jamdani

অথ বাঙালির ‘কাম’ কথা

ডঃ শক্তি রায়চৌধুরী

পর্ব ১

‘হুঁকো মুখো হ্যাংলা বাড়ি তার বাংলা…হ্যাংলার বাড়ি বাংলাতেই কী অর্থে কবি লিখেছেন জানি না। হুঁকোর মতো মুখ, না হুঁকো খেয়ে খেয়ে প্যাংলা… হিউয়েন সাঙ বাঙালির প্রশংসা করেছেন শ্রমসহিষ্ণু, সাহসী, সাধু, অমায়িক, লেখাপড়া শেখবার অদম্য আগ্রহ, অবশ্যই স্থানবিশেষে, কিন্তু এগারো শতকের কাশ্মীর রাজের সভাকবি সেমেন্দ্র দেশোপদেশে বাঙালিকে রূঢ়, অমার্জিত, দেহ ক্ষীণ, ধীরে ধীরে পথ চলেন, থেকে থেকে তাদের দর্পিত মাথাটি এদিক-সেদিক দোলান… হাঁটবার সময় তাদের ময়ূরপঙ্খী জুতোতে মচমচ শব্দ হয়। একটা বাঙালি বাবুর ছবি ভেসে ওঠে বই কী…

এহেন বাঙালির ‘কাম’ চিন্তা কী প্রকারের হতে পারে তা সহজেই অনুমান করতে পারি… এ ব্যাপারে এরা একটু ভীতু বই কী… সেমেন্দ্র আবার বলছেন,’তারা গোপনে গণীকালয়ে গমন করে এবং বেশ্যাদের ফেলে রাখা মদ খায়… ছিঃ ছিঃ… বাঙালি মেয়ের কিন্তু প্রশংসা আমরা পাই। স্বয়ং বাৎস্যায়ন মৃদুভাষিণী কোমলাঙ্গী ও অনুরাগবতী বলে বর্ণনা করেছেন। বাঙালির ছুঁতমার্গের কি প্রয়োজন আছে…? যেখানে খোদ ভারতীয় শাস্ত্রে কামের একজন দেবতাকেই বানিয়ে ফেলা হয়েছে… অথর্ববেদে কাম অর্থে যৌনকাঙ্খা বলা হয়নি, বলা হয়েছে সমস্ত পৃথিবীর মঙ্গলাকাঙ্খা।

 

মৎস্যপুরাণে বলা হয়েছে ব্রহ্মার হৃদয় থেকে কামদেবের জন্ম। ব্রহ্মা স্বয়ং তাঁর বাণে জর্জরিত হয়ে নিজের মেয়ে শতরূপাকে গ্রহণ করেন, আবার এর জন্য কামদেবকেই দায়ী করে রেগে গিয়ে অভিশাপ দেন মহাদেব তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবেন। কামদেব তো হাউমাউ করে কেঁদে-কেটে একাকার করলে- ব্রহ্মার মন নরম হল, শাপমুক্ত হল… কামদেব পরে শ্রীকৃষ্ণের ছেলে হয়ে জন্মাল ইত্যাদি। লে-হালুয়া, ব্রহ্মা নিজে করলেন দোষ, অন্যের ঘাড়ে সে দোষ চাপালেন সবই সম্ভব। রাজনীতির পাওয়ার আছে, ব্রহ্মা বলে কথা। রতি হলেন যৌন আকাঙ্ক্ষার দেবী, দক্ষ নিজের শরীর থেকে ঘামজলসম্ভূতা রতি নাম দিয়ে কামদেবের হাতে দান করলেন… দেবতাদেরও এনার প্রতি খুব দুর্বলতা ছিল… বেশ রগরগে তৃতীয় শ্রেণির সাউথ ইন্ডিয়ান ছবি জমে উঠেছে… ভারতীয় হিন্দুশাস্ত্রে যৌনতাকে কখনই খারাপ ভাবে দেখা হয়নি, মহাভারতে আটটি আনন্দের প্রধান কারণ হিসেবে যা দেখানো হয়েছে, তা সুখজনকও বটে-

“অষ্টবিমানি হর্ষস্য মহাস্থানানি ভারত…

*** পুত্রেণ চ পরিষ্কঙ্গ সন্নিপাতশ্চ মৈথুনে(মহাভারত, প্রজাগরপর্বে ৮৭-৮৯)

আটটি আনন্দের মধ্যে দুটো হল, পুত্রের আলিঙ্গন এবং মৈথুনকালে রেতঃস্খলন (Orgasm) – এই সত্যতাকে কিছুতেই বাঙালি মন মানতে পারেনি। ‘র’ মদ যেমন ডিরেক্ট মুখে নেওয়া যায় না, পুড়ে যায়, জল মিশিয়ে খাওয়া ভাল, যারা খেতে খেতে অভ্যস্ত তাদের কাছে সব সত্যই মঙ্গলময় এবং সুন্দর।

যে বাঙালি পঞ্চইন্দ্রিয়ের সাহায্যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে সংসার সমাজকে দেখে তাঁরা স্থূল সাধারণ বাঙালি এদের জীবন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা, পরিশ্রমী, মেহনতি মানূষ এরা অতিপ্রাকৃত, এদের যৌনচিন্তাও পরিষ্কার। কাজের মেয়েটির সঙ্গে তার রিকশাচালক বরের নিত্য ঝগড়া তাও টাকাপয়সা নিয়েই… তিনটি সন্তান দু’জনেই মারপিট করে, বরটি মদও খায়… তাকে বললাম তোর লজ্জা করে না মাতালটার সাথে থাকিস… শুস কী করে? মেয়েটি বরের হয়ে সাফাই গাইল- দিনরাত রিকশা টানে, মদ না খেলে ঘুম আসবে? হাতে হাতে মারপিট হয়েছে… ঝগড়া তো মুখে মুখে হয়েছে, উতিতে উতিতে তো কিছু হয়নি…’ বাঃ, এরকম অকপটে সুন্দর উত্তর দিতে এরাই পারে- গাল বেয়ে চড়টা আমিই খেলাম- পাড়ার গৌরবাবু লোকটি ভদ্র, পড়াশোনাও জানেন, রেলে চাকরি করেন, মহাভারত নিয়ে প্রচুর পড়াশোনাও করেছেন। জীবনে একজন অন্ধ মহিলাকে সম্বন্ধ করেই বিয়ে করেন। দু’ছেলে-মেয়ের সংসার, কিন্তু প্রতিদিন রাত্রে উনি বেশ্যাপল্লী থেকে ফেরেন সবাই জানে… ছেলে বড় হয়ে মারতে উদ্যত হলে রেগে গিয়ে (আমরা বাঙালিরা ইংরেজি বলি) ইংরেজিতে গালাগালি দেয়, বাবা মার খেতে খেতেও ইংরেজি প্রিপজিশনটা শুধরে দিতে ভোলেননি… স্ত্রী কোনওদিনই অভিযোগ করেননি, অভিমান করলে বলতো তোমার জন্য আমি আছি… বেশ্যাপল্লীর আর পাঁচটা মেয়েরও তো চোখের জল মোছাতে হবে…। এনার যৌনচিন্তাকে কোন শ্রেণীতে ফেলবো পাঠকরাই বিবেচনা করুক…।

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes