jamdani

ইস্টবেঙ্গলের মেয়ে

মৌমিতা তারণ

পর্ব-১ 

ছোট্ট মেয়েটি সাদা টেপফ্রক পরে এ-ঘর, ও-ঘর নেচে বেড়াচ্ছে। ঘড়িতে বিকেল চারটে। আজ পর্যন্ত রোদ্দুরে এতটুকু মন কেমন করা মেজাজ নেই। বরং টানটান উত্তেজনা গনগনে রোদ্দুরের তাপ ছড়াচ্ছে। বাড়ির ম্যাস্ট্রো রেডিওর সামনে হুমড়ি খেয়ে আছেন বাবা, কাকা, দাদারা। জানলার পর্দা ওঠানো। ও-পারে প্যাসেজে দাদাদের দু-চারজন বন্ধুবান্ধব। রেডিওতে চলছে ধারাবিবরণী। ভাষ্যকার অজয় বসু। ইডেনে আজ ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ফুটবল লিগের ফাইনাল ম্যাচ। হঠাৎই ঘরের সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে উত্তেজিত বাবার চিৎকার, ‘শালা শুয়োরের বাচ্চা হাবিবটারে দিয়া কিস্যু হইব না।’ এ কি বাবার মুখে গালি! মেয়েটির চক্ষু ছানাবড়া! কস্মিনকালেও বাবাকে এমন রূপে দেখেনি সে। হ্যাঁ, এমনই ছিল সোনার খাঁচায় ভরা সে-সব নানা রঙের দিনগুলি।

আর সেই গানটি?- ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’। শুনলেই লাফিয়ে উঠত মন, রক্ত ফুটত টগবগিয়ে। আসলে ওটা তো কেবল গান ছিল না, ছিল জাগো বাংলা মন্ত্র। আহা! মাঠের যে দিকে তাকাও বাঙালি। গোলকিপার বাঙালি, স্টপার বাঙালি, মিডফিল্ডার বাঙালি, উইঙ্গার বাঙালি, স্ট্রাইকার বাঙালি। সাইড লাইনের ধারে বসে আছেন ওই যে দুই কোচ মহাশয়- আজ্ঞে হ্যাঁ, তারাও নিখাদ বাঙালি। কোথায় লাগে ফার্গুসন, মারিনহো! লাইন্সম্যানের সঙ্গে সঙ্গে অমল দত্তর দৌড়। বাপরে, সে এক দিন গেছে বটে! ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহমেডান কত রাতের ঘুম যে কেড়ে নিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ম্যাচের দিন সকাল থেকেই আকাশে- বাতাসে উৎসবের আমেজ। বহুতল তখনও পাড়ার মেজাজ কেড়ে নেয়নি। পাড়ার মোড়ে মোড়ে জটলা। আজ যুদ্ধ কী হবে? শুধু ফলাফল নয়, খেলার স্ট্র্যাটেজি থেকে শুরু করে পাস্ট রেকর্ড, প্লেয়ারদের মনমেজাজ, ঠিকুজিকুষ্ঠি যাবতীয় বিষয় সে আলোচনায়। এরই মাঝে দুই সমর্থকের পতাকা উত্তোলন। কাছাকাছি কালীমন্দির থেকে শুরু করে দক্কিনেশ্বর, কালীঘাট- সর্বত্রই অর্থাৎ, মায়ের ব্রাঞ্চ অফিস টু হেড অফিস সব জায়গাতেই সমর্থকদের আবদার, ‘জিতিয়ে দে মা।’

আমাদের ছোট্ট মেয়েটিও ভেসে যেত সেই ফুটবল উৎসবে। ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের দিন সে লাল-হলুদ ফ্রক পরবে। আর পরবেই নাই বা কেন? বাবা যে ইস্টবেঙ্গলের লাইফ মেম্বার। ৫০ সনে রিফিউজি পরিচয়ে এই বাংলায় বাবার আগমন। সঙ্গে ছয়-ছয়টি সন্তান এবং সর্বংসহা স্ত্রী। প্রথম আস্তানা শিয়ালদহ স্টেশন। তার পর এপাশ-ওপাশ হাজারো লাট খেয়ে অবশেষে এই বাংলায় থিতু হওয়া। এরই মাঝে জন্ম নিয়েছে ছোট্ট মেয়েটি। মধ্যিখানে এক যুগ পেরিয়ে এলেও ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ শহর তখনও বাবাকে তাড়া করে বেড়ায়। মা তখনও বিভোর থাকেন শীতলখ্যা নদী আর লক্ষ্মীনারায়ণজির আখড়াতে। রিফিউজি পরিচয় ঘুচে গেলেও এই বঙ্গে জুটেছে একটা নতুন নাম- ‘জার্মান’। ‘মাইর‍্যা ফেলুম, কাইট্যা ফেলুম’ বিড়বিড়ানিতে বাবা-কাকার রক্ত তখনও টগবগায়। বাড়ির খাওয়া-দাওয়া, আচার-অনুষ্ঠান সবেতেই ওপার বাংলার ছোঁয়া। ‘মুসুরির ডাইল দিয়া ভাত মাইখ্যা’ খায় সবাই।

গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় ছাদে খোলা আকাশের নিচে কিংবা ঝড়বৃষ্টিতে ঘেঁষের রাস্তার ল্যাম্প পোস্ট উপড়ে গিয়ে লাইট নিভে গেলে বাড়িতে শুরু হত আড্ডা। সে আড্ডায় অবধারিতভাবে উঠে আসত রায়টের গল্প। বাবা, কাকা, বাস্তুভিটে হারানোর বেদনা ভুলত ইস্টবেঙ্গলের হয়ে গলা ফাটিয়ে। সেই রায়টের গল্প, উদ্বাস্তু, জীবনের গল্প শুনতে শুনতে ছোট্ট মেয়েটিও কবে যেন ইস্টবেঙ্গলের এক মস্ত সাপোর্টার হয়ে উঠল। ক্লাস ফাইভ-সিক্স-সেভেনেই তার স্বপ্নে উঁকি মারে সমরেশ, সুরজিৎ, শ্যাম, ভাস্কর, চিন্ময়-রা। চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত সেই সেমসাইড গোল আজও মেয়েটির স্মৃতিকে ভীত করে। শ্যাম থাপার বাইসাইকেল কিক বা সুরজিৎদার ড্রিবলিং-এ মশগুল থাকলেও বিপক্ষের প্রসূনদার বাঁ-পায়ের জাদু মেয়েটির নজর এড়াত না। প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় কপাল কুঁচকলে তাঁর ভ্রুযুগলের মাঝখান দিয়ে দুটো ভাঁজ যে সোজা কপালের দিকে উঠে যায় সে খবরও রাখত মেয়েটি ও তার বন্ধুরা। কে যেন খবর এনেছিল, ভাস্কর গাঙ্গুলি নাকি একটি অসাধারণ সুন্দরীর সঙ্গে প্রেম করেন। এরকম বিচ্ছিরি খবরে মেয়েটি নাওয়া খাওয়া ভুলতে বসেছিল প্রায়।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes