jamdani

অল্প চেনা দারিংবাড়ি

দেবিকা বসু (দাশগুপ্ত)

ওড়িশার একমাত্র শৈলগ্রাম কন্ধমাল জেলার দারিংবাড়ি। শাল, সেগুন, মহুয়ার বন, কফির বাগান আর কাছে-দূরে ছোট ছোট সাঁওতাল গ্রাম নিয়ে পূর্বঘাট পর্বতমালার কোলে এই উপত্যকা – মনে হয় যেন প্রকৃতি তার সবটুকু রঙ, রস, রূপ ঢেলে দিয়ে তৈরি করেছে একে। ৩০৮৪ ফিট উচ্চতায় শীতকালে তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নীচে নেমে যায়, মাঝে মাঝে নাকি বরফও পড়ে। স্থানীয় মানুষজনের ভাষায় দারিংবাড়ি তাই ‘পূর্বভারতের কাশ্মীর’।

এই মায়াবী উপত্যকাটি রয়েছে আমাদের এক্কেবারে কাছেই, কলকাতা থেকে ভুবনেশ্বর, ব্রহ্মপুর হয়ে দারিংবাড়ি মাত্র আট ঘন্টার পথ। ব্রহ্মপুর হল দারিংবাড়ি আসার সবথেকে কাছের রেলস্টেশন, দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিমি। গাড়িতে সময় লাগে কম-বেশি চার ঘন্টা। পরিচিত কয়েকজনের মুখে শুনে যাত্রা করলাম দারিংবাড়ির উদ্দেশে। ব্রহ্মপুর থেকে দারিংবাড়ি ১৭ এ জাতীয় সড়ক ধরে। দুদিকে শুধু বড় বড় মাঠ আর ধানখেত। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম। কিছুদূর যাবার পরই আমাদের সঙ্গ নিল ঋষিকুল্যা নদী। শুরু হল কন্ধমাল জেলা, বইসালা থেকে। এরপর সমতল ছেড়ে গাড়ি উঠল ধীরে ধীরে পাহাড়ি রাস্তায়। এঁকেবেঁকে চলল পাহাড়ি পথ – রাস্তার দুধারে ঘন শালবন। আর আছে আম, হরীতকী, কুল আরও কত নাম না জানা বুনো পাহাড়ি ফুলের গাছ। রাস্তার উপরে ডালপালা নুইয়ে তারা যেন পর্যটকদের স্বাগত জানাচ্ছে অল্প চেনা এই পাহাড়ি সৌন্দর্যের অফুরান ভান্ডারটিতে।

যাত্রাপথের চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে থাকতে থাকতে এগিয়ে চলেছি, হঠাৎ সম্বিৎ ফিরল গাড়ির ড্রাইভারের কথায়- ‘এসে গেছি আমরা দারিংবাড়ি’। সামনেই তাকিয়ে দেখি সবজির বাজার বসেছে, সঙ্গে রয়েছে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান। কলকাতা থেকেই যোগাযোগ করে এসেছিলাম ইকো লজের কর্ণধারের সঙ্গে। বাজার ছাড়িয়ে অল্প উঁচু লালমাটির ছোট্ট টিলার উপরে কর্ণধার মহাশয়ের ইকো হোম। ছবির মতন সুন্দর। প্রবেশদ্বারের মাথায় ছোট ছোট টুকরো কাপড় উড়ছে, তাতে লেখা ভগবান বুদ্ধের বাণী। গাড়ি এসে দাঁড়াতেই শশব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন লজের কর্ণধার মিস্টার সোয়াইন। সাদরে ভিতরে নিয়ে এলেন আর আশ্বাস দিলেন এই অচেনা দারিংবাড়িতে যতদিন থাকব ততদিনই আমাদের সুখ-সুবিধার ভার তাঁর। মুহূর্তেই যেন আপন করে নিলেন আমাদের। দ্বিশয্যার পরপর ছয়টি স্নানঘর সংলগ্ন ঘর। সামনে ছোট ছোট বারান্দা। রয়েছে হরেক ফুল আর ফলের গাছে ভরা বেশ সুন্দর বাগান। গাছে গাছে খেলা করছে পাখির দল। যতদূর চোখ যায় দেখি দূরে সবুজে মোড়া ছোট-বড় পাহাড়। ঘরের জানলা খুলতেই পিছন দিকে দেখি লালমাটির টিলায় শালগাছের ঘন বন। কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় শাল পাতার সবুজ রঙ যেন ঠিকরে পড়ছে। একটু পরে প্রফুল্ল এসে জানান দিল লাঞ্চ তৈরি। সহজ, সরল প্রফুল্ল সদাই ব্যস্ত তাঁর অতিথি আপ্যায়নে।

 

 

কাঠের সুদৃশ্য ডাইনিং হল। গরম গরম সুস্বাদু খাবার খেয়ে যাত্রাপথের সব ক্লান্তি নিমেষে উধাও। একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম শালবনের ভিতর দিয়ে লাল কাঁকড়ের রাস্তায়। হাজারো বুনো ফুলে উড়াউড়ি করছে হরেক রঙের প্রজাপতি। দেখা হল প্রফুল্লর সঙ্গে। সে চলেছে বাজারের দিকে রাতের খাবারের জোগার করতে। আমরাও পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম সবুজের মধ্য দিয়ে। দু-চারজন আদিবাসী মহিলা চলেছেন- পরনে গাঢ় উজ্জ্বল রঙের ফুলছাপ শাড়ি। কাঁচা রাস্তা ছেড়ে এবার আমরা উঠে এলাম পিচ রাস্তায়। প্রায় দুই কিলোমিটার এগোতেই বাঁ-দিকে হিলটপ যাবার বাঁধানো পথ। টিলার মাথায় নজরমিনারে উঠলাম। চতুর্দিকে পাহাড় আর তার ভাঁজে ভাঁজে দুর্ভেদ্য জঙ্গল। আর রয়েছে অসীম স্তব্ধতা। শুনলাম এখানে এমন অনেক পাহাড় আর বন রয়েছে, সেখানে আদিবাসী মানুষজন ছাড়া কেউই প্রবেশ করতে পারে না। পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতায় এই শৈলগ্রামে রয়েছে পাইনবন। পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো চারাগুলো আজ বিস্তীর্ণ পাইনবনে পরিণত হয়েছে। ধীরে ধীরে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে। ঘন নীল আকাশের মধ্যে দিয়ে পড়ন্ত সূর্যের আলো গাছগাছালির মাথা ডিঙিয়ে উপত্যকার নীচে ছড়িয়ে পড়ছে – এ যেন প্রকৃতির কোলে আলো আর ছায়ার এক মায়াময় খেলা।

পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। বারান্দায় বেরিয়ে দেখি ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙছে পাহাড়েরও। পূবের কোণ থেকে উঁকি মারছে আলোর রেখা। তারই সঙ্গে ব্যস্ততা শুরু হয়েছে দূরের গ্রামে। ব্রেকফাস্ট সেরে নিতেই গাড়ি নিয়ে হাজির হয় নিত্যানন্দ। মিস্টার সোয়াইন আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, আজ থেকে নিত্যানন্দই আমাদের আশেপাশের জায়গাগুলি ঘুরিয়ে দেখাবে।

 

প্রথমেই পাঁচ-ছয় কিলোমিটার পথ পেরিয়ে গিয়ে পৌঁছলাম কফির বাগানে। পথে দুপাশে যতদূর দৃষ্টি যায়, কেবলই কফি গাছের বাহারি ছোট ছোট সাদা ফুল। কোনও গাছে সবুজ, আবার কোথাও রয়েছে লাল চেরির মত ফল। কফি গাছের ফাঁকে ফাঁকে জন্মেছে গোলমরিচ লতা। এই সব চাষই এখানে ওড়িশার ভূমি সংরক্ষণ বিভাগের সৌজন্যে। সমস্ত যাত্রাপথটিই সবুজের চাদরে মোড়া। মহুয়া, হলুদ, ধান আর সর্ষে গাছের ভিড়ে মাঝে মাঝে পাহাড়ের কোলে দেখা দেয় ছোট ছোট ঘর। গাড়ি ঘুরিয়ে নিত্যানন্দ নিয়ে চলল আমাদের Lover’s Waterfall –এর দিকে। গভীর অরণ্যের বুকে চিরে বয়ে চলেছে শুভ্র, ফেলেনি জলরাশি। ছোট-বড় পাথরে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে সে হয়ে উঠেছে আরও – চঞ্চল বহুদূর থেকে আসে তার গর্জন।

এরপর আমাদের গন্তব্য এমু পাখির এক আশ্চর্য প্রতিফলন কেন্দ্রে। চারধারে মোটা তারজালি দিয়ে ঘিরে তার মধ্যে প্রায় ৪০-৫০ টি এমু পাখি বড়ো করে তোলা হচ্ছে। বাবা-মার সঙ্গে রয়েছে ছানারাও । খাদ্য আর যথোপযুক্ত নিরাপত্তা পেয়ে বেড়ে উঠছে ওরা। পূর্ণবয়স্ক হলে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন চিড়িয়াখানায়। তারজালির কাছে গিয়ে দাড়াতেই লম্বা লম্বা পা ফেলে গলা বাড়িয়ে আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানাল ওদের ডেরায়।

ফেরার পথে দেখলাম মাথায় জ্বালানি কাঠের বোঝা নিয়ে ঘরে ফিরছে আদিবাসীরা, দেহ ক্লান্ত , কিন্তু মুখের মৃদু হাসিটি তখনও রয়েছে অটুট। পুরুষদের পাশাপাশি কাঠ মাথায় নিয়ে চলছে মেয়েরাও। কিন্তু ওদের মুখে আর গলায় ও কীসের দাগ? জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই নিত্যানন্দ ভেদ করল রহস্য। এরা কন্ধমালের কান্ধা উপজাতির মানুষ , কথা বলে এরা ক্যুই ভাষায়- মুখে, গলায় মেয়েরা উকিল কাটে। বহুকাল আগে কন্ধমালের দুষ্টু রাজার হাত থেকে বাঁচতে মুখে, গলায় উলকি কেটে নিতেন মেয়েরা। সুন্দর মুখ হয়ে উঠত কুশ্রী- বেঁচে যেত সন্মান। সেই লম্পট রাজার শাসন আজ আর নেই, কিন্তু কন্ধমালের এই ভূমিপুত্রের দেশে মেয়েরা আজও উলকি কাটে। বিস্ময়ে বিভোর হয়ে দেখি ওড়িশার এই অল্পচেনা জায়গাটিতে কীভাব ইতিহাস তার প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। হাজার অভি তা সঞ্চয় করে এবার লজের পথ ধরলাম। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে নেমেছে বৃষ্টিও। বৃষ্টিস্নাত অরণ্য যেন আরও সবুজ আরও সুন্দর করে তুলেছে পূবের কাশ্মীরকে। উঁচু-নীচু লালমাটির পথ পেরিয়ে গাড়ি চলেছে যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে। রাত নামার আগে লজে ফিরতে হবে- বরাবর সর্তক করে দিয়েছিলেন শ্রী সোয়াইন। ঘরে ফিরতেই পকোড়া সহযোগে এসে পড়ল গরম চা, প্রফুল্লের কল্যাণে। এত উষ্ণ আতিথেয়তা, এত প্রত্যন্ত জায়গায় কল্পনাও করা যায় না। নশভোজের টেবিলে বসেই শ্রী সোয়াইন বলে রেখেছিলেন আমাদের পরেরদিনের যাত্রা মন্ডাশোরের দিকে। রাস্তার অবস্থা খুব ভালো নয়। তাই সকাল সকাল তরি হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম গাড়িতে, সঙ্গী হল নিত্যানন্দ। আমলকী, হরীতকী, কুল আর বহেরা গাছ পথের দুধারে। ‘মুন্ডা কথার অর্থ হল ‘পাহাড়চূড়া’ , আর ‘ কোর ‘ মানে খাদ- কেঁপে ওঠে বুক খাদের গভীরতা দেখে। হাজারও নাম না জানা গাছ আর লতাগুল্মের ভিড় পাহাড়ের গায়ে গায়ে- প্রকৃতির এ এক আদিম অ-কত্রিম রূপ। নিত্যানন্দ দেখাল দূরে পাহাড়ের বুকে রয়েছে কন্ধমালের   জেংরিয়া উপজাতির মানুষের বাস। জঙ্গল আর পাহাড়ই ওদের জীবন। ভূমির কোলে যথাসম্ভব সভ্যতার ছোঁয়াকে দূরে সরিয়ে রেখে বন্যজন্তুদের সঙ্গে একসঙ্গে আছেন ভূমিপুত্ররা।

ফেরার সময় বাজার থেকে সংগ্রহ করি এখানকার বিখ্যাত রঙবেরঙের ফুলছাপ শাড়ি, ধুতি , চুড়ি, রঙিন  গামছা আর জাঁতায় পেষা গুঁড়ো হলুদ। অন্ধপ্রদেশের গা- ঘেঁষা এই কন্ধমাল জেলায় ঘটেছে পুব আর দক্ষিণের এক অপূর্ব মিশেল। স্থানীয় মানুষজনের খাদ্যাভাস আর বেশভূষাই তার পরিচয়। পরদিন আমাদের ঘরে সবুজেজ আচ্ছাদান, উঁচু-নীচু পাহাড় আর স্থানীয় মানুষজনের উষ্ণ আতিথেয়তাকে পিছনে ফেলে ফিরতে হবে। প্রকতির কোলে কেমন করে যে কেটে গেল তিনটি দিন বুঝতেই পারিনি- একবারও মনে হয় নি বাড়ি ফেরার কথা। এমনি করেই বেশ কয়েক বছর আগে জনৈক প্রকৃতিপ্রেমিক চিকিৎসক এই শান্ত উপত্যকায় বেড়াতে এসে মায়াবী পাহাড়তলির নেশায় বুঁদ হয়ে রয়ে গিয়েছিলেন এখানেই – নামকরন করেছিলেন দারিংবাড়ির। কিন্তু আমাদের উপায় নেই! ফিরতেই হবে। যাত্রা শুরুর আগে শ্রী সোয়াইন পরম যত্নে পেট ভরে খাইয়ে দিলেন – বললেন অনেকটা পথ ফিরতে হবে আপনাদের। কথা দিয়ে বললাম আবার ফিরে আসব এই শান্ত, নিরুপদ্রপ প্রকৃতির মাঝে দুদন্ড জিরিয়ে নিতে।

কীভাবে যাবেনঃ

ফলকনামা এক্সপ্রেস, হাওড়া-যশোবন্তপুর এক্সপ্রেস, করমন্ডল এক্সপ্রেস অথবা হাওড়া-চেন্নাই মেলে চেপে প্রথমে ব্রহ্মপুর। ব্রহ্মপুর থেকে দারিংবাড়ি ১২৫ কিমি। ইকো লজে আগে থেকে বলে রাখলে এরাই গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়। খরচ প্রায় ২৫০০ টাকা।

থাকবার জায়গাঃ

শ্রী অনিল সোয়াইনের ইকো লজ। ৬ টি দ্বিশয্যার কটেজ আছে। ডাইনিং হলে চা, ব্রেকফাস্ট, মধ্যানহ্নভোজ ও নৈশভোজের ব্যবস্থা আছে। বুকিং এবং বেড়ানোর জন্য যোগাযোগঃ ০৯৪৩৮৪-২২৪৫২/ ০৯৮৬১৪-৯৬২৬১

যাবার সময়ঃ

শুধুমাত্র মে মাসের প্রচন্ড গরমে না গিয়ে সারা বছরই যাওয়া যায় এখানে। নভেম্বর-জানুয়ারি এই তিন মাস প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ে এখানে। হাতে সময় থাকলে ফেরার পথে ব্রহ্মপুর থেকে চলে যাওয়া যায় তপ্তপানির উষ্ণ প্রস্রবণ বা চন্দ্রগিরির বিখ্যাত মনাস্ট্রি।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes