jamdani

প্রখ্যাত পোষ্যরা

কৃষ্ণকলি চক্রবর্তী

শেষ পর্ব 

পঞ্চপাণ্ডবের পঞ্চুর মতো অতটা বিখ্যাত না হলেও ‘চিক্কুস’ নামের লাসা পপি কুকুরটিও কম বিখ্যাত হয়নি একসময়। তবে চিক্কুসের মনিব গোগোল তো এককালে কিশোর কিশোরীদের আইডিয়াল ছিল বলা যায়। সমরেশ বসু-র রচনায় খুদে ডিটেকটিভ গোগোল বাঙালি কিশোর মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিল তাঁর বুদ্ধিদ্দীপ্ত এবং সাহসী কাণ্ডকারখানায়। গোগোল চিক্কুসকে পায় ভুটানের ফুনসিলিং-এ। সেখানে গোগোলের মামার এক নেপালি বন্ধু উপহার দেন চিক্কুসকে।

‘গোগোল চিক্কুস নাগাল্যান্ডে’ গল্পে এই জ্যান্ত উপহারটি পেয়ে গোগোলের আহ্লাদের সীমা ছিল না। চিক্কুস তখনও খুব ছোট। মামার বন্ধুর বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করে সে। বাবা সোনদা, ঠাকুর্দা জং আর মা ছিল গোল্ডি। মাত্র ছ’ সপ্তাহ বয়সেই চিক্কুসের কান ছিল ঝোলা আর লোমশ মুখে তিনটি ছোট কালো বিন্দু ছাড়া কিছুই দেখা যেত না। তবে একেবারে দেখা যেত না বললে ভুল হবে। মাঝে মাঝে তার টুকটুকে লাল জিভ আর নতুন গজানো সাদা ছোট ছোট ঝকঝকে দাঁত দেখা যেত। প্রথম দর্শনে, গোগোল চিক্কুসকে একটি বেশ বড়সড় সাদা খরগোশ ভেবে ভুল করেছিল। আর সেই নেপালি ভদ্রলোকের বাড়ি গিয়ে পৌঁছনো মাত্রই দেখতে পেয়েছিল, বড় খরগোশের মতো একটা প্রাণী প্রথমেই লাফ দিয়ে ওর পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। যেমনি পিছনো, অমনি চিক্কুসের আর এক লাফ। গোগোলের দু’পায়ের ফাঁকে মাথা গুঁজে দিয়ে, জুতোর গোড়ালির ওপরে, মোজায় কুটকুট করে দাঁত বিঁধিয়ে দিয়েছিল। সেই দাঁত বিঁধনোতে গোগোলের ভারী সুড়সুড়ি লেগেছিল। তার পরেই নিচু হয়ে, চিক্কুসকে দু’হাতে তুলে নিয়েছিল। আর চিক্কুস এমনভাবে ওর গলা চেটে আদর করেছিল, যেন গোগোল ওর কত দিনের চেনা। চিক্কুসের কালো দুটো চোখের দিকে গোগোলের দিকে তাকিয়ে গোগোলের মনে হয়েছিল, ও যেন হাসছে। তবে বাকি গল্পে চিক্কুসের সব হাসি উবে যায়, ওরা যখন গিয়ে পড়ে নাগাল্যান্ডে। নাগা মানুষদের প্রিয় খাদ্য কুকুরের মাংস। তবে অতিথির কুকুর কেড়ে খাওয়ার মতো অভব্য তারা যদিও নয় কিন্তু যে পরিবারের আতিথ্য গ্রহণ করেছিল তারা সেই পরিবারের এক লোভী ও বোকা ভৃত্য চিক্কুসকে চুরি করে মাংস খাওয়ার লোভে। এদিকে ওই পরিবারের একটি ছেলে, বাবা মা-এর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছুদিন আগেই তাঁদের পোষা একমাত্র কুকুরটিকে কেটে, তার মাংসের ভোজ লাগিয়েছিল বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে- এই ঘটনার কথা জানতে পারায় গোগোলের মনে শান্তি ছিল না প্রথম থেকেই। গোটা ব্যাপারটিই ছিল ভারী গোলমেলে। শেষ পর্যন্ত কীভাবে চিক্কুস উদ্ধার করে গোগোল, এই নিয়েই টানটান উত্তেজনায় ভরা গপ্পো। পড়তে পড়তে কিশোরবেলায় গোগোলের মতো আমরাও ভালবেসে ফেলেছিলাম চিক্কুসকে, উদ্বিগ্ন হয়েছিলাম তার জীবন সংশয়ে।

নিবন্ধ শেষ করব আরও এক প্রখ্যাত পোষ্যকে দিয়ে। সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে আসা নয়। একেবারে জলজ্যান্ত বাস্তব। হিজ মাস্টার ভয়েস-এর লোগোতে যে কুকুরটিকে চোঙ্গাওয়ালা গ্রামোফোনের সামনে বসে থাকতে দেখি, সেই বিস্ময় সারমেয়টি কিন্তু একেবারে বাস্তব। ‘নিপার’ নামের কুকুরটি ১৮৮৪-তে হাতে পান মার্ক ব্যারাড।

নামে ব্রিস্টলের এক ভদ্রলোক। মার্ক-এর মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই ফ্রান্সিস নিপারকে নিয়ে যান লিভারপুল-এ। ফ্রান্সিস ছিলেন একজন চিত্রকর। তিনি লক্ষ্য করেন ফোনোগ্রাফ মেশিনে কোনও গান বাজানো হলে নিপার ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে কোথা থেকে কণ্ঠটি ভেসে আসছে সেটি খুঁজতে। এই চিত্রটি চিত্রকর ফ্রান্সিসের মনে গেঁথে থাকা ছবিটি। মূল ছবিটি আঁকা হয় ১৮৯৯-তে। ছবিতে দেখা যায় একটি কুকুর ব্ল্যাক হর্ন-সহ একটি ফোনোগ্রাফ মেশিনে মনোযোগ দিয়ে মিউজিক শুনছে। পরবর্তীতে ফ্রান্সিস ছবিটির নামকরণ করেন ‘হিজ মাস্টারস ভয়েস’। এর পর ‘রয়াল অ্যাকাডেমি’-তে ছবিটি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা করেন তিনি এবং অসফল হন। এর পর বিভিন্ন ম্যাগাজিনে ছবিটি প্রকাশের প্রচেষ্টাও হয়। কিন্তু কুকুরটি ঠিক কী করছে সেটি বোঝা যাচ্ছে না- এই অজুহাতে প্রত্যখ্যাত হয়। এর পর সিলিন্ডার ফোনোগ্রাফ তৈরির প্রথম সারির কোম্পানি ‘এডিসন বেল’ কোম্পানি-কে ছবিটি দেওয়ার চেষ্টা করেন ফ্রান্সিস। কিন্তু সরাসরি জবাব আসে ‘কুকুর কখনও ফোনোগ্রাফ শুনতে পারে না।’

এর পর ফ্রান্সিসের এক বন্ধু পরামর্শ দেন এই ছবিটিতে ব্ল্যাক হর্নের পরিবর্তে ব্রাশের তৈরি হর্ন আঁকলে সেটি আরও বেশি আকর্ষণীয় হবে এবং বিক্রির সম্ভাবনাও বাড়বে। ফ্রান্সিস এর পর একটি নতুন প্রতিষ্ঠিত গ্রামোফোন কোম্পানিতে যান তার ছবিটির একটি ফোটোগ্রাফ নিয়ে এবং অনুরোধ করেন একটি ব্রাশ হর্ন তাকে দেওয়া হোক ছবিটির মডেল হিসেবে। গ্যারি ওয়েন, তৎকালীন ম্যানেজার ছবিটিকে পছন্দ করেন এবং কেনবার প্রস্তাব দেন। তবে শর্ত একটাই ফোনোগ্রাফ-এর পরিবর্তে বার্লিনর গ্রামোফোনের ছবি আঁকতে হবে ফ্রান্সিসকে। চিত্রকর ছবিটিকে নতুন রূপ দেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৭ অক্টোবর ১৮৯৯, ছবিটি তুলে দেন গ্রামোফোন কোম্পানির হাতে। এর পর তো সবটাই মিথ। ছবিটি পরবর্তীতে কোম্পানির ট্রেডমার্ক হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যা আজও ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’-এর লোগো হিসেবে ব্যবহৃত।

পরিশেষেরও পরিশেষে উল্লেখ করা যাক আরও দু’একজন সাহিত্য নির্ভর স্বল্পখ্যাত পোষ্যদের কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছেলেটা’ কবিতার ভোলা কুকুর, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ‘লোটাকম্বল’ উপন্যাসে কচ্ছপ বলাই কিংবা নবনীতা দেবসেনের ‘প্রজেক্ট চর্মচটিকা’-র পোষা চামচিকে অথবা প্রাণবিন্দুবাবুর খরগোশ সোনা-সবাই অল্পবিস্তর জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল পাঠকমহলে।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes