jamdani

পানচরিত কথা 

যে কোনও ভুরিভােজের পরে শেষপাতে পান না হলে বাঙালির ঠিক জমে না। রাংতায় মােড়া মশলাসমৃদ্ধ সবুজ পাতা ছাড়া যে কোনও আয়ােজনই ব্যর্থ। শুধু এদেশে নয়, পানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বিদেশেও এর কদর সেই প্রাচীন আমল থেকেই। ফিলিপিন্স, মায়ানমার, নেপাল, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম সহ একাধিক দেশে রয়েছে পানের প্রচলন। তবে যাঁরা পান খেতে ভালােবাসেন, তাঁদের কাছে অবশ্য কোনও অনুষ্ঠানের প্রয়ােজন হয় না। বিয়েবাড়ি বা অন্য কোনও আয়ােজনের অপেক্ষায় না থেকেই তাঁরা পান নিয়ে বিলাসিতা পছন্দ করেন।

বােধহয় এঁদের কথা মাথায় রেখেই শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে শতশত পানের দোকান। আর সেসব দোকানে চিরাচরিত মিঠেপাতার পান ছাড়াও শােভা পাচ্ছে হাল আমলের একাধিক নানা স্বাদের পান। আমাদের এখানে মূলত মিষ্টি পানের কদরই বেশি। তবে বেনারসি পাতা বা বাংলা পাতাতেও সাজিয়ে পান পরিবেশন করা হয়। এক এক পানের এক এক মেজাজ। যেমন ধরুন, বাদশাহি পানের কথা। নানা মশলা আর সুপারির সংযােজনে সত্যিই এক রাজকীয় আমেজ। মুখে দিলেই সােজা পৌঁছে যাবেন পুরনাে দিনের জমাদার বাড়ির দালানে। কম যায় না শিঙারা পান অথবা গুণ্ডি পানও। আর এখন তাে পানের জগতেও তুমুল পরীক্ষা-নিরীক্ষার হাওয়া। আগেকার চিরাচরিত পানের জায়গায় এখন আকছার বিক্রি হচ্ছে চকোলেট পান, ফার্স্ট নাইট পান, মশলা পান।

কলকাতার দোকান ঘুরে দেখলে এই নানা স্বাদের পানের সন্ধান মিলবে। এমনিতে পাড়ার মােড়ে মােড়ে পানপ্রেমীদের কথা মাথায় রেখে অসংখ্য পানের দোকান গজিয়ে উঠলেও, কৌলিন্যে-আভিজাত্যে-জনপ্রিয়তায় শহরের কয়েকটি দোকান কিন্তু এখনও শীর্ষে। এরা বয়সে বেশ প্রবীণ। তবে পানের চাহিদা আর স্বাদ এখানে চিরসবুজ। বয়স কারওর ৬০-এর উপরে, কেউ আবার একশাে ছুইছুই। দোকানে ঢুকলেও পাওয়া যায় সেই সাবেকি আমেজ। কলকাতার এমনই কয়েকটি পানের দোকানের হদিশ দিচ্ছি আমরা। এদের পানেই মজে আছেন আম বাঙালি। যদি না খেয়ে থাকেন, তাহলে চেখে দেখতেই পারেন এদের স্পেশাল পান। গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় যে আপনার মন ভালাে হতে বাধ্য।

কল্পতরু ভাণ্ডার 

কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায় উজ্জ্বল অবস্থান কল্পতরু ভাণ্ডারের। মালিক শ্যামল দত্ত শােনালেন দোকানের আদি ইতিহাসের কথা। ‘আমরা স্বর্ণবেনে ছিলাম। পূর্বপুরুষেরা ভাবলেন আলাদা কিছু করবেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ঢাকাতে এই একই নামে শুরু হল পান ব্যবসা। দেশভাগের পর পাততাড়ি গুটিয়ে এ দেশে।’ শ্যামলবাবু নিজে ১৯৮০ সাল থেকে এই দোকানের দায়িত্বে আছেন। বাবা রাধাবিনােদ দত্তর অ্যাক্সিডেন্টের পরেই চাকরি ছেড়ে চলে আসেন ব্যবসায়। রাধাবিনােদবাবু ছাড়াও পান ব্যবসায় উদ্যোগী হয়েছিলেন দুই কাকা নির্মল দত্ত আর সনাতন দত্ত। কল্পতরুর বয়স এখন ৮২ বছরেরও বেশি। পানের নামগুলােও বেশ মজাদার। মন মাতােয়ারা পানে থাকে মােহিনী মশলা (চুন, খয়ের, সুপারি, যষ্টীমধু), ছােয়ারা মিষ্টি সুপারি, চেন্নাই থেকে আনা নেহরুপাতি সুপারি, লচ্ছা সুপারি সহ আরও অনেক সামগ্রী। নেহরুপাতি সুপারির কল্যাণে এই পান দুদিন পরে খেলেও একইরকম থাকবে। পানের বিভিন্ন উপকরণ আসে চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, কানপুর থেকে। রুপােলি রাংতায় মােড়া কল্পতরু স্পেশাল পানও অসাধারণ। দাম হাজার টাকা। জনপ্রিয় পানের মধ্যে আছে মুখ বিলাস, দিলখােশ, মুখরঞ্জন পান। এখানকার পানের প্রশংসায় শুধু আমজনতা নন, পঞ্চমুখ হয়েছেন বহু নামী ব্যক্তিত্ব। ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, মান্না দে, পদ্মজা নাইডু, ইন্দিরা গান্ধি থেকে শুরু করে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়—কে নেই সেই তালিকায়! এছাড়াও চোখে পড়ে একটা গােলাপ জল স্প্রে করার পাত্র। বড়াে বড়াে অনুষ্ঠানে পান সাপ্লাই দিতে গেলে ওই পাত্রটা নিয়ে যাওয়া হয়। অতিথিদের পানের ওপর গােলাপজল ছিটিয়ে দেওয়ার জন্য। কল্পতরুর পান পাতা মূলত মিষ্টিপাতা। শ্যামলবাবুর মতে, বেনারসি পাতায় এই স্বাদ ঠিকমতাে মেলে না। প্রায় ৪০ রকমের সুপারি রয়েছে এনাদের জিম্মায়। বাদশাহি পানে থাকে চিপস (ভাজা সুপারি পাতা), ডলার সুপারি, মেওয়া সুপারি, আইসি সুপারি, মৌরি, লং কেসর, টাকা সুপারি, কাশ্মীরি ট্যাবলেট। শেষেরটা মাউথ ফ্রেশনার। দুপুর১২টা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত খােলা থাকে দোকান।

ঠিকানা: ৬/১ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০৭২

ফোন:৯৮৩১৬৯২০৭৮ 

তাজমহল পান শপ 

নিউ মার্কেটের ব্যস্ত এলাকায় তাজমহল পান শপ। পাশেই বিখ্যাত উত্তর ভারতীয় খাবারের রেস্তোরাঁ। তাই, শেষপাতে পান খাওয়ার লােভ হলে চলে আসতেই পারেন এই দোকানে। দোকানের বয়স প্রায় ১০০ ছুইছুই। দোকানে ঢুকতেই হাসিমুখে পান সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মালিক মহম্মদ মনিরুদ্দিন। এঁদের পানের দাম একেবারেই সাধ্যের মধ্যে। মনিরুদ্দিনের বাবা মহম্মদ মইনুদ্দিন থাকতেন মুম্বইতে। তিনি নিজেও মুম্বইতে ছিলেন বহুবছর। সেসময়ে একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সান্নিধ্যে আসেন তাঁরা। কলকাতায় পান ব্যবসা শুরু করার পরেও সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন তাঁরা। অন্তত দোকানে ঢােকার সঙ্গে সঙ্গেই হাতেনাতে তার প্রমাণ মেলে। দোকান জুড়ে মহম্মদ রফির ছবি। মনিরুদ্দিন জানালেন, মহম্মদ রফি আমাদের পানের রীতিমতাে ভক্ত ছিলেন। উনি যতবার কলকাতায় ফাংশন করতে এসেছেন, ততবারই আমাদের পান খেয়েছেন। তিনি নিজেও অবশ্য রফি সাহেবের ভক্ত। এখানকার স্পেশালিটি হল বেনারসি পান, মিষ্টি পান আর বাংলা পান। সবই অবশ্য পানপাতার বিভেদের উপর নির্ভর করে। পানে এঁরা ব্যবহার করেন মূলত মিষ্টি মশলা। মিষ্টিপাতার পানই এখানে সবথেকে বেশি জনপ্রিয়। তবে এখানকার সবথেকে মন ভালাে করে দেওয়া ব্যাপার বােধহয় এনাদের আতিথেয়তা। মালিক ও কর্মীদের হাসিমুখে পান বানানাের টানেই অনেকে আসেন একের পর এক পান খেতে। দাম পাঁচ টাকা থেকে ২৫ টাকা। এখানে পানের অনেক ভ্যারাইটি যেমন নেই তেমন বহুমূল্যের পানও নেই। তবে স্বাদে ও ঐতিহ্যে অন্য অনেক দোকানকেই রীতিমতাে টেক্কা দিতে পারেন এঁরা।

ঠিকানা:৬ এ, এস.এন ব্যানার্জি রােড, কলকাতা-৭০০০৮৭ 

ফোন: ৮২৮২৮৭৪৪৪

শিবশঙ্কর বেনারসি পান ভাণ্ডার 

বিবেকানন্দ রােড ক্রসিং-এর উপর জ্বলজ্বল করছে নামটা। বাইরে থেকে দেখতে আহামরি না হলেও এদের পান খেয়ে প্রশংসা করবেন না এমন লােক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। শহরের পুরনাে পানের দোকানের লিস্টে এঁরাও তাই অগ্রগণ্য। প্রায় ৭০ বছর বয়স এই পান দোকানের। এখানে অন্যতম জনপ্রিয় মিঠা মশলা পান। দাম মাত্র ২৫ টাকা। আর সেই পানে থাকে জেলি, চেরি, গুলকন্দ মিক্সচার, শুকনাে নারকেল, ড্রাই ফুটসের কুচি। এছাড়াও স্বাদ বৃদ্ধির জন্য আছে গুলাব সুপারি, লচ্ছা সুপারি, আইসক্রিম সুপারি, কেশর সুপারি। লিকুইড চকোলেট সমৃদ্ধ চকোলেট পানও খেতে পারেন। দাম মাত্র ৩৫ টাকা। চকোলেট আর পান পাতার স্বাদ মিলেমিশে মুখের ভিতরে তখন স্বর্গীয় অনুভূতি। আর যাঁরা বিশেষ দিনের জন্য পানের অর্ডার দেন, তাঁদের জন্য রয়েছে ফার্স্ট নাইট পান। এক জোড়ার দাম ১১০০ টাকা। এমনিতে বেনারসি ছাড়াও মিষ্টিপাতা ও বাংলা পাতায় পান সাজেন এঁরা। তবে ফার্স্ট নাইট পান কিন্তু বেনারসি পাতাতেই তৈরি। আর আপনি চাইলে গােল্ড ফয়েলে মুড়ে দেবেন এঁরা। এখানকার পানে অন্যতম আকর্ষণ একাধিক রকমের সুপারি। এছাড়াও পানবিলাসীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় মিঠা গুণ্ডি পান, মিঠা মশলা পান, মিঠা স্পেশাল পান। পানের আকার বেশ বড়াে। দোকানের মালিক সঞ্জয় চৌরাশিয়া জানালেন, একদম শুরুতে তিন আনায় পান বিক্রি হতাে। সেখান থেকে আজ এ জায়গায় আমরা। বেনারসের কাছে একটা জায়গায় থাকতেন পূর্বপুরুষেরা। দাদু কলকাতায় চলে আসেন। ‘পানের ব্যবসা দাদুর হাতেই তৈরি। পানপাতার কোয়ালিটির সঙ্গে আমরা কোনও রকম আপস করি না। আমরা পানে ১৮ রকমের মশলা ব্যবহার করে থাকি।’ দোকানের দেখাশােনার দায়িত্বে তারিণী প্রসাদ হালদার। তিনিই হাসিমুখে পান সাজিয়ে অভ্যর্থনা জানান ক্রেতাদের। তারিণীবাবুরও প্রায় ৪৫ বছর বয়স হয়ে গেল। সকাল আটটা থেকে রাত বারােটা পর্যন্ত খােলা থাকে দোকান। আর সারাদিনই নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে ক্রেতাদের আনাগােনা। তাঁদের চাহিদার তালিকায় কখনও মিঠা পান আবার কখনও বা চকোলেট পান।

ঠিকানা:২১০ বিধান সরণী (বিবেকানন্দ রােড ক্রসিং), কলকাতা- ৭০০০০৬ 

ফোন:৯৩৩০৫৪২৬৯০ 

সাততলা পানওয়ালা 

বড়ােবাজারের ঘিঞ্জি গলি। তার মধ্যেও ঠিক আলাদা করে খুঁজে পেয়ে যাবেন এই দোকানটিকে। সত্যনারায়ণ পার্ক এ.সি মার্কেটের পাশে সাততলা বাড়িটির নীচের তলায় এর অবস্থান। তাই বােধহয় লােকের মুখে মুখে প্রচলিত হয় এর নাম সাততলা পানওয়ালা। দোকানের বয়স নব্বইয়ের উপরে! শুরু করেছিলেন বিশ্বনাথ প্রসাদ চৌরাসিয়া। এখন মালিক গণেশ প্রসাদ চৌরাসিয়া। এনাদের পানের স্বাদের টানে রােজ প্রায় ৫০০ ক্রেতা আসেন। এখানকার জনপ্রিয় পানের মধ্যে রয়েছে শিঙারা পান। রুপােলি বা সােনালি ফয়েলে মােড়া শিঙাড়ার মতাে ত্রিভুজাকৃতি পানটির দামও বেশ কম! মাত্র ২০ টাকা। ক্রেতাদের মধ্যে সুপারহিট এঁদের গুণ্ডি পান, চকোলেট পান। চকোলেট পানের দাম ৩০ টাকা। রয়েছে ফার্স্ট নাইট পান। কেসর, পেস্তা, কাজু-সমন্বিত এই পান খেতে গেলে পকেট একটু বেশি খসাতে হবে বই কী! এক একটা ফার্স্ট নাইট পানের দাম ৫০১ টাকা। যদিও অবাঙালি পানের দোকান, তবে পানের পাতায় কিন্তু বেনারসের তুলনায় বাংলার প্রভাবই বেশি। গণেশবাবু জানালেন তাঁদের স্পেশাল পান হল কিমাম পান। কিমাম জরদা পান তৈরি হয় প্রায় ৬০০ জরদা দিয়ে। এই পানের স্বাদই শুধু নয়, সুগন্ধও রীতিমতাে মনমাতানাে। কথা বলতে বলতে চোখ গেল সামনের থালায় কলাপাতার উপরে সাজিয়ে। রাখা পানের দিকে। প্রতিটি পানের উপর ছড়ানাে গােলাপের পাপড়ি। এক একটা পান এত বড়াে সাইজের যে একেবারে আস্ত পান খাওয়া রীতিমতাে কঠিন কাজ! শুকনাে নারকেল, জয়পুরিয়া চেরি আর বেশ খানিকটা জেলি— পানের স্বাদ এই উপকরণগুলাে থেকেই আসে।

ঠিকানা: ১৪৩/১/১ কটন স্ট্রিট, কলকাতা – ৭০০০০৭

ফোন: ৯৮৩১১৪২২০২

 

Trending


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes