jamdani

আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে

পাঁচ পাঁচটি ছেলের মা বোস গিন্নির বছরভর মস্ত এক কাজ ছিল ছেলেদের পুরনো জামাপ্যান্ট সযত্নে গুছিয়ে রাখা। কারণ পূজো গিয়ে শীত শেষ হতে না হতেই এসে হাজির হত দোল পূর্ণিমা। পাঁচটি ছেলেই রঙ খেলায় মহা ওস্তাদ। শুধু আবির বা রঙ হলে না হয় হত। বড়টি তো আবার দলবল নিয়ে নালি-নর্দমার পাক দিয়ে দোল খেলত। অন্যগুলোও কম যায় না। বাদুরে রঙ হল ওদের সবথেকে পছন্দের রঙ। এমনই টেকসই সেসব রঙ যে দোল শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও প্রায় মাসখানেক ধরে মনে হত ঘরের মধ্যে পাঁচটি ভূতের ছানা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তা ছানাপোনাগুলো না হয় ভূত সেজে ঘুরে বেড়ালো, তাই বলে পয়সা দিয়ে কেনাভাল ভাল শার্ট-প্যান্টগুলোকে তো আর ভূতের জামা বানানো যায় না। অগত্যা ছেঁড়াফাটা জামাকাপড় গুছিয়ে রাখতেই হত এই বিশেষ দিনটির জন্য।

বোস গিন্নির মতো এরকম পুরনো জামা গুছিয়ে রাখা মা সে সময় ঘরে ঘরে ছিলেন। মানে আজ থেকে আরও পনের কী বিশ বছর আগে দোল এমনই এক উৎসব ছিল যার অপেক্ষায় থাকত ছোট বড় সকলে। তখন রঙ বলতে কেবল কৌটোর মধ্যে লাল, নীল, বেগুনী, সবুজ এই কয়েকটি রঙ। জল দিয়ে রঙ গুলে পিচকারিতে ভরে নিয়ে সামনে যাকে পাবে তাকেই রঙিন করো। এমনকি ঘরের পোষা মেনিটা বা রাস্তার গরু, ছাগল, কাউকেই ছাড়া নেই। বাহারি পিচকিরি সেসময় ছিল না। সবই ছিল একরকম দেখতে লম্বা লম্বা তেলের শিশির মত। রঙ বা পিচকারি বাহারি না হলেও বাহার ছিল আবিরে। সেই লাল রঙে লালের কোনও ভেজাল নেই। মোলায়েম সেই আবির হাতে নিলেই মন কেমন করত। ইচ্ছে হত রাঙিয়ে দিই প্রিয় মানুষটির মুখ।

জমানা বদলের সঙ্গে সঙ্গে দোল খেলার সরঞ্জামও তার চেহারা বদলাতে লাগল। কোনও এক দোলে দেখা গেল বাজারে রঙ-বেরঙের কাগজের টুপি বিক্রি হচ্ছে। মাথা বাঁচিয়ে দোল খেলার প্রচেষ্টা। এরকমই এক দোলে বাজার ছেয়ে গিয়েছিল ‘বন্দুক পিচকিরিতে’। দেখতে দেখতে লাল আবিরেরও একক দর্প চূর্ণ হল। দোসর হিসেবে সে পাশে পেল সবুজ, গোলাপি, কমলা হরেক রঙের জাতভাইকে। আর এখন তো রঙ খেলার সরঞ্জাম টেকনিক্যালি অনেক বেশি রঙদার। তবে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই স্বতস্ফুর্ত রঙিন উৎসাহ। বড্ড বেশি যেন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে দোল উৎসব। অভিভাবকের হাজারো বিধিনিষেধ বেঁধে দিচ্ছে কচিকাঁচাদের দোল খেলার সীমারেখা।

বাঙালি যাকে দোল উৎসব বলে বাংলা পেরিয়ে নাম বদলে সে হয়ে যায় হোলি উৎসব। ‘হোলি’ নামটির এক চমকপ্রদ ইতিহাস রয়েছে। অতীতে রাজা হিরণ্যকশিপু নিজেকে প্রবল পরাক্রমশালী বলে ভাবতে শুরু করলেন। নিজ রাজ্যপাটের সব প্রজার জন্য আদেশ জারি করলেন, ‘রাজা ছাড়া আর কারও পূজো করা চলবে না’। রাজার এই কঠোর আদেশ অমান্য করার কোনও সাহস ছিল না সাধারণ প্রজাদের। তবুও একটি ছোট্ট ছেলে রাজাদেশ অমান্য করতে শুরু করল। ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত এই ছেলেটি আর কেউ নয়, স্বয়ং রাজপুত্র প্রহ্লাদ। বাপ-ছেলে দুজনেই সমান জেদি। ছেলের বিষ্ণুপূজো কিছুতেই বন্ধ করতে না পেরে রাজা পুত্রহত্যার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু সেখানেও পুত্রকে বাগে আনতে পারলেন না। বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদকে বারেবারেই রক্ষা করতে লাগলেন স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু। হিরণ্যকশ্যিপুকে এবার সাহায্য করতে এগিয়ে এল তার বোন হোলিকা। অগ্নি কখনও হোলিকাকে স্পর্শ করবে না- এমনই বরপ্রাপ্ত ছিল হোলিকা। রাজার নির্দেশে ছোট প্রহ্লাদকে স্পর্শ করল না। তবে হোলিকা মস্ত ভুল করে বসল। সে জানত না এককভাবে আগুনের মধ্যে প্রবেশ করলে তবেই তার প্রাপ্ত বর কাজ করবে। কিন্তু কোলে প্রহ্লাদ থাকায় হোলিকার সেই বর কোনও কাজ করে নি। ভস্মীভূত হয় হোলিকা। এই হোলিকার নাম থেকে হোলি উৎসবের নামকরণ। এই ঘটনাকে মনে রেখেই হোলির আগের দিন ‘ন্যাড়া পোড়া’র রেওয়াজ দেখা যায়। কেউ আবার একে বলে বুড়ির ঘর পোড়ানো। ছোটবেলার এইসব ছেলেমানুষি মজা বোধহয় নিছক ছেলেমানুষি ছিল না। এ বিষয়ে বড়দের ব্যাখ্যা ছিল শীতে যত শুকনো পাতা গাছ থেকে খসে পড়ে সেগুলোকে পুড়িয়ে ফেলে বাড়ির চারধারকে পরিস্কার রাখার উদ্দেশ্যেই এই ন্যাড়া পোড়ার আয়োজন। তবে পুরাণ মতে এই ন্যাড়া পোড়া উৎসবের মেসেজ হল, ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের জয়’।

তবে যে যাই বলুক আদতে হোলি যে প্রেমের খেলা একথা সকলেই মানেন। আর এই প্রেমের খেলার প্রেমিক পুরুষটি হলেন কৃষ্ণ ঠাকুর। গৌরবর্ণা রাধার গাত্রবর্ণ কৃষ্ণকে ভয়ানক হীনম্মন্যতায় ভোগাত। ‘রাধা কেন ফর্সা’- এই প্রশ্নবাণে মা যশোদা খেলাচ্ছলে একবার কানুকে বলেছিলেন, ‘যা রাধার মুখে ইচ্ছেমত রঙ মাখিয়ে ওর কমপ্লেকশন বদলে দে’। মায়ের এই আইডিয়া দারুণ মনে ধরে গেল কানুর। দৌড়ল সে রাধার মুখে রঙ মাখাতে। বাদ পড়ল না ললিতা, বিশাখা ও অন্যান্য গোপীনীরাও। মনে তো প্রেম ছিলই। রঙ দেওয়ার ছুতোয় শরীরী প্রেমে মাতোয়ারা হল রাধা-কৃষ্ণ জুটি। ব্যস সেই যে ব্রজধামে প্রেমের রঙিন খেলা শুরু হল আজও নন্দগ্রামের ছেলেমেয়েরা সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে বছরের বিশেষ এই দিনটিতে। শুধু ব্রজধামই বা বলি কেন, ব্রজধাম থেকে সেই রঙ মাখানো ছোঁয়াছুয়ি-র প্রেম কবে যে সারা ভারতব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল কেউ টেরটিই পেল না।

এই রঙিন উৎসবকে আরও রঙদার করে তুলল ভারতীয় সিনেমার রঙিন পর্দা। বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, তামিল, ভোজপুরি, গুজরাতি ইত্যাদি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার কোনও না কোনও ফিল্মে হোলির দৃশ্য আমরা আজও পেয়ে আসছি।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes