jamdani

দুয়ার খোলা ডুয়ার্সে

জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়

‘ক’-এ কলকাতা থেকে কন্যাকুমারীর মধ্যে কোথাও ক্লাভের অ্য়ানুয়াল মিট হবে সেটা ঠিক করতে গিয়ে আমরা, মানে ট্রেক অ্যান্ড থ্রিলের সদস্যরা দু-কাপ করে চা খান তিনেক শিঙাড়া শেষ করে দিলাম, কিন্তু কোনও জায়গা ঠিক করে উঠতে পারলাম না। এমন সময় শিবুদা ক্লাবের প্রণব চ্যাটার্জি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে আম্পায়ার বিলি বাউডেন স্টাইলে ডান হাতের তর্জনী ওপরে উঠিয়ে বললেন, আমার একটা কথা আছে। কি কথা শোনার জন্য আমাদের ক্ষণিকের নীবতার সুযোগে শিবুদার ঘোষণা; চলো আবার ডুয়ার্সেই যাওয়া যাক। তাই তো! আগের বার সান্তালে খোলা, মূর্তি, ঝালং, বিন্দু ঘুরে এসেছি, তাই এবার জয়ন্তী মহাকাল, বক্সাফোর্ট, রসিকবিল,জলদাপাড়া, খয়েরবাড়ি এমনকী কোচবিহার রাজবাড়ি ওমদনমোহন মন্দির এইগুলোও ঘুরে আসা যায়। হ্যাঁ, ডুয়ার্সের সমর্থনে এতগুলো হাত উঠল যে ছানাপোনা নিয়ে আমাদের ডুয়ার্স ভ্রমনের সদস্য সংখ্যা দাঁড়াল চৌত্রিশ।

২৫ ডিসেম্বর কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে রওনা দিয়ে ২৬ তারিখ দুপুর ১২ টা ২০ মিনিটে আলিপুরদুয়ার স্টেশনে নামলাম। পূর্ব নির্ধারিত এলিট হোটেলেই উঠলাম। দল ভারী বলে জয়ন্তী ও হলং বনবাংলোতে আমাদের থাকার জায়গা জোটেনি। তাই ২৯ তারিখ পর্যন্ত আলিপুরদুয়ারের এই হোটেলেই থাকব আমরা । হোটেল ভাড়া বাথরুম সহ দ্বিশয্যা ঘর ৮০০ টাকা।

ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে খাওয়াদাওয়া সেরে বাসে উঠে বসলাম। বাস ছেড়ে দিল। ঘড়িতে তখন ৪টে। গন্তব্য কোচবিহার রাজবাড়ি। শহর ছাড়াতেই দেখা হল কালজানি নদীর সঙ্গে। জম্ম ভুটানের দুনগিনা পাহাড়ে ( ৭১০ ফুট )। ১১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আলিপুরদুয়ারে নেমে এসেছে। পথ মধ্যে পানা , বাসারা, নোনাই, ডিম, গারাম এই সব নদীরা এসে মিশেছে কালজানি নদীর সঙ্গে। বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে কালজানি নিজেকে সমর্পণ করেছে তোর্সা নদীর বুকে।

চারটে পঁয়ত্রিশ বাজতেই বাস থেকে নেমে পড়লাম। রাজবাড়ি এসে গেছি। পাঁচটায় বন্ধ হয়ে যাবে মিউজিয়াম। সুতরাং ছুট, ছুট, সবাই প্রায় ছুটতে ছুটতেই গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। টিকিট মূল্য মাত্র পাঁচ টাকা।

১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় গঠনশৈলী অনুসারে নির্মিত হয় এই রাজপ্রসাদ। খরচ হয় ৮৭৭২০৩ টাকা রাজপরিবারের ইতিহাস, ব্যবহৃত জিনিসপত্র আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রসাদের ভেতরে গড়ে উঠেছে মিউজিয়াম। দেওয়ালে ঝুলছে রাজ পরিবারের সদস্যদের ছবি। তাড়াহুড়ো করেই দেখতে হল আমাদের। পাঁচটা বাজাতেই বেরিয়ে আসতে হল। প্রসাদের খিলনে ও গম্বুজে পড়েছে শীতের সন্ধ্যার ছায়া। আর একটু অন্ধকার হতেই আলোর সাজে সাজে উঠল রাজবাড়ি । অপরূপ দ্শ্য। শুক্রবার বন্ধ থাকে রাজবাড়ি।

রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে সাগরদিঘির পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখছি সাইনবোর্ডে সাল –তারিখ সহ রাজপরিবারের ইতিহাস। দেখতে দেখতে চলে এলাম মদনমোহন মন্দিরে। এটাই একদা রাজপরিবারের কুলদেবতার মন্দিরে। দুশো বছরের প্রচীন সোনা ও অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি মূল বিগ্রহজোড়া আজ আর নেই। চুরি হয়ে গেছে। মাঝখানে গম্বুজওয়ালা মন্দিরে আছেন রাজ পরিবারের কুলদেবতা মদনমোহন। কালী ও তারা আছেন পাশাপাশি। খানিকটা দূরে ভবানী মন্দির। মন্দিরের ফটকের সামনে রাস্তার ওপারে বৈরাগী দিঘি । মন্দির দেখে সরকারি বাসে আলিপুরদুয়ারে ফিরে এলাম।

পরদিন ২৭ ডিসেম্বর। আজ থেকে তিনদিনের জন্যে তিনটে সুমো আর একটা স্করপিও আমাদের সেবায় থাকবে। ব্রেকফাস্ট সারতেই গাড়িরা ছুটল। ঘড়িতে তখন ৯টা। মিনিট পনেরো বাদেই গাড়ি মেইন রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলে ঢুকল। শুরু হয়ে গেছে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গল। রাস্তার দুধারে হাতির ছবি দেওয়া সাইনবোর্ড চোখে পড়েছে। এই জনপদে মাঝে মাঝেই হাতির উপদ্রব হয়। তাই এই জনপদে মাঝে মাঝেই হাতির উপদ্রব হয়। তাই এই সতর্কবার্তা।

একবার তো আমাদের গাড়ির কনিষ্ঠতম সদস্য মুকুটের ‘ হাতি! হাতি!’ চিৎকারে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল অবশেষে অসীম ধৈর্য,উৎকন্ঠা, আর প্রতীক্ষার পর জঙ্গল থেকে একটা গোরু বেরিয়ে এসে সবাইকে আশ্বস্ত করে আবার জঙ্গলে ঢুকে গেল।

আধ ঘন্টার মধ্যে গাড়ি এসে থামল রাজাভাতখাওয়া নেচার ইনফর্মেশন সেন্টারের সামনে। জায়গাটা খুব সুন্দর। নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে একফালি ঘেরা জায়গা। তার মাঝখানে গোলাকার একটা বাড়ি। দেওয়ালে ইতিহাস আর বর্তমানের টুকরো টুকরো ছবি। একটা ছবিতে রাজাভাতখাওয়া নামটার ইতিহাস ফুটে উঠেছে। কুচবিহারের রাজা পণ করেছিলেন ভুটানের রাজাকে না তাড়িয়ে ভাত খাবেন না আক্রমন করলেন ভুটানরাজাকে। বেগতিক দেখে সন্ধি করলেন ভুটানরাজ। নৈতিক জয় হল কোচবিহারের রাজার। দুই রাজা এই স্থানে বসে ভাত খেলেন। তাই নাম হল রাজাভাতখাওয়া। এই ঘটনা সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিতে। সেন্টারের ভেতরে ঢুকলাম। সেখানে নানান পশুপাখি ও কীটপতঙ্গের নমুনা সংরক্ষিত করা আছে।

রাজাভাতখাওয়া হল বক্সা টাইগার প্রজেক্টের গেট। সেই গেট পেরিয়েই গাড়ি ছুটে চলল। কিছুটা এগিয়ে মাথাপিছু ৪০ টাকা আর গাড়ি পিছু ২০০ টাকা এন্ট্রি ফি দিতে হল। রাজাভাতখাওয়া থেকে ১৬ কিলোমিটার পেরিয়ে এসে গাড়ি থমল সান্ত্রাবাড়িতে। এখান থেকে আমাদের হাঁটা পথ শুরু। গন্তব্য বক্সা ফোর্ট। দূরত্ব ৫ কিলোমিটার।

অসংখ্য পাখির কোলাহল শুনতে শুনতে আর রংবেরঙের প্রজাপতিকে সঙ্গে নিয়ে হালকা চড়াই ভাঙতে ভাঙতে চলেছি। ফোটো তুলেছি। দুপাশে শাল, সেগুন, শিরীষ, শিমুল, শিশু, জারুল, আরও কত নাম না-জানা গাছগাছালির ভিড়। ইনফর্মেশন সেন্টারে কিছু বইপত্র ঘেঁটে দেখেছিলাম। এই বক্সা টাইগার প্রজেক্টের আয়তন ৭৬০ বর্গ কিলোমিটার। ৩৩১ বর্গ কিলোমিটার কোর এরিয়া আর বাকিটা বাফার জোন। এর মধ্যে ২৬৯ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে অভয়ারন্য। ১৯৯২ সালে এই ব্যাঘ্র প্রকল্পের ১১৭ বর্গ কিলোমিটার বনভূমি জাতীয় উদ্যানের শিরোপা পেয়েছে। বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ৪০টি। বাঘ ছাড়া আছে হাতি, লেপার্ড, ভালুক, হরিণ, বুনো কুকুর, গাউর ইত্যাদি। এই বনে ব্ক্ষ আছে ১৫৯ প্রজাতির, গুল্ম আছে ১৫৭ প্রজাতির। এছাড়া বাঁশ আছে ৬ প্রজাতির আর বেত আছে ৮ প্রজাতির। অর্কিডের সংখ্যা ১৩২ প্রজাতির। বক্সায় সতেরো রকমের পোকামাকড় ও প্রজাপতি আছে। আর এগুলোই গড়ে তুলেছে পাখিদের খাদ্যভান্ডার। ২৩৪ প্রজাতির পাখি আছে বক্সা অরন্যে। তাই এই জায়গাটাকে পাখিদের স্বর্গরাজ্য বলা যায়।

 

দুলকি চালে গাছগাছালি আর পাখপাখালিকে সঙ্গী করে আড়াইয়ে পৌঁছে গেলাম বক্সা দুর্গে। ইতিহাস আর প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে এই বক্সাদুয়ারে। একদা ভুটান, তিব্বত ও কোচবিহারের মধ্যে বানিজ্যের প্রবেশদ্বার ছিল বক্সা।সিঞ্চুলা পাহাড়ের চূড়ায় (২৬০০ ফুট) এই দুর্গ, যা ১৮৬৪ সালে ভুটানরাজের পরাজয়ের পর ব্রিটিশদের অধিকারে আসে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্দি করে রাখার জন্যে প্রায় অগম্য এই শ্বাপদসংকুল বনের মধ্যে এই দুর্গকে জেলখানা বানিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। প্রভাস লাহিরি, হেমচন্দ্র ঘোষ, ত্রৈলোক্য মুহারাজ, গোপাল হালদার, নিকুঞ্জ সেন প্রমুখ বিপ্লবীদের স্ম্তিধন্য সেই দূর্গ আজ কিছু ইট-কাঠ-পাথরের খিলান মাত্র। সিঁড়ির মুখে পাথরের ওপর খোদাই করা বন্দিদের নিয়ে কবিগুরুর লেখা কবিতাটাও সময়ের সরণি ধরে যত্নের অভাবে মলিন হয়ে গেছে।

আধ ঘন্টার মতো বক্সা ফোর্টে কাটিয়ে একই পথে পাখিদের কাকলি আর ঝিঁঝিদের কনসার্ট শুনতে শুনতে নেমে এলাম সান্ত্রাবাড়ি। এবার আমাদের গাড়ি ছুটল জয়ন্তীর দিকে। আলিপুরদুয়ারের পথে ৭ কিলোমিটার পেরিয়ে পৌঁছালাম জয়ন্তী মোড়। এই মোড় থেকে বাঁদিকে ঘুরে আরও ৪ কিলোমিটার এগোতেই পেলাম জয়ন্তী নদী।

 

 

জয়ন্তী নদীর কাছে এসে দাঁড়ালাম। নির্জন সবুজে ছাওয়া জয়ন্তীর বুকে তখন আঁধার নেমেছে। তাই আকাশ গেইছে বেলা শেষের গান। বুকে তার গোল চাঁদ। নীচে জয়ন্তী নদীর রিক্ততা আর রুক্ষ হাহাকার। তাই বুঝ সেই পূর্ণ চাঁদের আলো প্রেম হয়ে ঝরে পড়ছে নদীর বুকে। সেই আলোয় সাদা সাদা পাথর আর নুড়িগুলো আজ এই মুহূর্তে হিরের থেকেও দামি কোনও অলংকার। কী এক ইশারায় মোহময় আকাশ ডাকছে নদীর দুপাশের বনানীকে। আর বনজ্যোৎস্নায় মাখামাখি হয় প্রকৃতি সেই রূপ, রস, বর্ণ ও গন্ধকে অনুভব করলাম আমরা। জয়ন্তীর প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে পরের দুদিনও আমরা ছুটে এসেছিলাম জয়ন্তীর কাছে।

২৮ ডিসেম্বর আলিপুরদুয়ারে তৃতীয় সকাল। ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা হতে হতে পৌনে নটা। ৫৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে মাদারিহাট পৌঁছালাম ১১ টায়। হলং বাংলোয় যাওয়ার প্রত্যেক গাড়ির জন্য পার্কিং ফি ২৫টাকা ও এনট্রি ফি ২০০ টাকা। আর আমাদের মাথাপিছু ৪০ টাকা এনট্রি ফি দিয়ে গাড়ি ঢুকল জলদাপাড়া ন্যাশানাল পার্কের মধ্যে। ভুটান পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই অভয়ারন্যটি ভারতীয় একশ্ঙ্গ গন্ডারের স্থায়ী আবাস। আয়তনে ২১৬ বর্গ কিলোমিটার। গন্ডার ছাড়াও এই চির সবুজ অরন্যে বাঘ, চিতাবাঘ, ভলুক, শম্ব্র, চিতল, বার্কিং ডিয়ার, বুনো শুয়োর, বাইসন, হাতি এই সব প্রাণীরাও আছে। আর আছে নানান প্রজাতির পাখিরা। এই বনভূমিকে ছুঁয়ে আছে কত নদী। কত সুন্দর সুন্দর নাম তাদের-বুড়িতোর্সা, মালঙ্গী, কালিঝোরা, শিশামারা, ভালুক, হলং আরও কত কী!

যেতে যেতে ড্রাইভার হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দিল। তারা ইশারা অনুসরণ করে ডান দিকে জঙ্গলের ভেতরে তাকাতেই চোখে পড়ল একটা বাচ্চা হাতি। শুঁড় দিয়ে গাছের ডাল ভেঙে খাচ্ছে। মা হয়তো কাছাকাছি কোথাও আছে। তার চোখে পড়ার আগেই আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিল।

মাদারিহাট গেট থেকে ৭ কিলোমিটার রাস্তা ড্রাইভ করে গাড়ি এসে থামল হলং বাংলোর সামনে। চারিদিকে সবুজের সমারোহ। আর তার মাঝে যেন প্রাকৃতিক ক্যানভাসে আঁকা সুন্দর হলং বাংলো। তাকতে পারলে কী দারুণ লাগত। এখানে থাকলে এলিফ্যান্ট সাফারির সুবিধা পাওয়া যায়। আমরা ডে ভিজিটর। তাই আমাদের ঘোরাফেরা যা কিছু এই হলং বাংলোর সামনে একফালি জায়গায়। একটা ফ্যামিলির সঙ্গে আলাপ হল, যারা কাল থেকে এই বাংলোতে আছেন। মন খারাপ। কাল কার-সাফারিতে গিয়েও গন্ডার চোখে পড়েনি। মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের জন্য বনদেবী নিশ্চয়ই অন্য কিছু ভেবেছিলেন। বাংলোর সামনে হলং নালার কাছে সবাই বসে আছি। নালার ওপারে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। কছু জায়গায় ছোট ছোট নুনের স্তূপ। এটা বনবিভাগের উদ্যোগে তৈরি কৃত্রিম সল্ট লিক পয়েন্ট। বন্য জন্তুরা এখানে নুন খেতে আসে। আমরা বসে আছি আড্ডার মেজাজে।                                                                   

রোদের আরাম উপভোগ করছে বাগ মশাই। একটা বাঘকে দেখলামন খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে এসে ফটো তোলার পোজ দিয়ে আবার শুয়ে পড়ল। অলস অপরাহ্ণকে বিদায় জানিয়ে আমরাও ফিরে এলাম আলিপুরদুয়ার।

পরদিন (২৯/১২ ) সকালে ব্রেকফাস্ট পর্ব মিটিয়ে রওনা দিলাম রসিক বিল। আলিপুরদুয়ার থেকে ৩৪ কিলোমিটার। গাড়ি এসে থামল ‘ রসিকবিল মিনি জু ‘ সাইনবোর্ড রাখা কাউন্টারের সামনে। একদিকে রায়ঢাক আর অন্যপ্রান্তে সঙ্কোশ এই দুই নদীর মাঝে রসিকবিল। রসিক, রাইচেঙ্গমারি, নীলডোবা, শাঁখামারি ও বোচামারি এই পাঁচ বিশাল জলাভূমিকে সঙ্গী করে গড়ে উঠেছে চিড়িয়াখানা। মোট আয়তন ১৭৮ হেক্টর। একটা ওয়াচ টাওয়ার আছে একদিকে। এর ওপর থেকে সবুজ আর জল দেখতে দেখতে নেশা ধরে যায়। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘড়িয়াল উদ্ধার কেন্দ্র, ময়ূর উদ্ধার কেন্দ্র, অজগর উদ্ধার কেন্দ্র, লেপার্ড উদ্ধার কেন্দ্র, কচ্ছপ উদ্ধার কেন্দ্র, ম্গ উদ্যান। আর জলাভূমিগুলো হল দেশি-বিদেশি পাখিদের আঁতুড়ঘর। শামুকখোল, হুইসলিং টিল, পিনটেল ডাব, ক্রেস্টেড সারপেন্ট ঈগল আর নানা রঙের মাছরাঙা চোখে পড়ল। ৮৮ প্রজাতির পাখি আছে এখানে । ঘুরতে   ঘুরতে দেখতে দেখতে অনেকটা সময় গড়িয়ে যায়। বেরিয়ে আসি চিড়িয়াখানা থেকে। গাড়ি ছেড়ে দেয়। একটু বাদেই রাস্তার ধারে একটা বড় ধাবার সামনে গাড়িগুলো থেমে যায়। হই হই করে উদরের জ্বালা মিটিয়ে ফেললাম সবাই। ঘড়ির কাঁটা তখন তিনটের ঘরে পৌঁছে গেছে।

গাড়ি আবার ছুটল। আবার জয়ন্তী। চেকপোস্ট পেরিয়ে শুকনো নদীর বুকের ওপর দিয়েই নদী পেরিয়ে এলাম আমরা। চেকপোস্ট অফিস থেকে প্রতি গাড়িতে একজন করে গাইড নিতে হয়েছে। গাইড চার্জ ২০০ টাকা। ভুটানি বস্তিকে বাঁ দিকে ফেলে রেখে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল চুনিয়াঝোড়া ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। ডানদিকে জয়ন্তী নদী। হঠাৎ ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিল। আমাদের সামনে আর একটা গাড়ি। অন্য দলের। ফিসফিস করে গাইড দেবেশ জানাল সামনে নাকি একটা দাঁতল বেরিয়েছে।

মাঝখানে কিছুটা জায়গা ছেড়ে পরপর দাঁড়িয়ে গেছে আসা-যাওয়ার গাড়িগুলো। ড্রাইভারদের চোখেও উৎকন্ঠা। বেশ খানিকটা বাদে আমাদের গাইড দেবেশ ড্রাইভারকে বলল এগিয়ে যেতে। তার কথামতো আমরা বাঁ-দিকে ঝোপের দিকে নজর রেখেছি। গাড়ির সদস্য সদস্যারা কেউ বা কালো কী যেন একটা নড়তে দেখল। আমার চোখে অবশ্য কিছুই পড়ল না। যাই হাক,১০০ মিটারের মতো পেরিয়ে এসে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এরপর গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল চুনিয়া ওয়াচ টাওয়ারের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে  সবাই ওয়াচ টাওইয়ারের ওপর উঠলাম। চারিদিকে শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। মনে হয় যেন এখানে মানুষের কথা বলা বারণ। এই নির্বাক প্রকৃতির মাঝে শুধু পাখিরাই কথা বলে। সেই গান, সেই কথা শোনে গাছেরা। আমরা ক্ষণিকের অতিথি মাত্র । ওয়াচ টাওয়ারের থেকে একটা সল্ট পয়েন্ট দেখতে পেলাম। নেমে এগিয়ে যেতেই মেয়ে সেঞ্চুর সাবধানবাণী, বাবা, একা একা কোথাও যাবে না। ওকেও ডেকে নিই সঙ্গে। সেংকু, মুকুট, মিমি, ডোনারা দল ভারী করে। ওয়াচ টাওয়ার থেকে খুব কাছেই এই সল্ট পয়েন্ট। নুনের ঢিপিকে ঘিরে জলের গর্ত।

পশুরা এখানে জল আর নুন খেতে আসে। দেখে ফিরে এসে গাড়িতে উঠে বসি। সঙ্গীরাও ওয়াচটাওয়ার থেকে নেমে আসে। গাড়ি ছেড়ে দেয়। সূর্যদেব তখন পশ্চিমে হেলেছেন। বেলা শেষের রাঙা আলোয় উদাস অরণ্যের বুকে অন্ধকার নামে। গাড়ির মধ্যে তখন বুড়ো, কচিকাঁচারা গাইছে।

এ কী শ্যামল সুষমা মধুময়

বিশ্ব শিশির হৃত অন্তে

নবঘন পল্লব কোকিল মুখর

নিকুঞ্জ সুমধুর বসন্তে।

আজ ৩০ ডিসেম্বর, ঘরে ফেরার দিন। কিন্তু সুন্দরী জয়ন্তী যে বশ করেছে আমাদের। তাই তো লজ্জার মাথা খেয়ে আজ সকালে আবার গেলাম তার কাছে। সময়ের অভাবে বড় মহাকাল যাওয়া হল না। তাতে কী। ছোট মহাকাল তো আছে। তাতেই হবে। নদীর বুকে পাথরের ওপর দিয়ে ঝম ঝম মচ মচ করতে করতে গাড়ি আমাদের নিয়ে গিয়ে থামল শীর্ণকায়া খরস্রোতার কাছে। এখান থেকে আমাদের হাঁটা শুঁরু। ডানদিকে ভুটান পাহাড় আর বাঁ দিকে ঘন জঙ্গল। নদী এখানে ছোট-বড় অনেক ধারায় ভাগ হয়ে গেছে। একটা নিরীহ ধারাকে সঙ্গী করে আমরা হাঁটছি। ডলোমাইট পাহাড় থেকে খনিজ নিয়ে আসছে যে! তাই তার জলের রং টকটকে লাল। পৌনে এক কিলোমিটার হাঁটার পর আমরা এলাম খরস্রোতা নদীর কাছে। কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও বা তার নীচে জল। গাইডের দেখানো জায়গা দিয়ে জুতো হাতে নদী পেরোলাম। সবার মধ্যে বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চার অ্যাডভেঞ্চার ভাব। এরপর ওপরে ওঠার পালা। কিছুটা উঠেই একটা ছোট্ট কাঠের মই। সেটা বেয়ে ওপরে উঠেই একটা ছোট্ট গুহা মন্দিরের মতো। এটাই ছোট মহাকাল। স্টালাগটাইট ও স্টালাগমাইটের কারিগরিতে তৈরি। তিনটে পাথরের মূর্তি আছে। আমাদের আসার খবর পেয়ে পূজারিজি আগেই হাজির। তাকে সন্তুষ্ট করে আর একটু ওপরে উঠতেই একটা ছোট্ট ঝরনা। আন্দাজ ৩০ ফুট উঁচু থেকে নেমে এসেছে। গাইড বলল, এই গা-ছমছম বনপথ দিয়ে আরও ওপরে উঠলে আদিম বন্য পরিবেশে মহাকাল গুহায় পৌঁছানো যায়। বুদ্ধ পূর্ণিমায় আদিবাসীদের মেলা বসে সেখানে। পাহাড়ের মাথায় আছে একটা পুকুর। তার মধ্যে আছে প্রচুর মাছ আর কচ্ছপ। কথায় কথায় নেমে আসি পাহাড় থেকে । একই পথে নদী পেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসি।

কয়েকজন আদিবাসী মেয়ে কাঠের বোঝা পিঠে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের মখে ঘরে ফেরার গান। আমাদের ঘরে ফেরার তারা। গাড়ি ছেড়ে দেয়। গাইড বলে যাচ্ছে ওর আরন্যের কথা। এই অরন্যভূমির গাছেদের কথা। পাখিদের কথা, নদীর কথা।আমরা শুনছি। একসময় তাকেও বিদায় জানাতে হয়। কিন্তু মনের মধ্যে ওর কথাগুলো ঘুরে ফিরে আসতে থাকে। ভাবতে ভাবতে কখন যেন মায়াবী জয়ন্তীকে পেছনে ফেলে ফিরে আসি আলিপুরদুয়ার।

সাড়ে চারটেয় ট্রেন ছাড়ল আলিপুরদুয়ার স্টেশন থেকে। কথায় কথায় হাসি গানে খুশির আবির ছড়াচ্ছে ছেলে, বুড়ো, কচিকাঁচার দল। সেই রঙেই বুঝি নিজেকে রাঙিয়ে নিয়ে সূর্যদেব গেলেন অস্তাচলে।আমরা রইলাম নতুন প্রভাতের অপেক্ষায়।

  • প্রয়োজনীয় তথ্যঃ সারাইঘাট এক্সপ্রেস, উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস, কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস, কামরূপ এক্সপ্রেস, তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস যে কোনও ট্রেনে যাওয়া যায় আলিপুরদুয়ার। সেকানে হোটেলে থেকে সব জায়গা ঘোরা যায়। আবার ইচ্ছে হলে জয়ন্তী, বক্সা ও হলং-এ বনবাংলো বা মাদারিহাট টুরিস্ট লজে থাকা যায়। আলিপুরদুয়ার থেকে সব জায়গা যাওয়ার বাস বা গাড়ি আছে।
  • বনবাংলোর জন্য যোগাযোগ করতে হবেঃ ডেপুটি ফিল্ড ডিরেক্টর, ডেপুটি টাইগার রিজার্ভ (ইস্ট), আলিপুরদুয়ার কোর্ট, পিনঃ ৭৩৬১২২, ফোন ০৩৫৬৪-২৫৬০০৫
  • জলদাপাড়া হলং টুরিস্ট লজের জন্যঃ ট্যুরিজম সেন্টার, ৩/২ বিবাদী বাগ (ইস্ট), কলকাতা-১, ফোন ২৪৮৮২৭১/২ অথবা ট্যুরিস্ট সেন্টার, M/4 হিলকার্ট রোড, শিলিগুড়ি। পিন- ৭৩৪৪০৩, ফোন ০৩৫৩-২৫১১৯৭৪/২৫১৭৫৬১।

 

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes