jamdani

‘কিছু ভালো না লাগা’ অথবা বোকেটো মোড

বৈশাখী নার্গিস

নাহ এখানে মন খারাপের কথা বল হচ্ছে না। মাঝে মাঝে এমন একটা সময় থাকে যখন কোনো কিছুই ভালো লাগে না। আর সেই কারণটা যে কি সেটা খুঁজতে বসলে, উত্তর মিলবে না যদিও। এই ভালো লাগা, ভালো না লাগাটা কোনো অসুস্থতা বা শরীর খারাপ লাগা নয়। এর সঙ্গে মন খারাপ, স্ট্যাটাস, অফিসের প্রোমোশন, পরীক্ষার রেজাল্ট কোনো কিছু দায়ী নয়। এ এক এমন অনুভূতি, যেখানে যে কেউ যেকোনো সময় আক্রান্ত হতেই পারে।

মনে করুন আপনার সামনে পরীক্ষা। আর ঠিক সেই সময় আপনার পড়তে ভালো লাগছে না। আবার অফিসে হয়ত বড়ো কোনও অ্যাসাইনমেন্ট আছে, ঠিক সেই মুহুর্তে আপনার ভালো লাগছে না কাজ করতে। কাজগুলো কিন্তু আপনাকেই করতে হবে। কিন্তু ওই যে ‘ভালো লাগছে না’ অনুভূতি। কাজ তো আপনাকে করতেই হবে, পরীক্ষা তো আপনাকে দিতেই হবে। এর থেকে বাঁচার সমাধান তাহলে কি?

গুলিয়ে যাচ্ছে তাই তো? তবে এই অনুভূতি কেবল একা আপনারই হয় না। এই বিশ্বের কোনো কোনো সংস্কৃতিতে কিন্তু একেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। আবার কোথাও একে বশে আনতে উপদেশ দেওয়া হয়। কারণ আপনি যদি কিছু করেন, তবেই আপনি উপার্জন করতে পারবেন। যা আপনার খাবার জোগাবে। সেখানে কিছু না করে অলস সময় নষ্ট করার মানেই হল জীবনটাই নষ্ট। কিন্তু প্রাণী জগতের সবথেকে বুদ্ধি ধারণ করা মানুষের মস্তিষ্ক ভীষণ জটিল। তাই আপনি কিভাবে খুশি হবেন, বা কিভাবে আপনার ভালো লাগবে- সেটি আপনাকেই ঠিক করতে হবে। কারণ প্রত্যেকটি মানুষই আলাদা, তাই মানিয়ে চলার ধরনগুলোও আলাদা।

যেমন ইতালির কথাই ধরা যাক।  তাঁদের মধ্যে একটি ধারণা আছে ডলসে ফার নিয়েন্তে। যার অর্থ হল ‘মধুর আলস্য’ বা কিছু না করার আরাম। আসলে এটি দিয়ে তারা বোঝায় শুধু অলস বসে থাকা নয়, সেই মুহুর্তকে উপলব্ধি করা। চারদিকের প্রশংসা করা, জীবনের রেস থেকে কিছু সময়ের বিরতি।

জাপানেও রয়েছে এরকম একটি শব্দ। যার নাম ‘বোকেটো’। বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘কোনো নির্দিষ্ট চিন্তা ছাড়া শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা’।  আমরা যখন অনেক চাপের মধ্যে থাকি। সেইসময় আমাদের মন মাঝে মাঝে এরকম বোকেটো মোডে চলে যায়। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃতভাবেই কখনো কখনো আমরা আমাদের চিন্তাভাবনায় লাগাম টানতে পারি, তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ ভালো।

মনে করুন, আপনি আপনার কাজের টেবিলে বসে আছেন, হাতে এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই। কিন্তু, আপনি কি কোনো চিন্তা ছাড়া বসে আছেন? হয়তো ভাবছেন, এরপর আপনার কোন কাজটা করতে হবে বা বাড়ির জন্য কী বাজার করতে হবে। অথবা আপনার মনে পড়েছে স্কুল জীবনের কোনো স্মৃতি, বন্ধু বা কোনো শিক্ষকের কথা। অথবা কোনো মধুর সময়ের কথা।

আবার আপনি হয়তো নতুন কোনো জায়গায় বেড়াতে গিয়েছেন, চারপাশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ক্যামেরায় ছবি তুলতে লাগলেন, যাতে ভবিষ্যতে এই জায়গার স্মৃতি রোমন্থন করতে পারেন। কিন্তু দেখা গেল, বাড়িতে এসে আপনি যখন ছবিগুলো দেখছেন, তখন কিছুতেই মনে করতে পারছেন না যে ঐ মুহূর্তে আপনার অনুভূতি কী ছিল। বেমালুম ভুলে গেছেন।

আসলে আমরা যখন যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, সবসময় অতীত অথবা ভবিষ্যতের চিন্তায় মগ্ন থাকি। বর্তমান বলে যে একটা কাল আছে, যার মধ্যে আমরা বেঁচে আছি, সেই বর্তমানকে নিয়ে আমরা কখনো ভাবি না। তবে এখন আর একটা জিনিস করি, কোনো কাজ না থাকলে ফোনের পর্দায় সময় কাটাই, কিন্তু সেটাও নিজের সঙ্গে নয়।

আসলে সবকিছুর পেছনে আছে ডোপামিন নামক হরমোনের কারসাজি। মনের ভাব নিয়ন্ত্রণ, আবেগ বা উত্তেজনায় সাড়া দেওয়ার নিয়ন্ত্রণ মূলত ডোপামিনের কারণে হয়ে থাকে। যখন অনবরত কিছু না কিছু নিয়ে আমরা ব্যস্ত থাকি; ভালো ফলাফল, আরও ভালো চাকরি-ভালো বেতন, বাড়ি-গাড়ি এসবের পেছনে ছুটতে থাকি, আমাদের মস্তিষ্ক তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আবার সাময়িক বিরতি নেবার বাহানায় যখন আমরা মোবাইলের সাথে সময় কাটাই, তখন সেখান থেকে আমাদের সাময়িক ভালোলাগার অনুভূতি হয়।

ভাবছেন, এ আবার কি? তাহলে আসুন, ইতালিয়ান ‘ডলসে ফার নিয়েন্তে’ অথবা জাপানি ‘বোকেটো’তে ফিরে যাই। কিছু না করার সময় খুঁজে নেই একটা। মনে করুন, আপনি কিছুর জন্য অপেক্ষা করছেন। হাতে ফোন আছে? সঙ্গে সঙ্গে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলুন। আপনার সাময়িক ‘কিছু না করা’র যাত্রা শুরু করুন। এটি আপনি প্রতিদিন করতে চাইলে সকালে ঘুম থেকে উঠে বা রাতে ঘুমোনোর সময়েও অভ্যাস করতে পারেন। এতে আপনার শরীর, মন; দুই-ই একসময় এর থেকে উপকৃত হবে।

‘কিছু না করা’র সময় একটি আরামদায়ক, শান্ত পরিবেশ বেছে নিতে পারেন, যা আপনাকে ঐ মুহূর্তের উপর মনোযোগ দিতে সাহায্য করবে। হতে পারে আরামদায়ক সোফা, বা আপনার বিছানা- তারপর আরাম করুন। হাতে নিতে পারেন গরম এক কাপ চা বা কফি। এবার সময় দিন ঐ মুহূর্তে। অথবা চাইলে বসতে পারেন কোনো পার্কের বেঞ্চে অথবা নদী-লেকের পাড়ে। এরপর, কী করবেন? কিছুই করবেন না! অর্থাৎ সেই কিচ্ছু না ভালো না লাগার মুহুর্তটা ‘কিছু না করার মোড’ অর্থাৎ বোকেটো মোডে নিয়ে যান।

কিছুই না করার কোনো সময়সীমা নেই, যতক্ষণ আপনি প্রয়োজন মনে করছেন, ততক্ষণ ‘কিছুই না করার’ চেষ্টা করতে পারবেন; সেটা হোক দুই মিনিট বা এক ঘণ্টা। আপনি ততক্ষণ ‘কিছুই করবেন না’, যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনার মনে হয় যে যথেষ্ট হয়েছে। সময় এক্ষেত্রে কোনো ব্যাপার নয়। যতটুকু সময় মনে হবে আপনি ‘আসলেই কিছু করেননি’– সেটাই হলো গুরুত্বপূর্ণ।

Image Source: Fistful of Talent, google

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes