় গলাধাক্কা খেয়েই বেরিয়ে আর খুব বেশি পা এগােতে পারেনি, উল্টে পড়ে গিয়েছিল পিউয়ের ঘরের সামনেপিউয়ের সেদিন খদ্দের হয়নি, মেজাজ খারাপ ছিল। তার ওপরে আবার এমন উটকো এসে দোরের সামনে উলটে পড়ে গেলে কার মাথার ঠিক থাকে। হতভাগাটাকে হাত ধরে টেনে সরাতে গিয়ে মুখটা দেখে কেমন একটু মায়া লেগেছিল পিউএরসরিয়ে দেওয়ার বদলে পট্টির দালাল শিবুর সাহায্য নিয়ে ছেলেটাকে নিজের ঘরে ঢুকিয়ে নিয়েছিলনইলে সারারাত ওইভাবে বাইরেই পড়ে থাকবে। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর ইয়াসিনের পরিচয় হয়েছিল পিউয়ের সঙ্গে। তারপর থেকে পিউয়ের কাছেই আসেদেখতে দেখতে পায় দেড় বছর… পিউ মাঝে মাঝে ভাবে ও ইয়াসিনকে বেশী ভালবাসে নাকি বলা ওই ছড়াগুলােকী সুন্দর যে লাগে শুনতেইয়াসিন অনেকবার বলেছে, এগুলােকে ছড়া বলে না, শের বলে। পিউ খিলখিল করে হেসে বলে, ধেত শের মানে তাে বাঘহাল ছেড়ে দিয়েছে ইয়াসিনইয়াসিন বলল আহ চুল ছাড় লাগছে

ছাড়ব না, বলে আরও জোরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল, মহা শয়তান তুইখুব যে বড় বড় কথা বলছিস, মরে গেলে তােকে কবর দেওয়ার লােকও তাে পাবি না রেবাপ মা তাে লাথ মেরে ঘর থেকে দূর করেই দিয়েছেতাের বােতলের বন্ধুরা কেউ ছুঁতেও আসবে নাশুনে ইয়াসিন হাসলবলল, আমি মরে গেলেও আমার বডির ডিমান্ড থাকবে বুঝেছিস। সেই ব্যবস্থা করে ফেলেছিরাত আটটার সময় পিউএর ঘরে এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে পিউ চমকে উঠে বলল, মানে? মানে? বলে রহস্যময় হাসল ইয়াসিন। ব্যাপার কী হয়েছে জানিস, আমি বেশ অনেকদিন ধরেই ভাবি এই যে আমি শের লিখছি, মদ খাচ্ছি, রােজ তাের কাছে আসছি, কাজ করছি, একদিন মরে যাব, কেউ কিছুই জানবে না। দুদিনও কেউ আলােচনা করবে না আমাকে নিয়ে, তাহলে কী করতে এলাম? এই দুনিয়ায় থেকে এতদিন তার থেকে এতকিছু নিয়ে তাকে কী দিলাম আর মনে রাখার মতই বা কী করলাম। পােকা মাকড়ও তাে জন্মায়, মরে যায়, তাহলে আমার আর পােকার মধ্যে পার্থক্য কী? কিছুদিন আগে আমার প্রিয় সায়র ফিরাখ গােরখপুরীর একটা শের পড়েছিলাম, ফিরাখ লিখেছেন আনেওয়ালি নসলে তুম পর রশক করেঙ্গি হামসুযব ইয়ে উনকো ধেয়ান আয়গা তুম নে ফিরাক কো দেখা হ্যায়। কিন্তু আমি তাে ফিরাক নয়, তার নখের ধুলাে হওয়ার যােগ্যতাও নেই আমার, তাহলে আমি কী করব? কী করলে আমি মরে গেলে কেউ না হলেও অন্তত তুই মনে রাখবি হাঁ ম্যায়নে ইয়াসিন কো দেখা হ্যায়আমি ভাবছিলাম বুঝলি, ভাবতে ভাবতে একদিন সুযােগ জুটে গেলবলে ইয়াসিন উঠে বসল। চৌকির পায়ার কাছে রাখা রামের বােতলটা হাতে নিয়ে একটোক খেয়ে আবার ওটা রেখে দিয়ে বলল, আমাদের মহল্লায় কয়েকদিন আগে রক্তদান শিবির ছিলপাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, থেমে গেলাম। ইচ্ছে হল রক্ত দিই। ওজন মেশিনে আমার ওজন দেখে ডাক্তার বলল ওজন খুব কম, ব্লাড দেওয়া যাবে না। মন খারাপ করে ফিরে আসছিলাম। একটা ছেলে ডাকলআমাকে জিজ্ঞাসা করল মরনােত্তর দেহদান করবেন ? জিজ্ঞাসা করলাম সেটা কী? ছেলেটা বলল, আপনি মারা যাওয়ার পর আপনার বড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় কিংবা দফন করে যান তাহলে মানুষের কোনও কাজেই আসে নাকিন্তু যদি আপনি আপনার বডি দান করে যান তাহলে মানুষের অনেক উপকার হবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কী উপকার হবে ভাই? বলল আমার বডি নাকি মেডিকেল কলেজে যে ডাক্তাররা পড়াশােনা করে তাদের অনেক কাজে লাগবেআমার বডির যেসব আইটেমগুলাে ভাল রয়েছে যেমন চোখ, কিডনি তারপর… লিভার.. না না আমার লিভার নেওয়ার মতাে নয়, বাকি অন্য যা সব রয়েছে সেগুলাে খুলে জীবিত যাদের এগুলাে দরকার।

ডাক্তাররা তাদের শরীরে এগুলাে সেটিং করে নিতে পারবে তারা বেঁচে যাবেতারপর অনেক রিসার্চ করতে পারবেতাে আমি দেখলাম বেঁচে থেকে তাে কারও হেল্প করতে পারলাম না, আর কদিনই বা বাঁচব তাে মরে গিয়ে যদি দুটো মানুষের হেল্পে লাগি তাে খারাপ কী? আর এমনিতেও আমি মরলে দফন করার জন্যও কেউ থাকবে না, তাের এখানে যদি মরি, তুইও বিপদে পড়বি। তাে তার থেকে বডি দান করে দিলে ব্যাস, কেউ একজন ওখানে ফোন করে দিলেই ওরা এসে নিয়ে যাবে।। ইয়াসিএমন সহজভাবে কথাগুলাে বলছিল যেন মরাটা ওর কাছে কোনও ব্যাপারই না, বেঁচে রয়েছি সেটাই আশ্চর্যেরপিউ এতদিনে ইয়াসিনকে অনেকটাই বুঝেছেযে সবসময় শরীরের লােভ নিয়ে এখানে আসে তাও নয়, কোনওদিন এসে অনর্গল শুধু কথা বলতে থাকে, কোনওদিন আবার এসে বলে আজ তাের গল্প শুনব, আবার এক এক দিন এসেই বলে আজ খুব ক্লান্ত একটু ঘুমােতে এসেছি। পিউ হাসে, মজা পায়, এমন খদ্দেরও হয়আর এই জন্যই হয়তাে ভাল লাগে ইয়াসিনকে। পিউ বােঝে ছেলেটার ভেতরে একটা একটা অন্যরকম ক্ষিদে রয়েছেকিন্তু সেই ক্ষিদে কেমন তা ও নিজেও বােঝে নাএসব কী বলছিস তুই? এত মরার শখ যখন যা না গিয়ে গলায় দড়ি দে, কিংবা ট্রেন লাইনে গলা দে, আমার কাছে এসে দিন রাত পড়ে থাকিস কেন? ইয়াসিন রাজেশ খান্নার গলা নকল করে পুস্পা মুঝে নেহি মালুম কিঁউ ইয়াহা আতা । সায়দ তুমহে নেহি দেখকর চ্যায়েন নেহি আতে ইসি লিয়ে আতা হুঁ। হুঁহু আর ঢং করিস না। একদিকে অবশ্য ভালই করেছিসকোনদিন রাস্তাঘাটে মরে পড়ে থাকবি শেয়াল কুকুরে খাবে তার থেকে ওই ক্যাচড়া বডি দান করে দেওয়াই ভাল বলতে বলতেই পিউ দেখল ওর এই কথাগুলাে বলতে ভঅল লাগছে না। মন খারাপ হয়ে উঠছে। ইয়াসিন হা হা করে হেসে উঠলআরেক চুমুক মদ খেয়ে বলল দাঁড়া একটা জিনিস দেখাই তােকেপ্যান্টের হিপপকেট থেকে মানিব্যাগটা বার করে সেখান থেকে কার্ড বার করল ইয়াসিন।

পিউয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল এই দেখ, এটা হল বডি ডােনেশনের কার্ড। বেঁচে থাকতে তাে কারও উপকারে লাগলাম না, মরার পর যদি কয়েকজনের কাজে লাগি... এটার দাম আমার কাছে আধার, ভােটার, এটিএম কার্ডের থেকে অনেক বেশি, বুঝলিপিউ ইয়াসিনের কাছ থেকে কার্ডটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। ওর ছবি দেওয়া কার্ডটায় নাম ধাম ইত্যাদি লেখাআর কার্ডের অপর পিঠে সংস্থার নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার ইত্যাদিভারি অদ্ভুত লাগছিল পিউএরবসিরহাটের মেয়ে পিউ ক্লাস সিক্স পাশ করার পর আর স্কুল যেতে পারেনি। ভ্যানওলা বাবার চারটে ছেলে মেয়ের মুখে দুইবেলা জোটে কি জোটে না। বয়সের সঙ্গে লাফিয়ে বাড়ছিল খিদে। পেটের টানেই চোদ্দবছর বয়েসে প্রথম নিজের শরীর ছুঁতে দিয়েছিল পাড়ার শিবুদাকে। কুড়ি টাকা পেয়েছিল। সেই শুরু। সহজে রােজগারের পথটা খুব দ্রুত ধরে নিয়েছিল পিউ। ছােটবেলায় পাড়ার মল্লিকাপিসিকে দেখে জীবনে খুব স্বপ্ন ছিল নার্স হওয়াররুগীদের সেবা করত বলে পাড়ায় মল্লিকাপিসিকে সকলে খুব শ্রদ্ধা করত। সেইজন্য বড় লােভ ছিল অমন হওয়ার। সেই জন্য বড় লােভ ছিল অমন হওয়ারসেই স্বপ্ন মেটেনিপিউ তার এই স্বপ্ন তার এই স্বপ্নের কথা শুধু একজনকেই বলেছে, ইয়াসিনইয়াসিন উত্তর দিয়েছে নার্সের বদলে তওয়াইফ হয়েছিস বলে মন খারাপ করিস না পিউ। নার্স যেমন রুগীর সেবা করে, তুইও আমাদের মতাে ঘায়েল দিল মরিজদের সেবা করিসকথাটা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠতে গিয়ে সেদিন ইয়াসিনকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিল পিউআজ এতকাল পরে ইয়াসিনের কার্ডটা দেখে ওর মনে কী হল কে জানে দুম করে বলে বসল আমিও বডি দান করতে পারি ? পারি মানে? তাহলে এতদিন কী করছিস তুই? বলে হাে হাে করে হেসে উঠেছিল ইয়াসিন।

অনেক রাতএকা চুপ করে শুয়েছিল পিউঘরে এখনও লাইট নেভায়নিখায়ওনি কিছুখিদে নেইআজ সন্ধেবেলা থেকে একটা মাছের ব্যবসায়ী ছিল ঘরেগায়ে যেমন ঘাম আর মাছের আঁশতে গন্ধে ভরপুর। প্রথম প্রথএমন বদ গন্ধে বমি পেত, কান্না পেত, শরীরের ওপর চেপে বসা কুৎসিত সব শরীরগুলােকে এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে ছুটে পালাতে ইচ্ছে করত এই পৃথিবী ছেড়ে। তীব্র অভিমান ঝরে পড়ত তার জন্ম দেওয়া বাবামা পরিবার এই দুনিয়ার সবকিছুর প্রতিঘেন্না আছড়ে পড়ত প্রত্যেকের গায়ে। মরে যেতে ইচ্ছে করত পিউয়েরবেঁচে থাকার কোনও সঙ্গত কারণ খুঁজে পেত না ওবসিরহাটে নিজের বাড়ি চিরকালের মত ছেড়ে দিয়ে যেদিন দালালের মারফত চলে এসেছিল ধান্দার জন্য তারপর অনেকগুলাে বছর নানা 

ঘাটের জল খেতে হয়েছে ওকেভয়ঙ্কর সেসব অভিজ্ঞতাসাতাশ বছরের পিউ সেইসব কথা ভাবলে এখনও শিউরে ওঠেকত ঝড়ঝাপটা যে এই শরীর এই মনের ওপর দিয়ে গিয়েছে। এক এক দিন এমনও হয়েছে আর যন্ত্রনা সইতে না পেরে সারাদিন বসে থেকেছে রেললাইনের ধারেচলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাপিয়ে পড়বে সইতে না পেরে সারাদিন বসে থেকেছে। রেললাইনের ধারে। চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাপিয়ে পড়বে ভেবেও শেষ পর্যন্ত পারেনি, শাড়ি পাকিয়ে সিলিং ফ্যানে ছুঁড়ে দেওয়ার পর মনে হয়েছে আর কিছুদিন দেখা যাকনাহ কিছুই বদলায়নি আরও কিছুদিন পরে বরং আহত হতে হতে এক সময় জীবন বলে যে পদার্থ রয়েছে, যে একজন জ্যান্ত মানুষ সেটাই ভুলে গেলভালবাসাহীন ভাতড়ালের মতই প্রেমহীন যৌনতায় একসময় স্রেফ অভ্যাসে থেকে যেতে থাকল ওঅনুভূতিহীন একটা জীবনএকদিন পরিচয় হল ইয়াসিনের সঙ্গেখদ্দের আর বেশ্যার সম্পর্ক যেমন য় তেমনই সম্পর্ক দিয়ে শুরু হয়ে তার থেকে সামান্য কিছুটা বেশিকিন্তু ওই পর্যন্তই পিউ বা ইয়াসিন কখনই কেউ কাউকে বলেনি ‘ভালবাসি’, কখনই ভাবেনি একে অপরের সঙ্গে আজীবন থেকে যাওয়ার কথা। কারন দুজনেই উদাসীন জীবনের ব্যাপারে, ভবিষ্যতের ব্যাপারে। তবু কখনও কোনও আন্তরিক অসতর্ক মুহুর্তে এই ঔদাসিন্যের গভীর আড়ালে না মরে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছেরা আচমকাই উকি দিত, উঁকি দেয়। যেমন ইয়াসিনের ওই মরনােত্তর দেহদানের কার্ড আর ওর মুখ থেকে সেইকথাগুলাে শােনার পর পিউএর হঠাই মনে হয়েছিল ওর জীবনে এই শরীরটাই সববেঁচে থেকে শরীর শুধু বিক্রিই করেছি, বাকি যতদিন বাঁচব হয়তাে তাইই করে যেতে হবে, তাই জীবনের শেষে অন্তত কিছুটা সত্যিকারের ভাললাগা, কিছুটা আরাম, একটু শান্তি মিলতইয়াসিনকে চমকে দেবে সেই ইচ্ছে নিয়ে কাল সকালে পিউ একাই গিয়েছিল দেহদান করার অফিসে। ইয়াসিনের কার্ডের পেছনে যে ঠিকানাটা দেওয়া ছিল সেটাতেইঅফিসটা সন্ধ্যাবাজার থেকে পাঁচ কিলােমিটার দূরেঅটো করে যেতে হয়এনজিওর একটা অফিসঘরএকটা ছেলে ফর্ম দিয়েছিল। সেটা নিয়ে ফিরেছিল পিউসন্ধেয় ইয়াসিন ওর ঘরে আসার পর ইংরেজিতে লেখা তিন পৃষ্ঠার ফর্মটা ইয়াসিনের সামনে। মেলে ধরে পিউ বলেছিল এটা ভরে দে তােইয়াসিন বেস কিছুক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ফর্মর্টার দিকেতারপর পিউয়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিল তুই সত্যিই চলে গিয়েছিলি। তুই শালা সত্যিই... অন্যরকমবলে জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। পিউ ফিক করে হেসে বলেছিল হুঁ যেমন তুইনে ভর এটা। 

আচ্ছা শােন আমি তাে তাের আগে মরব, এটা গ্যারান্টেডতুই কিন্তু আমার হয়ে ওদের ফোন করে জানাবি বডি নিয়ে যাওয়ার জন্য। হুঁ, আর যদি আমি আগে ফুটে যাই তাহলে তুই। তারপর দুজনেই হেসে উঠেছিল জীবনকে কঁচকলা দেখিয়েপিউকে কিছু করতে হয়নি, ইয়াসিনই ওর হয়ে ফর্মটা ফিলআপ করে দিয়েছিলতারপর ওর হাতে দিয়ে বলেছিল, তাের জন্য সত্যি আমার অহংকার হচ্ছে রেপরদিন ওই ফিলআপ করা ফর্মটা নিয়ে পিউ আবার ছুটেছিল ওই অফিসেবুকের ভেতরে মুঠো মুঠো আনন্দ। সেই ছেলেটার হাতে ফর্মটা জমা দিয়ে খেয়াল করেছিল একটা মাঝবয়েসি টেকো লােক একটু দূরের চেয়ারে বসে ওকে একদৃষ্টিতে দেখছে। একটু ঘাবড়েই গিয়েছিল পিউ। চেনা নাকিফর্মটা দেওয়া ছেলেটাকে হাঁক পেড়ে ডেকেছিল লােকটাছেলেটাকে নিচু গলায় কিসব যেন বলছিল আর বার বার ওদের দিকে তাকাচ্ছিল, মনে কু ডাকছিল পিউর। ছেলেটা আবার ফিরে এসে ফর্মটায় চোখ বুলিয়ে বলেছিল আপনি পেশার জায়গায় ফাঁকা রেখেছেন কেন? কিছু করেন না? পিউ উত্তর দিয়েছিল, না কিছু করি নাআপনি তাে বিবাহিতা তাে নন দেখছি তাহলে কি বাবা মায়ের সঙ্গে থাকেন? না আমি একা থাকিএকা? তাহলে আপনার ইনকামের সাের্স কী? এবার পিউ একটু বিরক্তি নিয়েই বলে উঠেছিল সেটা জানাতেই হবে নাকি? নিশ্চয়ই জানাতে হবে। নইলে আর ফর্মে লেখা রয়েছে কেন? ফর্ম ঠিকঠাক ফিলআপ না হলে আমরা এটা অ্যাকসেপ্ট করতে পারব না। 

কেন পারব না? আমি তাে বডি বেচতে আসিনি, দান করতে এসেছিঅত সমস্যা কিসের? রেগে উঠেছিল পিউআবার তাকিয়েছিল সেই টেকো লােকটার দিকে। ওর জীবন ওকে অনেককিছু শিখিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে মানুষ চেনা। হাত তুলে লােকটা আচমকাই ডেকে উঠেছিল পিউ। ও দাদা এদিকে একবার শুনবেন? এমন আহ্বানে লােকটা কেমন ঘাবড়ে গিয়ে সত্যিই উঠে এসেছিল ওদের সামনে। কী হয়েছে? আচ্ছা দাদা আপনি তাে আমাকে চেনেন, আমিও আপনার সবটা চিনি, বলুন তাে এখানে আমি কী কাজ করি সেটা লেখা কি দরকার রয়েছে? বেমালুম আন্দাজে ঢিলটা ছুঁড়ে দিয়েছিল পিউআর লােকটা মুহুর্তের মধ্যে কাঠের মতাে শক্ত হয়ে গিয়ে একটু আমতা আমতা করে পরক্ষণেই বলে উঠল কে বলেছে? কে বলেছে আমি আপনাকে চিনি? মােটেই চিনি না। 

কে আপনি? তাই সত্যিই চেনেন না? নাহ... চিনি নাবলে আর দাঁড়ায়নি লােকটাএকেবারে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলফর্ম দেওয়ার অল্পবয়েসি ছেলেটা তখন গলা নামিয়ে বলেছিল, দিদি আপনি দত্ত বাবুকেই চটিয়ে দিলেন? উনিই সব ফর্ম এখান থেকে হেড অফিসে স্যাংশান করে পাঠান। এখানে আর আপনার কাজটা হবে নাআপনি বরং অন্য কোথাও দেখুনঅন্য কোথাও ? কোথায়? কলকাতায়। আমাদের মতাে এমন এমন বেশ কিছু অফিস রয়েছে, হসপিটালও রয়েছে। গিয়ে খোঁজ নেবেনকলকাতায়। আমি কী করে চিনব ? প্লিজ একটু ওই দাদাকে বলুন না। ছেলেটা ঠোট ওল্টাল। আচ্ছা আমি অন্যায় করেছি, ওর কাছে ক্ষমা চাইছি বলুনএকটা কথা জিজ্ঞাসা করব আপনাকে? কী ? দেহ দান করার জন্য আপনার এত আর্জ মানে এত ইচ্ছে কেন? প্রশ্নটার মুখে থমকে গিয়েছিল পিউকী বলবে ছেলেটাকেবলে ফেলেছিল, জানি না। ছেলেটা কী বুঝেছিল কে জানে, বলেছিল আপনি একটু বসুন, আমি দেখছি। উঠে গিয়েছিল চেয়ার ছেড়ে বাইরে। বেশ কিছুক্ষণ পর পর ফিরে এসে চেয়ারে বসে বেশ আমতা আমতা করে বলেছিল উনি মানে রাজি হয়েছেন কিন্তু..

কী চাই বলুন? ওনার পান সিগারেটের নেশা খুব। কত লাগবে? 

পাঁচশ দিন আমি ম্যানেজ করে নেব। শুনে হেসে ফেলেছিল পিউ। মানুষ আসলে যে একটি আদ্যন্ত ব্যবসায়ী প্রাণী সেটা ওর থেকে ভাল আর কে জানে? যে যেখানে বিজনেস করার সুযােগ পায়, করেপিউও করেনি কখনও এমন বিজনেস ? হয়তাে ওই লােকটার সঙ্গেই করেছে কখনও। আজ পিউ এর অসহায়তা আন্দাজ করে সুযােগ বুঝে পালটা হিসেব বুঝে নিচ্ছে। অত টাকা তাে আনিনি ভাইঠিক আছে, ফর্মটা নিয়ে যানআর এইখানে সেলফ এমপ্লয়েড লিখে টাকাটা নিয়ে কাল আসবেনফর্মটা হাতে নিয়ে ব্যাগে ভরে উঠে দাঁড়িয়েছিল পিউ। আজ বিকেল থেকে দুটো খেপে রােজগার হয়েছে মাত্র দুশাে। ইয়াসিন এসেছিল, ঘরে লােক রয়েছে দেখে অনেকক্ষন অপেক্ষা করে ফিরে গিয়েছেহারামি মাছওলাটা একেবারে বুনাে মােষ ছুটিয়েছে পিউয়ের ওপর। গতর টনটন করছে। জ্বালা করছে যােনীদ্বারক্লান্ত হয়ে অনেকক্ষন শুয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠল পিউ। খাটের নীচের বাক্সটা টেনে বার করল, ওর ভেতরে একটা টিনের কৌটোসেখানে কিছু পাকানাে নােট। কয়েকটা নােট সেখান থেকে বার করলমােট পাঁচটা একশাের নােট ভাল করে যত্নে হাত বুলিয়ে টান করে বিছানার তলা থেকে সেই ফর্মটা বার করলনােটগুলাে ওর ভেতরে গুঁজে আবার সেটা রাখল নিজের পাশে। সিলিং ফ্যানের হাওয়ায় ফর্মের প্রথম পৃষ্ঠাটা প্রজাপতির মতাে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেফর্মটাকে নিজের মাথার বালিশের তলায় রাখল পিউ। মাথার ওপর সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে। সিলিং ফ্যান থেকে। মেঝের দূরত্ব কতটা সেটা ভাবতে ভাবতে আজ রাতের মতাে ঘুমিয়ে পড়ল। 

অলংকরণthe-she-wolf

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes