jamdani

ইস্ট বেঙ্গলের মেয়ে

মৌমিতা তারণ

শেষ পর্ব 

ঠিক মোহনবাগানকে নয়, মোহনবাগানের কোনও কোনও প্লেয়ারকে। সেই যেবারে কসমস দলের হয়ে পেলে খেলতে এসেছিলেন। সে খেলা নিয়েও কত গুজব। মাঠে ওটা নাকি পেলে নয়, পেলের ডামি। পেলে নাকি গ্র্যান্ডে বসে টিভিতে খেলা দেখছেন। এ-সব গুজব-টুজব মন্দ লাগত না। বরং ফুটবল নিয়ে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়ত। আসলে কালো বুট পায়ে মাঠে দৌড়নো ওই ছেলেগুলোকে কখনই অন্য বাড়ির ছেলে মনে হত না। কেনই বা হবে? মাচ জিতে ওরা তো কখনও নিজেদের মধ্যে আনন্দ করত না। সাপোর্টারদের সঙ্গে মিশে গিয়ে আনন্দে মাতত। কথা হচ্ছিল মানস ভট্টাচার্যর সঙ্গে।

বাটানগরের ছেলে মানসদাকে সাপোর্ট করত পুরো বাটানগর। যারা মোহনবাগানের সমর্থক তারা চাইত দল জিতবে মানসের দেওয়া গোলে। আর বাটানগরবাসী ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টাররা চাইত ইস্টবেঙ্গল জিতুক কিন্তু বিপক্ষের মানস অন্তত একটি গোল করুক। অর্থাৎ, মানস ভাল খেলুক। প্লেয়ারদের খেলার ভুলভ্রান্তি নিয়ে সে সময় ট্রামে, বাসে মানুষ চর্চা করত। একসময়ের ডিআইজি দময়ন্তী সেনও বইয়ের ফাঁকে মানস ভট্টাচার্যের ছবি রেখে হিরো পূজো করতেন। প্লেয়ার খারাপ খেললে ভোগান্তি হত সাপোর্টারদের। প্লেয়ারের সঙ্গে খিস্তিখাস্তা হজম করতে হত তাদেরও। তবে মাঠে রেষারেষি থাকলেও খেলার বাইরে ফুটবলাররা সবাই সবার বন্ধু। ভাস্কর, চিন্ময়, মানস, বিদেশের বন্ধুত্বের কথা কে না জানে।

খেলা নিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করতে মিডিয়ার একটা বিরাট ভূমিকা থাকে। সে সময় ইলেকট্রনিক মিডিয়া বর্তমানের মতো এত সক্রিয় ছিল না। তা সত্ত্বেও বাংলার রান্নাঘরে ফুটবল পৌঁছে গিয়েছিল। বাঙালিকে ফুটবল পাগল করে দিতে প্রিন্ট মিডিয়া যথেষ্টই সফল। বড় ম্যাচের খবর প্রথম পাতাতে কাগজের পাতায় চোখ রেখে পে কে-র ভোকাল টনিক গলাধঃকরণ করত ইস্টবেঙ্গলের মেয়েটি। দৈনিক পত্রিকা ছাড়াও বেশ কিছু খেলার ম্যাগাজিন সে সময় প্রকাশিত হত। নিমেষের মধ্যে সে ম্যাগাজিন মুখস্থ হয়ে যেত মেয়েটির। ৩-২-৫ নয়, ৪-২-৪ ছক তাঁকে বেশি আনন্দ দিত। ডায়মন্ড ছক-টক তখন ছিল না। বড় ম্যাচের আগের দিন বন্ধুরা মিলে দুই দলের টিম ঠিক করে ফেলত। দেখা যেত ওদের ঠিক করা টিমই খেলছে।

এমনই সব ফুটবলবোদ্ধা ছেলেমেয়ে তখন পথেঘাটে ঘুরে বেড়াত। এমনটা হবে নাই বা কেন? ওই ২২টা কেলোকুলো যে আমাদেরই ঘরের ছেলে। হোটেল থেকে নয়, ওরা বাড়ি থেকে মাঠে খেলতে যায়। তাই বলে কি সে সময় নঈম, হাবিব, আকবর, শ্যাম থাপা, জামশেদ নাসিরি, মজিদ বাসকার, সাবির আলি, জেভিয়াস পায়াস-রা মাঠে দৌড়ত না? অবশ্যই দৌড়ত। দৌড়তে দৌড়তে ওরাও একদিন আমাদের ঘরেরই কেলোকুলো ছেলে হয়ে গিয়েছিল। এই ছেলেগুলোকে উৎসাহিত করার জন্য আমাদের ভুভুজেলার দরকার পড়েনি। গলা ফাটানো চিৎকার আর খিস্তিতেই ওরা চনমনে থাকত।

দুই বিনুনির কিশোরী আজ উঠতি প্রৌঢ়ের দলে নাম লিখিয়েছে। ঘর-বার সামলে সে আজ অদ্বিতীয়া। তা স্তত্বেও মাঝে মাঝে বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সকালে খবরের কাগজে দেখল আজ নাকি আই এফ এ শিল্ডের ফাইনাল ম্যাচ। তার প্রিয় ইস্টবেঙ্গল ফাইনালিস্ট। কিন্তু কই সে তো এতটুকু উত্তেজিত হচ্ছে না। অফিসে আসার পথে মানুহশজনের মুখেও ফুটবল নিয়ে কোনও আলোচনা শুনল না। অথচ, বাংলার বুক থেকে ফুটবল হারিয়ে গেছে এ কথাই বা সে বলে কী করে? ‘গো-ও-ও-ল’ শব্দে আজও সল্টলেক স্টেডিয়াম কেঁপে ওঠে। মোহনবাগানকে সাসপেনশন থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আজও লাখো মানুষ সই দেয়। সব সত্যি। কিন্তু বাংলার ফুটবল আজ আর ‘ইস্টবেঙ্গলের মেয়ে’ বা ‘মোহনবাগানের মেয়ে’ তৈরি করে না। কেন করে না সে উত্তর খুঁজুক বাংলার যাবতীয় ফুটবলপ্রেমী।

 

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes