jamdani

দুর্ঘটনায় চূর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যাওয়ার পর ফিরে আসার লড়াই

মানুষের জীবন হাইওয়ের মতো কখনও সমান্তরাল,কখনও উচু-নিচু। যেখানে জীবনের ঘাত প্রতিঘাত লেগেই রয়েছে। কারওর জীবনে আবার সেটি বিশাল আকার ধারণ করে। এই পরিস্থিতিতে মনে হতেই পারে, কিভাবে এখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো যায়। কিন্তু নিজের জীবনের সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তুলেছেন মুনিবা মাজারি। পাকিস্তানে যিনি আয়রন লেডি নামে পরিচিত।

১৯৮৭ সালে ৩ মার্চ পাকিস্তানে জন্ম হয় মুনিবার। বাবা একজন শিল্পী, মা গৃহবধু। ভাই বোনের মধ্যে মুনিবা সবার বড়ো। আর্মি পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা করার পর ফাইন আর্টসে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন মুনিবা। ইচ্ছে ছিল বড়ো চিত্র শিল্পী হবেন। কিন্তু কম বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় পাকিস্তানি পাইলট খুররাম শাহজাদের সঙ্গে।  মুনিবা সেদিন বাবা মায়ের খুশীর জন্যই বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু বিয়ের বছর ২-৩ বছর পরেই জীবনের সংজ্ঞাটাই পাল্টে যায় মুনিবার কাছে। মাত্র ২১ বছর বয়সে মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়েন মুনিবা। স্বামীর সঙ্গে বালুচিস্তান থেকে বাবার বাড়ি যাওয়ার পথে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। তাঁর স্বামী গাড়ি থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে গেলেও গাড়ি সমেত খাদে পড়ে যান মুনিবা। আর এই দুর্ঘটনায় তাঁর শিড়দাঁড়া ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। সেইসঙ্গে তাঁর হাত, কাঁধ, পাঁজর ও কলারবোনে একাধিক ফ্র্যাকচার দেখা দিয়েছিল। তাঁর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তাঁকে কোনও হাসপাতালই ভর্তি নিতে চাইছিল না, আর এইভাবে এক হাসপাতাল থেকে আর এক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়ে শরীরের নীচের অংশ থেকে স্পাইনাল কর্ডের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যার ফলে তাঁর কোমরের নীচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়।

চিকিৎসকরা তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি আর কোনওদিনও হাঁটা-চলা করতে পারবেন না, সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারবেন না, এমনকি কোনওদিনও রঙ-তুলি ধরতে পারবেন না। মেরুদণ্ড এবং কোমরের হাড় মারাত্মকভাবে জখম হওয়ার জন্য তিনি ভবিষ্যতে কোনওদিনও সন্তানের জন্মও দিতে পারবেন না। এই ঘটনার পর তিনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, যখন এই পৃথিবীতে তাঁর অস্তিত্ত্বের কোনও মূল্যই নেই তখন তাঁর আর বেঁচে কী লাভ! একজন সন্তান ছাড়া একটি মেয়ের জীবন তো প্রায় অসম্পূর্ণ!

আর এইসময়ে তাঁর জীবনে তাঁর মেরুদণ্ড হয়ে পাশে দাঁড়ান তাঁর মা। তিনিই তাঁকে বলেন যে, এই খারাপ সময় একদিন ঠিক কেটে যাবে, আর তাঁর যখন পুনর্জন্ম হয়েছে, নিশ্চয় ঈশ্বরের কোনও অন্য পরিকল্পনা করেছেন। এরপর মুনিবা মনের বল ফিরে পান। হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়েই  রঙ-তুলি ধরতে শুরু করেন মুনিবা।

এই ঘটনার কেটে গেছে প্রায় ৯ বছর। তাঁর জীবনের এই গল্প সারা পৃথিবীর মানুষকে শুনিয়েছিলেন তিনি, আর তাঁর জীবনের গল্পে উজ্জীবিত হয়েছিল সকলে। ২০১৫ সালে ফোর্বস-এর সেরা ১০০ জন অনুপ্রেরণামুলক মহিলার মধ্যে নাম ছিল মুনিবার। এরপর পাকিস্তান টেলিভিশন কর্পোরেশন-এর অ্যাঙ্কর হিসাবে কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি করে পরিচিতি লাভ করেন। মুনিবাই হলেন পাকিস্তানের প্রথম হুইল চেয়ার-ব্যবহারকারী শিল্পী এবং প্রথম গুডউইল অ্যামবাসাডর, যার গল্প আজও বহু মানুষের জীবনে অনুপ্রেরণা জোগায়। সাহস জোগায় বেঁচে থাকার।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes