jamdani

অথ বাঙালির ‘কাম’ কথা

ডঃ শক্তি রায়চৌধুরী

পর্ব ২

যে বাঙালি ষষ্ঠেন্দ্রিয়, অর্থাৎ মগজের সাহায্যে চিন্তা ও মনন জ্ঞানবৃদ্ধি করেন তারাই বিদ্বজ্জন। সবকিছুই ভেবেচিন্তে করেন, জীববৃত্তিকে আমল দিতে চান না। পেটের খিদে ও যৌনখিদে দুটোকেই ভালর জন্য চেপেচুপে রাখেন… সংযমী হলে বহুদিন বাঁচবেন এ আশায় ‘ভোগের একটা আর্ট’ আছে মনে করেন… মুশকিল এদেরকেই নিয়ে।
পাড়ায় রুটি বানিয়ে সংসার চালায় স্বামী-স্ত্রী। বরটি রুটি সেঁকে আর মহিলাটি নাদুসনুদুস শরীর নিয়ে রুটি বেলে… বেশ একটা সুন্দর ছন্দ আছে… মাঝে মাঝে আঁচল সরে যায় আর তালে তালে শরীরও দোলে… পাড়ার ভেতো বাঙালি রাতারাতি ভাত ছেড়ে রুটি খাওয়া ধরল, কারণ রক্তে চিনির অনুপ্রবেশ, ঘরে নিজের বউ-এর শরীর দেখবে তাও বন্ধ, বড় আলখাল্লা পরে থাকে… বউ তার এতই সচেতন ‘০’ ফিগারে মন দিয়েছে… কৃত্রিম উপায়ে মাংস-মেদ ঝরিয়ে ফেলেছে… বুদ্ধিজীবী বরেদের পক্ষে ভালই হল… ক্লার্ক থেকে শিক্ষক, ডাক্তার, মোক্তার লাইন দিয়ে রুটি নেয়, জুলজুল চোখে রুটিওয়ালি দেখতেই থাকে। হয়তো বা ছোটবেলার কথা ভাবে- মা যেভাবে গরম গরম রুটি, পরোটা বানিয়ে গুড় দিয়ে খাওয়াতেন। ভাগ্যিস বউ রুটি করতে চায়নি…।

এই কামকলাক্রিয়ার ক্ষেত্রে বাঙালি নর-নারীর মধ্যে কে বেশি ইনিসিয়েটিভ, মানে দায়িত্ব নেবে এটাও একটু ভাবার আছে… এক্ষেত্রেও বোধহয় ভীতু বাঙালি হঠাৎ পুরুষসিংহ হয়ে যায়… মেয়েদের আসন সংরক্ষণ কাজে দেয় না… তবে ঘুমকাতুরে পুরুষ হলে ব্যতিক্রমী বাঙালি মেয়েও নিজের প্রাপ্তিটুকু বুঝে নিতে ছাড়ে না… চামড়া, ত্বকের সৌন্দর্য নাকি রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে, সুতরাং ভোলা মহেশ্বর ঘুমিয়ে থাকলে তাকে জাগাতে হবে, অগত্যা বিপরীত রতিক্রিয়া করা যেতে পারে। কালীতন্ত্র অনুসারে শিব শবের মতো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন, তাই তাকে জাগানোর জন্য কালী বিপরীত রতি করেছিলেন… ‘কালের উপর রমণ করেন যিনি তিনিই কালী।’ স্ট্রেস ফ্রি, রিঙ্কল ফ্রি সৌন্দর্যের জন্য বাঙালি মেয়েকে পাশ্চাত্যের মেয়েদের অনুকরণ করতেই হবে। ভ্যাদা মেয়ে হলে চলবে না। সৃষ্টিতত্ত্বের এই সত্যসুন্দরকে মেনে নিতে পারলে কতই না ভাল হত… কোথায় একটা কিন্তু কিন্তু ভাব থেকেই যায়… জীববৃত্তি স্বাভাবিক, খিদে পেলে হাঁকপাঁক করি… যদি শুনি অমুক দিন বনধ হবে… ব্যস, আমরা কীভাবে খাবারের জোগাড় করতে থাকি… সবকিছু কিনে রাখার চেষ্টা করি… পাছে… যদিও সত্যি সত্যি দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা কীভাবে করব বুঝে পাই না।

ঘর ভরতি খাবার আছে, খাবাদের তাগিদ নেই, এমনকি বাড়ির বাচ্চাটাও চুরি করে খাবার খায় না… তার তো ভাগীদার নেই, মাথা ঠান্ডা… চাইলেই খেতে পারবে। স্বামী-স্ত্রী পাশাপাশি আছে, ভোগের সামগ্রী পাশে আছে, ভোগের তাগিদ নেই, আ-মা-র জিনিসটা তো আছে, মাথা ঠান্ডা তৃপ্তিও আছে। মনে হয় কী অতৃপ্তি থেকেই যত বিকৃতির শুরু। খিদের জন্য চিৎকার করলে, রাগারাগি করলে, ‘দাঁড়া দাঁড়া খেতে দিচ্ছি’ বলে মা সন্তানকে শান্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু যৌনখিদের চিৎকারে কে সাড়া দেবে?


বর্তমান বাংলা সমাজে যে অনাচার অজাচার চলছে তাকে কী করে সামলানো যাবে বুঝতে পারাই যাচ্ছে না… অজাচার মানে অজের আচার… দু’রকম অর্থ হতে পারে, ‘অজ’ মানে যার জন্ম হয় না, অর্থাৎ ব্রহ্মার আচরণ- বাবা হয়ে মেয়ের সাথে… হায় এ কী সভ্যতা… আর এক মানে ‘অজ’ ‘ছাগের’ আচরণ… ছাগ নাকি এমন জীব যে জন্মের কিছু পরেই মায়ের সঙ্গে প্রথম সংগম করতে যায়… তাই কামনার প্রতীক হিসেবে তাঁকে বলি দেওয়া হয়। এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে ধোঁয়াশা বা মতানৈক্য থাকলেও সম্প্রতি বয়স্কা মায়ের মতো সন্ন্যাসিনীকে ধর্ষণ করার ঘটনা দ্বিতীয় অজাচারের ঘটনাই সত্য বলে মনে হয়।


কামসর্বস্ব দুনিয়াতে এ এক বিচিত্র অনুভব। ছোটবেলায় প্রথম যখন জানা যায়… তখন কীরকম একটা কষ্ট- এ মা কী কাণ্ড। সিক্সে পড়ুয়া দুই বন্ধুর ঝগড়া… একজনের আটটি ভাই-বোন, আর একজনের তিনটি ভাইবোন, সন্তানের পরিসংখ্যা দিয়ে বাবা-মায়ের চরিত্র কতটা খারাপ তা মাপা হচ্ছে, কারণ তার আগে ফাইভে ‘ছেলেদের মহাভারতে’ পড়া হয়ে গেছে… পৃথিবী থেকে ভারী কী?
– যুধিষ্ঠিরের উত্তর, মা… আকাশের থেকে উঁচু কী- বাবা… সহজিয়া বাউলের ভাষায় আমাদের মনকেও ভাবিয়ে তোলে-
কামে মাতি উভয়েতে শৃঙ্গার করিল সৃষ্টিকালে ভালোমন্দ নাহি বিচারিল, ক্ষণীকের তৃপ্তি হেতু হয়ে মাতোয়ারা মারিল আমারে আর নিজে মরে তারা
**
আমার আসার গরজ কিছু নাহি ছিল,
দু’জনার ইচ্ছায় আমায় আসিতে হইল।

পৃথিবীতে আমরা কী বোঝা? হতাশায় ভোগে বাঙালি- সুন্দর পৃথিবী তো, যৌনতা পাপ কেন হতে যাবে? মনটা তেতো হয়ে যায়… জানি না পৃথিবীতে থাকলে কামসর্বস্ব আর কী কী কলঙ্কের ঘটনার সাক্ষী হতে হবে-

Trending

Most Popular


Would you like to receive notifications on latest updates? No Yes